
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যখন ইরান ও লেবাননে মুহুর্মুহু হামলা চালাচ্ছে, তখন পাল্টাহামলায় তীব্রতা বাড়িয়েছে ইরান। ইসরায়েলের স্পর্শকাতর স্থাপনাগুলোকে নিশানা করার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে ব্যাপক পরিসরে আঘাত হেনে যাচ্ছে ইরানি বাহিনী। সৌদি আরব, আরব আমিরাত, কুয়েত ও কাতারের মতো মার্কিন মিত্রদেশগুলোতে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। দেশগুলোর নাগরিক এবং সেখানে বসবাসরত প্রবাসীরা জরুরি প্রয়োজন ছাড়া রাস্তায় বের হচ্ছেন না। বিশেষ করে বিমানবন্দর ও নৌবন্দরগুলো আক্রান্ত হওয়ায় দেশগুলোর ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির হয়ে পড়েছে। শুধু দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আরব আমিরাত প্রতি এক মিনিটে প্রায় ১০ লাখ ডলার ক্ষতি গুনছে বলে হিসাব দিয়েছে সংবাদমাধ্যমগুলো।
ইসরায়েলে ভারী মিসাইলের আঘাত : ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার ভোরে ‘খুররমশাহর-৪’ নামের কিছু অসাধারণ ভারী ক্ষেপণাস্ত্র পাঠানো হয়েছে তেলআবিবের কেন্দ্রস্থলে। আইআরজিসি বলেছে, ইসরায়েলের বেনগুরিয়ান বিমানবন্দর ও সেখানকার ইসরায়েলি বিমান বাহিনীর স্কাডরান-২৭ ঘাঁটি ছিল এসব ক্ষেপণাস্ত্রের লক্ষ্য। এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো সাত স্তরের আঞ্চলিক ও ইসরায়েলি বাধা এড়িয়ে সফলভাবে টার্গেটগুলোতে আঘাত হানাতে সক্ষম হওয়ায় সেখানে আগ্রাসীদের জন্য প্রকৃত নরক সৃষ্টি হয়েছে। এইসব ক্ষেপণাস্ত্র পাঠানোর আগে কিছু ড্রোন পাঠানো হয়। ‘ট্রু প্রমিজ-৪’ শীর্ষক অভিযানের ১৮তম জোয়ারের আওতায় এসব অভিযানের পাশাপাশি বাহরাইন, আরব আমিরাত ও কুয়েতসহ আশপাশের নানা অঞ্চলে ২০টি মার্কিন সামরিক অবস্থানেও আঘাত হানা হয়েছে। উচ্চতর সমন্বয়, পরিকল্পনা ও কৌশলগত আঘাতের সমাহারের মাধ্যমে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী ব্যাপক বিস্তৃত ও বহুমুখী যুদ্ধের ময়দানে মার্কিন ও ইসরায়েলি যুদ্ধের হিসাব-নিকাশকে ভুল প্রমাণ করে যুদ্ধের সমীকরণ বদলে দিয়েছে। এ অবস্থায় মার্কিন সেনারা পালিয়ে গিয়ে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে তাদের আতিথ্য দানকারী দেশগুলোর হোটেলে কিংবা বেসামরিক আশ্রয়স্থলগুলোতে অবস্থান নিয়েছে, যা ইরানি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর গোয়েন্দা পর্যবেক্ষণে ধরা পড়েছে। এই আগ্রাসী মার্কিন সেনাদের শিকার করতে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী ফাঁদ পেতে অপেক্ষায় রয়েছে এবং তাদেরকে রেহাই দেওয়া হবে না।
মার্কিন তেলবাহী ট্যাঙ্কারে হামলা চালাল ইরান : ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনের কঠোর জবাব দিয়ে যাচ্ছে ইরান। এরইমধ্যে দেশটি আশপাশে প্রায় দেশেই মার্কিন সামরিক ঘাঁটি, দূতাবাসসহ বিভিন্ন স্থাপনাকে টার্গেট করেছে। এবার যুক্তরাষ্ট্রের একটি তেলবাহী ট্যাঙ্কারে হামলার দাবি করল তেহরান। ইরান বলেছে, তারা পারস্য উপসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের একটি তেলবাহী ট্যাঙ্কারে হামলা চালিয়েছে। রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইরনায় প্রকাশিত এক বিবৃতিতে আইআরজিসির জনসংযোগ বিভাগ জানায়, ইরানি নৌবাহিনী ‘সফলভাবে একটি আমেরিকান তেলবাহী ট্যাঙ্কারকে লক্ষ্যবস্তু করেছে’। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত আর কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি।
শক্তিশালী ‘থাড’ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় ইরানের আঘাত : ইরান তার অত্যাধুনিক হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে ইসরায়েলের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অবকাঠামো ধ্বংস করার কথা জানিয়েছে। আইআরজিসি এই প্রতিশোধমূলক হামলার বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেছে। ইরানি বাহিনী বলেছে, তারা ইসরায়েলে মোতায়েন করা যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি অত্যন্ত শক্তিশালী ‘টার্মিনাল হাই অ্যাল্টিটিউড এরিয়া ডিফেন্স’ বা ‘থাড’ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে সফলভাবে আঘাত হেনেছে। ইরানের ছোঁড়া হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মূল রাডার কেন্দ্রগুলোকে মুহূর্তের মধ্যে ধ্বংস করে দিয়েছে। আইআরজিসির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর গতি এতই বেশি ছিল যে ইসরায়েলের বর্তমান কোনো প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাই সেগুলোকে শনাক্ত বা আটকাতে পারেনি। শব্দের চেয়ে কয়েক গুণ দ্রুতগতিসম্পন্ন এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো অত্যন্ত নিখুঁতভাবে তাদের নির্ধারিত লক্ষ্যে আঘাত হেনেছে। ইরান জানিয়েছে, তাদের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন এবং সাম্প্রতিক উস্কানিমূলক হামলার কঠোর জবাব দিতেই এই বিশেষ অপারেশন পরিচালনা করা হয়েছে। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ‘থাড’-এর মতো উন্নত ব্যবস্থা বিকল করে দেওয়া ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তির এক বিশাল অগ্রগতি নির্দেশ করে। এর ফলে ওই অঞ্চলে আকাশ প্রতিরক্ষার সমীকরণ আমূল বদলে যেতে পারে।
সৌদি আরবে ড্রোন হামলা : আলজাজিরা জানিয়েছে, সৌদি আরবে আবার ড্রোন হামলা করেছে ইরান। উত্তরাঞ্চলীয় আল জওফ অঞ্চলের কাছে বৃহস্পতিবার সকালে এই হামলা হয়। তবে ড্রোনটি প্রতিহত করা সম্ভব হয়েছে বলে জানিয়েছে সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। প্রায় একই সময়ে জর্ডানের শহর আকাবার ওপর দিয়ে ইসরায়েলের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র উড়ে যেতে দেখেছেন আলজাজিরার প্রতিনিধি। ইরানের পক্ষ থেকে ইসরায়েল অভিমুখে এক ঝাঁক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের ঘোষণা দেওয়ার পর এ খবর পাওয়া গেল। ইরানের তাসনিম নিউজ জানায়, বৃহস্পতিবার সকালে ইসরায়েল এবং মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করে নতুন করে সমন্বিত মিসাইল ও ড্রোন অভিযান শুরু করেছে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসি।
কুয়েত উপকূলে তেল ট্যাঙ্কারে ভয়াবহ বিস্ফোরণ : কুয়েতের মুবারক আল-কবীর বন্দর থেকে প্রায় ৩০ নটিক্যাল মাইল দক্ষিণ-পূর্বে একটি তেল-ট্যাংকারে শক্তিশালী বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে। যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস বৃহস্পতিবার এই ঘটনার কথা নিশ্চিত করেছে। নোঙর করে থাকা একটি তেল-ট্যাংকারের ক্যাপ্টেন জানিয়েছেন, তিনি জাহাজের বাম দিকে একটি বড় ধরনের বিস্ফোরণের শব্দ শুনতে পান এবং আগুনের শিখা দেখতে পান। বিস্ফোরণের পরপরই একটি ছোট নৌকাকে দ্রুত ওই এলাকা ছেড়ে চলে যেতে দেখা গেছে বলে জানিয়েছেন জাহাজের মাস্টার। বিস্ফোরণের ফলে জাহাজটির একটি কার্গো ট্যাংক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং সেখান থেকে সমুদ্রে তেল ছড়িয়ে পড়তে দেখা গেছে। এছাড়া জাহাজের ভেতরে পানি ঢুকে পড়েছে বলেও জানা গেছে। সমুদ্রে তেল ছড়িয়ে পড়ার ফলে ওই অঞ্চলে বড় ধরনের পরিবেশগত বিপর্যয়ের আশঙ্কা করা হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের সমুদ্রসীমায় ইরানের সিরিজ হামলার পর কুয়েত উপকূলে এই বিস্ফোরণ নতুন করে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। অবশ্য, কোনো গোষ্ঠী এখন পর্যন্ত এই হামলার দায় স্বীকার করেনি।
কুর্দিস্তানে ইরানবিরোধী বাহিনীর ওপর হামলা : প্রতিবেশী দেশ ইরাকের আধা-স্বায়ত্তশাসিত কুর্দিস্তান অঞ্চলে অবস্থানরত ‘ইরানবিরোধী বিচ্ছিন্নতাবাদী বাহিনী’-কে লক্ষ্য করে সামরিক অভিযান শুরু করেছে ইরান। দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম ‘প্রেস টিভি’র বরাত দিয়ে এই তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে। ইরান বলেছে, উত্তর ইরাকে অবস্থানরত ইরানবিরোধী কুর্দি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে লক্ষ্য করে এই অভিযান চালানো হচ্ছে। প্রেস টিভির প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা গেছে, রাতের অন্ধকারে শক্তিশালী বিস্ফোরণের আলোয় আকাশ আলোকিত হয়ে উঠছে। তবে ঠিক কোন স্থানে এই হামলা চালানো হয়েছে, তা নির্দিষ্ট করে জানানো হয়নি। স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে, উত্তর ইরাকের সুলাইমানিয়াহ প্রদেশে বেশ কয়েকটি বিস্ফোরণ ঘটেছে। ধারণা করা হচ্ছে, কুর্দি সশস্ত্র গোষ্ঠী ‘কোমালা’-এর সদর দপ্তর লক্ষ্য করে এই হামলা চালানো হয়। সম্প্রতি সংবাদমাধ্যমে খবর ছড়িয়ে পড়ে, কুর্দি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো ইরানের পশ্চিমাঞ্চলে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর হামলার পরিকল্পনা করছে। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরান-ইরাক সীমান্ত এলাকায় অবস্থানরত কুর্দি গোষ্ঠীগুলোর একটি জোট যুক্তরাষ্ট্রের মদতে ইরানের সামরিক শক্তিকে দুর্বল করার লক্ষ্যে স্থল অভিযানের প্রশিক্ষণ নিচ্ছে।
দোহার মার্কিন দূতাবাস এলাকা জনশূন্য : সৌদি আরব ও আরব আমিরাতের মার্কিন দূতাবাসে ইরানি হামলার পর কাতারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে দোহার মার্কিন দূতাবাসের নিকটবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের ঘরবাড়ি খালি করার নির্দেশ দিয়েছে। আলজাজিরার প্রতিনিধি ওই এলাকায় বসবাসকারী লোকজনের সঙ্গে কথা বলেছেন। তারা জানিয়েছেন, পুলিশ সদস্যরা এলাকায় অবস্থান করছেন এবং অত্যন্ত শান্তভাবে সবাইকে এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়ার অনুরোধ জানাচ্ছেন। স্থানান্তরিত বাসিন্দাদের জন্য বিকল্প আবাসনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। একজন বাসিন্দা জানিয়েছেন, বেশ কিছু মানুষকে নিকটবর্তী একটি মেট্রো স্টেশনে আশ্রয় নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টও তাদের নাগরিকদের জন্য এক জরুরি সতর্কতা জারি করেছে। এতে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত আমেরিকানদের অবিলম্বে এই অঞ্চল ত্যাগের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এমনকি বাণিজ্যিক ফ্লাইট পাওয়া না গেলে ওমান বা সৌদি আরবের মতো প্রতিবেশী দেশগুলোর মাধ্যমে হলেও তাদের দ্রুত প্রস্থান করতে বলা হয়েছে।
কমপক্ষে ৫০০ মার্কিন সেনা নিহত : ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব আলী লারিজানি এক কড়া বার্তায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সরাসরি প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ভয়াবহ যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে তিনি জানতে চেয়েছেন, ট্রাম্পের কাছে নিজের দেশ বড় নাকি ইসরায়েলের স্বার্থ রক্ষা বড়? আলী লারিজানি দাবি করেন, গত কয়েক দিনের লড়াইয়ে কমপক্ষে ৫০০ মার্কিন সেনা প্রাণ হারিয়েছেন। যদিও মার্কিন পেন্টাগন এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে মাত্র ৬ জন সেনা নিহতের খবর নিশ্চিত করেছে, তবে লারিজানি এই বিশাল সংখ্যক নিহতের দাবি তুলে ট্রাম্প প্রশাসনকে নিজের জনগণের বড় প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছেন। লারিজানি বলেন, ‘৫০০-র বেশি মার্কিন সেনা নিহতের পর ট্রাম্পের এখন হিসাব করা উচিত- তার কাছে কি এখনও ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নাকি তিনি ‘ইসরায়েলকে’ অগ্রাধিকার দিচ্ছেন?’ তিনি অভিযোগ করেন, ট্রাম্প ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর ‘ভাঁড়ামিপূর্ণ আচরণে’ প্রভাবিত হয়ে মার্কিন জনগণকে ইরানের বিরুদ্ধে এক অন্যায্য যুদ্ধে টেনে এনেছেন। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ওপর সাম্প্রতিক হামলার প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি সতর্ক করে বলেন, এই ধরনের দুঃসাহসের জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে ‘চরম মূল্য’ দিতে হবে।
আজারবাইজানে হামলার অভিযোগ অস্বীকার করল ইরান : আজারবাইজানে কয়েকটি ড্রোন আঘাত হেনেছে বলে দেশটি জানিয়েছে। তারা সন্দেহ করছে, হামলাটি ইরান থেকে হয়েছে। এজন্য তেহরানের রাষ্ট্রদূতকে তলবও করেছিল বাকু। তবে আজারবাইজানকে টার্গেট করার অভিযোগ অস্বীকার করেছে ইরান। ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গারিবাবাদি বলেন, তারা আজারবাইজানকে লক্ষ্যবস্তু করার দাবি অস্বীকার করছেন। এর আগে আজারবাইজান জানায়, দুটি ইরানি ড্রোন তাদের স্বায়ত্তশাসিত নাখচিভান অঞ্চলে আঘাত হেনেছে, যার মধ্যে একটি বিমানবন্দরের ভবন ছিল। ইরানের তাসনিম নিউজ এজেন্সির বরাত দিয়ে গারিবাবাদি বলেন, ‘ইরান আজারবাইজান প্রজাতন্ত্রকে লক্ষ্যবস্তু করেনি। আমরা আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করি না।’ তিনি আরও বলেন, ইরানের নীতি হলো কেবল এ অঞ্চলে সক্রিয় তার ‘শত্রুদের সামরিক ঘাঁটিগুলোতে’ হামলা চালানো, যেগুলো ইরানকে আক্রমণ করার জন্য ব্যবহৃত হয়; যার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ঘাঁটিগুলো অন্তর্ভুক্ত।
জ্বালানির দামে বড় অস্থিরতা : ক্রমবর্ধমান উত্তজনা এবং পাল্টাপাল্টি সামরিক হামলার প্রভাবে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দামে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। ইউনিভার্সিটি অফ হিউস্টনের জ্বালানি অর্থনীতিবিদ এবং লেকচারার এড হারস সতর্ক করে বলেছেন, সংঘাতের কারণে জোগান ব্যাহত হলে তেলের দাম অভাবনীয় পর্যায়ে পৌঁছে যেতে পারে। এড হারস জানান, যদি উত্তেজনার কারণে পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ জাহাজ চলাচলের পথ ‘হরমুজ প্রণালী’ দিয়ে তেলের সরবরাহ অর্ধেকও কমে যায়, তবে বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১৫০ ডলারে গিয়ে ঠেকতে পারে। বিশেষ করে যদি মার্কিন নৌবাহিনী তেলের ট্যাংকারগুলোকে আর নিরাপত্তা দিতে সক্ষম না হয়, তবে এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। সংঘাতের প্রথম দিনেই তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজির দাম ৪০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। গত সোমবার ও মঙ্গলবারের মধ্যে ইউরোপের দেশগুলোতে প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ডিজেলের দামও অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল দেশগুলো এখন অগ্রিম তেল কেনা শুরু করায় যুক্তরাষ্ট্রের কিছু অঙ্গরাজ্যেও এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। বিশ্লেষক হারস মনে করেন, এই জ্বালানি সংকট যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলবে। সামনেই যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন থাকায় তেলের এই আকাশচুম্বী দাম প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য দেশের ভেতরে বড় ধরনের রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
হরমুজ প্রণালী নিয়ে ব্যর্থ ট্রাম্প : ইরান-নিয়ন্ত্রিত হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক তেল-ট্যাংকারগুলোকে নিরাপত্তা বা ‘এস্কর্ট’ দেওয়ার বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষণা এক দিনের মাথায় হোঁচট খেয়েছে। খোদ মার্কিন নৌ-বাহিনী জানিয়েছে, সাগরে এই বিশাল কর্মযজ্ঞ চালানোর মতো পর্যাপ্ত জনবল বা নৌ-সেনা তাদের নেই। ইরানি সংবাদ সংস্থা ‘ফার্স’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন নৌ-বাহিনী আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেছে, সাগরে তেলের ট্যাংকারগুলোকে পাহারা দিয়ে নিয়ে যাওয়ার মতো প্রয়োজনীয় সুরক্ষা ও সাহায্যকারী নৌ-সেনা এই মুহূর্তে তাদের হাতে নেই। অথচ জ্বালানি তেলের দাম অস্বাভাবিক বাড়তে থাকায় গত রাতেই ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছিলেন, মার্কিন ট্যাংকারগুলোকে সামরিক প্রহরায় পার করা হবে। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই পরিকল্পনা বাস্তবসম্মত নয়। স্বাভাবিক সময়ে হরমুজ প্রণালী দিয়ে প্রতিদিন ২৫০ থেকে ৩৫০টি তেল-ট্যাংকার চলাচল করে। এই বিশাল সংখ্যক জাহাজ পাহারা দিতে যে সক্ষমতা প্রয়োজন, তার বিপরীতে ওই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মাত্র তিনটি ছোট যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন রয়েছে। ফলে হাজার হাজার ট্যাংকারকে ‘এস্কর্ট’ দেওয়ার বিষয়কে অনেকটা ‘হাস্যকর’ বলে অভিহিত করেছেন বিশেষজ্ঞরা। এদিকে, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে হরমুজ প্রণালী বন্ধ ঘোষণা করলেও কিছু জাহাজ সেই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করার চেষ্টা করছে। ইরানের আইআরজিসি জানিয়েছে, নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে অগ্রসর হওয়ায় ১০টিরও বেশি তেল-ট্যাংকার ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার শিকার হয়েছে। এদিকে, আইআরজিসি-র নৌবাহিনীর একজন ঊর্ধ্বতন কমান্ডার বুধবার সতর্ক করে বলেছেন, এখন থেকে বিশ্বকে অবশ্যই ইরানের নির্ধারিত নিয়মগুলো মানতে হবে এবং অনুসরণ করতে হবে। তিনি বলেন, কোনো যুদ্ধজাহাজ যেন ইরানের ৮০০ মাইলের মধ্যে আসার দুঃসাহস না দেখায়। হরমুজ প্রণালী দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে পাহারা দিয়ে নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে ট্রাম্পের দাবির প্রতিক্রিয়ায় ওই কমান্ডার তাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলেন, ‘এখনই জাহাজ পাহারা দেওয়ার সময়, তাই আসুন এবং জাহাজগুলোকে পাহারা দিন।’ তিনি ট্রাম্পকে উপহাস করে বলেন, ‘উপসাগরে আটকে পড়াদের উদ্ধার করতে বা হরমুজ প্রণালী উন্মুক্ত করতে ট্রাম্প তার নৌবহর পাঠাতে পারবেন না। কারণ, সমুদ্রে শক্তির সমীকরণ এখন পরিষ্কার।’
