ঢাকা বুধবার, ০১ এপ্রিল ২০২৬, ১৮ চৈত্র ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

হরমুজ ইরানের হাতে রেখেই যুদ্ধ শেষ করতে চান ট্রাম্প

* ৬ এপ্রিলের মধ্যে চুক্তির আশা যুক্তরাষ্ট্রের * দুবাইয়ে ২০ লাখ ব্যারেলের তেল ট্যাঙ্কার জ্বলছে * মার্কিন-ইসরায়েলি সেনাদের গোপন আস্তানায় হামলা * মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে ইরাকি যোদ্ধাদের আবার হামলা * ইয়েমেনের প্রতিরোধে পিছু হটল মার্কিন রণতরী * ‘বাব আল-মানদেব’ ইরানের নিয়ন্ত্রণে, যুক্তরাষ্ট্রের অস্থিরতা * স্পেনের আকাশ মার্কিন ও ইসরায়েলি বিমানের জন্য বন্ধ * মার্কিন-ইসরায়েলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে জার্মানি ও ব্রিটেন * মধ্যপ্রাচ্যে আসতে শুরু করেছেন হাজারো মার্কিন প্যারাট্রুপার * ইরানে গোলাবারুদের ডিপোতে ‘বাংকার বাস্টার’ বোমা হামলা
হরমুজ ইরানের হাতে রেখেই যুদ্ধ শেষ করতে চান ট্রাম্প

ট্রাম্প তার সহযোগীদের জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালী পুরোপুরি উন্মুক্ত না হলেও তিনি ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন সামরিক অভিযান শেষ করতে আগ্রহী। মার্কিন প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বরাতে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এমন পদক্ষেপ নেওয়া হলে জলপথটির ওপর তেহরানের শক্ত নিয়ন্ত্রণ আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে। এছাড়া এটি আবার চালু করার জটিল কাজটি ভবিষ্যতের জন্য ঝুলে থাকবে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, গত কয়েক দিনে ট্রাম্প ও তার সহযোগীরা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেছেন। তারা মনে করছেন, এ গুরুত্বপূর্ণ জলপথটি জোর করে উন্মুক্ত করার অভিযানে নামলে যুদ্ধ ট্রাম্পের নির্ধারিত চার থেকে ছয় সপ্তাহের সময়সীমা ছাড়িয়ে যেতে পারে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ট্রাম্প হুমকি-ধমকি দিয়ে চললেও স্পষ্ট বুঝতে পারছেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে। সর্বব্যাপী যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি চাপে পড়েছে; নিজ দেশে ট্রাম্পের জনসমর্থন দ্রুত কমছে; লাখ লাখ মার্কিন নাগরিক তার বিরুদ্ধে নজিরবিহীন বিক্ষোভে রাস্তায় নেমেছেন। এখন ট্রাম্প যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার সক্রিয় চেষ্টা করছেন।

৬ এপ্রিলের মধ্যে চুক্তির আশা যুক্তরাষ্ট্রের : মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ বন্ধে আগামী ৬ এপ্রিলের মধ্যে ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে পারবে বলে আশা করছে যুক্তরাষ্ট্র। সোমবার এক ব্রিফিংয়ে এ তথ্য জানিয়েছেন হোয়াইট হাউজের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি পোস্ট সম্পর্কে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন। ট্রাম্প এর আগে ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর হামলা ১০ দিনের জন্য, অর্থাৎ ৬ এপ্রিল পর্যন্ত স্থগিত রাখছে। এই সময়ের মধ্যে ওয়াশিংটন কী অর্জন করতে চায়- এ প্রশ্নের জবাবে লেভিট বলেন, ট্রাম্প একটি চুক্তি করতে চান। তিনি আরও বলেন, এই সময়সীমা দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। আর কয়েক দিন বাকি, তারপর ১০ দিনের সময়সীমা শেষে কী হয়, দেখা যাবে।

মার্কিন-ইসরায়েলি অফিসার ও পাইলটদের গোপন আস্তানায় হামলা : মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন ও ইসরায়েলি কমান্ড সেন্টার, ড্রোন হ্যাঙ্গার এবং পাইলটদের গোপন আস্তানা লক্ষ্য করে আবার বড় ধরনের হামলা চালিয়েছে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসি। ‘অপারেশন ট্রু প্রমিজ ফোর’-এর ৮৭তম ধাপে সোমবার এই হামলা চালানো হয়েছে বলে আইআরজিসির পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে। বাহিনীর জনসংযোগ শাখা জানিয়েছে, এই অভিযানে তরল ও কঠিন জ্বালানিচালিত ইমাদ, কিয়াম এবং খোররামশহর-ফোর ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের পাশাপাশি বিপুল সংখ্যক ‘কামিকাজে’ ড্রোন ব্যবহার করা হয়েছে।

বিবৃতিতে জানানো হয়, হামলায় মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনীর কমান্ড-অ্যান্ড-কন্ট্রোল সেন্টার, অস্ত্র গুদাম এবং সামরিক পাইলটদের গোপন অবস্থানস্থলগুলোকে কার্যকরভাবে আঘাত করা হয়েছে। আইআরজিসি জানায়, এই সম্মিলিত ও বহুমুখী অভিযানটি সারারাত চালানো হয়। তাদের তথ্য অনুযায়ী, এ অঞ্চলের পাঁচটি মার্কিন ঘাঁটিসহ ইসরায়েলের উত্তর, দক্ষিণ ও মধ্য অঞ্চলের বেশ কিছু সামরিক অবস্থানে আঘাত হানা হয়েছে। উল্লেখযোগ্য এলাকাগুলোর মধ্যে রয়েছে- ইসরায়েলের হাইফা বে, কিরিয়াত শমোনা, তেল আবিব, বিরশেভা ও ডিমোনা। সৌদি আরবের রিয়াদে অবস্থিত আল-খারজ এবং বাহরাইনের মানামায় জুফায়েরেও বড় ধরনের হামলার কথা জানিয়েছে আইআরজিসি। ক্ষেপণাস্ত্র হামলার খবরের পাশাপাশি আইআরজিসি কুয়েতের একটি পানি শোধন কেন্দ্রে ইসরায়েলি হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। একে ‘বেআইনি ও অমানবিক’ আখ্যা দিয়ে সংস্থাটি মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকে মার্কিন-ইসরায়েলি বিভেদ ও অস্থিতিশীলতা তৈরির ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে সজাগ থাকার আহ্বান জানিয়েছে।

দুবাইয়ে ২০ লাখ ব্যারেলের তেল ট্যাঙ্কার জ্বলছে : দুবাই বন্দরের বহির্নোঙরে জ্বালানি তেলবোঝাই একটি বিশাল জাহাজে ইরানের হামলার পর এটিতে ভয়াবহভাবে আগুন ধরে গেছে। এতে জাহাজটির মূল কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং সাগরে তেল ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। দুবাই কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ড্রোন হামলার কারণে জাহাজটিতে আগুন ধরে যায়। মঙ্গলবার ভোরে কয়েক ঘণ্টার চেষ্টায় সে আগুন কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হুঁশিয়ারির কয়েক ঘণ্টা পরই এ হামলার ঘটনা ঘটল। ট্রাম্প বলেছিলেন, ইরান যদি হরমুজ প্রণালি খুলে না দেয়, তবে যুক্তরাষ্ট্র দেশটির বিদ্যুৎকেন্দ্র ও তেলের খনিগুলো ধ্বংস করে দেবে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা শুরু করার পর থেকে পারস্য উপসাগর এবং হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে একের পর এক হামলা চলছে। ‘আল-সালমি’ নামের কুয়েতি জাহাজে এই হামলা সেই উত্তেজনারই সবশেষ উদাহরণ। কুয়েতের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা কুনা জানিয়েছে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই বন্দরে নোঙর করা অবস্থায় আল-সালমি জাহাজে ইরানি হামলা হয়। এতে জাহাজটির মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান কুয়েত পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন বা কেপিসি ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি সাগরে তেল ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে বলে সতর্ক করেছে। দুবাই কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নৌ-অগ্নিনির্বাপক দল ড্রোন হামলায় লাগা আগুন সফলভাবে নিভিয়ে ফেলেছে। বর্তমানে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। জাহাজের ২৪ জন ক্রুর সবাই নিরাপদ আছেন। কুয়েতের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে হামলার খবর আসার পর বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম সাময়িকভাবে বেড়ে যায়। আক্রান্ত এই জাহাজে প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহনের ক্ষমতা রয়েছে, যার বর্তমান বাজারমূল্য ২০ কোটি ডলারের বেশি। তবে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এক প্রতিবেদন প্রকাশের পর তেলের দাম কিছুটা কমেছে।

ইরানে শত্রুর ভূপাতিত ড্রোনের সংখ্যা ১৪৫ : আইআরজিসি জানিয়েছে, মধ্য ইরানের ইস্পাহানের আকাশে আরও দুটি এমকিউ-৯ ড্রোন ধ্বংস করেছে অত্যাধুনিক ইরানি আকাশ প্রতিরক্ষা ইউনিট। এ ধরনের প্রতিটি ড্রোনের আর্থিক মূল্য অন্তত প্রায় ১০ লাখ ডলার। এ দুটি ড্রোনসহ এ পর্যন্ত ঘায়েল হওয়া মাকিন-ইসরায়েলি ড্রোনের মোট সংখ্যা ১৪৫-এ উন্নীত হলো বলে জানিয়েছে আইআরজিসি। ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এ পর্যন্ত বেশ কয়েকটি মার্কিন অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমানও ঘায়েল করেছে। এসব যুদ্ধবিমানের মধ্যে রয়েছে- একটি এফ-৩৫, একাধিক এফ-১৬ ও এফ-১৮। ইরানের সম্পূর্ণ নিজস্ব প্রযুক্তিতে নির্মিত একটি রাডার-ব্যবস্থা মার্কিন এফ-৩৫ জঙ্গিবিমান ধ্বংস করতে সক্ষম হয়। এছাড়াও ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা প্রায় ১০০ মার্কিন-ইসরায়েলি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র আকাশে শনাক্ত ও ধ্বংস করেছে।

হিজবুল্লাহর অবিরাম হামলা : ইসরায়েলে, বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলে, অবিরাম আঘাত হেনে যাচ্ছেন লেবাননের প্রতিরোধ আন্দোলন হিজবুল্লাহর যোদ্ধারা। দক্ষিণ লেবাননে অগ্রসরমান জায়নবাদী সেনাদের ওপরও অন্তত ১১ দফা শীর্ষস্তরের হামলা পরিচালনা করেন তারা। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী মঙ্গলবার জানিয়েছে, দক্ষিণ লেবাননে হিজবুল্লাহর সঙ্গে ক্লোজ রেঞ্জের লড়াইয়ে তাদের চারজন সেনা নিহত হয়েছেন। আইডিএফের এক বিবৃতিতে একই ব্যাটালিয়নের তিন সেনার নাম প্রকাশ করে জানানো হয়েছে, তারা ‘লড়াই চলাকালে নিহত’ হন। পৃথক আরেকটি বিবৃতিতে জানানো হয়, একই ঘটনায় আরও একজন সেনা মারা গেছেন। তবে তার নাম এখনও প্রকাশ করা হয়নি। অন্য একটি বিবৃতিতে বলা হয়, এ লড়াইয়ে আরেক সেনা গুরুতর আহত হয়েছেন। এছাড়া রিজার্ভ ফোর্সের এক সদস্য মাঝারি ধরনের আহত হয়েছেন। হিজবুল্লাহ বলছে, ইসরায়েল ও দক্ষিণ লেবাননের ইহুদিবাদী ঘাঁটিগুলোতে চলমান মুহুর্মুহু আঘাতে হতাহত ইসরায়েলি সেনাদের সংখ্যা অনেক বেশি। জনরোষ থেকে রক্ষা এবং সেনাদের মনোবল অটুট রাখার চেষ্টার তারা এই সংখ্যা গোপন করার চেষ্টার করছে।

মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে ইরাকি যোদ্ধাদের আবার হামলা : মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে গত ২৪ ঘণ্টায় অন্তত ৫টি বড় ধরনের অভিযান চালিয়েছে ‘ইসলামিক রেজিস্ট্যান্স ইন ইরাক’। মঙ্গলবার ভোরে দেওয়া এক বিবৃতিতে গোষ্ঠীটি এই তথ্য নিশ্চিত করে জানিয়েছে, ইরাকের রাজধানী বাগদাদে মার্কিন বাহিনীর উপস্থিতি সাধারণ নাগরিকদের জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত কয়েকদিন ধরেই এই অঞ্চলে মার্কিন ও ইসরায়েলি অবস্থানের ওপর হামলার মাত্রা কয়েকগুণ বেড়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী শনিবার ৪১টি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে অভিযান চালানো হয়েছে। সোমবার ৮টি পৃথক অভিযান সম্পন্ন হয়। গত ২৪ ঘণ্টায় আরও ৫টি নতুন হামলা চালানো হয়েছে। সংগঠনটি জানিয়েছে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরানকে লক্ষ্য করে যে মার্কিন-ইসরায়েলি আগ্রাসন শুরু হয়েছে, তার পাল্টা জবাব হিসেবেই তারা এই ধারাবাহিক অভিযান চালাচ্ছে। এদিকে, ইরাকের জনপ্রিয় আধাসামরিক বাহিনী ‘পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেস’ জানিয়েছে, সোমবার রাতে মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনী তাদের অবস্থানে ‘বিশ্বাসঘাতকতামূলক’ বিমান হামলা চালিয়েছে। তবে তারা নিশ্চিত করেছেন, এই হামলায় কোনো প্রাণহানি ঘটেনি এবং তাদের বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় রয়েছে।

অন্যদিকে, বাগদাদের উপকণ্ঠ থেকে ১২২ মিমি. ‘গ্রাড’ রকেট দিয়ে ‘শহীদ মোহাম্মদ আলা’ বিমান ঘাঁটিতেও হামলার খবর দিয়েছে ইরাকের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। ইরাকের প্রতিরোধ সংগঠন ‘কাতায়েব হিজবুল্লাহ’ এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, বাগদাদে মার্কিন দূতাবাসের নিকটবর্তী গোয়েন্দা ও নাশকতামূলক কেন্দ্রগুলোতে তারা সাময়িকভাবে হামলা স্থগিত রেখেছে। তবে এই স্থগিতাদেশের পেছনে একটি কঠোর শর্ত রয়েছে। তারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ‘যদি মার্কিন বাহিনী বা তাদের সহযোগীরা বাগদাদ বা অন্য কোনো প্রদেশের আবাসিক এলাকায় বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্য করে হামলা চালায়, তবে আমরা পুনরায় এই ঘাঁটিগুলো গুঁড়িয়ে দেব। আমাদের লক্ষ্য শুধু ‘জায়নবাদী-আমেরিকান’ শত্রু এবং তাদের সহযোগীদের মোকাবিলা করা।’

ট্রাম্পকে কঠোর জবাব দিলেন ইরানি স্পিকার : মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক আগ্রাসী হুমকির তীব্র নিন্দা জানিয়ে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ইরানের ওপর স্থলহামলা হলে তার ‘দাঁতভাঙা’ জবাব দেওয়া হবে। সোমবার সামাজিকমাধ্যম এক্স-এ দেওয়া এক বিবৃতিতে কলিবাফ বলেন, শত্রুপক্ষ তাদের আগ্রাসী ইচ্ছাকে ‘খবর’ হিসেবে প্রচার করে ইরানি জাতিকে ভয় দেখানোর কৌশল নিয়েছে। ট্রাম্পের আল্টিমেটামকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, ‘অনেক বড় ভুল করছেন শত্রুরা। তারা যদি একটি আঘাত করে, তবে বিনিময়ে একাধিক পাল্টা আঘাত পাবে।’ স্পিকার কালিবাফ ইরানের জনগণের দৃঢ় মনোবলের ওপর পূর্ণ আস্থা প্রকাশ করে জানান, ইসলামি বিপ্লবের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়েদ মোজতবা খামেনির দূরদর্শী নেতৃত্বে যেকোনো আগ্রাসনকারীকে তাদের দুঃসাহসের জন্য তিক্ত পরিণতির স্বাদ নিতে বাধ্য করা হবে। তিনি বিশ্বাস করেন, ইরান তার বৈধ অধিকার পূর্ণাঙ্গভাবে পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সর্বশেষ হুমকি- তেহরান যদি ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ‘হরমুজ প্রণালী’ পুরোপুরি খুলে না দেয়, তবে ইরানের বিদ্যুৎ কেন্দ্র, তেলের খনি এবং এমনকি পানি শোধন কেন্দ্রগুলোও ‘বিধ্বস্ত’ করে দেওয়া হবে। একে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন এবং ‘অর্থনৈতিক ব্ল্যাকমেইল’ হিসেবে দেখছে তেহরান। ইরানি কর্মকর্তাদের মতে, বিশ্ব জ্বালানি বাজারে প্রভাব বিস্তার এবং মধ্যপ্রাচ্যে ওয়াশিংটনের কৌশলগত ব্যর্থতা ঢাকতেই এই মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ চালানো হচ্ছে। কালিবাফ বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন-জায়নবাদীদের একচ্ছত্র আধিপত্যের দিন শেষ হয়ে গেছে। শত্রুপক্ষের যেকোনো ভুল হিসাব তাদের অপমানজনক পরাজয়কেই ত্বরান্বিত করবে।

ইয়েমেনের প্রতিরোধে পিছু হটল মার্কিন রণতরী : ইয়েমেনের প্রতিরোধ যোদ্ধাদের বীরত্বপূর্ণ ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন আইআরজিসি-র কুদস ফোর্সের কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইসমাইল কানি। তিনি জানিয়েছেন, ইয়েমেনের কৌশলগত প্রতিরোধের মুখে অত্যাধুনিক মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ‘ইউএসএস জেরাল্ড ফোর্ড’ পিছু হটতে বাধ্য হয়েছে। সোমবার প্রকাশিত এক বার্তায় জেনারেল কানি উল্লেখ করেন, মার্কিন এই রণতরী দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে লোহিত সাগরের ইয়ানবু ও জেদ্দার মধ্যবর্তী এলাকায় দ্বিধাগ্রস্ত অবস্থায় ঘুরপাক খাচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন অজুহাতে এটি ফিরে যেতে বাধ্য হয়। তিনি বলেন, ‘যারা মার্কিন রণতরী জেরাল্ড ফোর্ডের ভাগ্য সম্পর্কে জানতে চান, তাদের বলব- এই রণতরীর উদ্দেশ্যহীন ঘোরাঘুরি এবং শেষ পর্যন্ত ফিরে যাওয়ার রহস্য লুকিয়ে আছে ইয়েমেনের বরকতময় ভূমি আর সুউচ্চ পাহাড়গুলোর অদম্য শক্তির মাঝে।’ জেনারেল কানি ইয়েমেনের সাহসী নেতৃত্ব ও যোদ্ধাদের প্রতি সংহতি প্রকাশ করে বলেন, তারা একদিকে যেমন অপরাধী আমেরিকা ও ‘শিশু হত্যাকারী’ ইসরায়েলি শাসনের মোকাবিলা করছে, অন্যদিকে গাজার মজলুম জনতা ও ইসলামি মূল্যবোধ রক্ষায় বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ইয়েমেনের এই সময়োপযোগী পদক্ষেপ পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ইসলামি প্রতিরোধ ফ্রন্টকে আরও শক্তিশালী করেছে। কুদস ফোর্স কমান্ডার বিশ্বাস করেন, গাজার জনগণের প্রতি ইয়েমেনের এই সর্বাত্মক সমর্থন আঞ্চলিক পরিস্থিতি সম্পর্কে তাদের সঠিক উপলব্ধিরই বহিঃপ্রকাশ। এই বীরত্বপূর্ণ অবস্থান ইয়েমেনকে শত্রুদের চাপিয়ে দেওয়া ‘নিপীড়নমূলক অবরোধ’ থেকে সম্পূর্ণ মুক্তির পথ প্রশস্ত করবে। বার্তার শেষে জেনারেল কানি পুনর্ব্যক্ত করেন, প্রতিরোধ ফ্রন্টের পাশে দাঁড়ানো ইরানের ঈমানি দায়িত্ব। তিনি বলেন, ইরান তার লক্ষ্য অর্জনে এবং পুরো অঞ্চল থেকে যুদ্ধের ছায়া সরাতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

‘বাব আল-মানদেব’ ইরানের নিয়ন্ত্রণে, যুক্তরাষ্ট্রের অস্থিরতা : আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো বলছে, হরমুজ প্রণালীর পর যুদ্ধের আঁচ এবার বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ ‘বাব আল-মানদেব’ প্রণালীতে গিয়ে লেগেছে। ইরানের সমর্থনে ইয়েমেনের আনসার-আল্লাহ বা হুথি বাহিনী আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধে যোগ দেওয়ায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেল, গ্যাস এবং পণ্য সরবরাহে চরম অস্থিরতার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, হরমুজ প্রণালীতে উত্তেজনার পর ইয়েমেনের এই ঘোষণা বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য দ্বিতীয় ধাক্কা। নেপোলিয়ন বোনাপার্টের বিখ্যাত উক্তি, ‘একটি রাষ্ট্রের নীতি তার ভূগোলের ওপর নির্ভর করে’; এর প্রতিফলন ঘটছে বর্তমান পরিস্থিতিতে। ইয়েমেনের ভৌগোলিক অবস্থান লোহিত সাগর, এডেন উপসাগর এবং সুয়েজ খালের সংযোগস্থলে হওয়ায় তারা এখন এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যকার প্রধান বাণিজ্য পথ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা রাখে। প্রতিদিন এই পথ দিয়ে ৮ মিলিয়নেরও বেশি ব্যারেল তেল এবং ৫৮টি এলএনজি-বাহী জাহাজ চলাচল করে। এশিয়া ও ইউরোপের বাণিজ্যের ৪০ শতাংশ এই পথে হয়। বিশ্বের মোট চাল ও গমের ২০ শতাংশ এবং সারের ৪০ শতাংশ এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। এই করিডোর দিয়ে বছরে ৮০০ বিলিয়ন থেকে ১ ট্রিলিয়ন ডলার সমমূল্যের পণ্য ও সেবা আদান-প্রদান হয়। পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে ইউরোপে তেল-গ্যাস পাঠানোর সহজ পথ হলো সুয়েজ খাল, যার জন্য বাব আল-মানদেব অতিক্রম করা বাধ্যতামূলক। এর বিকল্প হিসেবে আফ্রিকার দক্ষিণ দিক কেপ অফ গুড হোপ ঘুরে যেতে জাহাজগুলোর অতিরিক্ত ৮ থেকে ৯ দিন সময় লাগবে। এতে পরিবহন খরচ এবং বিমার প্রিমিয়াম বহুগুণ বেড়ে যাবে, যার প্রভাব পড়বে সরাসরি সাধারণ ভোক্তার ওপর।

সৌদি আরব হরমুজ প্রণালীর ওপর নির্ভরতা কমাতে লোহিত সাগর পর্যন্ত পাইপলাইন তৈরি করলেও সেটি এখন ইয়েমেনের নাগালের মধ্যে। কোনো কারণে এই পাইপলাইন ক্ষতিগ্রস্ত হলে সৌদি আরবের তেল রপ্তানি ক্ষমতা প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে আসতে পারে। পরিস্থিতি বিবেচনা করে ইউরোপীয় নৌ-মিশন ‘অ্যাসপাইডস’ এরইমধ্যে তাদের বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় রেখেছে। তারা বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে ইয়েমেনি জলসীমা এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরানের নেতৃত্বাধীন ‘অক্ষশক্তি’ এখন বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি জ্বালানি সরবরাহ পথ সরাসরি প্রভাবিত করার ক্ষমতা অর্জন করেছে। ইয়েমেন যদি তাদের অপারেশন আরও বিস্তৃত করে সৌদি আরব বা অন্য কোনো জিজিসি দেশের অবকাঠামোতে আঘাত হানে, তবে ২০১৫ সালের সৌদি-ইয়েমেন যুদ্ধের চেয়েও ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে।

স্পেনের আকাশ মার্কিন ও ইসরায়েলি বিমানের জন্য বন্ধ : স্পেনের আকাশকে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ গ্রহণকারী মার্কিন ও ইসরায়েলি বিমানগুলোর জন্য বন্ধ ঘোষণা করেছে দেশটির সরকার। সরকার বলেছে, দেশটির আকাশসীমা ও বিমান-ঘাঁটিগুলো ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার সঙ্গে সম্পর্কিত যে কোনো তৎপরতা ও পদক্ষেপের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এই যুদ্ধে অংশ নেওয়া বা অংশ নিতে যাওয়া মার্কিন সামরিক বিমান কিংবা তেল পরিবাহী বিমানগুলোকে স্পেনের কোনো ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হবে না বলে স্পেন সরকার ঘোষণা করেছে। এমনকি ব্রিটেন বা ফ্রান্সের মতো বিভিন্ন দেশে মোতায়েন মার্কিন বিমানগুলোর জন্যও স্পেনের আকাশসীমা নিষিদ্ধ করা হল বলে ঘোষণা করেছে মাদ্রিদ।

মার্কিন-ইসরায়েলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে জার্মানি ও ব্রিটেন : ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, এই যুদ্ধটি ব্রিটেনের নয় এবং তার দেশকে এই যুদ্ধে টেনে আনা যাবে না। ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন-ইসরায়েলি যুদ্ধের বিস্তারের বিষয়ে জনসাধারণের উদ্বেগের কথা উল্লেখ করে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমার সোমবার বলেছেন, ব্রিটিশ জনগণ যখন যুদ্ধের খবর শুনবে তখন সংকট বিস্তার আরও বৃদ্ধির বিষয়ে ?উদ্বিগ্ন হওয়া স্বাভাবিক। এটি আমাদের যুদ্ধ নয় এবং আমরা এই যুদ্ধের সঙ্গে জড়াব না। জার্মানি বলেছে, পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধের বিস্তার ইউরোপীয় অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রেডরিখ মের্টজ আবারও ইরানের বিরুদ্ধে অবিলম্বে মার্কিন-ইসরায়েলি সামরিক আগ্রাসন অবসানের আহ্বান জানান। তিনি সতর্ক করে বলেন, এই যুদ্ধের বিস্তার ইউরোপীয় অর্থনীতির ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যে আসতে শুরু করেছেন হাজারো মার্কিন প্যারাট্রুপার : যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর অভিজাত ৮২তম এয়ারবর্ন ডিভিশনের কয়েক হাজার প্যারাট্রুপার মধ্যপ্রাচ্যে আসতে শুরু করেছেন। ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হতে পারে, এ নিয়ে আলোচনার মধ্যে সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের দুজন কর্মকর্তা রয়টার্সকে এ তথ্য জানালেন। রয়টার্স প্রথম গত ১৮ মার্চ একটি প্রতিবেদনে বলেছিল, ট্রাম্প প্রশাসন মধ্যপ্রাচ্যে আরও হাজার হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন করার কথা ভাবছে। ইরানের ভেতরে সৈন্য মোতায়েনের বিষয়টিও এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। এ প্যারাট্রুপাররা নর্থ ক্যারোলাইনার ফোর্ট ব্র্যাগ থেকে যাত্রা শুরু করেছেন। তারা মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন কয়েক হাজার অতিরিক্ত নাবিক, মেরিন ও ‘স্পেশাল অপারেশনস ফোর্স’-এর সঙ্গে যুক্ত হবেন। গত সপ্তাহান্তে প্রায় ২ হাজার ৫০০ মেরিন সেনাসদস্য মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছেছেন।

ইরানে গোলাবারুদের ডিপোতে ‘বাংকার বাস্টার’ বোমা হামলা : যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তরের একজন কর্মকর্তা ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে জানিয়েছেন, মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানের ইসফাহানে একটি বিশাল গোলাবারুদের ডিপোতে ২ হাজার পাউন্ডের (৯০৭ কেজি) ‘বাংকার বাস্টার’ বোমা দিয়ে হামলা চালিয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ হামলায় বিপুলসংখ্যক ‘পেনিট্রেটর মিউনিশন’ বা ভূগর্ভস্থ স্থাপনা ধ্বংসকারী অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে। ইসফাহানে বিশাল বিস্ফোরণের একটি ভিডিও ট্রাম্প কোনো ক্যাপশন ছাড়াই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করার পর এই প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ট্রাম্প গতকাল মঙ্গলবার ভোরে কোনো মন্তব্য ছাড়াই একটি বিশাল বিস্ফোরণের ভিডিও শেয়ার করেছেন। এটি ইসফাহানের উপকণ্ঠে চালানো একটি বড় ধরনের হামলার বলে মনে করা হচ্ছে।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত