
নবীজি (সা)-এর যাত্রার খবর আবু সুফিয়ানের কাছে পৌঁছলে সে বদরের পানির কূপগুলোর নিকটে পৌঁছেও দ্রুত সাথীদের কাছে ফিরে যায় এবং তার কাফেলা সাগর তীরের পথ ধরে বদরকে বাম পাশে রেখে দ্রুত কেটে পড়ে।
আবু সুফিয়ান যখন অনুভব করল, বাণিজ্য কাফেলা বিপদমুক্ত তখন কুরাইশ বাহিনীর কাছে লোক পাঠিয়ে বলল: তোমরা বাণিজ্য কাফেলার প্রতিরক্ষার জন্য মক্কা থেকে এসেছ, কাফেলার লোকদের বাঁচানোই তোমাদের লক্ষ্য ছিল। কাজেই এখন ফিরে এসো। আবু জাহলজবাব দিল: খোদার কসম, ফিরব না, বদরে পৌঁছবই। (বদর ছিল আবরদের একটি মওসুমী বাণিজ্য মেলার স্থল। প্রতি বছর সেখানে বাজার বসত)। আমরা সেখানে তিনদিন অবস্থান করব। আমাদের জন্তুগুলো জবাই করব। লোকদের যেয়াফত দেব। আমরা মদ্য পান করব। দাসীরা আমাদের জন্য নৃত্যগীত করবে। আরবভূমি আমাদের অবস্থা জানবে, আমাদের গতিপথ ও বাহিনী সম্পর্কে অবহিত হবে। সবসময় আমাদের ভয় করবে। কাজেই সম্মুখপানে চল।
কুরাইশ বাহিনী এক পর্যায়ে মক্কার দিক থেকে নিকটবর্তী ও মদীনার দিক থেকে দূরবর্তী একটি প্রান্তরে তাঁবু ফেলে। পানির কূপগুলো ছিল মদীনার নিকটবর্তী প্রান্তরের অংশ। যে অংশে রাসূলে পাক তাঁবু ফেলেছিলেন তা ছিল সাধারণ জমি। আল্লাহ তাআলা বৃষ্টি বর্ষণ করেন। ফলে রাসূলে পাকের (সা) জন্য জমি বিধৌত ও পরিচ্ছন্ন হয় এবং বৃষ্টি কুরাইশদের জন্য প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়। ইবনে সাআদ বলেন: ঐ সময় মুসলমানরা নিদ্রা ও ঝিমুনির চোটে এদিক-ওদিক ঢলে পড়ছিল। তারা বালিময় একটি স্থানে তাঁবু ফেলেছিল। আল্লাহ্ বৃষ্টি বর্ষণ করেন। ফলে জমি পরিচ্ছন্ন ও শক্ত সমতল হয়ে যায়। ঠিক পাথুরে জমিনের মত। মুসলমানরা অতি সহজে তাতে দৌঁড়াদৌড়ি করতে পারছিল। আল্লাহ মুসলমানদের প্রতি অনুগ্রহের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন:
“স্মরণ কর সে সময়ের কথা, যখন আল্লাহ নিজের পক্ষ হতে তোমাদের প্রশান্তির জন্য তোমাদের ওপর তন্দ্রাচ্ছন্নতা আরোপ করেন এবং তোমাদের ওপর আকাশ থেকে পানি অবতরণ করেন, তা দ্বারা তোমাদের পবিত্র করার জন্য, তোমাদের থেকে শয়তানের অপবিত্রতা অপসারণের জন্য, তোমাদের হৃদয় দৃঢ় করবার জন্য এবং তোমাদের পদক্ষেপসমূহ স্থির রাখবার জন্য।”(সূরাআনফাল, আয়াত-১১)
ইবনে ইসহাক বলেন, বৃষ্টির কারণে কুরাইশ বাহিনী এমন বেকায়দায় পড়ে যে, তাদের নড়াচড়া করার সুযোগও ছিল না। রাসূলে পাক (সা) তখন যাত্রা করলেন এবং কুরাইশ বাহিনীর আগেই পানির নিকট পৌছে গেলেন। বদরের পানির কূপ এলাকার নিকট পৌঁছে তিনি তাঁবু ফেললেন।হুবাব ইবনে মান্যার ইবনে জামূহ নবীজির সামনে এসে আরজ করলেন:ইয়া রাসূলাল্লাহ্! যদি আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিয়ে থাকেন যে, এখানেই তাঁবু ফেলেন তাহলে আমাদের মতামত দেয়ার অধিকার নেই। এখানে থেকে একটু আগে বা একটু পেছনে যাওয়া উচিত নয়। কিন্তু যদি নিছক যুদ্ধ হয়ে থাকে এবং রণকৌশলের ব্যাপার হয় তাহলে আমার মতামত আছে। রাসূলে পাক (সা) ফরমালেন: এটি যুদ্ধ এবং কূটকৌশলের ব্যাপার। হুবাব বললেন: এটি ভালো জায়গা নয়। এখান থেকে লোকদের সামনে নিয়ে যান। দুশমনের নিকটতম কূপটির কাছে আমরা অবস্থান গ্রহণ করি এবং অন্যান্য কূপের মুখ আমরা আড়াল করে দেই। আমাদের জন্য একটি হাউজ তৈরি করি, তাতে পানি ভর্তি করে রাখি, তারপর যুদ্ধ শুরু করি। তাহলে পানি আমাদের দখলে থাকবে এবং তারা পানি ব্যবহার করতে পারবে না।
নবীজি (সা) বললেন: সঠিক মতামত দিয়েছ। তিনি লোকদের নিয়ে অগ্রসর হলেন এবং কূপের নিকট গিয়ে অবতরণ করলেন আর অন্যান্য কূপের মুখ আড়াল করে দিলেন। একটি চৌবাচ্চা তৈরি করে তা পানি দ্বারা ভর্তি করালেন এবং পানি তোলার পাত্রগুলো তাতে রাখলেন।
সাআদ ইবনেমাআয বলেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি অনুমতি দিন, আপনার জন্য একটি ছাউনি তৈরি করি। আপনি সেখানে থাকুন, আপনার বাহনগুলোও সেখানেই রাখুন। আমরা দুশমনের সাথে লড়াই করব। আল্লাহ তাআলা যদি আমাদের ইজ্জত দান করেন এবং দুশমনের ওপর বিজয়ী করেন তা হবে সেই জিনিস, যা আমরা কামনা করি। যদি ভিন্নরূপ নেয়, আপনি আপনাদের বাহনে সওয়ার হবেন এবং আমাদের সম্প্রদায়ের সাথে মিলিত হবেন। আমাদের সম্প্রদায়ের একদল লোক- যারা এ সফরে আপনার সঙ্গী হয়নি; তা শুধু এজন্যই যে, তারা ভাবেনি যে, যুদ্ধ সংঘটিত হবে। যদি ধারণা করতে পারত যে, এমনটি হবে তাহলে কখনো এ যাত্রা হতে পিছপা হত না। আপনার প্রতি আমাদের ভালোবাসা তাদের ভালোবাসার চাইতে অধিক নয়। আল্লাহ্ আপনাকে তাদের মাধ্যমে হেফাজত করবেন। তারা আপনার শুভাকাঙ্ক্ষী এবং আপনার হয়ে যুদ্ধ করবে।
হযরত (সা) তার জন্য দোয়া করলেন। এরপর হযরতের জন্য একটি ছাউনি নির্মাণ করা হল। তিনি সেখানেই অবস্থান করেন।
কুরাইশ বাহিনী পরদিন ভোরে আক্রমণ রচনা করে এবং সম্মুখে আসে। রাসূলে খোদা (সা) তাদের দেখামাত্র বললেন: ইয়া আল্লাহ্! এরা হচ্ছে কুরাইশ, গর্ব অহংকার ও দম্ভ নিয়ে তোমার সাথে যুদ্ধ করতে এসেছে। তোমার রাসূলকে মিথ্য প্রতিপন্ন করছে। প্রভু হে! যেসাহায্য ও বিজয়ের ওয়াদা দিয়েছ তা আমাদের নসীব কর। ইয়া আল্লাহ্! তাদেরকে আজকেই দুপুরের আগে নাস্তানাবুদ করে দাও।
ইবনে সাআদ বলেন, কুরাইশ বাহিনীর সংখ্যা ছিল ৯৫০ জন। সাথে ছিল ১০০টি অশ্ব এবং ৩টি পতাকা। একটি পতাকা ছিল আবু-আযিয ইবনে ওমাইর এর কাঁধে। আরেকটি নদর ইবনে হারেস এর সাথে। অপর পতাকাটি বহন করছিল তাল্হা ইবনে আবি তালহা।