সামনে লড়াই ছাড়া কিছু নেই- হিজবুল্লাহ : লেবাননের প্রতিরোধ আন্দোলন হিজবুল্লাহর প্রধান শেখ নাঈম কাসেম এক বিশেষ ভাষণে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ অব্যাহত রাখার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন। বুধবার দেওয়া এই ভাষণে তিনি চলমান সংঘাত এবং লেবাননের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় হিজবুল্লাহর অবস্থান স্পষ্ট করেন। শেখ কাসেম স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, ‘আমাদের সামনে এখন একটিই পথ- আর তা হলো লড়াই। আমরা কোনোভাবেই আত্মসমর্পণ করব না।’ তিনি জোর দিয়ে বলেন, ইসরায়েলি আগ্রাসন লেবাননের জনগণের জন্য এক অস্তিত্ব রক্ষার হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি লেবানন সরকারকে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, আগ্রাসন বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘আমাদের ধৈর্যের সীমা আছে।’ বর্তমান সংকটকালীন পরিস্থিতিতে সব লেবানিজ পক্ষকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, শত্রুর মোকাবিলা করাই এখন প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক মতভেদ পরে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব।
ইরানে হামলার নিন্দা জাতিসংঘ বিশেষজ্ঞদের : ইরানজুড়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান সামরিক অভিযানকে ‘আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন’ হিসেবে অভিহিত করে তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন জাতিসংঘের একদল মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ। তারা এই হামলাকে ‘বেআইনি আগ্রাসন’ আখ্যা দিয়ে অবিলম্বে সংঘাত বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন। বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, নিরাপত্তা পরিষদের কোনো অনুমোদন ছাড়া এবং কোনো উস্কানি ছাড়াই চালানো এই হামলা জাতিসংঘ সনদের অনুচ্ছেদ ২-এর ৪-এর পরিপন্থী। এটি কোনো দেশের সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতার ওপর সরাসরি আঘাত। হামলায় বিপুল সংখ্যক বেসামরিক মানুষের মৃত্যুতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। বিশেষ করে দক্ষিণাঞ্চলীয় মিনাব এলাকায় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হামলায় ১৬০ জনের বেশি শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনাকে ‘মানবাধিকারের ওপর পেশিশক্তির জয়’ বলে বর্ণনা করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তেহরানসহ বিভিন্ন শহরে স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র এবং বেসামরিক অবকাঠামোয় হামলার ফলে মানবিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে বলে তারা সতর্ক করেছেন। বিশেষজ্ঞরা স্পষ্টভাবে বলেছেন, ইরানের অভ্যন্তরীণ কোনো বিষয় বা পারমাণবিক কর্মসূচি কখনও আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে সামরিক হস্তক্ষেপের অজুহাত হতে পারে না। এদিকে, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের পক্ষ থেকে এই হামলাকে আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য একটি ‘ভয়াবহ হুমকি’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব ডেমোক্রেটিক লয়ার্স এই আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে এবং মার্কিন ও ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনার জন্য বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।