ঢাকা শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ৮ কার্তিক ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

বন্য প্রাণীর আবাস দখল

আকতিয়া আক্তার
বন্য প্রাণীর আবাস দখল

চলতি বছরে টিবিএস এর প্রতিবেদন অনুযায়ী ২৩ শে জুলাই রাতে চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার পুকুরিয়া এলাকায় বন্যহাতি লোকালয়ে ঢুকে পড়ে। ফলে স্থানীয়দের মনে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। গত ১ দশকে বন্যহাতি আক্রমণে বাঁশখালীতে ১৩ জন মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। শুনে মনে হচ্ছে হাতি হয়তো হিংস্র হয়ে উঠেছে। কিন্তু বিষয়টি মোটেও সেরকম নয়। বন বিভাগ ও বিশেষজ্ঞদের মতে নির্বিচারে বৃক্ষচ্ছেদনের কারণে বনভূমি বৃক্ষ ও পাহাড়শূন্য হয়ে পড়া এবং তীব্র খাদ্য সংকটের কারণে হাতি মানব বসতিতে ঢুকে পড়ছে। গভীরভাবে চিন্তা করলে বোঝা যায় আমরাই তার ঘর কেড়ে নিয়েছি। আমরা প্রতিনিয়তই সভ্যতার অগ্রগতির গল্প লিখে চলেছি। মানব জীবনকে সহজ ও গতিশীল করতে এ অগ্রগতি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু যদি এ সাফল্যের আড়ালে বন উজাড় হয়ে বন্যপ্রাণীদের আবাসস্থল হারিয়ে যায় এবং প্রকৃতি তার ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে তাহলে প্রশ্ন উঠতে পারে যে নিরীহ প্রাণীদের বিলুপ্তির মুখে ঠেলে দিয়ে কেমন পৃথিবী গড়ছি আমরা। ২০২৬ সালের ৮ অক্টোবর প্রকাশিত ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ফান্ড ফর নেচার এর সর্বশেষ লিভিং প্লানেট রিপোর্ট অনুযায়ী ১৯৭০ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত ৩৫০০০ এরও বেশি জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত প্রায় ৬০০০ পর্যবেক্ষণাধীন মেরুদন্ডী প্রজাতির সংখ্যা গড়ে ৭৩% পর্যন্ত হ্রাস পেয়েছে।

প্রতিবেদনে এরূপ হ্রাসের পেছনে আবাসস্থল ধ্বংস ও অবক্ষয়কে প্রধান হুমকি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এমনকি বাংলাদেশের মতো জীব বৈচিত্র্য সমৃদ্ধ দেশেও একই ঘটনা ঘটছে। একসময় এদেশের নদ-নদী, বনভূমি, হাওর ও সুন্দরবন এলাকা অসংখ্য বন্যপ্রজাতির নিরাপদ আশ্রয়স্থল ছিল। কিন্তু বিভিন্ন কারণে এদেশের প্রাণী প্রজাতির অস্তিত্বও এখন হুমকির মুখে রয়েছে। আইইউসিএন এবং বাংলাদেশ বন অধিদপ্তরের সর্বশেষ 'রেড লিস্ট' অনুযায়ী গত ১০০ বছরে বাংলাদেশ থেকে সম্পূর্ণরূপে হারিয়ে যাওয়া ৩১ টি প্রজাতিকে 'আঞ্চলিকভাবে বিলুপ্ত' হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এর মধ্যে স্তন্যপায়ী প্রজাতি রয়েছে ১১ টি, পাখি ১৯ টি এবং সরীসৃপ প্রজাতি রয়েছে ১টি। এমনকি বর্তমানে ৩৯০ টি প্রাণী প্রজাতি তীব্র ঝুঁকিতে রয়েছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন প্রাণী প্রজাতির বিলুপ্তির পেছনে বন উজার ও বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংস মুখ্য কারণ। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, বসতি স্থাপন, পুনর্বাসন, কৃষি জমির সম্প্রসারণ, শিল্প কারখানা নির্মাণ, এবং সড়ক উন্নয়নের লক্ষ্যে এদেশের প্রাকৃতিক বনভূমি পরিবর্তিত হয়ে বন্য প্রাণীর আবাসস্থল সংকুচিত হয়ে আসছে। ফলে প্রাণীরা তাদের নিরাপদ আশ্রয়, খাদ্য সংগ্রহের ক্ষেত্র ও প্রজননের উপযোগী পরিবেশ হারিয়ে লোকালয়ে প্রবেশ করছে। এমনকি ?বাংলাদেশ বর্তমানে আন্তর্জাতিক বন্যপ্রাণী পাচারের অন্যতম প্রধান 'ট্রানজিট রুট' হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। দ্যা বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড এর প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশে সংগঠিত বন্যপ্রাণী পাচার চক্র ১০ কোটি টাকার বেশি অবৈধ বাণিজ্য পরিচালনা করছে। আবার শিল্প কারখানার বর্জ্য, প্লাস্টিক, রাসায়নিক পদার্থ ও অন্যান্য দূষক পরিবেশের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট করছে। ফলে বিভিন্ন দূষিত পদার্থ প্রাণীর খাদ্য শৃঙ্খলে প্রবেশ করে প্রাণীদের প্রজনন ক্ষমতা হ্রাস, রোগব্যাধি ও মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে। এ ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি, সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রাণীদের আবাসস্থলকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করছে। এরূপ প্রভাব শুধু বন্য প্রাণীর জন্য নয় বরং একটি দেশের প্রাকৃতিক পরিবেশ, অর্থনীতি ও মানবজীবনের ওপর বহুমুখী সংকট সৃষ্টি করে। ক্রমাগতভাবে প্রাণীদের আবাসস্থল সংকুচিত হয়ে যাওয়ার কারণে প্রধান বীজ বিস্তারকারী প্রাণীরা যেমন : চামচিকা, কাঠবিড়ালি ও পাখি হারিয়ে যাচ্ছে। ফলে বনের ভেতরের গাছপালা স্বাভাবিকভাবে বংশবৃদ্ধি করতে না পারায় সামগ্রিক বনাঞ্চল দুর্বল হয়ে পড়েছে। আবার বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম বনাঞ্চলে হাতি করিডোর বেদখল হওয়ার কারণে স্থানীয় কৃষকদের ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ ছাড়া বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত সুন্দরবনের প্রাণী ও আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হলে দেশের জীববৈচিত্র্যের পাশাপাশি বননির্ভর মানুষের জীবিকা ও দেশের পর্যটন শিল্প প্রভাবিত হবে। একই সাথে উপকূলের প্রাকৃতিক সুরক্ষা ব্যবস্থাও দুর্বল হতে পারে। যাইহোক বাংলাদেশ সরকার বন্যপ্রাণীদের আবাসস্থল সংরক্ষণ ও তাদেরকে বিলুপ্তির হাত থেকে বাঁচাতে বিভিন্ন আইন সংস্কার ও প্রযুক্তিগত নজর দাড়ির উপর জোর দিচ্ছে। সরকার পূর্বের আইন সংশোধন করে 'বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) অধ্যাদেশ ২০২৬' জারি করেছে। এর অধীনে বন্যপ্রাণী হত্যা, পাচার এবং বনের সীমানা দখলের শাস্তি ২ থেকে ৭ বছর কারাদণ্ড এবং ভারী জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। সরকার বর্তমানে সুন্দরবনে 'স্মার্ট পেট্রোলিং' চালু করেছে। ফলস্বরূপ সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা ১১৪ থেকে বর্তমানে বেড়ে ১২৫ টি তে পৌঁছেছে। সুন্দর বনে নদী ও সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ড এলাকায় 'ডলফিন কনজারভেশন প্রজেক্ট' এর সুফল পাওয়া গেছে। এতে ডলফিনের মৃত্যুর হার কমে ৩০ শতাংশ এসেছে। এমনকি পার্বত্য চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার বনাঞ্চলে 'এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিম' গঠনের পর থেকে লোকালয়ে হাতির আক্রমণ ও ফসল ধ্বংসের হার আগের চেয়ে কমেছে। যদিও এ প্রকল্প গুলোর মাধ্যমে কিছু ক্ষেত্রে বড় সাফল্য এসেছে তবুও জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের কারণে বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল পুরোপুরি দখলমুক্ত করা এখনো সম্ভব হয়নি।

তাই সম্পূর্ণ সফলতা পেতে সরকারকে আইনি প্রয়োগের কঠোরতা বৃদ্ধি করতে হবে। বন্য প্রাণী প্রকৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাদের অস্তিত্ব রক্ষা মানে মানব অস্তিত্ব রক্ষা করা। তাই এখনই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। নয়তো ভবিষ্যৎ প্রজন্ম অনেক প্রাণীকে কেবল বইয়ের পাতাতেই দেখতে পাবে।

লেখক : শিক্ষার্থী, ইংরেজি বিভাগ, ইডেন মহিলা কলেজ

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত