ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৬ মার্চ ২০২৬, ১২ চৈত্র ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে দুর্নীতির মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন

মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে দুর্নীতির মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন

এক-এগারোর সময়ে আলোচিত সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও ফেনী-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য লে. জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী, তার মেয়ে এবং তার প্রতিষ্ঠানের তিন সহযোগীর সম্পদের হিসাব তলব করবে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। গতকাল বুধবার বিষয়টি নিশ্চিত করে দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. আকতারুল ইসলাম বলেন, অবৈধ সম্পদ অর্জনের প্রাথমিক অনুসন্ধানের প্রেক্ষিতে শিগগিরই তাদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের বিস্তারিত বিবরণী জমা দেওয়ার জন্য আদেশ জারি করা হবে। গত সোমবার রাতে রাজধানীর বারিধারা থেকে মাসুদ উদ্দিনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর পল্টন থানার মানবপাচার মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। সিন্ডিকেট করে অর্থ আত্মসাৎ ও মানবপাচারের অভিযোগে গত বছরের ৩ সেপ্টেম্বর রাজধানীর পল্টন থানায় মামলাটি দায়ের করেন আফিয়া ওভারসিজের প্রোপাইটর আলতাব খান। মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে ২৪ হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছে। এছাড়া মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠিয়ে প্রায় ১১৯ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দুদকের করা মামলায়ও তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়।

যাদের বিরুদ্ধে সম্পদ বিবরণী তলব করা হচ্ছে তারা হলেন- সাবেক সংসদ সদস্য ও ফাইভএম ইন্টারন্যাশনালের অংশীদার লে. জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী, তার সন্তান এবং ফাইভএম ইন্টারন্যাশনালের অংশীদার তাসনিয়া মাসুদ, ফাইভএম ইন্টারন্যাশনালের অংশীদার নূর মোহাম্মদ আব্দুল মুকিত ও মহবুবা আফতাব সাথি।

দুদকের প্রাথমিক অনুসন্ধান প্রতিবেদনে ফাইভএম ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ ও জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের তথ্য উঠে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, ক্ষমতার অপব্যবহার করে এবং বিভিন্ন ব্যবসায়িক অনিয়মের মাধ্যমে তারা বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। নামে-বেনামে থাকা সম্পদের প্রকৃত উৎস অনুসন্ধানের জন্য সম্পদ বিবরণী দাখিলের আদেশ জারি করবে দুদক।

২০২৫ সালের ১১ মার্চ মালয়েশিয়া মানবপাচারে ১১২৮ কোটি ৬১ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে সাবেক অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল ও তার পরিবার, সাবেক সংসদ সদস্য নিজাম উদ্দিন হাজারী, লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদউদ্দিন চৌধুরী এবং সাবেক সংসদ সদস্য বেনজীর আহমেদের প্রতিষ্ঠানসহ ১২টি রিক্রটিং এজেন্সির মালিকদের বিরুদ্ধে মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

আসামির তালিকায় রয়েছে- ১২ রিক্রুটিং এজেন্সির ৩২ মালিক-কর্মকর্তা। তাদের বিরুদ্ধে সরকার নির্ধারিত ৭৮ হাজার ৯৯০ টাকার স্থলে অতিরিক্ত পাঁচগুণ অর্থগ্রহণ করে ৬৭ হাজার ৩৮০ জন প্রবাসী থেকে ওই অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছে।

দুদক জানায়, ১২টি রিক্রুটিং এজেন্সির মধ্যে মেসার্স ওরবিটাল এন্টারপ্রাইজের মাধ্যমে ৬ হাজার ২৯ প্রবাসীর কাছ থেকে অতিরিক্ত ১০০ কোটি ৯৮ লাখ ৫৭ হাজার ৫০০ টাকা নেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির মালিক সাবেক অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের স্ত্রী কাশমিরি কামাল। মামলায় কাশমিরির পাশাপাশি তার স্বামী মুস্তফা কামালও আসামি। মেসার্স ওরবিটাল ইন্টারন্যাশনালের মাধ্যমে ২ হাজার ৯৯৫ জন থেকে অতিরিক্ত ৫০ কোটি ১৬ লাখ ৬২ হাজার টাকা গ্রহণের অভিযোগ রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির মালিক মুস্তফা কামালের মেয়ে নাফিসা কামাল। এ মামলায় বাবা ও মেয়ে আসামি।

স্নিগ্ধা ওভারসিজ লিমিটেডের মাধ্যমে ৬ হাজার ৬৫৭ জন প্রবাসীর কাছ থেকে অতিরিক্ত ১১১ কোটি ৫০ লাখ ৪৭ হাজার ৫০০ টাকা গ্রহণের অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটির মালিক সাবেক সংসদ সদস্য নিজাম উদ্দিন হাজারী, তার স্ত্রী নুরজাহান বেগম, শেখ আব্দুল্লাহ, জাহাঙ্গীর আলম, এম আমিরুল ইসলাম, জসিম উদ্দিন ও মো. জিয়াউর রহমান ভুঁইয়া। রিক্রুটিং এজেন্সি বিনিময় ইন্টারন্যাশনালের মাধ্যমে ৫ হাজার ৪৫৮ জন থেকে অতিরিক্ত ৯১ কোটি ৪২ লাখ ১৫ হাজার টাকা গ্রহণের অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটির মালিক চৌদ্দগ্রামের সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আবদুস সোবহান ভুঁইয়া, তার স্ত্রী তাসলিমা আক্তারকে আসামি করা হয়েছে।

ফাইভএম ইন্টারন্যাশনালের মাধ্যমে ৭ হাজার ১২৪ জন প্রবাসী থেকে অতিরিক্ত ১১৯ কোটি ৩২ লাখ ৭০ হাজার টাকা গ্রহণের অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটির মালিক ফেনীর সাবেক সংসদ সদস্য অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী, নূর মোহাম্মদ আব্দুল মুকিত, মেহবুবা আফতাব সাথি, মাসুদ উদ্দিনের মেয়ে তাসনিয়া মাসুদ আসামি।

মেসার্স ইউনিক ইস্টার্ন প্রাইভেট লিমিটেডের মাধ্যমে ৩ হাজার ৭৮৮ জন থেকে ৬৩ কোটি ৪৪ লাখ ৯০ হাজার টাকা গ্রহণের অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটির মালিক মোহা. নুর আলী, তার স্ত্রী সেলিনা আলী, মেয়ে নাবিলা আলী, নাছির উদ্দিন আহমেদ, সাবেক সচিব খোন্দকার শওকত হোসেন আসামি করা হয়েছে। ক্যাথারসিস ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের মাধ্যমে ৭ হাজার ৭৮৭ জন থেকে ১৩০ কোটি ৪৩ লাখ ২২ হাজার ৫০০ টাকা অতিরিক্ত গ্রহণের অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটির মালিক মোহাম্মদ রুহুল আমিন এবং তার স্ত্রী লুৎফুর নেছা শেলী আসামি।

মেসার্স আহমদ ইন্টারন্যাশনালের মাধ্যমে ৮ হাজার ৫৯২ জন প্রবাসীর কাছ থেকে ১৪৩ কোটি ৯১ লাখ ৬০ হাজার টাকা অতিরিক্ত গ্রহণের অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটির মালিক ঢাকা-২০ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য বেনজীর আহমদ আসামি। বি এম ট্রাভেলস লিমিটেডের মাধ্যমে ৮ হাজার ৯৩ জন প্রবাসীর কাছ থেকে ১৩৫ কোটি ৫৫ লাখ ৭৭ হাজার ৫০০ টাকা অতিরিক্ত গ্রহণের অভিযোগে আসামি হয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির মালিক ও ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের সাবেক কাউন্সিলর মো. শফিকুল ইসলাম এবং তার স্ত্রী মৌসুমি আক্তার।

বিএনএস ওভারসিজ লিমিটেডের মাধ্যমে ৪ হাজার ২১৫ জন প্রবাসী থেকে ৭০ কোটি ৬০ লাখ ১২ হাজার ৫০০ টাকা গ্রহণের অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটির মালিক যুবলীগ নেতা ইশতিয়াক আহমেদ সৈকত ও তার স্ত্রী নসরুন নেছাকে আসামি করা হয়েছে।

অন্যদিকে রুবেল বাংলাদেশ লিমিটেডের মাধ্যমে ২ হাজার ৮৪৫ জন থেকে ৪৭ কোটি ৬৫ লাখ ৩৭ হাজার ৫০০ টাকা গ্রহণের অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটির মালিক মুহাম্মদ মজিবুল হক রুবেল তার স্ত্রী কামরুন নাহার হীরামনি আসামি হয়েছে।

এছাড়া দি ইফতী ওভারসিজের মাধ্যমে ৩ হাজার ৭৯৭ জন প্রবাসী থেকে অতিরিক্ত ৬৩ কোটি ৫৯ লাখ ৯৭ হাজার ৫০০ টাকা গ্রহণের অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটির মালিক মো. রুবেল ও বোরহান উদ্দিন পান্নাকে আসামি করা হয়েছে। দুদকের অনুসন্ধানে মালয়েশিয়াগামী প্রত্যেক প্রবাসীর কাছ থেকে অতিরিক্ত ১ লাখ ৬৭ হাজার ৫০০ টাকা নেওয়া হয়েছে। আসামিদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ১২০(বি)/১৬১/১৬২/ ১৬৩/১৬৪/১৬৫(ক)/৪২০/৪০৯/১০৯ ধারা ও মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন-২০১২ এর ৪(২) ও ৪(৩) ধারা এবং ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।

মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে দুর্নীতির মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন : মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠিয়ে ১১৯ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দুদকের করা মামলায় এক-এগারোর সময়ে আলোচিত সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও সাবেক সংসদ সদস্য মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন করা হয়েছে। গতকাল বুধবার ঢাকার মেট্রোপলিটন সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালতে দুদকের সহকারী পরিচালক আবুল কালাম আজাদ তাকে গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন করেন। আদালতের ভারপ্রাপ্ত বিচারক মঈনউদ্দীন চৌধুরী এ বিষয়ে শুনানির জন্য আগামী ৯ এপ্রিল দিন ধার্য করেছেন। সেদিন আসামিকে আদালতে উপস্থিত করতে বলা হয়েছে। দুদকের সহকারী পরিচালক আমিনুল ইসলাম এ তথ্য জানান।

আবেদনে বলা হয়েছে, আসামি মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ও অন্যদের বিরুদ্ধে পরস্পর যোগসাজশে, অপরাধজনক বিশ্বাস ভঙ্গের মাধ্যমে অসৎ উদ্দেশে সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার করার অভিযোগ আছে। তারা সরকার-নির্ধারিত ৭৮ হাজার ৯৯০ টাকায় মালয়েশিয়ায় শ্রমিক রিক্রুটের জন্য এজেন্ট হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন। তবে তারা রিক্রুটেড শ্রমিকদের অবৈধভাবে ক্ষতিসাধন করে বিভিন্ন ধাপে বাড়তি অর্থ গ্রহণের অসৎ উদ্দেশ্যে সরকার দলীয় এমপির প্রভাব খাটিয়ে অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র করেন। তারা চুক্তিবদ্ধ আইনসংগত পারিশ্রমিক ব্যতীত এবং চুক্তিবহির্ভূত কর্মকাণ্ড করে পাবলিক সার্ভেন্ট হিসেবে অবৈধ পারিতোষিক গ্রহণ করেন। তারা ৭ হাজার ১২৪ জন মালয়েশিয়ায় পাঠানো কর্মীর কাছ থেকে পাসপোর্ট, স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং প্রতি কর্মীর কাছে থেকে নির্ধারিত ফির অতিরিক্ত অর্থ গ্রহণসহ সর্বমোট ১১৯ কোটি ৩২ লাখ ৭০ হাজার টাকা আত্মসাৎ করেছেন।

এ ঘটনায় গত ১১ মার্চ আসামি মাসুদসহ অন্যদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির পৃথক ধারা ও মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ২০১২ এর ৪(২) ও ৪(৩) ধারাসহ দুর্নীতি দমন প্রতিরোধ আইন ১৯৪৭ সনের ৫(২) ধারায় মামলা করা হয়েছে। তিনি জামিনে মুক্তি পেলে তদন্তে বাধা সৃষ্টি করতে পারেন। এজন্য সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে এই মামলায়ও তাকে গ্রেপ্তার দেখানো বিশেষ প্রয়োজন।

এর আগে গত সোমবার রাতে রাজধানীর বারিধারা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর পল্টন থানার মানবপাচার মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। সিন্ডিকেট করে অর্থ আত্মসাৎ ও মানবপাচারের অভিযোগে গত বছরের ৩ সেপ্টেম্বর রাজধানীর পল্টন থানায় মামলাটি দায়ের করেন আফিয়া ওভারসিজের প্রোপাইটর আলতাব খান। মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে ২৪ হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছে।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত