ঢাকা শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ৮ কার্তিক ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

সড়ক নিরাপত্তায় চাই আইনের কঠোর প্রয়োগ

সড়ক নিরাপত্তায় চাই আইনের কঠোর প্রয়োগ

সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিদিন ঝরছে প্রাণ, পঙ্গুত্ব বরণ করছেন অসংখ্য মানুষ। দুর্ঘটনার পর একটি পরিবারে নেমে আসে অনিশ্চয়তা, আর্থিক সংকট ও দীর্ঘস্থায়ী দুর্ভোগ। অথচ কার্যকর প্রতিরোধব্যবস্থা, ট্রাফিক আইন মেনে চলা এবং দুর্ঘটনাকবলিত ব্যক্তির দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে অনেক প্রাণহানি ঠেকানো সম্ভব। এ বাস্তবতায় প্রস্তাবিত 'সড়ক নিরাপত্তা আইন ২০২৬' নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। তবে আইনের খসড়া তৈরি করাই যথেষ্ট নয়; এর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

প্রস্তাবিত আইনে দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের 'গোল্ডেন আওয়ারে' বিনামূল্যে জরুরি চিকিৎসা, উদ্ধারকারীদের আইনি সুরক্ষা, ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনে ডিমেরিট পয়েন্ট এবং একই অপরাধের পুনরাবৃত্তিতে দ্বিগুণ শাস্তির বিধান রাখার উদ্যোগ ইতিবাচক। একই সঙ্গে সড়ক অবকাঠামোর নিরাপত্তা, গতি নিয়ন্ত্রণ, পথচারীবান্ধব ব্যবস্থা, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং দুর্ঘটনার তথ্য সংরক্ষণে কেন্দ্রীয় ডাটাবেস গঠনের প্রস্তাব সময়োপযোগী।

দীর্ঘদিন ধরে আমাদের সড়ক নিরাপত্তাব্যবস্থায় দুর্ঘটনার পর ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হলেও দুর্ঘটনা প্রতিরোধে সমন্বিত উদ্যোগের ঘাটতি রয়েছে। শুধু চালকের ভুলকে দায়ী করে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। ত্রুটিপূর্ণ সড়ক, ঝুঁকিপূর্ণ মোড়, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, অদক্ষ চালক, অতিরিক্ত গতি, অনিয়ন্ত্রিত ওভারটেকিং এবং দুর্বল নজরদারিও দুর্ঘটনার জন্য দায়ী। তাই নতুন আইনে চালক, পরিবহনমালিক, সড়ক নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণকারী সংস্থা এবং সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব সুনির্দিষ্ট করা জরুরি। প্রযুক্তিনির্ভর গতি নিয়ন্ত্রণ, সিসিটিভি ক্যামেরা, স্পিড ক্যামেরা এবং দুর্ঘটনাপ্রবণ স্থান চিহ্নিত করে সংস্কারের উদ্যোগ বাস্তবায়ন করতে হবে। পাশাপাশি চালকদের প্রশিক্ষণ, লাইসেন্স প্রদান ও নবায়ন, যানবাহনের ফিটনেস পরীক্ষা এবং গণপরিবহনের কর্মঘণ্টা নিয়ন্ত্রণে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। আইন প্রয়োগে কোনো ধরনের পক্ষপাত, অনিয়ম কিংবা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ছাড় দেওয়ার সুযোগ থাকা উচিত নয়। দুর্ঘটনাকবলিত ব্যক্তিদের জরুরি চিকিৎসা নিশ্চিত করার প্রস্তাবটি বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে। অর্থের অভাবে কিংবা অগ্রিম টাকা জমা দিতে না পারায় যেন কাউকে চিকিৎসাবঞ্চিত হতে না হয়, সে জন্য হাসপাতালগুলোর দায়িত্ব, চিকিৎসার ব্যয় নির্বাহ এবং সরকারি-বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের সমন্বয় সম্পর্কে সুস্পষ্ট বিধান প্রয়োজন। একই সঙ্গে দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিকে হাসপাতালে নেওয়া সাধারণ মানুষ যেন অযথা পুলিশি হয়রানি বা আইনি জটিলতার শিকার না হন, তা নিশ্চিত করতে হবে। ডিমেরিট পয়েন্ট ও পুনরাবৃত্ত অপরাধে দ্বিগুণ শাস্তির বিধান কার্যকর হলে বেপরোয়া চালকদের মধ্যে আইন মানার প্রবণতা বাড়তে পারে। তবে শাস্তির পাশাপাশি ন্যায়সংগত তদন্ত, নির্ভুল প্রমাণ সংগ্রহ এবং আপিলের সুযোগ নিশ্চিত করাও জরুরি। পথচারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে শুধু তাদের জরিমানা করলেও সুফল মিলবে না; আগে ফুটপাত দখলমুক্ত করা, নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থা এবং পর্যাপ্ত ফুটওভারব্রিজ নির্মাণ করতে হবে।

সড়ক নিরাপত্তা কোনো একক মন্ত্রণালয় বা সংস্থার দায়িত্ব নয়। সরকার, পরিবহন মালিক-শ্রমিক, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ নাগরিক— সবার সম্মিলিত দায়িত্বশীলতা প্রয়োজন। প্রস্তাবিত আইনটি দ্রুত পর্যালোচনা ও অনুমোদনের পাশাপাশি বাস্তবায়নের জন্য পর্যাপ্ত অর্থ, দক্ষ জনবল এবং নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করতে হবে। মনে রাখতে হবে, সড়কে প্রতিটি প্রাণ অমূল্য। নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করা শুধু প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়, এটি নাগরিকের জীবন ও অধিকার রক্ষার অঙ্গীকার।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত