
ইস্তেগফার। আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া। আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া আল্লাহর বড় পছন্দের কাজ। মানুষ দুর্বল, পদে পদে তার ভুলভ্রান্তি হয়। মানুষের মধ্যে খারাপ সেই লোক, যে নিজের ভুলকে ভুল মনে করে না; উল্টা ভুল কাজটিকে শুদ্ধ হিসেবে চালিয়ে দিতে চায়। শেষ পর্যন্ত তার জীবনটাই ভুল হয়ে যায়, সে শয়তানের অনুসারীতে পরিণত হয়। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি নিজের ভুল বুঝতে পারার সঙ্গে সঙ্গে নিজকে শুধরে নেওয়ার উদ্যোগ নেয়, ভুল স্বীকার করে কায়মনোবাক্যে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চায়, সে আল্লাহর প্রিয়পাত্রে পরিণত হয়।
মাহে রমজান মানুষকে আত্মণ্ডউপলব্ধির বেলাভূমিতে দাঁড়িয়ে নিজের সত্তাকে আবিষ্কার করা এবং ভুলত্রুটি ক্ষমা চেয়ে মহান আল্লাহর ইচ্ছার কাছে নিজকে সমর্পণ করার মনোভাব জাগিয়ে দেয়।
‘ইস্তেগফার’-এর শাব্দিক অর্থ ক্ষমা চাওয়া। পরিভাষায় মহান আল্লাহর কাছে নিজের ভুলত্রুটি, পাপ-তাপের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করার নাম ইস্তেগফার।
ইস্তেগফার কীভাবে করতে হয়? ইস্তেগফার-এর সবচেয়ে সহজ ভাষা হচ্ছে, ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ বলা। মানে ‘আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি।’ আরেকটু বড় করে বলতে চাইলে বলতে হবে, ‘আস্তাগফিরুল্লাহা রাব্বি মিন কুল্লে যানবিঁউ ওয়া আতুবু ইলাইহি লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহিল আলিয়্যিল আজিম।’ অর্থ ‘আমি আমার প্রতিপালকের কাছে ক্ষমা চাইছি প্রতিটি গোনাহ হতে আর আমি তার দিকেই ফিরে যাচ্ছি। সৎকাজ করার ক্ষমতা বা মন্দকাজ থেকে বিরত থাকার সামর্থ্য অতিশয় উচ্চ ও মহান আল্লাহর সাহায্য ছাড়া কারো নেই।’ ইস্তেগফার শুধু মুখের উচ্চারণে নয়; বরং হৃদয় নিংড়ানো মিনতি মিশ্রিত হতে হবে।
ইস্তেগফারের গুরুত্ব প্রমাণ করার জন্য এ তথ্যটিই যথেষ্ট যে, প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, আমি প্রতিদিন ৭০ বারের বেশি ইস্তেগফার করি। নবীজি তো নিষ্পাপ ছিলেন, নবীজির আগের পরের গোনাহগুলো আল্লাহ মাফ করে দিয়েছেন। এরপরও তিনি ইস্তেগফার করতেন কেন? প্রথম উত্তর উম্মতের তালিমের জন্য। দ্বিতীয় এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নবীজি সর্বক্ষণ আল্লাহর ধ্যানে থাকতেন; কখনও এই ধ্যানমগ্নতায় ব্যঘাত হয়েছে মনে করলে তিনি ইস্তেগফার করতেন, আল্লাহর সান্নিধ্যের উঞ্চতায় ফিরে যেতেন। নচেত আমাদের মতো কোনো গোনাহের কারণে তিনি ইস্তেগফার করেননি। তার তো গোনাহই ছিল না।
আধ্যাত্মিক উন্নতির সর্বোচ্চ স্তর হলো আল্লাহর সান্নিধ্য। ইস্তেগফারের মাধ্যমে সেই মাকামে উন্নীত হওয়ার সাধনা করেছেন নবী রাসূল ও আওলিয়ায়ে কেরাম। ইস্তেগফারের উল্লেখিত আধ্যাত্মিক নেয়ামত ছাড়াও তার বৈষয়িক নেয়ামতও অফুরান। বিশেষ করে বড় বড় চারটি লাভের তথ্য বর্ণিত হয়েছে কোরআন মজীদে।
বসরার প্রসিদ্ধ বুজুর্গ তাবেঈ ইমাম হাসান বসরী (র.)। তার কাছে লোকেরা আসত নানা সমস্যা ও জিজ্ঞাসা নিয়ে। একবার একসঙ্গে চার ব্যক্তি আসেন চার রকমের সমস্যা নিয়ে।
প্রথম ব্যক্তি বলল, ‘হে ইমাম! বহুদিন বৃষ্টি হচ্ছে না, চারদিকে খরা। আপনি দোয়া করুন, আমরা নিরূপায়। ইমাম বললেন- বেশি বেশি ইস্তেগফার কর।’
দ্বিতীয় ব্যক্তি বলল, হুজুর ‘আমি খুবই গরিব, অভাব আমার পিছু ছাড়ে না। আমার জন্য দোয়া করুন। ইমাম বললেন- ইস্তেগফার কর’।
তৃতীয় ব্যক্তি বলল, হুজুর আমার কোনো সন্তান হচ্ছে না। আমার জন্য দোয়া করুন। ইমাম জবাবে বললেন, ইস্তেগফার কর।
চতুর্থ ব্যক্তি অভিযোগ করল, আমার জমিতে ফসল হয় না, বরকত নেই। আমার জন্য দোয়া করুন। ইমাম আবারও একই কথা বললেন- ইস্তেগফার কর।
তখন উপস্থিত এক লোক বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করল- হে ইমাম! সবাই ভিন্ন ভিন্ন সমস্যা নিয়ে এসেছে, আর আপনি সবাইকে একই উপদেশ দিচ্ছেন- ইস্তেগফার কর। এর মাহাত্ম্য কী?
ইমাম হাসান আল-বসরী (র.) প্রশ্নকারীর প্রশ্নের উত্তরে কোরআন মজীদের কয়েকটি আয়াত তেলাওয়াত করলেন, যার মধ্যে ইস্তিগফারের অন্তত চারটি লাভের কথা উল্লেখ আছে। এই আয়াত নাজিল হয়েছে আল্লাহর কাছে স্বজাতির লোকদের ব্যাপারে হযরত নূহ (আ.)-এর অনুযোগ প্রসঙ্গে।
‘আমি তাদের বলেছি, তোমরা তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা চাও, নিশ্চয় তিনি অতিশয় ক্ষমাশীল। তিনি তোমাদের ওপর প্রচুর বৃষ্টি বর্ষণ করবেন, তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান দ্বারা সাহায্য করবেন এবং তোমাদের জন্য উদ্যান স্থাপন করবেন ও প্রবাহিত করবেন নদী-নালা।
-(সূরা নূহ, আয়াত-১০, ১১, ১২)
উল্লেখিত আয়াতগুলো হতে ইস্তিগফারের অন্তত চারটি লাভের কথা জানা যায়। (১) বৃষ্টি ও রহমত নাজিল হয় (২) রিজিকে বরকত ও সচ্ছলতা আসে (৩) সন্তান লাভ হয় আর (৪) ফসল, সম্পদ ও সার্বিক বরকত বৃদ্ধি পায়।
এখান থেকে আমরা শিক্ষা পেলাম, ইস্তেগফার শুধু গোনাহ মাফের মাধ্যম নয়- বরং এটি দুনিয়া ও আখিরাতের সংকট সমাধানের চাবিকাঠি। যে যত বেশি ইস্তেগফার করবে, তার জীবনে তত বেশি আল্লাহর রহমতের দরজা খুলে যাবে।
আল্লাহ পাক বান্দাদের প্রতি ডাক দিয়ে বলেন, ‘হে আমার বান্দারা! তোমরা যারা নিজেদের প্রতি অবিচার করেছ- আল্লাহর অনুগ্রহ হতে নিরাশ হইও না; আল্লাহ সমুদয় পাপ ক্ষমা করে দিবেন। তিনি তো ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’
তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের অভিমুখী হও এবং তাঁর কাছে আত্মসমর্পণ কর, তোমাদের ওপর শাস্তি আসার পূর্বে; যে অবস্থায় তোমাদের সাহায্য করা হবে না। -(সূরা যুমার, আয়াত-৫৩, ৫৪)
হে আল্লাহ আমাদের জন্য তোমার রহমতের দরজাগুলো খুলে দাও।