ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৬ মার্চ ২০২৬, ১২ চৈত্র ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

ট্রাম্পের ১৫ দফা ‘শান্তি প্রস্তাব’ কঠিন পাঁচ শর্ত ইরানের

ট্রাম্পের ১৫ দফা ‘শান্তি প্রস্তাব’ কঠিন পাঁচ শর্ত ইরানের

ইরানের ওপর যৌথ সামরিক হামলার পর চাপে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি এবং ইসরায়েলের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে ধারাবাহিক হামলা চালিয়ে যাচ্ছে তেহরান, যা অঞ্চলজুড়ে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি করেছে। চলমান এই উত্তেজনায় মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি ক্রমেই নাজুক হয়ে উঠছে। পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনতে নানামুখী চাপের মুখে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শান্তির প্রস্তাব দিয়েছেন, ট্রাম্পের সেই প্রস্তাবে পাঁচ শর্ত জুড়িয়ে দিয়েছে তেহরান।

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যেকার উত্তেজনা প্রশমনে কূটনৈতিক উদ্যোগে সক্রিয় হয়েছেন ট্রাম্প। তিনি এরইমধ্যে একটি শান্তি প্রস্তাব উত্থাপন করেছেন। তবে তেহরান সেই প্রস্তাবে সরাসরি সাড়া না দিয়ে পাল্টা পাঁচটি শর্তজুড়ে দিয়েছে, যা কার্যত আলোচনার পথকে জটিল করে তুলেছে। কূটনৈতিক মহলের ধারণা, ইরানের দেওয়া শর্তগুলো মূলত নিরাপত্তা নিশ্চয়তা, আঞ্চলিক প্রভাব এবং নিষেধাজ্ঞা সংক্রান্ত ইস্যুকে কেন্দ্র করে হতে পারে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, দীর্ঘদিনের পারস্পরিক অবিশ্বাস, ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং সামরিক উত্তেজনা- সব মিলিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতার পথ এখনও অনিশ্চিত। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের এই সংকট কোন দিকে মোড় নেবে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে।

ইরানকে ১৫ দফা শান্তি পরিকল্পনা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র : মার্কিন ও ইসরায়েলি সংবাদ মাধ্যমগুলো নাম প্রকাশ না করা সূত্রকে উদ্ধৃত করে জানিয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্র একটি ১৫ দফা শান্তি পরিকল্পনা ইরানের কাছে হস্তান্তর করেছে। তবে বিবিসি এ ধরনের কোনো ডকুমেন্টস এখনও দেখেনি।

এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শেষ করতে এই মুহূর্তে একটি আলোচনা চলছে এবং যাদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র এ নিয়ে কথা বলছে তারা খুবই মরিয়া হয়ে একটি চুক্তি করতে চাইছে। যদিও একদিন আগেই ইরানের কর্মকর্তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার খবর প্রত্যাখ্যান করে এটিকে ‘ভুয়া খবর’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তবে মঙ্গলবার চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ইর সঙ্গে আলাপের সময় বলেছেন, ইরান শুধু অস্থায়ী নয়, একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতিতে আগ্রহী। এদিকে বিশ্ববাজারে তেলের দাম প্রায় ছয় শতাংশ কমেছে। যদিও ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা অব্যাহত আছে। ইরান জানিয়েছে, শত্রু ভাবাপন্ন নয় এমন জাহাজকে তারা হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচল করতে দেবে। এতে বোঝা যাচ্ছে যে, কোনো চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত ওই জলপথের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে চাইছে তেহরান। অপরদিকে ইরানের রেড ক্রিসেন্ট জানিয়েছে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে দেশটিতে এ পর্যন্ত প্রায় ৮২ হাজার স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধে পাঁচ শর্ত দিল ইরান : যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধের চুক্তিতে পৌঁছাতে ইরান পাঁচটি শর্ত দিয়েছে বলে গত সোমবার হিব্রু সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে। যুদ্ধ বন্ধে ইরানের শর্তগুলো হলো: ১. যুদ্ধ যেন আর কখনও শুরু না হয়, সেটির শক্তিশালী নিশ্চয়তা দিতে হবে। ২. পশ্চিম এশিয়ায় (মধ্যপ্রাচ্য) থাকা যুক্তরাষ্ট্রের সব সামরিক ঘাঁটি বন্ধ করতে হবে। ৩. যুদ্ধের কারণে ইরানের হওয়া সব ক্ষয়ক্ষতির জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে পূর্ণ ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। ৪. হরমুজ প্রণালীর ওপর নতুন একটি আইনি ব্যবস্থা কার্যকর করতে হবে; যার মাধ্যমে এ এলাকা মূলত ইরানের নিয়ন্ত্রণে থাকবে এবং ৫. ইরানের প্রতি ‘বিদ্বেষপূর্ণ সংবাদমাধ্যম’-এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের ইরানের হাতে তুলে দিতে অথবা তাদের বিচারের আওতায় আনতে হবে। এর আগে সোমবার ট্রাম্প বলেন, ওয়াশিংটন বেশ কিছুদিন ধরে ইরানের সঙ্গে আলোচনা করছে এবং ‘এবার তারা (ইরান) বেশ গুরুত্ব দিচ্ছে’। টেনেসিতে এক অনুষ্ঠানে ট্রাম্প আরও বলেন, ‘আমাদের সামরিক বাহিনীর অসামান্য কর্মদক্ষতার কারণেই এটি সম্ভব হয়েছে। আমরা আশা করি, একটি চুক্তিতে পৌঁছানো যাবে। তবে যাই ঘটুক না কেন, আমরা নিশ্চিত করব যে- ইরান যেন কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে।’ বক্তব্যের শেষে ট্রাম্প বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ও আমাদের মিত্রদের প্রতি হুমকি বন্ধ করার জন্য ইরান এখন আরও একটি সুযোগ পেয়েছে। আমরা আশা করি, তারা এটি কাজে লাগাবে। যেকোনো পরিস্থিতিতেই যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্ব আরও নিরাপদ হবে এবং আমাদের পৃথিবী আরও স্থিতিশীল হবে।’

ইরানের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব পৌঁছে দিয়েছে পাকিস্তান : যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া যুদ্ধবিরতির একটি প্রস্তাব ইরানের কাছে পৌঁছে দিয়েছে পাকিস্তান। ইসলামাবাদের জ্যেষ্ঠ সূত্রগুলো আল-জাজিরাকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। আল-জাজিরার প্রতিবেদক ওসামা বিন জাভাইদ বলেন, ‘আমরা এখন নিশ্চিত করতে পারি যে, ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে পাকিস্তানকে দেওয়া একটি নথি তারা ইরানিদের কাছে উপস্থাপন করেছেন বলে পাকিস্তানের জ্যেষ্ঠ সূত্রগুলো আল-জাজিরাকে জানিয়েছেন। এখন তারা এর জবাবের অপেক্ষায় আছেন।’

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান করছে তুরস্ক : তুরস্কের ক্ষমতাসীন দল একে পার্টির পররাষ্ট্রবিষয়ক ভাইস চেয়ারম্যান হারুন আরমাগান রয়টার্সকে বলেছেন, তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে ‘বার্তা আদান-প্রদানে ভূমিকা পালন করছে’ আঙ্কারা। হারুন বলেন, এই বার্তাগুলোর মূল লক্ষ্য হলো দুই দেশের মধ্যকার উত্তেজনা কমানো এবং সরাসরি আলোচনার পথ প্রশস্ত করা। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয় দেশের কর্মকর্তাদের সঙ্গেই তুরস্কের ভালো সম্পর্ক রয়েছে। এই অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে তুরস্ক আরও কয়েকটি দেশের সঙ্গে মিলে একটি সম্ভাব্য মধ্যস্থতাকারী হিসেবে নিজেকে তুলে ধরার চেষ্টা করছে।

