
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে আসছে। এবার জাতীয় নির্বাচনের পাশাপাশি সমান গুরুত্ব নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে বিরাজ করছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মাধ্যমে অর্জিত জুলাই সনদের ওপর অনুষ্ঠেয় গণভোটের বিষয়টি। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সংসদ নির্বাচন নিয়ে ডামডোল চললেও গণভোটের আলোচনা অনেকটাই ঝিমিয়ে পড়েছে।
জুলাই আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকা বেশ কয়েকজন জানান, কিছুদিন আগেও রাজনৈতিক দলগুলোর বক্তব্য, সভা-সমাবেশ ও আলোচনায় জুলাই সনদ ও গণভোট ছিল অন্যতম প্রধান ইস্যু। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পর এসব দাবিকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা ও বিতর্ক সৃষ্টি হয়। নির্বাচনের আগে এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত ও রূপরেখা চূড়ান্ত হবে- এমন প্রত্যাশাও তৈরি হয়েছিল। কিন্তু ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে দলগুলোর মনোযোগ এখন প্রার্থী বাছাই, জোট গঠন ও নির্বাচনি কৌশল নির্ধারণে বেশি কেন্দ্রীভূত হচ্ছে। ফলে জুলাই সনদের ওপর গণভোটের প্রসঙ্গ রাজনৈতিক অঙ্গনে তুলনামূলকভাবে গুরুত্ব হারাতে শুরু করেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ফ্যাসিবাদি পন্থায় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা আকড়ে রাখা আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর জুলাই সনদ এবং এ নিয়ে গণভোটের বিষয়টি রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন প্রত্যাশার জন্ম দেয়। নাগরিক অধিকার, শাসনব্যবস্থার সংস্কার এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় জনগণের সরাসরি অংশগ্রহণ- এসব প্রশ্ন সামনে আসে নতুন করে। আন্দোলনের সময় বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এসব দাবির প্রতি নৈতিক সমর্থন জানালেও নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু হওয়ার পর সেই অবস্থান আর তেমনভাবে দৃশ্যমান নয়। এখন প্রতিটি রাজনৈতিক দল সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে, আর ঝিমিয়ে পড়েছে জুলাই সনদ ও গণভোটের ইস্যু।
তবে, গণভোটের প্রচারে সারা দেশে প্রায় ৮০ লাখ ৪২ হাজার লিফলেট এবং ৫৭ হাজার ব্যানার প্রস্তুত করছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ৫ জানুয়ারি থেকে এসব লিফলেট বিতরণ শুরু হওয়ার কথা। সারা দেশে এই লিফলেট বিতরণ হবে। ইসি সচিবালয়ের পরিচালক (জনসংযোগ) ও তথ্য প্রদানকারী কর্মকর্তা মো. রুহুল আমিন মল্লিক জানান, গণভোটের প্রচারে জনবহুল স্থানে ১০ ফিট বাই চারফিট এবং ভোট কেন্দ্রের সামনে ৩ ফিট বাই ৫ ফিট আকারের বিপুল সংখ্যক ব্যানার টানানো হবে।
এছাড়া রিটার্নিং অফিসারের অফিসের সামনে এবং জনবহুল স্থানে প্রদর্শনের জন্য ১০ ফিট বাই চারফিট সাইজের প্রায় ১৫ হাজার বড় ব্যানার এবং ভোট কেন্দ্রের সামনে স্থাপনের জন্য ৩ ফিট বাই ৫ ফিট আকারের ৪২ হাজার ৭৬৬টি ব্যানার প্রস্তুত করা হচ্ছে। গণভোটের প্রচারে ইসির অনুমোদিত ব্যানার ও লিফলেটে বলা হয়েছে, ‘আপনি কি জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ এবং জুলাই জাতীয় সনদে লিপিবদ্ধ সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত নিম্নলিখিত প্রস্তাবসমূহের প্রতি আপনার সম্মতি জ্ঞাপন করিতেছেন?’ (হ্যাঁ/না)।
গণভোটে যে চারটি বিষয়ে ভোটারদের মতামত চাওয়া হবে, তা হলো-
‘(ক) নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়ার আলোকে গঠন করা হইবে।’
‘(খ) আগামী জাতীয় সংসদ হইবে দুই কক্ষবিশিষ্ট ও জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ সদস্যবিশিষ্ট একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হইবে এবং সংবিধান সংশোধন করিতে হইলে উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন দরকার হইবে।’
‘(গ) সংসদে নারীর প্রতিনিধি বৃদ্ধি, বিরোধী দল হইতে ডেপুটি স্পিকার ও সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচন, মৌলিক অধিকার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, স্থানীয় সরকার, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতাসহ তফসিলে বর্ণিত যে ৩০টি বিষয়ে জুলাই জাতীয় সনদে ঐকমত্য হইয়াছে- সেগুলো বাস্তবায়নে আগামী সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী রাজনৈতিক দলগুলো বাধ্য থাকিবে।’
‘(ঘ) জুলাই জাতীয় সনদে বর্ণিত অপরাপর সংস্কার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুসারে বাস্তবায়ন করা হইবে।’
বিষয়গুলোর ওপর হ্যাঁ অথবা না ভোট দেওয়া অপশন উল্লেখ করা হয়েছে ব্যানার ও লিফলেটে।
জানা গেছে, জাতীয় সংসদ নির্বাচন, জুলাই সনদ ও গণভোট নিয়ে ভোটারদের সচেতনতামূলক প্রচার কার্যক্রম হাতে নিয়েছে সরকার। তবে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে গণভোট নিয়ে সরকারের প্রচারণামূলক কার্যক্রম কয়েকদিন স্থগিত রাখা হয়।
গণভোট প্রসঙ্গে সম্প্রতি ‘গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষায় কেমন নির্বাচনি ইশতেহার চাই?’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো গণভোটের ক্ষেত্রে ‘হ্যাঁ’ নাকি ‘না’ ভোটের পক্ষে, তা ইশতেহারে সুস্পষ্ট করতে হবে। তিনি বলেন, যদিও দলগুলো জুলাই জাতীয় সনদে সংস্কার বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করেছে, কিন্তু তাদের ইশতেহারেও এটি সুস্পষ্টভাবে লিপিবদ্ধ থাকতে হবে।
সংবাদ সম্মেলনে বদিউল আলম মজুমদার বলেন, শুধু সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনই যথেষ্ট নয়, গণতান্ত্রিক উত্তরণে যেতে হবে। গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ করতে হবে। প্রতিবারই যেন সুষ্ঠু নির্বাচন হয়, সেই ব্যবস্থা করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোকে আইন মেনে কাজ করার আহ্বান জানান বদিউল আলম মজুমদার। তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো গণতান্ত্রিক না হলে দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে না। সংবাদ সম্মেলনে বিগত নির্বাচনগুলোতে জয়ী প্রার্থীদের সম্পদ বৃদ্ধির বিষয়টি তুলে ধরেন বদিউল আলম মজুমদার। তিনি বলেন, ক্ষমতার সঙ্গে জাদুর কাঠি রয়েছে। রাজনীতিবিদদের জানাতে হবে, ক্ষমতায় যাওয়ার মাধ্যমে অর্থবিত্তের মালিক হওয়ার যে সুযোগ, রাজনীতির ব্যবসায়ীকরণ ও ব্যবসায়ের রাজনীতিকরণের অবসান তারা কীভাবে ঘটাবেন।
বদিউল আলম মজুমদার বলেন, নির্বাচনি ইশতেহার একটি লিখিত চুক্তি। স্বাক্ষরিত না হলেও এটি ভোটারদের সঙ্গে দলগুলোর চুক্তি। এই চুক্তি অমান্য করলে যেন নাগরিকদের আদালতে যাওয়ার সুযোগ থাকে। মানুষ যেন প্রশ্ন করার সুযোগ পায় যে দলগুলো তাদের অঙ্গীকার কতটা বাস্তবায়ন করেছে। বদিউল আলম মজুমদার বলেন, নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ ‘দিন বদলের সনদ’ নামে একটি ইশতেহার করেছিল। পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ তাদের সেই অঙ্গীকার ভুলে গেছে। তার মাশুলও দিতে হয়েছে দলটিকে।
রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে অন্তর্ভুক্ত হওয়া উচিত, এমন ১৫টি বিষয় সুজনের পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরেন বেসরকারি নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিন অধ্যাপক এ কে এম ওয়ারেসুল করিম। বিষয়গুলো হলো- জুলাই জাতীয় সনদ ও সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নে স্পষ্ট অঙ্গীকার।
রাষ্ট্রযন্ত্র ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জবাবদিহি; গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া; সাংবিধানিক ভারসাম্য পুনঃপ্রতিষ্ঠা; গণতান্ত্রিক ও স্বচ্ছ রাজনৈতিক দল; দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ও প্রাতিষ্ঠানিক লড়াই; মেধাভিত্তিক সমাজ গঠনের অঙ্গীকার; সহনশীল ও টেকসই অর্থনৈতিক কাঠামো; চরম দারিদ্র্য দূরীকরণে দৃঢ় অঙ্গীকার; নারী ক্ষমতায়নের অগ্রাধিকার; শক্তিশালী স্থানীয় সরকারব্যবস্থা; ন্যায়সংগত ও সহজলভ্য স্বাস্থ্যসেবা; পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অবস্থান; পরিবেশ রক্ষা, জলবায়ু পরিবর্তন, বৈশ্বিক উষ্ণতার প্রেক্ষাপটে অবস্থান; গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের অবক্ষয় রোধ ও রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিবর্তন।
সম্প্রতি ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) বিজ্ঞপ্তিতে বলেছে, ‘এজন্য গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বিজয়ী হওয়ার কোনো বিকল্প নেই। জুলাই সনদের আলোকে ‘বৈষম্যহীন’ বাংলাদেশ বিনির্মাণ ও ‘কার্যকর’ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় আসন্ন সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু ও রাষ্ট্র সংস্কারের ধারাবাহিকতা চায় টিআইবি। জুলাই সনদের পূর্ণ বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করা দলগুলো প্রতিশ্রুতি কতটুকু রাখবে এবং গণভোট বিষয়ে তাদের অবস্থান নির্বাচনের ইশতেহারে স্পষ্ট করারও আহ্বান জানিয়েছে টিআইবি।
সংস্থাটি ধানমন্ডি কার্যালয়ে বার্ষিক সভা শেষে সংবাদমাধ্যমে পাঠানো বিজ্ঞপ্তিতে বলেছে, ‘জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে আলোচনা হয়েছে কিন্তু জুলাই সনদে অন্তর্ভুক্ত হয়নি, এমন সব সুপারিশসহ আলোচনার বাইরে থাকা সংস্কার কমিশন বিশেষ করে গণমাধ্যম, নারী, শ্রম, স্বাস্থ্য ও স্থানীয় সরকারবিষয়ক কমিশনের প্রস্তাবিত সুপারিশমালার বিষয় যেন বিস্মৃত হয়ে না যায়।’
নির্বাচন নিয়ে টিআইবি বলেছে, ‘আসন্ন নির্বাচনে অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব হল, কর্তৃত্ববাদের বিদায়ের মধ্য দিয়ে জনমনে স্বাধীন ও অসংকোচ মত প্রকাশের যে প্রত্যাশার সঞ্চার হয়েছে ভোটাধিকার প্রয়োগে তা পূরণে কার্যকর পরিবেশ সৃষ্টিতে পদক্ষেপ গ্রহণ করা এবং সকল রাজনৈতিক দলের জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করা।
কর্তৃত্ববাদের বিরুদ্ধে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সমগ্র দেশ যেভাবে একসঙ্গে লড়েছে, একটি সুশাসিত ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ বিনির্মাণে সেই বন্ধন অটুট রেখে আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সহঅবস্থান বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর অঙ্গীকার বা প্রত্যয় তাদের নির্বাচনি ইশতেহারে তুলে ধরতে হবে।’