প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ২১ অক্টোবর, ২০২৬
বর্তমান বিশ্বে প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির ফলে শিক্ষাব্যবস্থায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে জটিল জটিল বিষয়গুলো কয়েক সেকেন্ডে সমাধান বিশ্বজুড়ে শিক্ষা ব্যবস্থাকে ভিন্ন রূপে উপস্থাপন করছে। ২০১৯ সালের করোনা মহামারির সময় শিক্ষাব্যবস্থার ধারাবাহিকতা রক্ষায় অনলাইন শিক্ষা ছিল জরুরি বিকল্প ব্যবস্থা। বর্তমানে অনলাইন শিক্ষা শুধু বিকল্প ব্যবস্থা নয় বরং আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার স্থায়ী অংশ হয়ে ওঠেছে। অনলাইন শিক্ষা প্রথাগত শিক্ষাব্যবস্থার ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা ভেঙে দিয়েছে।
স্মার্টফোন, কম্পিউটার ও বিভিন্ন ডিভাইসের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা ঘরে বসে সরাসরি শ্রেণিকক্ষে উপস্থিত না থেকেও ভিডিও ক্লাস, অনলাইন পরীক্ষা, ডিজিটাল লাইব্রেরি ও ভার্চুয়াল আলোচনার মাধ্যমে জ্ঞান অর্জনের সুযোগ তৈরি হয়েছে। ভিডিও লেকচার, উন্মুক্ত কোর্স, ভার্চুয়াল ল্যাব আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত শিক্ষণ সহায়ক শেখার ধরনটাই বদলে দিচ্ছে। প্রত্যন্ত অঞ্চলের একজন শিক্ষার্থীও আজ মোবাইল ফোনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত বিভিন্ন লার্নিং প্ল্যাটফর্ম প্রতিটি শিক্ষার্থী নিজস্ব শেখার গতি এবং মেধা অনুযায়ী পাঠ্যসূচি নির্ধারণ করতে পারছে যা পারসোনালাইজড লার্নিং বা ব্যক্তিগত শিক্ষার বিস্তার ঘটছে।
ভিডিও অ্যানিমেশন, ভার্চুয়াল রিয়েলিটি এবং সিমুলেশনের মাধ্যমে জটিল বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব বা মহাকাশের রহস্য এখন চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে উঠছে। সময় ও দূরত্বের এ স্বাধীনতা অনলাইন শিক্ষাকে চাকরিজীবী বা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন বা সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের কাছে পরম আশীর্বাদ। প্রযুক্তি শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা ও গবেষণামূলক চিন্তাভাবনা বিকাশ সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। বিভিন্ন অনলাইন প্লাটফর্ম ফ্রী কোর্স থাকায় কোনোরকম পে ছাড়াই অনেক শিক্ষার্থী সহজেই পাঠ্যবই এর সিলেবাস সম্পূর্ণ করতে পারছে। তাছাড়া প্রজেক্ট, প্রেজেন্টেশন কিংবা এসাইনমেন্ট করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। উচ্চ শিক্ষাগ্রহণের প্রাথমিক গবেষণামূলক কাজ প্রযুক্তির সহায়তায় শিক্ষার্থী নিজেই করতে পারছে।
