ঢাকা মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬, ৫ কার্তিক ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

স্ক্রিনে সংযুক্ত বাস্তবে বিচ্ছিন্ন

মুহিবুল হাসান রাফি
স্ক্রিনে সংযুক্ত বাস্তবে বিচ্ছিন্ন

সকালে ঘুম ভাঙে স্মার্টফোনের অ্যালার্মে, দিনের শুরু নোটিফিকেশনে, আর রাত শেষ হয় পর্দায় চোখ রেখে। একই ঘরে বসে থাকা মানুষগুলোও যেন ভিন্ন ভিন্ন জগতে বাস করে। কারও আঙুল ব্যস্ত স্ক্রল করতে, কারও চোখ নতুন বার্তার অপেক্ষায়, অথচ পাশের মানুষটির সঙ্গে কয়েক মিনিট কথা বলার সময় নেই। প্রযুক্তি দূরের মানুষকে কাছে এনেছে, কিন্তু কাছের মানুষের সঙ্গে দূরত্বও বাড়িয়েছে। এটাই আমাদের সময়ের এক নীরব বৈপরীত্য স্ক্রিনে সংযুক্তি বাড়ছে, বাস্তব জীবনে কমছে সংযোগ। ডিজিটাল প্রযুক্তি যোগাযোগ, শিক্ষা, তথ্যপ্রাপ্তি ও কর্মক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। প্রবাসী স্বজনের সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলা কিংবা জরুরি মুহূর্তে দ্রুত তথ্য আদান-প্রদান এখন সহজ। সমস্যা প্রযুক্তিতে নয়, এর অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারে। যে মাধ্যম যোগাযোগ সহজ করার কথা, সেটিই যখন মানুষের সময়, মনোযোগ ও সম্পর্কের ওপর আধিপত্য বিস্তার করে, তখন সুবিধা সংকটে রূপ নেয়।

যোগাযোগ বাড়ছে, কথোপকথন কমছে : সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বন্ধুর সংখ্যা বাড়ছে, প্রতিদিন অসংখ্য বার্তা আদান-প্রদান হচ্ছে। কিন্তু বিপদের দিনে পাশে দাঁড়ানোর মতো মানুষের সংখ্যা কি একই অনুপাতে বাড়ছে? কারও ছবিতে প্রতিক্রিয়া জানানো সহজ, অথচ তার মন খারাপের কারণ জানতে চাওয়া কঠিন। অভিনন্দন জানাতে একটি ইমোজিই যথেষ্ট, কিন্তু দুঃসময়ে পাশে বসে কথা বলার সময় বের করা কঠিন হয়ে পড়ছে। অনলাইনে উপস্থিতি সহজ; সম্পর্কের দায় বহন করা কঠিন। একটি সম্পর্ক টিকে থাকে বিশ্বাস, সহমর্মিতা ও পারস্পরিক মনোযোগে। শুধু বার্তা বিনিময়ে এসবের বিকল্প তৈরি হয় না। ভার্চুয়াল জগতে মানুষ নিজের পছন্দমতো পরিচয় তুলে ধরতে পারে, কিন্তু বাস্তব সম্পর্ক দাবি করে দুর্বলতা ও সীমাবদ্ধতা নিয়েও অকপট হওয়ার সাহস। ফলে পরিচিতির পরিধি বাড়লেও গভীর সম্পর্কের জায়গা সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

একই ছাদের নিচে আলাদা জগৎ : পরিবার মানুষের সামাজিকীকরণের প্রথম প্রতিষ্ঠান। অথচ অনেক পরিবারে একসঙ্গে খাবার খেতে বসেও প্রত্যেকে নিজের ফোনে ব্যস্ত থাকেন। বাবা-মা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে, সন্তান ভিডিও বা গেমে। কথোপকথন সীমাবদ্ধ থাকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা ও দৈনন্দিন কাজের মধ্যে। একই ছাদের নিচে থেকেও একে অপরের অনুভূতি সম্পর্কে অজ্ঞ থেকে যাওয়ার প্রবণতা বাড়ছে।শিশুরা শুধু উপদেশ শুনে নয়, বড়দের আচরণ দেখেও শেখে। অভিভাবক যদি প্রতিটি অবসরে ফোনে ডুবে থাকেন, তাহলে সন্তানকে স্ক্রিন ব্যবহারে সংযত হতে বলার নৈতিক ভিত্তিও দুর্বল হয়। তাই সন্তানকে নিয়ন্ত্রণের আগে বড়দের নিজেদের অভ্যাস পর্যালোচনা জরুরি। পরিবারের সম্পর্ক রক্ষায় নিষেধাজ্ঞার চেয়ে কার্যকর হতে পারে একসঙ্গে সময় কাটানো এবং মনোযোগ দিয়ে কথা শোনার সংস্কৃতি।

তুলনার পর্দায় আত্মপরিচয়ের সংকট : সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাধারণত জীবনের নির্বাচিত, আকর্ষণীয় অংশটুকুই তুলে ধরা হয়। সাজানো ছবি, ভ্রমণ, সাফল্য ও আনন্দঘন মুহূর্ত দেখে অন্যের জীবনকে নিখুঁত মনে হতে পারে। নিজের বাস্তবতার সঙ্গে সেই প্রদর্শিত জীবনের তুলনা করতে গিয়ে কেউ কেউ নিজের অর্জনকেও তুচ্ছ ভাবতে শুরু করেন। কৈশোর ও তরুণ বয়সে এ প্রবণতা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কতজন ছবি পছন্দ করল, কতজন মন্তব্য করল কিংবা কে উত্তর দিল এসবের ওপর নিজের গুরুত্ব নির্ধারণের অভ্যাস আত্মবিশ্বাসকে অন্যের স্বীকৃতিনির্ভর করে তুলতে পারে। অথচ মানুষের মূল্য অনুসারীর সংখ্যা কিংবা একটি পোস্টের জনপ্রিয়তায় নির্ধারিত হয় না।

সততা, দায়িত্ববোধ, দক্ষতা ও সম্পর্কের গভীরতাই মানুষের পরিচয়ের প্রকৃত ভিত্তি। তবে অনলাইনে সক্রিয় থাকলেই কেউ একাকী এমন সিদ্ধান্তও ভুল। ডিজিটাল মাধ্যম অনেকের জন্য বন্ধুত্ব ও সহযোগিতার কার্যকর ক্ষেত্র। সংকট তৈরি হয় যখন অনলাইন উপস্থিতি বাস্তব সম্পর্কের বিকল্প হয়ে দাঁড়ায়, কিংবা এর ব্যবহার দৈনন্দিন দায়িত্ব ও প্রয়োজনীয় কথোপকথনে বাধা সৃষ্টি করে।

মনোযোগের বাজারে মানুষের সময় : ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে অবিরাম স্ক্রল, ধারাবাহিক ভিডিও ও তাৎক্ষণিক নোটিফিকেশন ব্যবহারকারীর মনোযোগ ধরে রাখার সুযোগ তৈরি করে। প্রয়োজনীয় তথ্য খুঁজতে ফোন হাতে নিয়ে কখন যে আধা ঘণ্টা পার হয়ে যায়, অনেকেই টের পান না। ক্ষতি শুধু সময়ের নয়; বারবার মনোযোগ ভাঙলে পড়াশোনা, কাজ ও সরাসরি কথোপকথনও ব্যাহত হতে পারে। কেউ কথা বলার সময় বারবার ফোনের পর্দায় তাকানোকে অনেকে নিছক অভ্যাস মনে করেন। কিন্তু এতে সামনের মানুষটি অবহেলিত বোধ করতে পারেন। সম্পর্কের ক্ষেত্রে মনোযোগও একধরনের সম্মান। কারও পাশে বসে থাকা আর তাকে মন দিয়ে শোনা এক বিষয় নয়। উপস্থিতি তখনই অর্থবহ হয়, যখন তাতে মনও উপস্থিত থাকে।

সমাধান প্রযুক্তিবিমুখতা নয়, সচেতন ব্যবহার : এ সংকট মোকাবিলায় স্মার্টফোন বর্জন বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পুরোপুরি বন্ধ করা জরুরি নয়। প্রয়োজন ব্যবহারে সংযম ও স্পষ্ট সীমারেখা। খাবারের সময় ফোন দূরে রাখা, পরিবারের জন্য নির্দিষ্ট সময় রাখা, ঘুমের আগে অপ্রয়োজনীয় স্ক্রিন ব্যবহার কমানো এবং কথোপকথনের সময় নোটিফিকেশন বন্ধ রাখা ছোট এসব অভ্যাস সম্পর্কের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাশ তৈরি করতে পারে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও প্রযুক্তি ব্যবহারের দক্ষতার পাশাপাশি ডিজিটাল শিষ্টাচার, তথ্য যাচাই ও দায়িত্বশীল আচরণ শেখানো জরুরি। পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে শুধু নিষেধাজ্ঞা নয়, বাস্তব উদাহরণের মাধ্যমে বোঝাতে হবে প্রযুক্তি জীবনের সহায়ক, জীবনের বিকল্প নয়।

লেখক : শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজ

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত