প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১০ অক্টোবর, ২০২৬
মাছ মানুষের কাছে একটি অতি পরিচিত নাম যদিওবা জলে বসত করে, তবে ঠিকই রোজ দেখা হয় মাছের সাথে বাঙালির ভাতের পাতে। শীতল রক্ত সম্পন্ন যে সব জলচর প্রাণী পাখনার সাহায্যে সাঁতার কাটে, ফুলকার সাহায্যে নিঃশ্বাস গ্রহণ করে গায়ে আঁশ থাকে তাকে মাছ বলা হয়। তবে গায়ে আঁশ নেই এমন কিছু মাছ ও আছে। আসলে মাছ কতো প্রজাতির আছে তা জেনে আমি নিজে ও অবাক হই কারণ জন্ম থেকে এ মাছের কাছেই আমার জীবন জীবীকা, পারিবারিক সূত্রে এখনও আমার নিজের সামুদ্রিক মাছ ধরার ফিশিং বোট আছে পরিবারের বড় ছেলে তাই নবম শ্রেণিতে পড়া অবস্থা থেকে জাল, বোট, মাছ, চিংড়ি ঘের নিয়ে বড় হই। তবে জানতাম ইলিশ, চাঁদা, চুরি, লইট্ট্যা, পোয়া, লাউক্ষা, টোনা, চিংড়ি, মাইট্যা, পুঁটি, চাপিলা, টাকি, অলুয়া, দাঁতিনা, কামিলা, কোরাল, ফাইস্যা, বাটা, তাইল্যা, ছুরি, পাঙ্গাশ, মুছ,শিংসহ আরো কিছু মাছের নাম, কিন্তু বাস্তবে যে হাজার হাজার প্রজাতির মাছ আছে তা জানতাম না। পৃতিবীতে মেরুদণ্ড প্রাণীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রজাতির প্রাণী হলো মাছ। কক্সবাজারের জেলেরা সারা বছর সমুদ্রে মাছ ধরে। জেলেরা ঘর ছেড়ে সমুদ্রে বহুদিন থাকে বলে চাটগাঁইয়া ভাষায় একটি ছড়া প্রচলিত আছে।
'ও জাইল্যা জাল বসাইতে যা
তোর বউএরে বিলাইয়ে নেরগৈ
তঁসা চাইতি যা।'
যারা ফিশিং বোটের মালিক তাদের বহদ্দার সাহেব বলে ডাকে।
মাছ নিয়ে যতোটা আগ্রহ নিয়ে গভীরে যেতে চেয়েছি যেতে যেতে দেখি, যতদুর সমুদ্র নদী ততোদূর যেন মাছের ঘরবাড়ি। সখের বসে নিজের বোট নিয়ে সমুদ্রে মাছ ধরতে গিয়ে গভীর সমুদ্রে ঘূর্ণিঝড়ের মুখোমুখি, মেশিন বিকল হয়ে বোট ভেসে যাওয়া, বোটের তলা ফুটো হয়ে বোট ডুবে যাওয়ার মতো বিপদ থেকে রক্ষা পেয়ে ফিরে আসার গল্প আমার জীবন স্মৃতিতে জমা আছে। খৃষ্ট্রিয় দ্বিতীয় শতক থেকে মাছকে যিশু খৃষ্টের প্রতীক হিসেবে ধরা হয়, অনেকে মাছ খেলে দীর্ঘজীবি হয় ও জ্ঞান বুদ্ধি বাড়ে বলে মনে করে। কথিত আছে সিরিয়ায় একসময় মাছকে প্রবিত্র মনে করে মাছ খেত না, আফ্রিকানদের মধ্যে এমন লোক আছে যাদের মাছ খাওয়া নিষিদ্ধ। তবে ইহুদীদের ধর্ম গ্রন্থ 'তালমুদে' মাছ খাওয়াকে উৎসাহিত করা হয়েছে। গ্রীস ও রোম সাহিত্যে শুশুককে শ্রম, প্রেম ও গতির বলে বর্ণনা করা হয়েছে। জ্যোতিবিদ্যায় মাছ রাশি চক্রের দ্বাদশ চিহ্ন। মাছের পিঠে চড়ে পীর আউলিয়া আগমনের কাহিনি বাংলাদেশে প্রচলিত আছে। পবিত্র কুরআনের বাণী: দরিয়া দুটি এক রূপ নয়, একটির পানি সুমিষ্ট ও সুপেয়, অপরটির পানি লোনা। প্রতিটি হতে তোমরা তাজা গোশত (মাছ) আহার করো এবং আহরণ করো অলংকার (মণি-মুক্তা) যা তোমরা পরিধান করো এবং তোমরা দেখ উহার বুক চিরিয়া নৌযান চলাচল করে যাতে তোমরা তাঁর অনুগ্রহ অনুসন্ধান করতে পারো এবং যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো।' (সুরা-৩৫ ফাতির, আয়াত: ১২)।
সিলাইফবেইস নামের একটি সমুদ্র মৎস্য জরিপ সংস্থা যখন তাদের জরিপ শুরু করে, ধারণা ছিল মাছ প্রজাতির সংখ্যা ২০ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ২৫ হাজারের মধ্যে হবে। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। ফিসবেইজের ইলেকট্রনিক রেজিস্ট্রারে ২০১৪ সালে বিবরণীসহ ৩৩ হাজার ৩০০ প্রজাতি মাছের বিবরণ পাওয়া যায়। আমার জানামতে এখন মাছের প্রজাতির সংখ্যা ৭০ হাজার ছড়িয়ে যাবে। কারন প্রতিবছর গড়ে ৩০০ থেকে ৫০০ নতুন প্রজাতির মাছ পাওয়া যায়। আপনি যখন লেখাটি পড়ছেন, তখন হয়ত আরও কয়েকটি নতুন প্রজাতির মাছ খুঁজে পাওয়া গেছে। তবে পৃথিবীতে মাছের প্রজাতির সংখ্যা ৭০ হাজারের অধিক হলেও বাংলাদেশে মাছের প্রজাতির সংখ্যা হাজারের কিছুটা অধিক সমুদ্রিক মাছের প্রজাতির সংখ্যা ৭৪০, স্বাদু পানির প্রজাতি ২৬৪, মোট ১ হাজার ৬ প্রজাতির মাছের সন্ধান পাওয়া গেছে।
এবার বলব শুঁটকি নিয়ে নিজের দেখা কিছু কথা, মাছ রোদে শুকিয়ে শুঁটকি তৈরি করা হয়, ভোজন রশিক মানুষের অত্যন্ত প্রিয় খাবার শুঁটকি। যে সমস্ত সামুদ্রিক মাছ শুঁটকি করা হয় ছুরী, লইট্যা, চিংড়ি, ফাইস্যা, রূপচাদা, লাউক্যা, কোরাল, মাইট্যা, সুরমা, কামিলা, পোয়া, হাঙ্গর, ইত্যাদি। সমুদ্র উপকূলবর্তী এলাকার মানুষের অন্যতম পেশা মাছ ধরা হলেও পাশাপাশি সমুদ্র থেকে মাছ ধরে শুঁটকি উৎপন্ন করে অনেকে। এক সময় আমার নিজের এলাকা ঘটিভাংঙার চর ও সোনাদিয়া দ্বীপে দেশের সবচেয়ে বেশি শুঁটকি উৎপাদিত হতো কিন্তু এখন সোনাদিয়া দ্বীপে অল্পসল্প তৈরি হয়, আর ঘটিভাংঙা চরে মাত্র কয়েজন মাছ শুঁকায় তবে বর্ষা মৌসুমে গটিভাঙা চরের আগুনের ধোঁয়া দিয়ে শুকানো চিংড়ি খ্বুই মজাদার তাই সারদেশে চাহিদাও প্রচুর। বলতে গেলে কক্সবাজারের নাজিরারটেকে এখন দেশের বৃহত্তম ও সবচেয়ে বেশী শুঁটকি তৈরীর স্থান, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, দুবলারচর, রাঙাবালি, রামপাল, শরন খোলা, মনপুরা ও হাওর অঞ্চলের কিছু শুঁটকি দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে ও রপ্তানি করা হয়। চট্টগ্রামের চাক্তাই দেশের সর্ববৃহৎ শুঁটকির বাজার। সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়ে ও দেশের পোয়া শুঁটকি রপ্তানী হয়। এ পোয়া শুঁটকির প্রধান ক্রেতা সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, হংকং। কক্সবাজারের নুনিয়াছড়াকে পোয়া মাছের জন্য শিল্প এলাকায় বলা হয়, এখন দেশি-বিদেশি মাত্র তিনটি রপ্তানি উপযোগী পোয়া শুঁটকির কারখানা আছে, কারখানায় শুঁটকি ডিহাইড্রেড করে রপ্তানি উপযোগী করা হয়, তিনটির মধ্যে একটির মালিকানায় আমি নিজে যুক্ত, ২০১২ সালের দিকে শুঁটকি উৎপাদনের ২০ টি কারখানা ছিল। নিজেদের মধ্যে মাছ কেনার প্রতিযোগিতায় আর্থিক ক্ষতির সন্মুখীন হয়ে প্রায় শুঁটকি কারখানা বন্ধ হয়ে যায়।
অথচ ২০০৬ থেকে ২০১২ পর্যন্ত প্রতি বছর ডিহাইড্রেড শুঁটকি রপ্তানি করে গড়ে প্রায় ২০০ কোটি টাকা আয় করেছে। শুঁটকি রপ্তানিতে যেসব প্রতিবন্ধকতা রয়েছে সেগুলো দূর করতে পারলে রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা হাজার কোটি টাকার উন্নতি করা যাবে। এবার আমার দেখা আরেকটি মাছের কথা বলছি যার নাম চৌক্ষাপাইস্যা অনেকটা দেখতে ইলিশ মাছের মতো এ মাছের প্রচুর পরিমাণ চাহিদা আছে চায়নাতে, তবে মাছে কোনোপ্রকার বরফ স্পর্শ করা যাবে না, লবণে সংরক্ষণ করে এই মাছ চায়নাদের বিক্রি করা হয়। এ মাছের হয়তো সুপ খায় চায়নিজরা, ২০১৫ সালের দিকে ও টেকনাফ স্থল বন্দর দিয়ে মায়ানমারে রপ্তানি হতো তবে এখন আর হয় না, এখন শুধু চায়নাতে রপ্তানি করা হয়। কক্সবাজারের মাত্র কয়েকটি ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান এ মাছের রপ্তানিতে জোগান দেয় তার মধ্যে আমার নিজের প্রতিষ্ঠানও।
নাপ্পি : ছোট চিংড়ি, মাছ ও অনান্য মাছ রোদে শুকিয়ে শুঁটকি করা হয়। তারপর শুঁটকিগুলোকে কাঠের ঢেঁকিতে চূর্ণ করা হয়। এসব শুঁটকি গুঁড়া রোদে শুকানো হয়। তারপর শুঁটকি গুড়ার সঙ্গে প্রয়োজনমত পানি, লবণ ও অন্যান্য দ্রব্য মিশিয়ে নাপ্পি তৈরি করা হয়। পাহাড়ি ও রাখাইন জনগোষ্ঠীর বেশ জনপ্রিয় খাবার নাপ্পি। এ জনগোষ্ঠী তরকারী ও খাবারের ভিবিন্ন পদে নাপ্পি ব্যবহার করে। সামুদ্রিক ছোটো চিংড়ি যাকে স্থানীয় ভাষায় মিং বলে তা দিয়ে মাছের তীব্র গন্ধ যুক্ত গুলানো ময়দার মতো করো তৈরি করে। এ খাবারটি শুধু কক্সবাজারের চৌফলণ্ডিতে তৈরি হয় তবে এখন মহেশখালীর মুদিরছড়া রাখাইন পল্লীতে ও নাপ্পি তৈরি হয়। নাপ্পির কথা বলতে গিয়ে সুকুমার রায়ের 'খাই খাই'কবিতাটি মনে পড়ল সেখানে কবি ঙাপ্পি বলে উল্লেখ করেছেন।
'ব্যাঙ খায় ফরাসিরা (খেতে নয় মন্দ), বার্মার 'ঙাপ্পি'তে বাপ্ রে কি গন্ধ!
মান্দ্রাজী ঝাল খেলে জ্বলে যায় কণ্ঠ, জাপানেতে খায় নাকি ফড়িঙের ঘণ্ট!
আরশুলা মুখে দিয়ে সুখে খায় চীনারা, কত কি যে খায় লোকে নাহি তার কিনারা।'
পাহাড়িরা নাপ্পিকে সিদল বলে, কবি নজরুল পুতুলের বিয়ে নাটকে নাপ্পি বলে উল্লেখ করেছেন।
আসলে আমাদের মাছে ভাতে বাঙালি বলা হলেও মাথাপিছু সবচেয়ে বেশি মাছ খায় এমন শীর্ষ ২০ দেশের মধ্য বাংলাদেশের নাম নেই, পৃথিবীর মাথাপিছু সবচেয়ে চেয়ে বেশি মাছ খায় দেশের মধ্যে মালদ্বীপের অবস্থান প্রথম, তবে শীর্ষ ২০ মাছ ধরা বা উৎপাদনকারী দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১০ম আর শীর্ষে আছে চীন। মাছ আমদানিতে একক সর্ববৃহৎ বাজার ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের আর দ্বিতীয় বৃহত্তম আমদানিকারক যুক্তরাষ্ট্র। সামুদ্রিক মাছ রপ্তানিতে চীন সবসময় এগিয়ে থেকে শীর্ষ স্থানটি দখলে রাখে বর্তমান বিশ্বে যে পরিমাণ মাছ ধরা হয়, তার এক-তৃতীয়াংশ যায় চীনাদের পাতে। সব দেশে মাছের জন্য বড় কয়েকটি বাজার থাকে, আর পৃথিবীর বড় মাছের বাজারটি জাপানের সেন্ট্রাল টোকিওতে জুকিজি নামক স্থানে, দ্বিতীয় বৃহত্তম বাজার মেক্সিকো সিটির নিউ বিম মার্কেট। টোনা মাছ ও অন্যান্য সামুদ্রিক মাছ বাজারজাত করে সামুদ্রিক মাছের বড় কোম্পানির নাম থাইল্যান্ডের থাই ইউনিয়ন গ্রুপ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসেবে ২০২০ সালে সমুদ্র থেকে উৎপাদিত মোট মাছের পরিমান ১১২ মিলিয়ন মেট্রিক টন আর মিঠাপানি থেকে ৬৬ মিলিয়ন মেট্রিক টন। বাংলাদেশের উৎপাদন ৪৭.৫৯ লক্ষ মেট্রিক টন (২০২১-২২ অর্থ বছরে। মানুষ সমুদ্রের ওপর আজীবন নির্ভর করে বসবাস করে।
কিন্তু যেভাবে নিষিদ্ধ জাল ব্যাবহার করে নিয়ন্ত্রণহীন মাছ শিকার কর সমুদ্রের পরিবেশ ক্ষতি করছে সমুদ্র কি পারবে মানুষের মাছের চাহিদা মেটাতে। ক্ষতিকারক প্রক্রিয়ায় পৃথিবীতে ২০-থেকে ৩০ শতাংশ মাছ ধরা হয়। আমাদের দেশেও এ ক্ষতিকারক প্রতিক্রিয়ায় মাছ ধরা অনেকটা এগিয়ে। ফলে দিনদিন মৎস্য শূন্য হচ্ছে সমুদ্র, আর গরিব গ্রামীণ জেলেরা আয়ের উৎস হারিয়ে ভিড়তে থাকে মাদক চক্রের সাথে কিংবা জলদস্যুতায় সমুদ্র পথে মানবপাচারে যার ফলে সামাজিক কাঠামো ধরে রাখতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
এতক্ষণ মাছ আমাদের খাদ্য তা নিয়ে নিজের দেখা কিছু অভিজ্ঞতা বর্ণনা করার চেষ্টা করেছি কিন্তু মাছের খাদ্য কি! এ প্রশ্নের জবাব সেক্সপিয়ারের পেরিক্লিস নাটকের একটি ব্যঙ্গোক্তি দিয়ে ইতি টানলাম—
প্রথম জেলে : প্রভু আমার বিস্ময় লাগে কিভাবে মাছ জলে বাঁচিয়া থাকে।
দ্বিতীয় জেলে : যেভাবে মানুষ স্থলে বেঁচে থাকে, বড়রা ছোটদের গিলিয়ে খায়...