
ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হয়েছেন। দেশটির ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসি খামেনি হত্যার ভয়াবহতম প্রতিশোধ নেওয়ার অঙ্গীকার করেছে। সুপ্রিম লিডারের মৃত্যুতে আইআরজিসি শোক প্রকাশ করে এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘আমরা একজন মহান নেতাকে হারিয়েছি এবং তার শোকে জাতি মুহ্যমান।’ বিবৃতিতে বলা হয়, ‘মানবতার সবচেয়ে নিষ্ঠুর সন্ত্রাসী ও জল্লাদদের হাতে খামেনির শাহাদাত প্রমাণ করে, এই মহান নেতা বৈধ ও ন্যায়সঙ্গত পথে ছিলেন।’ আইআরজিসি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, ‘ইরানিরা সেই জল্লাদদের ছেড়ে দেবে না; এমন প্রতিশোধ নেওয়া হবে, যা তারা আগে কখনও দেখেনি।’ বাহিনীর তরফে বলা হয়, তারা দেশের ভেতরে ও বাইরে যেকোনো ষড়যন্ত্রের মোকাবিলায় দৃঢ়ভাবে অটল থাকবে। এদিকে, মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতার শীর্ষ রাজনৈতিক উপদেষ্টা আলী শামখানি, সেনাপ্রধান আবদুল রহিম মুসাভি, প্রতিরক্ষামন্ত্রী আজিজ নাসিরজাদেহ এবং আইআরজিসি-র কমান্ডার মোহাম্মদ পাকপুর নিহত হয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছে দেশটির সরকারি সংবাদ সংস্থা ইরনা। নিহত আলী শামখানি ইরানের সর্বোচ্চ নেতার প্রধান রাজনৈতিক উপদেষ্টার পাশাপাশি দেশটির জাতীয় প্রতিরক্ষা পরিষদের সচিব হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছিলেন। হামলায় সর্বোচ্চ নেতা খামেনির মেয়ে, মেয়েজামাই ও নাতিও নিহত হন বলে জানিয়েছে ইরানি মিডিয়া।
হরমুজ প্রণালী বন্ধ করেছে ইরান : শত্রুদের কোণঠাসা করার লক্ষ্যে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহ পথ ‘হরমুজ প্রণালী’ দিয়ে সব ধরনের জাহাজ চলাচল নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে ইরানের আইআরজিসি। বাহিনীর পক্ষ থেকে রেডিও বার্তার মাধ্যমে জানানো হয়েছে, এখন থেকে হরমুজ প্রণালী দিয়ে কোনো জাহাজ যাতায়াত করতে পারবে না। ইউরোপীয় ইউনিয়নের নৌ-মিশন ‘অপারেশন অ্যাসপাইডস’ নিশ্চিত করেছে, ওই এলাকায় চলাচলকারী জাহাজগুলো আইআরজিসি-র কাছ থেকে কোনো জাহাজকে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হবে না মর্মে সতর্কবার্তা পাচ্ছে।
এর ফলে বিশ্ব বাজারে জ্বালানি তেলের সংকটের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। আইআরজিসি-র একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ‘বর্বর আগ্রাসনের’ জবাবে ইরান যে বিশাল সামরিক অভিযান পরিচালনা করেছে, তাতে শত শত মার্কিন এবং জায়নবাদী সেনা নিহত হয়েছেন। ইরান বলেছে, তারা অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ইসরায়েলের ভেতর এবং মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত ২৭টি মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে।
কাতারে অত্যাধুনিক মার্কিন রাডার ধ্বংস : তাসনিম নিউজ জানিয়েছে, ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে কাতারে অবস্থিত অত্যাধুনিক মার্কিন রাডার ধ্বংস হয়ে গেছে। এছাড়া একটি মার্কিন জাহাজে আঘাত হেনেছে আইআরজিসির ক্ষেপণাস্ত্র। কাতারে মোতায়েন আমেরিকার ‘এফপি ওয়ান-থ্রি-টু’ রাডার যা পাঁচ হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত ক্ষেপণাস্ত্র চিহ্নিত করার ক্ষমতা রাখে। এই রাডারটিতে ওটিএইচ ব্যবস্থা ছিল, যা এতটাই নিখুঁত যে, প্রতিপক্ষের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের সঙ্গে সঙ্গে সেটাকে চিহ্নিত করতে পারে এবং কেন্দ্রে বার্তা পাঠাতে পারে। এই রাডার ধ্বংস করার মানে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য অশনি সংকেত এবং তারা আগাম বার্তা পাবে না। ফলে, ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর মোকাবিলা করার জন্য তাদের ক্ষমতা ব্যাপকভাবে সীমিত হয়ে গেল।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের ইউএস এমএসটি কমব্যাট সাপোর্ট জাহাজ আইআরজিসি-র নৌ ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে মারাত্মকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে। অন্যান্য মার্কিন সামরিক নৌযানও ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোনের সাহায্য লক্ষ্যবস্তু করা হবে বলে আইআরজিসি জানিয়েছে। ইরানের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, সমন্বিত খাতামুল আম্বিয়া বিমান প্রতিরক্ষা ঘাঁটির নেটওয়ার্ক শত্রুর ১২টি ড্রোন ধ্বংস করেছে।
ইসরায়েলের বেশ কিছু সামরিক ও নিরাপত্তা কেন্দ্রে আঘাত : ইরানের সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, ইসরায়েলি ও মার্কিন আগ্রাসনের জবাবে পাল্টা আঘাত হিসেবে শনিবার রাত থেকে ইসরায়েল এবং মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ঢেউ পরিচালনা করছে তেহরান। আইআরজিসি-র জনসংযোগ বিভাগ থেকে জানানো হয়েছে, হামলার তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম ঢেউ সফলভাবে শুরু হয়েছে। এবার আগের তুলনায় আরও উন্নত ও নির্ভুল ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন ব্যবহার করা হচ্ছে। হামলায় আক্রান্ত হয়েছে ইসরায়েলের হাইফা ও রামাত ডেভিডসহ বেশ কিছু কৌশলগত সামরিক ও নিরাপত্তা কেন্দ্র। বাহরাইন, কুয়েত, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে অবস্থিত বিভিন্ন মার্কিন সামরিক ও লজিস্টিক ঘাঁটিতে নতুন করে হামলার পাশাপাশি ভারত মহাসাগরে মার্কিন নৌবাহিনীর রসদ সরবরাহকারী জাহাজেও হামলা চালানো হয়। গতকাল রোববার রাতে এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ইরানের প্রতিশোধমূলক হামলা অব্যাহত ছিল। এসব হামলায় অনেকে হতাহত হয়েছেন। গতকালও ভয়াবহ বিস্ফোরণে কেঁপেছে সৌদি আরব, আরব আমিরাত, বাহরাইন ও কাতার। ইসরায়েলের বিভিন্ন স্থানের ধ্বংসস্তূপের ছবি প্রকাশিত হয়েছে গণমাধ্যমে। আইআরজিসি-র বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এই অপারেশন ইরানের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের সরাসরি জবাব। তারা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, প্রতিটি পরবর্তী ধাপ আরও বেশি ধ্বংসাত্মক হবে এবং শত্রু পক্ষকে তাদের কৃতকর্মের জন্য চরম মূল্য দিতে হবে। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, ইসরায়েলের হাইফা, তেল আবিব এবং জেরুজালেমসহ বিভিন্ন এলাকায় সাইরেন বাজার খবর পাওয়া গেছে। ইরান দাবি করেছে, তাদের ছোড়া ‘কদর থ্রি-এইট-জিরো’ ক্ষেপণাস্ত্রগুলো অনেক স্থানে শত্রুর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করতে সক্ষম হয়েছে।
কঠিন প্রতিশোধের অঙ্গীকার ইরানি প্রেসিডেন্টের : ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যার তীব্র নিন্দা জানিয়ে এর কঠিন প্রতিশোধ নেওয়ার অঙ্গীকার করেছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। প্রেসিডেন্টের কার্যালয় থেকে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে এই হত্যাকাণ্ডকে একটি ‘মহাঅপরাধ’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। পেজেশকিয়ান স্পষ্ট করে বলেন, ‘এই ভয়াবহ অপরাধের জবাব না দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হবে না। এটি ইসলামী বিশ্বের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে।’ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এই উচ্চপদস্থ নেতার পবিত্র রক্ত একটি গর্জনকারী ঝরনার মতো প্রবাহিত হবে এবং মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমেরিকান-জায়নবাদী নিপীড়ন ও অপরাধের মূলোৎপাটন করবে। অপরাধের মূল পরিকল্পনাকারী এবং বাস্তবায়নকারীদের সতর্ক করে পেজেশকিয়ান বলেন, ‘আমরা আমাদের সমস্ত শক্তি ও সংকল্প দিয়ে, ইসলামী উম্মাহ এবং বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষের সমর্থনে এই অপরাধের হোতাদের এমন শিক্ষা দেব, যাতে তারা চিরকাল অনুতাপ করবে।’ এই অপূরণীয় ক্ষতিতে ইরানে ৪০ দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করা হয়েছে। পাশাপাশি আগামী সাত দিন সরকারি ছুটি ঘোষণা করেছেন প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান।
খামেনির জন্য কাঁদছে ইরান : গতকাল রোববার ভোর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যুতে শোক প্রকাশের জন্য তেহরানের রাজপথে জড়ো হতে শুরু করেন লাখ লাখ মানুষ। ইরানি রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, তেহরানের রেভোলিউশন স্কয়ার এবং তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে বিপুল মানুষ ভিড় জমান। শোকাতুর জনতাকে ইরানের পতাকা ওড়াতে, শোকগাঁথা গাইতে এবং খামেনির ছবি সংবলিত প্লাকার্ড হাতে মৌন মিছিল করতে দেখা গেছে। দেশটির রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবি থেকে প্রাপ্ত ফুটেজে দেখা যায়, উপস্থিত ইরানিরা ‘আমেরিকা নিপাত যাক’ এবং ‘ইসরাইল নিপাত যাক’ বলে স্লোগান দিচ্ছিলেন। খামেনির মৃত্যুতে তেহরানজুড়ে এক থমথমে এবং আবেগঘন পরিবেশ বিরাজ করছে, যেখানে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি নিরাপত্তা বাহিনীর ব্যাপক উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে।
প্রয়োজন বিরতিহীনভাবে হামলা, ট্রাম্পের হুমকি : এর আগে, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আয়াতুল্লাহ খামেনি নিহত হওয়ার খবর নিশ্চিত করেন। বাংলাদেশ সময় গতকাল রোববার মধ্যরাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে একটি পোস্টে ট্রাম্প বলেন, ‘ইতিহাসের সবচেয়ে নিষ্ঠুর ব্যক্তি খামেনি নিহত।’ পোস্টে তিনি লেখেন, ‘এটি শুধু ইরানের মানুষের জন্য নয়, বরং সেইসব মার্কিনি এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষের জন্যও এক কাঙ্ক্ষিত বিচার। তিনি আমাদের গোয়েন্দা এবং অত্যন্ত উন্নত ট্র্যাকিং সিস্টেম থেকে বাঁচতে পারেননি। ইসরায়েলের সঙ্গে মিলে আমরা এমন এক অভিযান চালিয়েছি, খামেনি বা তার সঙ্গে মারা যাওয়া অন্য নেতাদের আসলে কিছু করার ছিল না।’
তিনি উল্লেখ করেন, ‘ইরানের জনগণের জন্য তাদের দেশ ফিরে পাওয়ার এটাই সবচেয়ে বড় সুযোগ। আমরা খবর পাচ্ছি, ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী, সেনাবাহিনী ও অন্যান্য নিরাপত্তা ও পুলিশ বাহিনীর অনেকেই আর যুদ্ধ করতে চায় না। এখনই সুযোগ, তারা চাইলে ক্ষমা পেতে পারে; কিন্তু দেরি করলে মৃত্যু ছাড়া আর কিছুই পাবে না।’ ট্রাম্প বলেন, ‘শুধু খামেনির মৃত্যু নয়, মাত্র একদিনের ব্যবধানে দেশটি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত এবং বলতে গেলে বিধ্বস্ত হয়ে পড়েছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যসহ সারা বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য অর্জন না হওয়া পর্যন্ত আমাদের এই নিখুঁত এবং ভারী বিমান হামলা পুরো সপ্তাহজুড়ে অথবা প্রয়োজনে বিরতিহীনভাবে চলতে থাকবে।’ শনিবার খামেনির প্রাসাদসহ দেশজুড়ে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। এতে তার প্রাসাদ পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়। দক্ষিণ ইরানের এক স্কুলে হামলায় অন্তত ১৪৮ জন নিহত হন। ২৪ প্রদেশে হামলায় প্রায় ২৫০ জন নিহত হওয়ার খবর দিয়েছে সংবাদমাধ্যম।
মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে আঘাতের পর আঘাত : এর জবাবে মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি আরব দেশে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে ভয়াবহ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায় ইরান। শনিবার সকালে ইরানজুড়ে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার পরপরই তেহরান এই পাল্টা আঘাত শুরু করে। আইআরজিসি নিশ্চিত করেছে, মধ্যপ্রাচ্যের অন্তত ছয়টি দেশে মার্কিন স্বার্থ সংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। আক্রান্ত স্থানগুলোর মধ্যে রয়েছে- কাতারের রাজধানী দোহার কাছে অবস্থিত আল-উদেইদ বিমান ঘাঁটি; বাহরাইনের রাজধানী মানামায় অবস্থিত মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তর; কুয়েতের আহমেদ আল-জাবের বা আল-সালেম বিমান ঘাঁটি এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবিতে অবস্থিত আল-দাফরা বিমান ঘাঁটি। এছাড়া সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদ এবং জর্ডানে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোতেও বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে। হামলার পরপরই সংশ্লিষ্ট দেশগুলো তাদের আকাশসীমা বন্ধ করে দিয়েছে এবং বিমান চলাচল স্থগিত করেছে। কাতার ও বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসগুলো তাদের কর্মীদের নিরাপদ আশ্রয়ে থাকার নির্দেশ দিয়েছে। বাহরাইনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জরুরি সতর্কতা জারি করে বাসিন্দাদের নিকটস্থ নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। ইরানের একজন সিনিয়র কর্মকর্তা আলজাজিরাকে জানিয়েছেন, ‘শত্রুভাবাপন্ন ও অপরাধী চক্রের আগ্রাসনের জবাবে এই প্রথম দফার ব্যাপক হামলা চালানো হয়েছে।’ তেহরান আগেই সতর্ক করেছিল, তাদের ভূখণ্ডে কোনো আক্রমণ হলে অঞ্চলের সব মার্কিন ঘাঁটি বৈধ লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচিত হবে।
যুক্তরাষ্ট্রকে চরম মূল্য দিতে হবে- ইরানি নেতারা : ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের প্রধান আলী লারিজানি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে চরম হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ইরানি ভূখণ্ডে হামলার জন্য জায়নবাদী অপরাধী এবং নির্লজ্জ আমেরিকানদের চরম মূল্য দিতে হবে। এক্স-এ দেওয়া এক পোস্টে লারিজানি বলেন, ‘আমরা তাদের এই কর্মকাণ্ডের জন্য অনুতপ্ত হতে বাধ্য করব।’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘ইরানের সাহসী বীর সেনা এবং মহান জাতি এই আন্তর্জাতিক নিপীড়কদের এমন এক অবিস্মরণীয় শিক্ষা দেবে, যা তারা আগে কখনো পায়নি।’ ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযান এবং ইরানে ‘শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের’ উচ্চাকাঙ্ক্ষী পরিকল্পনার তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি এই প্রকল্পকে একটি ‘অসম্ভব মিশন’ বা অবাস্তব লক্ষ্য হিসেবে অভিহিত করেন। শনিবার আরাকচি বলেন, ট্রাম্প প্রশাসন এবং ইসরায়েলি সরকার ইরানি জনগণের ইচ্ছা ও শক্তির ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত এই শাসনব্যবস্থাকে উপড়ে ফেলার যে স্বপ্ন দেখছে, তা কখনোই সফল হবে না। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ইরানের ইসলামিক প্রজাতন্ত্র কোনো কৃত্রিম রাষ্ট্র নয় যে বাইরের শক্তির হামলায় ধসে পড়বে। এটি কয়েক দশকের প্রতিরোধ এবং জনগণের সমর্থনের ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
খামেনি হত্যাকাণ্ড আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন- পুতিন : আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের কাছে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যুতে গতকাল রোববার এক বিবৃতিতে ওই শোক জানিয়েছেন তিনি। পুতিন খামেনির এই মৃত্যুকে একটি ‘নৃশংস হত্যাকাণ্ড’ বলে অভিহিত করেন। তিনি বলেছেন, এই ঘটনা মানবিক নৈতিকতার সমস্ত আদর্শ এবং আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন।
আমিরাতে ১৩৭ ক্ষেপণাস্ত্র, ২০৯ ড্রোন ছুড়েছে ইরান : মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় দেশ এবং যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র সংযুক্ত আরব আমিরাতে শনিবার থেকে এ পর্যন্ত মোট ১৩৭টি ক্ষেপণাস্ত্র এবং ২০৯টি বিস্ফোরকবাহী ড্রোন নিক্ষেপ করেছে ইরান। অধিকাংশ ক্ষেপণাস্ত্র-ড্রোন এয়ার ডিফেন্স সিস্টেমের সাহায্যে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার আগেই ধ্বংস করতে সক্ষম হয়েছে আমিরাতের প্রতিরক্ষা বাহিনী, তবে কয়েকটিকে আটকানো সম্ভব হয়নি। সেসব ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে দেশটিতে অন্তত একজন নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন আরও ৭ জন। বিশ্বের ব্যস্ততম আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দুবাই বিমানবন্দরেও আঘাত হেনেছে ইরানি ড্রোন। সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাজধানী আবুধাবির দক্ষিণে আল দাফরা বিমান ঘাঁটি অবস্থিত এবং দুবাইয়ের জেবেল আলী বন্দর যৌথভাবে ব্যবহার করে আমিরাত ও মার্কিন সেনাবাহিনী।
কে হচ্ছেন খামেনির উত্তরসূরি : ১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামি-বিপ্লবের পর আলি খামেনি ছিলেন দ্বিতীয় ব্যক্তি, যিনি দেশটির সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণ করেন। ১৯৮৯ সালে বিল্পবের প্রতিষ্ঠাতা আয়াতুল্লা রুহুল্লাহ খোমেনির মৃত্যুর পর স্বাভাবিক নিয়ম আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত হয়েছিলেন। কিন্তু, এবারের প্রেক্ষাপট একেবারেই ভিন্ন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি হামলায় এই নেতা নিহত হওয়ার পর দেশ শাসন ও নেতৃত্বে শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে। সেই শূন্যতা কাটাতে অন্তর্বর্তীকালীন পরিষদ গঠন করেছেন দেশটির প্রভাবশালী কর্মকর্তারা। সেই পরিষদের সদস্যরা হলেন- ইরানের বর্তমান প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, বিচারব্যবস্থার প্রধান গোলাম হোসেইন মোহসেনি ইজেজি ও অভিভাবক পর্ষদের এক সদস্য। এবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, গত বছর জুনে ইরান ও ইসরায়েলের ১২ দিনের যুদ্ধে আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি তার ভবিষ্যৎ উত্তরসূরি হিসেবে তিনজনের নাম বলেছিলেন। প্রতিবেদন অনুসারে, সম্ভাব্য তিনজন হলেন- গোলাম হোসেইন মোহসেনি-ইজেজি, আলি আসগার হিজাজি ও হাসান খোমেনি। এর মধ্যে গোলাম হোসেইন মোহসেনি ইজেজি বর্তমানে ইরানের প্রধান বিচারপতি। তিনি দেশটির অন্তর্বর্তী শাসন পরিষদের একজন সদস্যও। আলি আসগার হিজাজি একজন ধর্মীয় নেতা। তিনি নিহত আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির ডেপুটি চিফ অব স্টাফ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। হাসান খোমেনি ইসলামি প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির নাতি।