স্পোকেন ইংলিশ, আইইএলটিএস এর মতো জটিল বিষয়ও অনলাইন কোর্সের মাধ্যমে ঘরে বসেই করতে পারছে। অনলাইন বিভিন্ন বিষয়কেন্দ্রিক অলিম্পিয়াডে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীরাও অংশগ্রহণ করতে পারছে। জাতীয় পর্যায় ছাড়াও আন্তর্জাতিক পর্যায়েও অনলাইনে বিভিন্ন শিক্ষা কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করে দেশকে রিপ্রেজেন্ট করছে। তবে এত সুযোগ সম্ভাবনার উল্টো পিঠে রয়েছে কিছু ভিন্নরকম বাস্তবতা। শিক্ষা শুধু কিছু তথ্য মুখস্থ করা বা স্ক্রিনে ভেসে ওঠা পরীক্ষা দেওয়া নয়। শিক্ষা হলো সার্বিক মানবিক প্রক্রিয়া। প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা এবং বাস্তব শ্রেণীকক্ষের পার্থক্য এখানেই। শ্রেণীকক্ষ হলো সমাজিক প্রতিষ্ঠান।
এখানে সমাজে বা পরিবারে ভিন্নভাবে বেড়ে উঠা একঝাঁক শিক্ষার্থীর মিলনমেলা ঘটে। তারা একে অপরের সঙ্গে কথা বলা, শেয়ার করতে শেখা, মতভেদ এবং অন্যের মতামত মেনে নেওয়া বা সম্মান করা শিখে। দলগত কাজ, খেলাধুলা এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে একজন শিক্ষার্থীর মধ্যে সহমর্মিতা, সহনশীলতা, নেতৃত্বগুণ এবং দায়িত্ব নিয়ে কাজ করা শেখে। স্ক্রিনের ওপারে বসে জুম বা গুগলের ভিডিও কলে এই সামাজিক ও মানসিক বিকাশ কখনও সম্ভব নয়। মহামারি করোনাকালীন দীর্ঘদিনের অনলাইন ক্লাস প্রতীয়মান শিক্ষার্থীরা তীব্র মানসিক একাকিত্ব এবং মনোযোগের অভাবে ভুগেছে। এর পাশাপাশি রয়েছে শিক্ষকের মানবিক স্পর্শ বা 'হিউম্যান টাচ'।
শ্রেণিকক্ষের চার দেয়ালের ভেতরের পাঠদান শুধু মুখস্থ বিদ্যার আদান-প্রদান নয় বরং একজন আদর্শ শিক্ষকের জাদুকরি স্পর্শে শিক্ষার্থীর মনের ভেতরের সুপ্ত প্রতিভা বিকশিত হতে শুরু করে। ভয় আর দ্বিধায় গুটিয়ে থাকা একজন শিক্ষার্থী যখন শিক্ষকের সামান্য একটু সহানুভূতি বা স্নেহের পরশ পায়, তখন সে নিজের ভেতরের অদম্য ও অদৃশ্য স্পৃহা জাগিয়ে তোলার সাহস পায়। শিক্ষক কেবল পাঠ্যপুস্তক বা প্রাতিষ্ঠানিক পাঠদানের গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় বরং তারা হলেন এমন পথপ্রদর্শক যারা শিক্ষার্থীর ভেতরের সম্ভাবনাকে জাগিয়ে তোলেন এবং তাকে একজন সৎ, মানবিক ও মূল্যবোধসম্পন্ন আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে সাহায্য করেন।
এ বাস্তবিক শিক্ষা কোনো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা অনলাইন প্লাটফর্ম এর পক্ষে দেওয়া সম্ভব নয়। এছাড়া বিজ্ঞান, চিকিৎসা, সহশিক্ষামূলক কাজ কিংবা কারিগরি শিক্ষার মতো বিষয়গুলো স্কিনের পর্দার মাধ্যমে যথাযথভাবে সম্পন্ন করা কঠিন। তাছাড়া মনোযোগ ধরে রাখার সমস্যা বিশ্বজুড়েই দেখা যায়। পেনসিলভেনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় কোর্সেরা-র ১৬টি কোর্সে নিবন্ধিত ১০ লাখ ব্যবহারকারীকে দেখা হয়েছে। তাতে কোর্স শেষ করার গড় হার মাত্র ৪ শতাংশ আর নিবন্ধিতদের প্রায় অর্ধেক শিক্ষার্থী একটি মাত্র লেকচার দেখেছেন। আরেকটি গবেষণায় ২৯টি কোর্সে গড় সমাপ্তির হার ছিল ৬.৮ শতাংশ। পরে ২২১টি কোর্স নিয়ে হওয়া বিশ্লেষণে মধ্যমান ১২.৬ শতাংশে উঠেছে, তবু অধিকাংশ শিক্ষার্থী শেষ পর্যন্ত থাকেনি। স্কিনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থেকে একজন শিক্ষার্থীর পক্ষে মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন। যেখানে এক ক্লিকেই গেম বা ভিডিওর জগতে চলে যাওয়ার সুযোগ থাকে।
গবেষণায়ও দেখা গেছে, অনলাইন কোর্সে ঝরে পড়ার হার সরাসরি শ্রেণিকক্ষের তুলনায় অনেক বেশি। শিক্ষার্থীর মানসিক বিকাশ ও সামাজিকীকরণে দীর্ঘ সময়ের স্ক্রিননির্ভরতা ক্ষতিকারক করোনা মহামারি পরবর্তী সময়ে ভয়াবহ আকারধারণ করেছে। এ অতিরিক্ত স্কিননির্ভরতা মেজাজ খিটখিটে বা নিজে নিজে বিস্তর চিন্তা-ভাবনায়ও বিরূপ প্রভাব ফেলছে। তাছাড়া এর সঙ্গে যুক্ত আছে মূল্যায়নে সততার প্রশ্ন। অনলাইন পরীক্ষায় শিক্ষার্থী দেখে দেখে পরীক্ষা দিচ্ছে কি না যাচাই করা কঠিন, অনলাইন মাধ্যমে একজন শিক্ষার্থী আসলে কতটুকু শিখেছে, তা যাচাই করা আরও জটিল হয়ে পড়ছে।
তাই বর্তমান সময়ে অনলাইন শিক্ষা ও প্রচলিত শ্রেণিকক্ষের মধ্যে প্রতিযোগিতা সৃষ্টি না করে সমন্বয় গড়ে তোলা প্রয়োজন। প্রযুক্তিকে শ্রেণিকক্ষের সম্পূর্ণ বিকল্প হিসেবে দাঁড় করানো সঠিক পদ্ধতি নয় বরং এটি হওয়া উচিত শ্রেণিকক্ষের সবচেয়ে শক্তিশালী সহযোগী। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ডিজিটাল অবকাঠামো উন্নয়ন, সাশ্রয়ী ইন্টারনেট নিশ্চিতকরণ এবং দরিদ্র শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় ডিভাইস সরবরাহে সরকারের কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি শিক্ষকদের প্রযুক্তিনির্ভর পাঠদান, ডিজিটাল মূল্যায়ন এবং শিক্ষার্থীদের অনলাইন নিরাপত্তাবিষয়ে প্রশিক্ষণ দিতে হবে।
পাঠ্যবিষয়ের ধরন অনুযায়ী সরাসরি পাঠদান ও অনলাইন শিক্ষার সমন্বয়ে মিশ্র শিক্ষাব্যবস্থা চালুকরণ নিশ্চিত করতে হবে। তাত্ত্বিক পাঠের জন্য ডিজিটাল উপকরণ ব্যবহার করা হলেও ব্যবহারিক শিক্ষা, দলগত আলোচনা ও মূল্যবোধ বিকাশে শ্রেণিকক্ষকে গুরুত্ব দিতে হবে। অভিভাবকদেরও শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তি ব্যবহারের সময় ও পড়াশোনার পরিবেশের প্রতি নজর রাখতে হবে। ভবিষ্যতের শিক্ষাব্যবস্থায় প্রযুক্তি ও শ্রেণিকক্ষকে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয় বরং পরিপূরক হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। সবার জন্য সমান সুযোগ, মানসম্মত পাঠদান এবং প্রযুক্তির দায়িত্বশীল ব্যবহারের সমন্বয় ঘটলেই অনলাইন শিক্ষার সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ নেবে।
প্রযুক্তি শ্রেণিকক্ষকে আরও আধুনিক, কার্যকরী ও আকর্ষণীয় করার মাধ্যম। প্রযুক্তি শিক্ষার পরিসর বাড়াতে পারে, তবে শিক্ষকের মানবিক নির্দেশনা, সহপাঠীদের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া এবং শ্রেণিকক্ষের সামগ্রিক অভিজ্ঞতার পূর্ণ বিকল্প হতে পারে না। প্রযুক্তি ও শ্রেণিকক্ষ এই দুই প্রক্রিয়ার সমন্বয় সঠিকভাবে কাজে লাগানোর মাধ্যমে আগামী প্রজন্মের জন্য উন্নত বিশ্বের সঙ্গে সমানগতিতে এগিয়ে যাওয়ার মতো কার্যকর ও মানবিক শিক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিতকরণ সম্ভব।
লেখক : শিক্ষার্থী, রসায়ন বিভাগ
ইডেন মহিলা কলেজ