ঢাকা সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৬ আশ্বিন ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

বইয়ের বিকল্প কিছু নেই

মো. মারুফ রহমান
বইয়ের বিকল্প কিছু নেই

খুব বেশি দিন আগের কথা নয় যে সময় মানুষের অবসরের অন্যতম সঙ্গী ছিল বই। দিনের ব্যস্ততা শেষে অবসরে কেউ হয়তো কাজী নজরুল ইসলামের সাড়া জাগানো উপন্যাস, কবি জসীমউদ্দিনের ভাষায় গ্রামের অপরুপ সৌন্দর্যের কবিতা কিংবা শরৎচন্দ্রের উপন্যাস খুলে পড়তে বসতেন, কেউ ইতিহাসের পাতায় ডুব দিতেন, আবার কেউ হয়তো কবিতার মর্মভেদী লাইন পড়ে নিজেকে অনুধাবন করার চেষ্টা করতেন। বই শুধু জ্ঞান অর্জনের মাধ্যম নয়; বই চিন্তার অকৃত্রিম সঙ্গী, কল্পনার জগতে বিচরণ করার মতো নিঃশব্দ এক আশ্রয়। কিন্তু সেই জায়গা এখন ক্রমেই জায়গা করে নিচ্ছে স্মার্টফোন। ঘুম থেকে ওঠার পর প্রথমবার স্ক্রিনে চোখ রাখা থেকে শুরু করে ঘুমানোর আগমুহূর্ত পর্যন্ত সবজায়গায় ছোট্ট এই যন্ত্রটি আমাদের জীবনের প্রায় প্রতিটি মুহূর্তের সঙ্গী, স্মার্টফোন ছাড়া কোনোকিছু ভাবাই যেন দুষ্কর। তাই প্রশ্নটা এখন আর শুধু 'মানুষ বই পড়ছে কি না'- এমন নয় বরং এখন সমসাময়িক প্রশ্ন হলো, স্মার্টফোন কি আমাদের দীর্ঘ সময় নিয়ে ফেলছে এবং প্রিয় সঙ্গী বই পড়ার অভ্যাসটিই বদলে দিচ্ছে কি না।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন গবেষণায় মানুষের সময় ব্যবহারের গবেষণা অর্থাৎ ব্যক্তি কিভাবে তার সময় অতিবাহিত করছে, অন্তত এই প্রশ্নটি গুরুত্ব দিয়ে ভাবার কারণ তৈরি করছে। চীনের ২০২৫ সালের জাতীয় পাঠাভ্যাস জরিপে দেখা যায়, দেশটির একজন প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক প্রতিদিন গড়ে ২৪ দশমিক ৬৮ মিনিট মুদ্রিত বই পড়েছেন। বিপরীতে, মোবাইল ফোনের সঙ্গে দৈনিক যোগাযোগের সময় ছিল ১০৯ দশমিক ৫৪ মিনিট। অর্থাৎ বই পড়ার তুলনায় মোবাইল ব্যবহারে সময় ব্যয় হয়েছে প্রায় সাড়ে চার গুণ। ২০২৪ সালেও বই পড়ার সময় ছিল ২৪ দশমিক ৪১ মিনিট, আর মোবাইল ব্যবহারের সময় ১০৮ দশমিক ৭৬ মিনিট। অর্থাৎ এই ব্যবধানটি সাময়িক নয়; বরং একটি স্থায়ী প্রবণতার ইঙ্গিত দেয়। এর থেকেই বোঝা যায় মানুষের বই পড়ার থেকে স্মার্টফোনের প্রতি বেশি আগ্রহ জন্ম নিচ্ছে।

তবে বর্তমান আধুনিক যুগে তথ্য প্রযুক্তির উন্নতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনও ঘটছে- ডিজিটাল মাধ্যম স্মার্টফোন নিজেই এখন বই পড়ার নতুন জায়গা হয়ে উঠছে। চীনের একই জরিপে ২০২৫ সালে ৭৯ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্কের মোবাইল ফোনে পড়ার অভ্যাসের কথা উঠে এসেছে। একই সময়ে ৪৫ দশমিক ৯ শতাংশ মানুষ জানিয়েছেন, তারা এখনও মুদ্রিত বই পড়তেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন; ৩৭ দশমিক ৬ শতাংশের পছন্দ মোবাইল ফোনে পড়া। অর্থাৎ প্রযুক্তির উৎকর্ষতায় বইকে পুরোপুরি সরিয়ে দিচ্ছে না; বরং বই পড়ার মাধ্যমটিই বদলে দিচ্ছে।

