
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের ওপর গণভোটে ভোটারদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। নির্বাচনের পর দ্রুততম সময়ে নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হবে বলেও জানান তিনি। গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে এ তথ্য জানান প্রধান উপদেষ্টা।
ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, আজ আপনাদের সামনে উপস্থিত হয়েছি এক অতি তাৎপর্যপূর্ণ, ঐতিহাসিক ও ভবিষ্যৎ-নির্ধারক মুহূর্তে। আর মাত্র একদিন পরই সারাদেশে অনুষ্ঠিত হবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং তার সাথে জুলাই জাতীয় সনদের ওপর গণভোট। জাতির বহু বছরের আকাঙ্ক্ষার দিন। মহান মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সব শহীদকে স্মরণ করে তিনি বলেন, যাদের রক্তের বিনিময়ে আমরা বাংলাদেশ পেয়েছি এবং স্বৈরাচারবিরোধী দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রামের সাফল্যের পর আজ আবার গণতান্ত্রিক উত্তরণের যুগসন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি। আপামর জনগণের- বিশেষ করে জুলাইয়ের যোদ্ধাদের- আত্মত্যাগ ছাড়া এই নির্বাচন, এই গণভোট কোনোটিই সম্ভব হতো না। সমগ্র জাতি তাই তাদের কাছে চিরঋণী। প্রত্যেক জাতির জীবনে এমন কিছু দিন আসে, যার তাৎপর্য থাকে সুদূরপ্রসারী, যেদিন নির্ধারিত হয় রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা, গণতন্ত্রের চরিত্র এবং স্থায়িত্ব ও আগামী প্রজন্মের ভাগ্য। আগামী পরশু ঠিক তেমনই একটি দিন, যেদিন দুটি ভোট অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। আমরা সবাই মিলে নতুন সরকার গঠনের নির্বাচন করব এবং পাশাপাশি গণভোটের মাধ্যমে আমাদের প্রাণপ্রিয় বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ কাঠামো নির্ধারণ করব। ইতোমধ্যে আনুষ্ঠানিক নির্বাচনি প্রচার-প্রচারণা শেষ হয়ে গেছে। এখন আমাদের সবার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পালা। এই মুহূর্তে রাষ্ট্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত একজন নাগরিক হিসেবে আপনাদের সঙ্গে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা ভাগ করে নেওয়াকে আমি আমার নৈতিক ও সাংবিধানিক দায়িত্ব মনে করেছি।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, বৃহস্পতিবার সারাদেশে একযোগে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং জুলাই জাতীয় সনদের ওপর গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। এটি শুধু সরকার গঠনের নির্বাচন নয়; একই সঙ্গে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ কাঠামো নির্ধারণের একটি গণতান্ত্রিক সুযোগ। এই নির্বাচন ও গণভোট বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রায় একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক। এসময় অধ্যাপক ইউনূস গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে মহান মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের স্মরণ করে বলেন, তাদের আত্মত্যাগ ছাড়া এই নির্বাচন ও গণভোট সম্ভব হতো না। জাতি তাদের কাছে চিরঋণী।
তিনি বলেন, এবারের নির্বাচনি প্রচারণা তুলনামূলক শান্তিপূর্ণ হয়েছে, যা সম্মিলিত দায়িত্ববোধের ফল। তবে কয়েকটি সহিংস ঘটনায় প্রাণহানিতে তিনি গভীর দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, গণতন্ত্রের পথে কোনো প্রাণ ঝরে যাওয়া কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়। নির্বাচনে ৫১টি রাজনৈতিক দল অংশ নিচ্ছে এবং স্বতন্ত্রসহ মোট প্রার্থী দুই হাজারের বেশি, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ বলেও জানান প্রধান উপদেষ্টা। তিনি বলেন, নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করতে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। রেকর্ডসংখ্যক আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতাসম্পন্ন সশস্ত্র বাহিনী, সিসি ক্যামেরা, বডি ক্যামেরা, ড্রোন ও ডগ স্কোয়াড মোতায়েন থাকবে।
তিনি বলেন, এবারের নির্বাচন শুধু আরেকটি নিয়মিত নির্বাচন নয়। এটি একটি গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের প্রথম জাতীয় নির্বাচন। দীর্ঘ সময় ধরে জমে থাকা ক্ষোভ, বৈষম্য, বঞ্চনা ও অবিচারের বিরুদ্ধে জনগণের যে জাগরণ আমরা দেখেছি, এই নির্বাচন তার সাংবিধানিক প্রকাশ। রাজপথের সেই দাবি আজ আপনাদের ব্যালটের মাধ্যমে উচ্চারিত হতে যাচ্ছে। তাই এই নির্বাচন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রায় একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক। প্রধান উপদেষ্টা বলেন, এই নির্বাচনের মাধ্যমে আমরা শুধু জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করছি না— একই সঙ্গে আমরা সিদ্ধান্ত নিচ্ছি, বাংলাদেশ কোন পথে এগোবে। আমরা কি একটি বৈষম্যহীন, ন্যায়ভিত্তিক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র গড়তে পারবো, নাকি আবারও পুরোনো ক্ষমতাকেন্দ্রিক ও অনিয়ন্ত্রিত বৃত্তে ফিরে যাবো- এই প্রশ্নের উত্তর দেবে গণভোট। তরুণ ও নারী ভোটারদের উদ্দেশে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, এই ভোট আপনাদের প্রথম সত্যিকারের রাজনৈতিক উচ্চারণ। ভয় নয়, সাহস নিয়ে ভোটকেন্দ্রে যান। ভাষণের শেষাংশে তিনি বলেন, নির্বাচনের পর দ্রুততম সময়ে নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে অন্তর্বর্তী সরকার তার দায়িত্ব শেষ করবে।
ভোট-গণভোটে ভয় নয়, সাহস নিয়ে কেন্দ্রে যান : ভয় নয়, সাহস নিয়ে ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও জুলাই জাতীয় সনদের ওপর গণভোট বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। এই নির্বাচন শুধু জনপ্রতিনিধি বাছাই নয়; বরং রাষ্ট্র কোন পথে এগোবে—তার সিদ্ধান্ত জনগণ নেবে। প্রধান উপদেষ্টা জানান, নির্বাচন সুষ্ঠু করতে ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং প্রথমবারের মতো প্রবাসী বাংলাদেশিরা ভোটাধিকার প্রয়োগ করছেন। গুজব ও অপপ্রচার থেকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছেই ক্ষমতা হস্তান্তর করবে- এ নিয়ে বিভ্রান্তির কোনো সুযোগ নেই।