প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ২৭ অক্টোবর, ২০২৬
শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য নির্ধারিত পাঠচক্র শেষ করার বাহিরেও জ্ঞান অর্জন করার সাথে চিন্তাশক্তির বিকাশের মাধ্যম। শেখা বিষয়গুলো ভালোভাবে বুঝে নিজের মধ্যে ধারণ করার অবিরাম প্রক্রিয়া। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষার এই দিকটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এ প্রযুক্তির সাহায্যে মুহূর্তেই কঠিন বিষয়ের ব্যাখ্যা পাওয়া যায় একইসাথে তথ্য গুছিয়ে নেওয়া যায় এবং তৈরি করা যায় সুন্দর উত্তর। তবে সহজে তথ্য পাওয়া মানেই বিষয়টি গভীরভাবে শেখা নয়। তৈরি করা উত্তর দিয়ে কাজ শেষ করা গেলেও সেই জ্ঞান বুঝতে এবং নিজের চিন্তার অংশ করে তুলতে প্রয়োজন মনোযোগ ও নিজে ভাবার অভ্যাস।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কঠিন বিষয় সহজভাবে বুঝতে, নতুন তথ্য জানতে এবং লেখার ভুল সংশোধন করতে সাহায্য করে। কিন্তু শিক্ষার্থী নিজে চিন্তা করার আগেই তৈরি উত্তর পেয়ে গেলে সেই উত্তরই শেখার বিকল্প হয়ে উঠতে পারে।
এতে বাড়ির কাজ শেষ হলেও বিষয়টি কতটা বোঝা হয়েছে তা নিশ্চিত হওয়া যায় না। কারণ প্রকৃত শিক্ষা শুধু উত্তর জানার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় বরং সেই উত্তর বোঝা এবং নিজের চিন্তার সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়ার মধ্যেও এর গুরুত্ব রয়েছে। পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান শুধু কিছু তথ্য কিংবা প্রশ্নের উত্তরের সমষ্টি নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের দীর্ঘদিনের জ্ঞানচর্চা, অনুসন্ধান ও আবিষ্কারের ইতিহাস। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এসব বিষয় সহজ ভাষায় বুঝিয়ে দিতে পারে।
তবে কোনো বিষয় গভীরভাবে বুঝে নিজের উপলব্ধি তৈরি করার কাজটি শিক্ষার্থীকেই করতে হয়। উত্তর কত সুন্দরভাবে সাজানো হয়েছে তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই জ্ঞান চিন্তা ও বোঝার ক্ষমতাকে কতটা সমৃদ্ধ করছে। শিক্ষাজীবন শুধু পরীক্ষার প্রস্তুতি কিংবা পাঠ্যবইয়ের প্রশ্নোত্তরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সাহিত্যের মধ্য দিয়ে মানুষের অনুভূতি এবং জীবনের নানা জটিলতা সম্পর্কে জানা যায়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ও সমরেশ মজুমদারের সাহিত্যের চরিত্রগুলো মানুষের জীবন, প্রতিবাদ, ভুল ও সিদ্ধান্তের সঙ্গে পরিচিত করে। বয়স ও অভিজ্ঞতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে একই চরিত্রকে নতুনভাবে বোঝা যায়। সমরেশ মজুমদারের সাতকাহন উপন্যাসের দীপা চরিত্র দেখা যেতে পারে। দীপার জীবনের নানা বাঁকের সাথে নিজের পরিচয় খোঁজার চেষ্টা এবং প্রতিকূলতার মধ্যেও সিদ্ধান্ত নেওয়ার অভিজ্ঞতা পাঠককে নিজের জীবন নিয়ে ভাবতে শেখায়।
অনেক নারী তার জীবন থেকে নিজেদের অবস্থান একইসাথে সম্ভাবনা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুনভাবে চিন্তা করার অনুপ্রেরণা পেতে পারেন। সাহিত্যের বিশেষত্ব এখানেই। এটি শুধু গল্প বলে না বরং মানুষের চিন্তা ও অনুভূতিকে সমৃদ্ধ করে। গল্পের সারাংশ জানা আর চরিত্রের অভিজ্ঞতা থেকে জীবনের শিক্ষা গ্রহণ করা এক বিষয় নয়। নতুন পাঠ্যবই হাতে পাওয়ার পর পাতায় ছাপা ছবিগুলো দেখার আনন্দ ছিল অন্য রকম। বাবুই পাখির বাসা, কাশফুলে ভরা মাঠের মাঝে বয়ে চলা বালুময় নদী কিংবা জ্যামিতির বিভিন্ন চিত্র ছোটবেলাতেই মনে কৌতূহল তৈরি করত। জ্যামিতির চিত্র বারবার আঁকা, ভুল হলে মুছে আবার চেষ্টা করা কিংবা কোনো বিষয় বুঝতে না পেরে শিক্ষকের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়ার মধ্য দিয়ে শেখার অভ্যাস গড়ে উঠত। সেই প্রক্রিয়ায় ছিল চেষ্টার পর ভুল করা পরবর্তীতে ধৈর্য নিয়ে বুঝতে পারার আনন্দ।
শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকের পাঠদান থেকে কৌতূহল তৈরি হয়। সেই কৌতূহল থেকেই আসে প্রশ্ন করার আগ্রহ। আলোচনা করা, যুক্তি দিয়ে নিজের মত প্রকাশ করা এবং সহপাঠীদের সঙ্গে মতের পার্থক্য নিয়ে কথা বলার মধ্য দিয়ে চিন্তার বিকাশ ঘটে। সব প্রশ্নের উত্তর সহজেই তৈরি অবস্থায় পাওয়া গেলে নিজে চেষ্টা করার আগ্রহ কমে যেতে পারে। ভুল করে শেখার সুযোগও কমে আসে। ফলে শেখার গভীরতা বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। শিক্ষাজীবন ভালো ফল করার সময়ই নয় বরং মানুষ হয়ে ওঠারও গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়। এই সময়েই মূল্যবোধ বিচার-বিশ্লেষণের ক্ষমতা এবং নিজের ভুল স্বীকার করার মানসিকতা গড়ে ওঠে। অন্যের মতকে সম্মান করা, বিনয়ী থাকা ও অনুভূতি সুন্দরভাবে প্রকাশ করার মতো গুণও চর্চার মাধ্যমে তৈরি হয়। বইপড়ার আনন্দ আর তা নিয়ে আলোচনা বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং ভুল থেকে শেখার মধ্য দিয়ে চিন্তা ও ব্যক্তিত্ব সমৃদ্ধ হয়। প্রযুক্তির অতিরিক্ত ও অপরিকল্পিত ব্যবহার এই বিকাশে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। তৈরি উত্তর পাওয়ার অভ্যাস দীর্ঘ লেখা পড়ার ধৈর্য, মনোযোগ দিয়ে অন্যের কথা শোনা এবং গভীরভাবে চিন্তা করার ক্ষমতাকে দুর্বল করতে পারে। পর্দার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা বাড়লে সরাসরি মেলামেশা ও বাস্তব অভিজ্ঞতার সুযোগ কমে যেতে পারে। ঋতুর পরিবর্তন কিংবা বিকেলের নরম রোদের মতো সাধারণ সৌন্দর্যও মনোযোগের বাইরে থেকে যেতে পারে।
তবে প্রযুক্তিই এর একমাত্র কারণ নয়। মূল উদ্বেগ হলো প্রযুক্তির ব্যবহার ও বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতার মধ্যে ভারসাম্য হারিয়ে ফেলা। এর সমাধান প্রযুক্তিকে পুরোপুরি বাদ দেওয়া নয় বরং সঠিকভাবে ব্যবহার করা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে কোনো বিষয় বোঝার পাশাপাশি তথ্য যাচাই করার পর পাঠ্যবইয়ের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা এবং নিজের ভাষায় ব্যাখ্যা করার অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও এমন মূল্যায়ন পদ্ধতি প্রয়োজন যেখানে মুখস্থ উত্তরের পাশাপাশি শিক্ষার্থীর নিজস্ব চিন্তা ও বোঝার ক্ষমতা গুরুত্ব পাবে। মৌখিক আলোচনার সাথে সাহিত্য পাঠের পর মতামত প্রকাশ এবং বাস্তব সমস্যার সমাধানভিত্তিক কাজ শিক্ষার্থীর প্রকৃত শেখার মাত্রা বুঝতে সাহায্য করবে।
প্রযুক্তি যত উন্নতই হোক শিক্ষকের গুরুত্ব কমে যায় না। তথ্য দেওয়া কিংবা উত্তর সাজিয়ে দেওয়ার বাইরেও শিক্ষার্থীর মনে কৌতূহল তৈরি করে দেয়া যাতে প্রশ্ন করতে উৎসাহ পাওয়া যায় এবং ভুল থেকে শেখার সুযোগ তৈরি হলে পাঠ্যবইয়ের সঙ্গে বাস্তব জীবনের সম্পর্ক বোঝানোর ক্ষেত্রে শিক্ষকের ভূমিকা অত্যন্ত কার্যকর হয়ে উঠবে। প্রযুক্তি শেখার সহায়ক হতে পারে কিন্তু শিক্ষার্থীর নিজস্ব চিন্তা ও উপলব্ধির বিকল্প নয়। শিক্ষার্থীর বাড়ির কাজ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে তৈরি হয়েছে কি না তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো সে বিষয়টি কতটা বুঝতে পেরেছে। অর্জিত জ্ঞান নিজের ভাষায় ব্যাখ্যা করা, সাহিত্যের চরিত্র কিংবা প্রকৃতির সাধারণ দৃশ্য থেকে নতুন উপলব্ধি অর্জন করা এবং সেই জ্ঞানকে জীবনের সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়াই শিক্ষার প্রকৃত সাফল্য।
প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে পাঠ্যবইয়ের গভীরতা শিক্ষার্থীদের ছুঁতে পারছে না একইসাথে সাহিত্যের মানবিক শিক্ষার প্রতিফলন হারিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি প্রশ্ন করার আনন্দ এবং নিজে চিন্তা করার সুযোগ খুব সহজেই হারিয়ে যাচ্ছে । কারণ শিক্ষার সার্থকতা শুধু কতগুলো উত্তর জানা কিংবা কত দ্রুত সেগুলো পাওয়া গেল তার ওপর নির্ভর করে না। সেই জ্ঞান চিন্তা, মূল্যবোধ ও উপলব্ধিকে কতটা সমৃদ্ধ করছে তার মধ্যেই শিক্ষার প্রকৃত সার্থকতা নিহিত।
লেখক : শিক্ষার্থী, উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ
ইডেন মহিলা কলেজ