ট্রাম্পের ১৫ দফা শান্তি প্রস্তাবে কী আছে, শর্ত মানলে ইরান কী পাবে : ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধে ১৫ দফার শান্তি প্রস্তাব পাঠিয়েছেন বলে জানা গেছে। এ প্রস্তাবের পূর্ণাঙ্গ তালিকা এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা না হলেও মার্কিন ও ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমগুলোতে এর বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ শর্ত প্রকাশ হয়েছে। ইসরায়েলের সংবাদমাধ্যম চ্যানেল ১২-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই শান্তি পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হলো, ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা পুরোপুরি নির্মূল করা এবং মধ্যপ্রাচ্যে দেশটির প্রভাব কমিয়ে আনা।

শান্তি প্রস্তাবে ইরানের প্রতি প্রধান শর্তগুলো : ১. ইরানের নাতাঞ্জ, ইসফাহান ও ফোরদো পারমাণবিক স্থাপনা পুরোপুরি বন্ধ এবং ধ্বংস করে ফেলতে হবে। ২. ইরানের সব ধরনের পারমাণবিক কর্মকাণ্ডে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) পূর্ণ তদারকি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। ৩. মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে সক্রিয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে (প্রক্সি) সমর্থন দেওয়া বন্ধ করতে হবে। এসব গোষ্ঠীকে অর্থ ও অস্ত্র সহায়তা দেওয়া থেকে ইরানকে বিরত থাকতে হবে। ৪. বর্তমানে ইরানের যেসব পারমাণবিক সক্ষমতা রয়েছে, তা পুরোপুরি ধ্বংস করতে হবে। ৫. ইরান কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি বা অর্জনের চেষ্টা করবে না- এমন লিখিত অঙ্গীকার দিতে হবে। ৬. ইরানের ভূখণ্ডে কোনো পারমাণবিক উপাদান সমৃদ্ধ করা যাবে না। বর্তমানে থাকা সব সমৃদ্ধ উপাদান আইএইএর কাছে হস্তান্তর করতে হবে। ৭. কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালী’ সব সময়ের জন্য উন্মুক্ত রাখতে হবে এবং একে একটি ‘মুক্ত সামুদ্রিক অঞ্চল’ হিসেবে ঘোষণা করতে হবে। ৮. ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা ও পাল্লা নির্দিষ্টসীমার মধ্যে রাখতে হবে; যা কি না শুধু আত্মরক্ষার কাজে ব্যবহার করা যাবে। এ বিষয়ে ভবিষ্যতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

সাময়িক নয়, পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতি চায় ইরান : ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই’র সঙ্গে আলোচনায় বলেছেন, সাময়িক নয়, পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতি চায় ইরান। চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, আব্বাস আরাঘচি ওয়াং ই-কে বলেছেন, ইরান শুধু অস্থায়ী নয়, একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতিতে আগ্রহী। হরমুজ প্রণালী ইস্যুতে ইরানের অবস্থান ব্যাখ্যা করে আরাঘচি বলেছেন, হরমুজ সবার জন্য উন্মুক্ত এবং জাহাজগুলো নিরাপদে যাতায়াত করতে পারবে। কিন্তু বর্তমানে শত্রু দেশগুলোকে সে বিবেচনায় রাখা হচ্ছে না। চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত কথোপকথনের বিবরণ থেকে আরও জানা গেছে, ওয়াং ই বলেছেন, যুদ্ধের চেয়ে আলোচনা করা সবসময় শ্রেয়। তিনি সব পক্ষকে শান্তির জন্য প্রতিটি সুযোগ ও সম্ভাবনা কাজে লাগিয়ে যত দ্রুত সম্ভব শান্তি প্রক্রিয়া শুরু করার আহ্বান জানান।

‘চোখের বদলে মাথা নেব’ যুক্তরাষ্ট্রকে কড়া হুঁশিয়ারি ইরানের : যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আবারও কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ইরানের শীর্ষ সামরিক উপদেষ্টা মোহসেন রেজায়ি। তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ‘শেষ সময় ঘনিয়ে আসছে’ এবং হামলা চালানো হলে ইরান এবার ‘চোখের বদলে মাথা’ নেবে। ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আইআরএনএ-কে দেওয়া এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে রেজায়ি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের অবকাঠামোয় আঘাত হানে, তাহলে তেহরান পাল্টা জবাবে যুক্তরাষ্ট্রকে পঙ্গু করে দেবে এবং উপসাগরে তাদের জাহাজ ডুবিয়ে দেবে। তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রকে এই সংকট থেকে বাঁচানোর সময় খুব বেশি নেই।’

রেজায়ি অভিযোগ করেন, ‘গ্রেটার ইসরায়েল’ গঠনের স্বপ্ন দেখিয়ে ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রকে এই যুদ্ধে জড়িয়েছে এবং এখন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প উদভ্রান্ত অবস্থায় রয়েছেন। তিনি এই যুদ্ধকে ‘অবৈধ’ আখ্যা দিয়ে বলেন, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, ক্ষতিপূরণ এবং ভবিষ্যতে হামলা না করার আন্তর্জাতিক নিশ্চয়তা না পাওয়া পর্যন্ত সংঘাত থামবে না। তিনি দাবি করেন, গত চার দশকের বেশি সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে শত্রুতা চালিয়ে আসছে এবং অতীতেও তারা ইরাকের সাবেক নেতা সাদ্দাম হোসেনকে সহায়তা করেছিল।

অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে ‘ভালো ও ফলপ্রসূ’ আলোচনা শুরু হয়েছে। তিনি জানান, আলোচনার সুযোগ দিতে ইরানের জ্বালানি স্থাপনায় সম্ভাব্য হামলা পাঁচ দিনের জন্য স্থগিত করা হয়েছে। তবে ইরান এই দাবিকে ‘ভুয়া খবর’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে। দেশটির পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো আলোচনা হয়নি এবং বাজার প্রভাবিত করতে এমন তথ্য ছড়ানো হচ্ছে।

ফের ইসরায়েল-কুয়েত-জর্ডান-বাহরাইনে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা : ফের ইসরায়েল, কুয়েত, জর্ডান এবং বাহরাইনে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে তেহরান। ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন বুধবার জানিয়েছে, দেশটির বিপ্লবী গার্ড ইসরায়েলের পাশাপাশি কুয়েত, জর্ডান ও বাহরাইনে মার্কিন বাহিনীর সামরিক ঘাঁটিগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। খবর এএফপির। রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারকারী আইআরআইবিতে প্রচারিত এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, অধিকৃত অঞ্চলের কেন্দ্রস্থলে থাকা লক্ষ্যবস্তু, অর্থাৎ ইসরায়েল এবং এই অঞ্চলের মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে সুনির্দিষ্টভাবে পরিচালিত তরল ও কঠিন জ্বালানি চালিত ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা এবং আক্রমণকারী ড্রোন দিয়ে আঘাত হানা হয়েছে। এদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই’র সঙ্গে আলোচনায় বলেছেন, সাময়িক নয়, পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতি চায় ইরান। চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, আরাঘচি ওয়াং ইকে বলেছেন, ইরান শুধু অস্থায়ী নয়, একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতিতে আগ্রহী। হরমুজ প্রণালী ইস্যুতে ইরানের অবস্থান ব্যাখ্যা করে আরাঘচি বলেছেন, হরমুজ সবার জন্য উন্মুক্ত এবং জাহাজগুলো নিরাপদে যাতায়াত করতে পারবে। কিন্তু বর্তমানে শত্রু দেশগুলোকে সে বিবেচনায় রাখা হচ্ছে না। চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত কথোপকথনের বিবরণ থেকে আরও জানা যাচ্ছে, ওয়াং ই বলেছেন, যুদ্ধের চেয়ে আলোচনা করা সবসময় শ্রেয়।

ইসরায়েলকে বাদ দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন সামরিক জোটের আহ্বান ইরানের : মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে বাদ দিয়ে একটি নতুন আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও সামরিক জোট গঠনের আহ্বান জানিয়েছে তেহরান। চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতাকে নতুনভাবে বিন্যাস করছে বলে মনে করছে ইরান। তুরস্কের সংবাদমাধ্যম টিআরটি ওয়ার্ল্ড এ খবর জানিয়েছে। ইরানের খাতাম আল-আম্বিয়া সেন্ট্রাল হেডকোয়ার্টার্সের মুখপাত্র ইব্রাহিম জোলফাঘারি এক ভিডিও বার্তায় বলেন, ‘এখন সময় এসেছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর নিজেদের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিজেরাই নেওয়ার এবং বাইরের শক্তির ওপর নির্ভরশীলতা কমানোর।’

তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক হামলা একটি ‘নতুন পর্যায়’ তৈরি করেছে, যা মুসলিম বিশ্বকে ঐক্যবদ্ধ প্রতিক্রিয়ার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। জোলফাঘারি আরও বলেন, ‘আমাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অবশ্যই ঐক্যবদ্ধ হতে হবে, নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আঞ্চলিক ঐক্য জরুরি।’ তার মতে, দীর্ঘদিন ধরে বহিরাগত শক্তির ওপর নির্ভরশীলতা মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা আনতে ব্যর্থ হয়েছে। তাই ধর্মীয় ও আঞ্চলিক বন্ধনের ভিত্তিতে একটি যৌথ নিরাপত্তা কাঠামো তৈরি করা প্রয়োজন।

খবরে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল হামলার প্রেক্ষাপটে তেহরান এখন কৌশলগতভাবে নতুন সমীকরণ তৈরির চেষ্টা করছে। চলমান সংঘাতের মধ্যে ইরান এরইমধ্যে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি রয়েছে- এমন দেশগুলোকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। প্রস্তাবিত এই জোট বাস্তবে গঠিত হবে কি না, তা এখনও অনিশ্চিত। কারণ মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশই দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা সহযোগিতার ওপর নির্ভরশীল। তবু বিশ্লেষকদের মতে, এই আহ্বান মধ্যপ্রাচ্যে নতুন ভূ-রাজনৈতিক বিভাজন এবং প্রতিযোগিতামূলক নিরাপত্তা কাঠামোর ইঙ্গিত দিচ্ছে।

যুদ্ধে জিতে গেছি- ট্রাম্প : ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধে জিতে গেছেন বলে দাবি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এর পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকটে যুক্তরাষ্ট্রের দুই মিত্রদেশের ভূমিকার প্রশংসাও করেছেন। গত মঙ্গলবার হোয়াইট হাউজে মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত নিয়ে সাংবাদিকদের তিনি এসব কথা বলেন। বরাবরের মতো এদিনও ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযানকে তিনি সফল বলে দাবি করেন। খবর বিবিসির। ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যের এই পরিস্থিতিতে সংযুক্ত আরব আমিরাতকে ‘চমৎকার’ এবং কাতারকে ‘মহান’ বলে অভিহিত করেন। তাকে সাংবাদিকরা এ সময় জিজ্ঞেস করেন ইরানের সঙ্গে শান্তিচুক্তির ব্যাপারে তিনি আশাবাদী কি না। জবাবে ট্রাম্প বলেন, এই যুদ্ধ জয় করা হয়ে গেছে। এ সময় ট্রাম্পকে তার জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা জ্যারেড কুশনার ও মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক দূত স্টিভ উইটকফকে ইরানের সঙ্গে মধ্যস্থতায় পাঠানোর ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হয়। জবাবে ট্রাম্প বলেন, ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভান্স ও সেক্রেটারি অব স্টেট মার্কো রুবিওর সঙ্গে তারা বর্তমানে সেখানেই আছে। তিনি এ সময় আবারও দাবি করেন, ইরানের শাসকরা এ ব্যাপারে সম্মত হয়েছেন যে, তারা ভবিষ্যতে কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বলেন, ইরানের মধ্যস্থতাকারীরা আমেরিকাকে তেল ও গ্যাস সম্পর্কিত ‘বিশেষ’ একটি উপহার দিয়েছে। উপহারটি হরমুজ প্রণালীর সঙ্গে জড়িত।

হরমুজে ‘মধ্যস্থতাকারী’ পাকিস্তানের জাহাজ আটকাল ইরান : হরমুজ প্রণালীতে এবার যুক্তরাষ্ট্রের মনোনীত মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানের একটি তেলবাহী জাহাজ আটক করেছে ইরানের প্রতিরক্ষা বাহিনীর অভিজাত শাখা ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)। মঙ্গলবার প্রণালী পার হওয়ার সময় জাহাজটি আটকানো হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে পোস্ট করা এক বার্তায় এ প্রসঙ্গে আইআরজিসির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ‘সেলেন’ নামের পাকিস্তানের পতাকাবাহী সেই কার্গো জাহাজটি সংযুক্ত আরব আমিরাতের শারজাহ থেকে করাচির দিকে যাচ্ছিল; কিন্তু হরমুজ প্রণালীতে প্রবেশের আগে ইরানের সামুদ্রিক জাহাজ চলাচল কর্তৃপক্ষের অনুমতি না নেওয়ায় জাহাজটিকে আটকানো হয়।

আটকের পর জাহাজের ক্যাপ্টেন এবং ক্রুদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ শেষে জাহাজটি ছেড়েও দিয়েছে আইআরজিসি, তবে হরমুজ প্রণালি পেরোনোর সুযোগ আর পায়নি ‘সেলেন’। জাহাজটিকে ঘুরপথে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে আইআরজিসি এবং সেই নির্দেশ মেনে হরমুজ থেকে পিছু হটেছে সেলেন। এক্সবার্তায় আইআরজিসি বলেছে, ‘আইনি প্রোটকল না মানা’ এবং ‘কর্তৃপক্ষের অনুমতি না নেওয়ার কারণে’ জাহাজটিকে হরমুজ প্রণলি থেকে পিছু হটার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ‘হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করতে ইচ্ছুক প্রতিটি জাহাজকে অবশ্যই ইরানের সামুদ্রিক জাহাজ চলাচল কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিতে হবে। এ জলপথ দিয়ে যাতায়াতকারী প্রতিটি জাহাজের ক্ষেত্রে এ নিয়ম প্রযোজ্য।’

প্রসঙ্গত, জ্বালানি পণ্য পরিবহনের জন্য আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথ হিসেবে হরমুজ প্রণালি খুবই গুরুত্বপূর্ন। জ্বালানির বৈশ্বিক বাজারের এক পঞ্চমাংশ পণ্য এই পথ দিয়ে পরিবহন করা হয়। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে হরমুজ প্রণালিতে অবরোধ জারি করেছে ইরান, ফলে জ্বালানির আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্য সরবরহারে ব্যাঘাত সৃষ্টি হচ্ছে, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ছে এবং বিশ্বের বহু দেশ এরইমধ্যে ভোগান্তিতে পড়েছে। তবে অন্যান্য দেশের থেকে পাকিস্তানের ব্যাপারটি আলাদা।

কারণ, ইরান-পাকিস্তান প্রতিবেশী দেশ এবং উভয় দেশই দাবি করে যে তেহরান ও ইসলামাবাদের মধ্যে ভাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। তাছাড়া হরমুজ প্রণালীতে অবরোধের কারণে ইরান যুদ্ধ ইস্যুতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ছে। এ কারণে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতিতে যেতে চাইছেন তিনি; আর এ বিষয়ে তেহরানের সঙ্গে আলোচনার জন্য মধ্যস্থতাকারী দেশ হিসেবে তিনি নিয়োগ দিয়েছেন পাকিস্তানকে। পাকিস্তানও বেশ আগ্রহের সঙ্গে এই দায়িত্ব নিয়েছে এবং এরইমধ্যে তেহরানের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনাও শুরু করেছে। এমন পরিস্থিতিতেই হরমুজ প্রণালীতে পাকিস্তানের জাহাজ আটকাল ইরানের আইআরজিসি।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত