
যে পুলিশ সদস্য একজন আহত জুলাইযোদ্ধাকে গুলি করেছিলেন, সেই পুলিশ সদস্যকেই পরবর্তীতে ওই আহত যোদ্ধার ভেরিফিকেশন করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, এমন অভিযোগ তুলে বিষয়টিকে চরম লজ্জাজনক বলে মন্তব্য করেছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রতিনিধিরা। গতকাল শুক্রবার দুপুর সাড়ে ১২টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) মধুর ক্যান্টিনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শহিদ ও আহত সেলের সম্পাদক তামিম খান বলেন, একজন আহত জুলাইযোদ্ধা আমার কাছে কান্না করে বলেছে, ভাই, যে আমাকে গুলি করেছে, সেই পুলিশই এখন আমাকে ভেরিফাই করার জন্য পিবিআইতে ডেকেছে। এটা কি কোনো মানুষের কাজ হতে পারে? তিনি জানান, জুলাই আন্দোলনে আহতদের তালিকাভুক্তির কাজ শুরু থেকেই নানা জটিলতা ও হয়রানির মধ্যে দিয়ে এগিয়েছে। প্রথমদিকে ছাত্র প্রতিনিধি, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও পুলিশ সুপারের সমন্বয়ে কোনো ভোগান্তি ছাড়াই প্রায় সাড়ে ৯ হাজার আহতের যাচাই-বাছাই সম্পন্ন হয়। এ প্রক্রিয়ায় প্রায় ১ হাজার ৪৮৫ জন আহতকে নিশ্চিত করা হয়েছিল।
তবে ২ ফেব্রুয়ারি হঠাৎ করে তালিকাকরণ ও এমআইএস কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়। এর কারণ হিসেবে দেখানো হয়, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের চাপের মুখে ভুয়া আহত অন্তর্ভুক্তির চেষ্টা। পরে ১২ ফেব্রুয়ারি সম্পূর্ণভাবে তালিকাকরণ বন্ধ হয়ে যায়।
তামিম খান বলেন, অনেক আহত জুলাই যোদ্ধা ছয় মাস ধরে চিকিৎসাধীন ছিলেন। তাদের কি তালিকার বাইরে রাখা হবে? তালিকাকরণের বিষয়ে গণমাধ্যম বা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা, ফরম বা নির্দেশনাও দেওয়া হয়নি। ফলে বিপুলসংখ্যক আহত তালিকার বাইরে পড়ে যান।
চাপের মুখে জেলা প্রশাসকের সভাপতিত্বে পুনরায় বৈঠক হয় এবং সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, কোনো আহত জুলাই যোদ্ধা তালিকার বাইরে থাকবে না। এরপর দরখাস্ত নেওয়া শুরু হলে এপ্রিল-জুনের মধ্যে আহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় দুই থেকে আড়াই হাজারে। তিনি বলেন, ২ জুন থেকে ২৯ জুলাই পর্যন্ত রাত ২টা-৩টা পর্যন্ত জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে বসে আমরা তালিকা যাচাই করেছি। না খেয়ে কাজ করেছি। অথচ তালিকার দাবিতে আমাদের ৮-১০ বার লংমার্চ করতে হয়েছে। আহত যোদ্ধাদের সম্মান কি এখন আন্দোলন ছাড়া পাওয়া যাবে না?
ঢাকা জেলার ক্ষেত্রে যাচাই-বাছাই শেষে ৯৪২ জনের তালিকা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়, যার মধ্যে ঢাকার বাসিন্দা ৩৯২ জন। তিন মাস পার হলেও এখনও সেই তালিকা গেজেট হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ তুলে তামিম খান বলেন, এই তালিকাগুলো হঠাৎ করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং পুলিশকে ভেরিফিকেশনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এমনকি যে পুলিশ গুলি করেছে, সেই পুলিশই আহতকে যাচাই করছে।
তিনি বলেন, ভেরিফিকেশনের নামে আহতদের কাছ থেকে সমন্বয়কের প্রত্যয়ন, দুইজন সাক্ষী, আন্দোলনে কেন গিয়েছিল- এমন প্রশ্ন করে হয়রানি করা হচ্ছে। পুলিশের দোষ দিচ্ছি না, তারা কমান্ড ফলো করে। কিন্তু এই সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ ভুল।
সংবাদ সম্মেলনে আহত সাংবাদিকদের প্রসঙ্গও উঠে আসে। তামিম খান বলেন, আমি ৩২ জন সাংবাদিকের দরখাস্ত পেয়েছি, যাদের মধ্যে ২৪ জন প্রকৃত আহত জুলাইযোদ্ধা। তারাও এখনো তালিকাভুক্ত হয়নি। ২০ জানুয়ারির মধ্যে যাচাই-বাছাই কমিটির পাঠানো তালিকা অনুযায়ী এমআইএস ও গেজেট নিশ্চিত না হলে কঠোর কর্মসূচির হুঁশিয়ারি দেন তিনি। বলেন, এবার আর শুধু পদত্যাগ দাবি নয়- দায়িত্বে অবহেলা করলে উপদেষ্টাদের পদত্যাগ করানো হবে।