ঢাকা শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬, ২৬ আশ্বিন ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

মশাবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় সরকারের ভূমিকা

মো. মারুফ রহমান
মশাবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় সরকারের ভূমিকা

গ্রীষ্মের প্রচণ্ড গরমের পর বৃষ্টি নামলে মানুষের মধ্যে এক ধরনের স্বস্তি ফিরে আসে। চারপাশের প্রকৃতিও বদলে যায়। কিন্তু এই স্বস্তির বর্ষাই অনেক সময় নিয়ে আসে নতুন দুশ্চিন্তা। বৃষ্টির পানি জমে থাকে এখানে-সেখানে, আর সেই জমে থাকা পানিকে ঘিরেই বাড়তে থাকে মশার বংশবিস্তার। এর মধ্যে ডেঙ্গু এখন আর শুধু বর্ষাকালের রোগও নয়। বছরের অন্যান্য সময়েও দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা ঘটছে।

আমাদের চারপাশে তাকালেই এর অনেক কারণ চোখে পড়ে। রাস্তার পাশে জমে থাকা পানি, বাড়ির ছাদে পড়ে থাকা কোনো পাত্র, ফুলের টব, পরিত্যক্ত বোতল বা কৌটা, ডাবের খোসা, নির্মাণাধীন ভবনের আশপাশ— ছোট ছোট এসব জায়গায় জমে থাকা পানিই এডিস মশার জন্য যথেষ্ট। আমরা হয়তো সেগুলোকে খুব একটা গুরুত্ব দিই না। কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যেই সেখানে মশার বংশবিস্তার হতে পারে। তারপর কোনো একদিন হঠাৎ জ্বর, শরীর ব্যথা, দুর্বলতা— শুরু হয় হাসপাতালমুখী ছোটাছুটি। কারও ক্ষেত্রে রোগটি সেখানেই থেমে থাকে, আবার কারও জন্য পরিস্থিতি হয়ে ওঠে জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের প্রথমার্ধ পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৪৮ হাজার ছাড়িয়েছে এবং মৃত্যুর সংখ্যা ১৩৯ জনে পৌঁছেছে। চলতি বছরের সেপ্টেম্বরেও ডেঙ্গুর প্রকোপ দ্রুত বাড়ছে। এর আগে ২০২৫ সালে দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ১,০২,৮৬১ জন এবং মারা যান ৪১৩ জন। সংখ্যাগুলো শুধু পরিসংখ্যান নয়; প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একজন মানুষ, একটি পরিবার এবং অনেকের জন্য দীর্ঘদিনের দুশ্চিন্তা।

ডেঙ্গু ভাইরাসজনিত একটি রোগ। সংক্রমিত এডিস মশার কামড়ের মাধ্যমে এটি মানুষের মধ্যে ছড়ায়। এডিস মশার বংশবিস্তারের জন্য বড় কোনো পুকুর বা জলাশয়ের প্রয়োজন হয় না। বাড়ির আশপাশে অল্প পরিমাণ পানি জমে থাকলেও সেখানে মশা জন্মাতে পারে। ফলে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি শুধু হাসপাতাল বা চিকিৎসকের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়; এর সঙ্গে আমাদের বাসাবাড়ি, রাস্তা, ড্রেন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং সামগ্রিক পরিবেশও জড়িত। এখানেই স্থানীয় সরকারের দায়িত্বটা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

একজন মানুষ নিজের বাড়ির আঙিনা পরিষ্কার রাখতে পারেন। নিজের ছাদে পানি জমতে দেন না, ফুলের টব পরিষ্কার রাখেন— এটুকু তার পক্ষে করা সম্ভব। কিন্তু পুরো এলাকার ড্রেন পরিষ্কার করা, রাস্তার পাশে জমে থাকা পানি সরানো, নিয়মিত ময়লা অপসারণ করা কিংবা নির্মাণাধীন ভবনগুলোতে নজর রাখা একজন সাধারণ নাগরিকের একার পক্ষে সম্ভব নয়। এসব কাজের সঙ্গে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদসহ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো সরাসরি যুক্ত। তাই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় সরকারের দায়িত্বকে কোনো আনুষ্ঠানিক কাজ হিসেবে দেখলে চলবে না। মানুষের প্রতিদিনের নিরাপত্তার সঙ্গেই এর সম্পর্ক।

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের প্রথম কাজ হওয়া উচিত মশার জন্মানোর জায়গা কমিয়ে আনা। কোনো এলাকায় কোথায় পানি জমছে, কোন ড্রেন বন্ধ হয়ে আছে, কোথায় নিয়মিত ময়লা ফেলা হচ্ছে— এসব স্থানীয় পর্যায়ে নিয়মিত দেখা দরকার। ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়ার পর লোক দেখানো অভিযান চালানোর চেয়ে আগে থেকেই ঝুঁকিপূর্ণ জায়গাগুলো চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া বেশি কার্যকর। কারণ মশা জন্মানোর পর তাকে মারার চেয়ে জন্মানোর সুযোগটাই বন্ধ করা ভালো। এর সঙ্গে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিষয়টিও খুব গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের শহর কিংবা গ্রাম— যেখানেই হোক, দিনের পর দিন ময়লা পড়ে থাকলে সেখানে প্লাস্টিকের বোতল, কৌটা, পলিথিনসহ বিভিন্ন জিনিসে পানি জমে থাকতে পারে। আর সেই পানিই হয়ে উঠতে পারে মশার প্রজননস্থল। তাই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ মানে শুধু ফগিং করা নয়। নিয়মিত ময়লা অপসারণ এবং পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিত করাও এর একটি বড় অংশ।

জলাবদ্ধতার বিষয়টিও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। বৃষ্টির পর কোথাও পানি কয়েক ঘণ্টার মধ্যে চলে যায়, আবার কোথাও দিনের পর দিন জমে থাকে। বিশেষ করে শহরাঞ্চলে বন্ধ ড্রেন, অপর্যাপ্ত পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে জলাবদ্ধতা তৈরি হলে মানুষের স্বাভাবিক জীবন যেমন ব্যাহত হয়, তেমনি মশার বংশবিস্তারের সুযোগও তৈরি হয়। তাই জলাবদ্ধতা নিরসনকে শুধু নাগরিক দুর্ভোগ কমানোর বিষয় হিসেবে দেখলে হবে না; এটি ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।

মশক নিধনের কথা উঠলেই সাধারণ মানুষের মনে প্রথমে আসে ফগিংয়ের কথা। কোনো এলাকায় ফগিং মেশিনের ধোঁয়া দেখলে অনেকেই মনে করেন, মশা এবার হয়তো কমবে। কিন্তু ফগিং একা ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। মশার জন্মানোর জায়গা যদি আগের মতোই থাকে, তাহলে কিছুদিন পর আবার মশা বাড়বে। তাই ফগিংয়ের পাশাপাশি লার্ভা নিয়ন্ত্রণ, জমে থাকা পানি অপসারণ এবং মশার প্রজননস্থল ধ্বংসের ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। সহজ কথায়, শুধু মশা মারলে হবে না, মশা যেন জন্মাতেই না পারে সেই ব্যবস্থাও করতে হবে।

নির্মাণাধীন ভবন ও পরিত্যক্ত জায়গাগুলোতেও স্থানীয় সরকারের নজরদারি বাড়ানো দরকার। এসব জায়গায় অনেক সময় দিনের পর দিন পানি জমে থাকে। কিন্তু নিয়মিত তদারকি না থাকায় বিষয়টি নজরের বাইরে থেকে যায়। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বিদ্যমান আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। তবে শুধু আইন প্রয়োগ করলেই হবে না; মানুষকে বিষয়টি বোঝাতেও হবে।

সচেতনতার জায়গাটিও তাই খুব গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় সরকার যদি শুধু নিজের কর্মীদের নিয়ে কাজ করে, তাহলে এর পরিধি সীমিত থাকবে। বরং স্থানীয় মানুষকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করলে ফল বেশি পাওয়া সম্ভব। ওয়ার্ড বা মহল্লাভিত্তিক প্রচার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতামূলক কার্যক্রম, স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকদের সম্পৃক্ত করা কিংবা পাড়া-মহল্লায় পরিচ্ছন্নতা অভিযান— এসব উদ্যোগ মানুষের মধ্যে নিজের এলাকার প্রতি দায়িত্ববোধ তৈরি করতে পারে।

তবে ডেঙ্গুর সব দায় স্থানীয় সরকারের ওপর চাপিয়ে দিলেও চলবে না। কারণ একজন নাগরিকের নিজের দায়িত্বও রয়েছে। বাড়ির ছাদে পানি জমে আছে কি না, ফুলের টবে অতিরিক্ত পানি পড়ে আছে কি না, অপ্রয়োজনীয় কোনো পাত্র পড়ে আছে কি না— এসব দেখার দায়িত্ব আমাদেরও। আশপাশে ময়লা না ফেলা এবং অন্যকেও নিরুৎসাহিত করা দরকার। স্থানীয় সরকার যতই কাজ করুক, মানুষ যদি নিজের বাড়ি ও আশপাশের জায়গাটুকু পরিষ্কার না রাখে, তাহলে সেই কাজ পুরোপুরি সফল হবে না।

আরও একটি বিষয় গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে— তথ্য। কোন এলাকায় বেশি রোগী পাওয়া যাচ্ছে, কোথায় মশার প্রজননস্থল বেশি, কোন এলাকায় দীর্ঘদিন জলাবদ্ধতা রয়েছে—এসব তথ্য নিয়মিত সংগ্রহ করা গেলে স্থানীয় সরকার প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পারবে। সব এলাকায় একই ধরনের অভিযান চালানোর পরিবর্তে যেখানে ঝুঁকি বেশি, সেখানে আগে কাজ করা সম্ভব হবে।

এ ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য বিভাগ ও স্থানীয় সরকারের মধ্যে সমন্বয়ও জরুরি। কোনো হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যদি দেখা যায় একটি নির্দিষ্ট এলাকায় হঠাৎ ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়ছে, তাহলে সেই তথ্য স্থানীয় সরকারের কাছে দ্রুত পৌঁছানো দরকার। এরপর ওই এলাকায় মশক নিয়ন্ত্রণ ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম জোরদার করা যেতে পারে। রোগী বাড়ার পর শুধু চিকিৎসা দেওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকলে হবে না; রোগটি ছড়ানোর পরিবেশটাও একই সঙ্গে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

মশক নিয়ন্ত্রণে অর্থ বরাদ্দ ও তার ব্যবহার নিয়েও স্বচ্ছতা থাকা দরকার। কোথায় কত টাকা খরচ হলো, কী ধরনের কার্যক্রম নেওয়া হলো, সেই কাজ আসলে কতটা ফল দিয়েছে— এসব বিষয়ে জবাবদিহি থাকা প্রয়োজন। শুধু কতবার ফগিং করা হয়েছে, সেটি দিয়ে কোনো এলাকার মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম সফল হয়েছে কি না, তা বিচার করা ঠিক হবে না। বরং মশার প্রজননস্থল কমেছে কি না, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা কমেছে কি না— এসব বিষয়ও বিবেচনায় নেওয়া উচিত।

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ কোনো একদিনের অভিযান নয়। বর্ষা এলেই কয়েক দিনের জন্য পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালিয়ে, কিছু এলাকায় ফগিং করে আবার সবকিছু আগের মতো রেখে দিলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। স্থানীয় সরকারকে সারা বছর ধরে পরিকল্পনা করে কাজ করতে হবে। একই সঙ্গে নাগরিকদেরও নিজেদের দায়িত্ব বুঝতে হবে।

শেষ পর্যন্ত ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে লড়াইটা আসলে আমাদের সবার। স্থানীয় সরকারকে তার দায়িত্ব আরও কার্যকরভাবে পালন করতে হবে, আর নাগরিককেও নিজের জায়গা থেকে দায়িত্বশীল হতে হবে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পানি নিষ্কাশন, নিয়মিত নজরদারি, সচেতনতা এবং প্রয়োজনীয় আইন প্রয়োগ— সবকিছুকে একসঙ্গে নিয়ে এগোতে হবে। কারণ একটি মশা হয়তো খুব ছোট, কিন্তু তার কারণে একটি পরিবারের ওপর নেমে আসতে পারে বড় বিপদ। তাই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় সরকারের সক্রিয় ভূমিকার পাশাপাশি নাগরিক অংশগ্রহণই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ।

লেখক : শিক্ষার্থী, লোকপ্রশান বিভাগ

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত