
সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদ (শাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচন চার সপ্তাহের জন্য স্থগিত করে হাইকোর্ট যে আদেশ দিয়েছেন, তার বিরুদ্ধে আপিল বিভাগের চেম্বার আদালতে আবেদন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। আবেদনে হাইকোর্টের দেওয়া স্থগিতাদেশ স্থগিত চাওয়া হয়েছে। গতকাল সোমবার বিকেলে আপিল বিভাগের চেম্বার আদালতে এ আবেদন করা হয়।
শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদণ্ডশাকসু নির্বাচন স্থগিতে হাই কোর্টের আদেশ প্রত্যাখান করে ভোটের দাবিতে সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়কে বিক্ষোভ করেন বিভিন্ন প্যানেলের সমর্থিত শিক্ষার্থীরা। গতকাল সোমবার আদেশ ঘোষণার আগ থেকেই বিশ্ববিদ্যালয় ফটকের সামনের রাস্তায় নেমে আসেন শিক্ষার্থীরা। প্রায় একই সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনেও তালা দেওয়া হয়। এতে সেখানে বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্য, উপ-উপাচার্য, কোষাধ্যক্ষ, রেজিস্ট্রারসহ অন্যান্য কর্মকর্তারা অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন। বিক্ষুব্ধদের মধ্যে ইসলামী ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেল, ছাত্রদল সমর্থিত প্যানেলের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত স্বতন্ত্র প্রার্থী, স্বতন্ত্র প্রার্থী ঐক্যবদ্ধ প্যানেল এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ঘটনাস্থলে দেখা গেছে।
দীর্ঘ ২৮ বছর পর আজ মঙ্গলবার শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল। শাকসু নির্বাচনের ভিপি পদপ্রার্থী মমিনুর রশিদ শুভসহ তিনজনের করা রিট আবেদনের শুনানি শেষে সোমবার দুপুরে ভোট চার সপ্তাহেরর জন্য স্থগিতের আদেশ দেন হাই কোর্টের বিচারপতি ফাহমিদা কাদের ও বিচারপতি মো. আসিফ হাসানের বেঞ্চ। আদালতে রিটের পক্ষে শুনানি করেন ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল, ব্যারিস্টার রাশনা ইমাম, ব্যারিস্টার মনিরুজ্জামান আসাদ। আর বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে শুনানি করেন অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ হোসাইন লিপু। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অনীক আর হক।
শাকসু নির্বাচনের দাবিতে গতকাল বিক্ষোভে সড়কে শত শত গাড়ি আটকা পড়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশের মদিনা মার্কেট এলাকা থেকে কুমারগাঁও বাসস্যান্ড পর্যন্ত যানজট লাগে। এ সময় শিক্ষার্থীদের ‘হাই কোর্ট না শাকসু- শাকসু, শাকসু’, ‘শাকসু হবে কয় তারিখ, ২০ তারিখ, ২০ তারিখ’, ‘শাকসু নিয়ে তালবাহানা, মানি না-মানব না’, ‘হাদি ভাই শিখিয়ে গেছে, লড়াই করে বাঁচতে হবে’, ‘সাস্টিয়ানদের ডিসিশন, কালকে হবে নির্বাচন’, ‘আমাদের ডিসিশন, মানতে হবে প্রশাসন’- ইত্যাদি স্লোগান দিতে দেখা গেছে।
বিক্ষোভের সময় ‘সাধারণের ঐক্যস্বর’ প্যানেলের ভিপি প্রার্থী মুহয়ী শারদ বলেন, ‘২০ তারিখে শাকসু নির্বাচনের দাবিতে আমাদের ‘সড়ক ব্লকেড’ কর্মসূচি চলবে। আমরা আমাদের অধিকার আদায় না করে ফিরে যাচ্ছি না। তবে জনদুভোর্গ কমাতে সড়কের একটি পাশ ওপেন করে দেওয়া হয়। ইসলামী ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেলের জিএস প্রার্থী মুজাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘হাই কোর্ট শাকসু স্থগিতের যে আদেশ দিয়েছে, আমরা সেটাকে প্রত্যাখান করি। শাকসু যাতে যথাসময়ে হয়, আমরা সে দাবিতে অটল আছি। আমাদের কর্মসূচি চলমান থাকবে।’ সিলেট মহানগর পুলিশের গণমাধ্যম কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘বর্তমানে শহরে যানজট স্বাভাবিক রয়েছে। শাবি গেইট এলাকায় সুনামগঞ্জগামী সড়ক খুলে দেওয়া হয়েছে। শহরগামী সড়কে তেমন যানজট নেই। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।’
শাকসু স্থগিত চেয়ে রিটকারী ভিপি প্রার্থীকে শাবিপ্রবিতে অবাঞ্ছিত ঘোষণা : শাকসু নির্বাচন স্থগিত চেয়ে রিট করা ভিপি প্রার্থী মমিনুর রশিদ শুভকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছেন শিক্ষার্থীরা। সোমবার উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশের পর এমন ঘোষণা দিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীরা বলেন, শাকসু আমাদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু স্বতন্ত্র ভিপি প্রার্থী বিশেষ একটি দলের প্ররোচনায় হাইকোর্টে রিট করে শিক্ষার্থীদের অধিকার হরণ করেছেন। তাই আমরা তাকে শাবিপ্রবিতে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করছি। এদিকে ইতোমধ্যে নির্বাচন উপলক্ষে করা ‘সোচ্চার: টর্চার ওয়াচডগ বাংলাদেশ’-এর করা একটি জরিপে দেখা গেছে, শাকসু নির্বাচনে ২.১ শতাংশ ভোট পেতে চলেছিলেন মমিনুর রশিদ শুভ।
নির্ধারিত সময়েই শাকসু নির্বাচন আয়োজনের আহ্বান ইউটিএল শিক্ষকদের : নির্ধারিত সময় অনুযায়ী ২০ জানুয়ারি শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (শাকসু) নির্বাচন আয়োজনের আহ্বান জানিয়েছেন ইউনিভার্সিটি টিচার্স লিংক (ইউটিএল)-এর শিক্ষকরা। শিক্ষার্থীদের স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে নির্বাচন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করা হবে বলেও জানিয়েছেন তারা। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক মিলনায়তনে ইউটিএলের সাস্ট চ্যাপ্টারের উদ্যোগে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে ইউটিএল সাস্ট চ্যাপ্টারের সদস্য সচিব অধ্যাপক ড. মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, দীর্ঘ ২৮ বছর পর আগামীকাল ২০ জানুয়ারি শাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ইউটিএলের পক্ষ থেকে আমরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি, যেন নির্ধারিত সময়েই এই নির্বাচন আয়োজন করা হয়। সাধারণ শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা ও দাবি বিবেচনায় নিয়ে নির্বাচন সম্পন্ন হবে—এটাই আমাদের প্রত্যাশা। তিনি আরও বলেন, ইউটিএল সাস্ট চ্যাপ্টারের পক্ষ থেকে আমরা নির্বাচন আয়োজন ও পরিচালনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করব। কিছু শিক্ষক অসহযোগিতার কথা বললেও আমরা মনে করি, অধিকাংশ শিক্ষকই শাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠানের পক্ষে। সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে অধ্যাপক ড. সাইফুল ইসলাম বলেন, আমরা কোনো শিক্ষককে ষড়যন্ত্রের সঙ্গে জড়িত বলে মন্তব্য করিনি। যারা নির্বাচন বিষয়ে অসহযোগিতার কথা বলেছেন, তাদের প্রতিও আমাদের অনুরোধ- শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করে সবাই একসঙ্গে এগিয়ে আসুন। সকল শিক্ষক মিলে আমরা একটি সুন্দর, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন উপহার দিতে চাই। সংবাদ সম্মেলনে ইউটিএলের আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ আল মামুন, অধ্যাপক ড. জামালুদ্দিন, অধ্যাপক ড. অহিদুজ্জামানসহ ইউটিএলের অন্যান্য নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
নির্বাচন কার্যক্রম থেকে বিরত থাকার ঘোষণা বিএনপিপন্থী শিক্ষকদের : শাকসু নির্বাচন দায়িত্ব পালন থেকে বিরত থাকার ঘোষণা দিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএনপিপন্থী শিক্ষকরা। সোমবার দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান ভবনের শিক্ষক লাউঞ্জে এক সংবাদ সম্মেলনে এ ঘোষণা দেন তারা। অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের সভাপতি অধ্যাপক ড. আশরাফ উদ্দিন, সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. শাহ মো. আতিকুল হক ও ইউট্যাবের সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. খায়রুল ইসলাম।
এসময় শিক্ষকরা বলেন, নির্বাচন নিয়ে নানা ইস্যু তৈরি হয়েছে। আমরা উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে শঙ্কিত ও বিব্রত। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে আমরা প্রশাসনকে জানিয়েছি এবং সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয় জানানো হয়েছে। ইতোমধ্যে নির্বাচন কমিশন থেকে বিএনপিপন্থী আটজন শিক্ষক পদত্যাগ করেছেন। আমরা যারা জাতীয়তাবাদী আদর্শের আছি সবাই মিলে প্রশাসনকে জানিয়েছি আমরা এ নির্বাচনে দায়িত্ব পালন করব না।
ইসির সামনে দ্বিতীয় দিনের মতো ছাত্রদলের অবস্থান : পোস্টাল ব্যালট এবং শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) ছাত্র সংসদ নির্বাচন নিয়ে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) পক্ষপাতমূলক আচরণের অভিযোগে টানা দ্বিতীয় দিনের মতো অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। সংগঠনের নেতাকর্মীরা সোমবার সকাল ১১টার পর থেকে আগারগাঁওয়ে নির্বাচন কমিশনের সামনে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। ছাত্রদলের ভাষ্য, পোস্টাল ব্যালট নিয়ে ইসির পক্ষপাতমূলক সিদ্ধান্ত নির্বাচন প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। তাদের অভিযোগ, একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের চাপে ইসি দায়িত্বশীল ও যৌক্তিক সিদ্ধান্তের বদলে তড়িঘড়ি করে অদূরদর্শী সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, যা কমিশনের স্বাধীনতা ও পেশাদারত্বকে ক্ষুণ্ণ করছে।
এ ছাড়া, শাবিপ্রবির কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (শাকসু) নির্বাচন নিয়ে ইসির দেওয়া নির্দেশনারও প্রতিবাদ জানিয়েছে ছাত্রদল। তাদের দাবি, একটি রাজনৈতিক দলের প্রত্যক্ষ প্রভাব ও হস্তক্ষেপে ইসি নজিরবিহীন ও বিতর্কিত নির্দেশনা জারি করেছে। উল্লেখযোগ্য যে গত ১৫ জানুয়ারি ইসি শাবিপ্রবি ছাত্র সংসদ ও হল সংসদ নির্বাচন পূর্বনির্ধারিত ২০ জানুয়ারি তারিখে অনুষ্ঠানের অনুমতি দেয়। যদিও, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে দেশে সব ধরনের নির্বাচন নিষিদ্ধ করেছিল নির্বাচন কমিশন। এ ব্যাপারে গত ১২ জানুয়ারি বিভাগীয় কমিশনার, আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসকদের এ ব্যাপারে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়ে দিয়েছিল নির্বাচন কমিশন। কিন্তু ওই নির্দেশনার তিন দিন পর নির্বাচন কমিশন এক প্রজ্ঞাপন দিয়ে জানায় যে পূর্বনির্ধারিত শাকসু নির্বাচনে তাদের আপত্তি নেই। ছাত্রদল নেতারা জানান, তাদের দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাবেন তারা। অবস্থান কর্মসূচিতে বিভিন্ন স্লোগান দিয়ে ইসির সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানান নেতাকর্মীরা।