এখানেই আলোচনাটি আরও গভীরতর হয়। স্মার্টফোন কি সত্যিই বইয়ের শত্রু? মূলত এই প্রশ্নের জবাব হ্যাঁ বা না দিয়ে সুনির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয়। যে স্মার্টফোনে একজন মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা উদ্দেশ্যহীনভাবে স্ক্রলিং করতে পারেন, আবার অন্যজন সেই ফোনেই একটি ই-বুক পড়তে পারেন, গবেষণাপত্র দেখতে পারেন, অনলাইন লাইব্রেরি ব্যবহার করতে পারেন কিংবা নতুন কোনো বিষয় জানতে ও শিখতে পারেন। সুতরাং সমস্যা প্রযুক্তির উন্নতি স্মার্টফোনের অস্তিত্বে নয়; সমস্যা হলো প্রযুক্তি ব্যবহারের ধরন ও আমাদের মনোযোগের ওপর তার প্রভাব।

তবে বর্তমান তরুণ সমাজের ফোন আসক্তির সমস্যা বেড়েই চলছে, তারা সবচেয়ে বেশি সময় অতিবাহিত করছে সোশ্যাল মিডিয়াতে যেমন: ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার প্রভৃতি মাধ্যমে, যে কারণে বই পড়ার অভ্যাস ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে। আমার সাধারণত বই পড়ি বিনোদনের জন্য নতুন নতুন বিষয়কে জানার জন্য, ইতিহাস, সাহিত্যকর্ম, ধর্মীয়সহ বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে জ্ঞান অর্জনের জন্য। বই পড়া এবং স্মার্টফোন ব্যবহারে আসল পার্থক্য হলো আনন্দ পাওয়ার ধরনে, সহজে কোন কিছু সম্পর্কে জানার ক্ষেত্রে। স্মার্টফোনে খুব দ্রুতই যেকোনো বিষয় জানা যায়। একটি ভিডিও ভালো না লাগলে আরেকটি ভিডিও, এভাবেই ফোন আমাদের মনোযোগ করে নেয়। ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই বারবার নতুন কিছু পাওয়ার সুযোগ থাকে। অন্যদিকে বই পড়ার আনন্দ ধীরে ধীরে তৈরি হয়। প্রথম কয়েক পৃষ্ঠা হয়তো খুব আকর্ষণীয় নাও লাগতে পারে, কিন্তু পড়তে পড়তে গল্প, চরিত্র বা বিষয়টির প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়। তাই বই পড়তে যেমন ধৈর্য দরকার, স্মার্টফোনের অনেক কনটেন্টে তেমন ধৈর্য ধরার প্রয়োজন হয় না। খুব দ্রুতই আমাদের মনোযোগ আকর্ষণ করতে পারে কিন্তু বই পড়ার ক্ষেত্রে মনোযোগ দিতে কিছুটা সময়ের প্রয়োজন হয়। তাই স্মার্ট ফোন ব্যবহারে অতি সহজেতর হওয়ায় মুদ্রিত বই পড়ার পাঠক কমে যাচ্ছে।

তবে স্মার্টফোনের কারণে বই পড়ার অভ্যাস যে একেবারেই কমে যাচ্ছে এমন সিদ্ধান্তেও দ্রুত পৌঁছানো ঠিক হবে না। বরং পরিসংখ্যান বলছে, পাঠাভ্যাসের একটি অংশ মুদ্রিত বই থেকে ডিজিটাল পর্দায় স্থানান্তরিত হচ্ছে। চীনের ২০২৫ সালের জরিপে প্রাপ্তবয়স্কদের মাঝে দেখা যায় গড় মুদ্রিত বই পড়ার পাশাপাশি ডিজিটাল মাধ্যমে পড়ার বিভিন্ন ধরন যেমন: মোবাইল, কম্পিউটার, ই-রিডার, ট্যাব এবং অডিও—আলাদাভাবে উল্লেখযোগ্য জায়গা দখল করে আছে। তাই আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত স্মার্টফোনকে নেতিবাচক মনে করে জীবন থেকে একেবারে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নয়; বরং স্মার্টফোনের এ ব্যবহারকে উদ্দেশ্যপূর্ণ করা। অপ্রয়োজনীয় নোটিফিকেশন বন্ধ করা, নির্দিষ্ট সময়মাফিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করা, পড়ার সময় ফোন দূরে রাখা এবং প্রতিদিন অন্তত কিছু সময় গভীরভাবে বই পড়ার অভ্যাস তৈরি করা। এক্ষেত্রে পরিবারের বড়দেরও ভূমিকা রয়েছে। একটি শিশু যদি ঘরে সারাক্ষণ সবাইকে ফোনে ব্যস্ত থাকতে দেখে, অথচ বই পড়তে না দেখে, তাহলে শুধু তাকে বই পড়ার পরামর্শ দিয়ে পাঠাভ্যাস তৈরি করা কখনো সম্ভব নয়।

লেখক : লোকপ্রশাসন বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত