ঢাকা সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬, ২৮ আশ্বিন ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

প্রকৃতির কাছে ফিরতে চায় মানুষ

মাসফিকুল হাসান
প্রকৃতির কাছে ফিরতে চায় মানুষ

একটা সময় ছিল, দিনের শেষে মানুষ ঘরে ফিরত। উঠানে বসত, গাছের নিচে দাঁড়াত, পুকুরপাড়ে কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকত। বিকালের বাতাস, পাতার শব্দ কিংবা দূরের পাখির ডাক— এসবই ছিল জীবনের স্বাভাবিক অংশ। তখন হয়তো কেউ ভাবেনি, প্রকৃতির সঙ্গে এ সহজ সম্পর্ক একদিন মানুষের কাছে বিলাসিতার মতো মনে হবে।

এখন আমাদের দিন শুরু হয় অ্যালার্মের শব্দে, আর শেষ হয় মোবাইলের স্ক্রিনে। ঘুম থেকে উঠে ফোন, পড়াশোনার চাপ, ক্লাস, অফিস, যানজট, কাজের ব্যস্ততা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম— সব মিলিয়ে দিনের বড় একটা সময় কেটে যায় কংক্রিটের দেয়ালের ভেতর। আমরা ব্যস্ত, খুব ব্যস্ত। অথচ এই ব্যস্ততার মাঝেই কোথাও একটা জায়গায় মানুষ বারবার একটু থামতে চায়। তাই সুযোগ পেলেই কেউ চলে যায় নদীর ধারে, কেউ পাহাড়ে, কেউ গ্রামের বাড়িতে, কেউবা কাছের কোনো পার্কে। কেউ গাছের নিচে বসে থাকে, কেউ সবুজের মধ্যে হাঁটে। আবার কেউ শুধু একটা ছবি তোলে— যেখানে আলো এসে পড়েছে পাতার ফাঁক দিয়ে, বাতাসে নড়ছে গাছের ডাল, আর মানুষটি কিছুক্ষণের জন্য শহরের কোলাহল থেকে দূরে।

প্রশ্ন হলো, মানুষ প্রকৃতির কাছে ফিরতে চায় কেন? সম্ভবত এর উত্তর আমাদের জীবনের খুব সাধারণ কিছু অভিজ্ঞতার মধ্যেই লুকিয়ে আছে। শহর আমাদের অনেক কিছু দিয়েছে। শিক্ষা, চিকিৎসা, কর্মসংস্থান, যোগাযোগ, প্রযুক্তি— সবকিছুই শহরকেন্দ্রিক জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। কিন্তু এই শহুরে জীবনেরও একটা মূল্য আছে। যানজট, শব্দ, দূষণ, তাড়াহুড়া, প্রতিযোগিতা এবং সবসময় কিছু একটা করার চাপ মানুষের মনকে ক্লান্ত করে তোলে।

এই ক্লান্তির বিপরীতে প্রকৃতি যেন এক ধরনের নীরব বিরতি। গাছ কথা বলে না। নদী কোনো প্রশ্ন করে না। বাতাস আমাদের কাছ থেকে কোনো জবাব চায় না। পাখির ডাকের জন্য কোনো নোটিফিকেশন আসে না। সূর্যের আলো আমাদের কোনো কাজের ডেডলাইন মনে করিয়ে দেয় না। প্রকৃতি শুধু তার নিজের নিয়মে থাকে। আর হয়তো সেই কারণেই মানুষ সেখানে গিয়ে নিজের ভেতরের অস্থিরতাকে কিছুটা নামিয়ে রাখতে পারে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও শহুরে সবুজ জায়গার সঙ্গে মানুষের স্বাস্থ্য ও সুস্থতার সম্পর্ক নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করেছে। তাদের প্রকাশিত পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, পার্ক, গাছপালা ও অন্যান্য সবুজ স্থান মানসিক প্রশান্তি, শারীরিক কর্মকাণ্ড এবং সামাজিক যোগাযোগের সুযোগ তৈরি করতে পারে; পাশাপাশি শহরের অতিরিক্ত তাপ, শব্দ ও কিছু পরিবেশগত ঝুঁকি কমাতেও ভূমিকা রাখতে পারে। অর্থাৎ প্রকৃতি শুধু চোখের আরাম নয়; মানুষের জীবনযাপনের সঙ্গেও এর সম্পর্ক আছে।

আমরা যখন সবুজের মধ্যে হাঁটি, তখন হয়তো কোনো বৈজ্ঞানিক হিসাব মাথায় থাকে না। আমরা শুধু হাঁটি। পাতার দিকে তাকাই। বাতাস অনুভব করি। কখনও কোনো গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে থাকি। কিন্তু এই সাধারণ কাজগুলোই ব্যস্ত জীবনের মধ্যে একটি বিরতি তৈরি করতে পারে। গবেষণাগুলোর একটি বড় অংশেও সবুজ পরিবেশের সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্য ও সুস্থতার ইতিবাচক সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তবে গবেষকেরা একই সঙ্গে সতর্ক করেছেন— সবুজ জায়গা থাকলেই সবার জন্য একই ধরনের ফল নিশ্চিত হয় না; জায়গাটির মান, নিরাপত্তা, সহজলভ্যতা এবং মানুষের সেখানে যাওয়ার সুযোগও গুরুত্বপূর্ণ। এখানেই আসে আমাদের শহরের আরেকটি গল্প। আমরা শহর তৈরি করছি, কিন্তু শহরের মধ্যে প্রকৃতির জায়গা কতটা রাখছি?

নতুন ভবন উঠছে। রাস্তা প্রশস্ত হচ্ছে। বাজার, শপিংমল, আবাসিক এলাকা বাড়ছে। কিন্তু সেই উন্নয়নের হিসাবের মধ্যে বড় গাছটির জায়গা কতটুকু? শিশুর খেলার মাঠটি কোথায়? বয়স্ক মানুষের হাঁটার জায়গা কোথায়? একজন ক্লান্ত শিক্ষার্থী কোথায় গিয়ে দশ মিনিট চুপচাপ বসবে?

একটি শহর শুধু ভবন, রাস্তা ও যানবাহনের সমষ্টি নয়। একটি বাসযোগ্য শহরের প্রয়োজন খোলা জায়গা, গাছপালা, হাঁটার পরিবেশ এবং মানুষের জন্য নিরাপদ সবুজ স্থান। আমাদের অনেক শহরে সবুজ জায়গা আছে, কিন্তু সেগুলো কতটা সহজলভ্য? কোথাও পার্ক আছে, কিন্তু রক্ষণাবেক্ষণ নেই। কোথাও গাছ আছে, কিন্তু বসার জায়গা নেই। কোথাও মাঠ আছে, কিন্তু সেটি দখলের ঝুঁকিতে। কোথাও জলাশয় ছিল, কিন্তু সেটি হারিয়ে গেছে নগর সম্প্রসারণের চাপে।

ফলে প্রকৃতির কাছে ফেরার ইচ্ছা থাকলেও প্রকৃতির কাছে যাওয়ার সুযোগ কমে যাচ্ছে। আর এই সংকট শুধু শহরের নয়। এটি আমাদের জীবনযাপনেরও সংকট। ছোটবেলায় আমরা অনেকেই গাছ চিনতাম। বৃষ্টির শব্দ শুনতাম। মাঠে খেলতাম। পুকুরে মাছ দেখতাম। গ্রামের রাস্তা দিয়ে হাঁটতাম। গাছের পাতার রং পরিবর্তনও হয়তো আমাদের চোখ এড়িয়ে যেত না। কিন্তু ধীরে ধীরে আমাদের জীবনের বড় অংশ স্ক্রিনের ভেতরে ঢুকে গেছে।

এখন প্রকৃতির সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক অনেক সময় ছবির মাধ্যমে। ফেসবুকে পাহাড়ের ছবি দেখি। ইনস্টাগ্রামে সমুদ্রের ভিডিও দেখি। ইউটিউবে গ্রামের দৃশ্য দেখি। মোবাইলের ওয়ালপেপারে বন দেখি। অথচ নিজের চারপাশের একটি গাছের দিকে তাকানোর সময় আমাদের নেই।

এটা কি অদ্ভুত নয়? আমরা প্রকৃতিকে দেখতে চাই, কিন্তু প্রকৃতির মধ্যে থাকতে চাই না। আমরা সবুজের ছবি সংরক্ষণ করি, কিন্তু সবুজ জায়গা সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা অনেক সময় ভুলে যাই। তবে প্রকৃতির কাছে ফিরে যাওয়া মানে সবকিছু ছেড়ে পাহাড়ে চলে যাওয়া নয়। এর জন্য খুব বড় কোনো আয়োজনও প্রয়োজন নেই।

হয়তো প্রতিদিন কিছুক্ষণ হাঁটা যায়। কাছের মাঠে বসা যায়। ছাদে কয়েকটি গাছ লাগানো যায়। বাসার আশপাশের গাছটি অকারণে কেটে ফেলা হচ্ছে কি না, সে বিষয়ে কথা বলা যায়। একটি শিশুকে গাছের নাম শেখানো যায়। বিশ্ববিদ্যালয় বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের খোলা জায়গাগুলো রক্ষা করা যায়।

ছোট ছোট কাজই প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্ককে আবার স্বাভাবিক করে তুলতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ক্ষেত্রেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। একটি বিশ্ববিদ্যালয় শুধু শ্রেণিকক্ষ, প্রশাসনিক ভবন আর পরীক্ষার হল নয়। শিক্ষার্থীদের বেড়ে ওঠার জন্য সবুজ ক্যাম্পাস, খোলা জায়গা এবং হাঁটার পরিবেশও প্রয়োজন। একটি গাছের নিচে বসে বন্ধুর সঙ্গে কথা বলা, বিকালে মাঠের পাশে হাঁটা কিংবা ক্লাসের ফাঁকে কয়েক মিনিট প্রকৃতির দিকে তাকিয়ে থাকা— এসবও শিক্ষাজীবনের অংশ।

কারণ শিক্ষা শুধু বই থেকে আসে না। চারপাশের পরিবেশও মানুষকে শেখায়। প্রকৃতি আমাদের ধৈর্য শেখায়। একটি গাছ বড় হতে সময় নেয়। একটি নদী নিজের গতিতে চলে। ঋতু বদলায় ধীরে ধীরে। ফুল ফুটতে তার নিজের সময় লাগে। অথচ আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যেখানে সবকিছু দ্রুত চাই। দ্রুত উত্তর, দ্রুত খবর, দ্রুত ফলাফল, দ্রুত সাফল্য।

হয়তো প্রকৃতির কাছে দাঁড়ালে আমরা আবার বুঝতে পারি— সবকিছু দ্রুত হওয়ার প্রয়োজন নেই। জীবনের কিছু মুহূর্ত ধীর হওয়াও দরকার। ছবিটির মানুষটির দিকে তাকালে এমনই একটি অনুভূতি তৈরি হয়। চারপাশে আলো, গাছের ছায়া, বাতাসে নড়তে থাকা পাতা— আর একজন মানুষ যেন কিছুক্ষণের জন্য নিজের ব্যস্ত পৃথিবী থেকে বেরিয়ে এসেছে। ছবিটি তাই শুধু সৌন্দর্যের ছবি নয়; এটি আমাদের জীবনের একটি প্রশ্নও হতে পারে— আমরা শেষ কবে কোনো উদ্দেশ্য ছাড়া প্রকৃতির মধ্যে দাঁড়িয়েছিলাম? শেষ কবে মোবাইল হাতে না নিয়ে গাছের দিকে তাকিয়েছিলাম? শেষ কবে কোনো গন্তব্য ছাড়াই হাঁটতে বের হয়েছিলাম? শেষ কবে প্রকৃতিকে শুধু ছবি তোলার বিষয় হিসেবে না দেখে অনুভব করেছিলাম? হয়তো আমাদের সবারই মাঝে মাঝে একটু থামা দরকার।

কারণ প্রকৃতির কাছে ফেরা মানে শুধু গাছের কাছে ফেরা নয়। এটি নিজের কাছেও ফিরে আসা। শহর আমাদের প্রয়োজন। প্রযুক্তিও আমাদের প্রয়োজন। উন্নয়নও প্রয়োজন। কিন্তু সেই উন্নয়নের ভেতর যদি মানুষের নিঃশ্বাস নেওয়ার জায়গা না থাকে, তাহলে উন্নয়নের অর্থ নিয়েও নতুন করে ভাবতে হয়।

আমাদের শহরগুলো এমন হতে পারে, যেখানে ভবনের পাশাপাশি গাছ থাকবে; রাস্তার পাশাপাশি হাঁটার জায়গা থাকবে; ব্যস্ততার পাশাপাশি বিশ্রামের সুযোগ থাকবে। শিশুরা স্ক্রিনের পাশাপাশি মাঠ চিনবে, তরুণেরা কফিশপের পাশাপাশি গাছের ছায়াও খুঁজবে, আর বয়স্ক মানুষ নিরাপদে হাঁটতে পারবেন সবুজ কোনো পথে। প্রকৃতি আমাদের কাছে ফিরে আসবে না— আমাদেরই প্রকৃতির কাছে ফিরতে হবে।

হয়তো কোনো এক বিকালে, ব্যস্ততার মাঝখান থেকে আমরা একটু সময় বের করব। ফোনটা পাশে রাখব। কোনো গাছের নিচে দাঁড়াব। বাতাসকে অনুভব করব। পাতার শব্দ শুনব। তখন হয়তো বুঝতে পারব, এতদিন আমরা যে শান্তিটা খুঁজছিলাম, সেটি হয়তো খুব দূরে কোথাও ছিল না। ছিল আমাদের চারপাশেই— একটু সবুজের মধ্যে।

লেখক ও শিক্ষার্থী

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় রংপুর

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত