
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর এ ইস্যুতে বাংলাদেশ সরকার যে বিবৃতি দিয়েছে, তাতে কষ্ট পেয়েছে তেহরান। ইরান প্রত্যাশা করে, আগ্রাসী শক্তির ভূমিকার নিন্দা করবে বাংলাদেশ। গতকাল বুধবার মধ্যপাচ্যের সাম্প্রতিক ঘটনা নিয়ে ঢাকায় ইরানের দূতাবাসে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত জলিল রহিমি জাহানাবাদি। তিনি বলেন, ‘ইরান ইস্যুতে বাংলাদেশ সরকারের বিবৃতিতে আমরা কষ্ট পেয়েছি। এই বিবৃতি আরও স্পষ্ট হওয়া উচিত ছিল। বাংলাদেশ মুসলিম রাষ্ট্র। আমাদের ভাই (বাংলাদেশ) হিসেবে ইরানে আগ্রাসী শক্তির বিরুদ্ধে নিন্দা করবে- এটাই আমাদের প্রত্যাশা ছিল, সেটা হয়নি। এটা আমাদের জন্য কষ্টের।’
বাংলাদেশের বিবৃতির পরিপ্রেক্ষিতে ইরান তার অসন্তুষ্টি তুলে ধরে ঢাকাকে কোনো চিঠি দেবে কি না, তা জানতে চাওয়া হয় ইরানি রাষ্ট্রদূতের কাছে। জবাবে তিনি বলেন, এ বিষয়ে ইরানের পক্ষ থেকে কোনো চিঠি দেওয়া হবে না। তবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ হলে বিষয়টি তুলে ধরবেন তিনি। রাষ্ট্রদূত বলেন, আমরা লক্ষ্য করেছি, বাংলাদেশের বিবৃতিতে শুধু উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। কিন্তু আগ্রাসনের স্পষ্ট নিন্দা করা হয়নি। আমরা আশা করি, বাংলাদেশ আরও স্পষ্ট ও দৃঢ় অবস্থান নেবে। অন্যান্য দেশ যেমন- পাকিস্তান, তুরস্ক এই হামলার নিন্দা করেছে এবং সংলাপ ও শান্তির আহ্বান জানিয়েছে। এমনকি ইউরোপের দেশ স্পেন স্পষ্টভাবে এ হামলার নিন্দা জানিয়েছে।
তি?নি বলেন, আমাদের প্রত্যাশা হলো, যখন কোনো দেশ জাতিসংঘের সনদ লঙ্ঘন করে অন্য দেশের ওপর আগ্রাসন চালায়, তখন অন্য দেশগুলো স্পষ্টভাবে এর নিন্দা জানাবে। আমরা শুধু চাই- আমেরিকা ও ইসরায়েল যে আগ্রাসন চালিয়েছে, তা নিন্দা করা হোক। এর বাইরে আমাদের আর কোনো দাবি নেই। বাংলাদেশের সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকার করে জ?লিল রহি?মি বলেন, বাংলাদেশের কিছু সীমাবদ্ধতা আছে আমরা তা বুঝি। কিন্তু এটি একটি আন্তর্জাতিক বিষয়। বাংলাদেশ জাতিসংঘ ও ওআইসির সদস্য হিসেবে এ বিষয়ে সুস্পষ্ট অবস্থান নিলে ভালো হয়। রাষ্ট্রদূত বলেন, রাশিয়া ও চীন এই আগ্রাসন নিন্দা করেছে। স্পেনের মতো ইউরোপীয় দেশও সরাসরি নিন্দা জানিয়েছে এবং বলেছে, আমরা এই হামলার সমর্থন করি না।
বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার বার্তা দেন রাষ্ট্রদূত জ?লিল রহি?মি। তি?নি বলেন, বাংলাদেশ আমাদের বন্ধু ও ভ্রাতৃপ্রতিম দেশ। আমরা চাই, আমাদের সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হোক। ইরানে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা আমাদের কাছে নেই। তবে বাংলাদেশ দূতাবাস যদি কোনো তালিকা দেয়, আমরা তাদের নিরাপদে দেশে ফেরাতে সহযোগিতা করব। রাষ্ট্রদূত বলেন, যদি বাংলাদেশ মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির উদ্যোগ নেয় বা কিছু করতে চায়, আমরা অবশ্যই সেটা স্বাগত জানাই। আমরা পাকিস্তান, তুরস্ক বা মিশর যারা মধ্যস্থতার চেষ্টা করছে তাদের উদ্যোগকে স্বাগত জানাই এবং তাদের ধন্যবাদ জানাই।
তি?নি বলেন, যদি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে স্পষ্টভাবে অবস্থান না নেওয়া হয়, তাহলে ভবিষ্যতে এই সমস্যা অন্য দেশগুলোর জন্যও হুমকি হয়ে উঠতে পারে। আজ আমরা কোনো প্রতিবেশী মুসলিম দেশে হামলা করছি না। আমরা শুধু সেই দেশগুলোর ভেতরে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করছি। রাষ্ট্রদূত বলেন, যুদ্ধের কারণে অনেক মানুষ মারা যাচ্ছে, এজন্য আমরা অত্যন্ত দুঃখিত। কিন্তু এর দায় সেই দেশগুলোর, যারা তাদের ভূখণ্ডে মার্কিন ঘাঁটি স্থাপনের অনুমতি দিয়েছে। তিনি প্রশ্ন তোলেন এই অঞ্চলে সংকট থাকা সত্ত্বেও, আরব দেশগুলো কীভাবে আমেরিকাকে ঘাঁটি স্থাপনের অনুমতি দিলো, বা ইসরায়েলকে সম্পর্ক স্থাপনের সুযোগ দিলো? ইরানের রাষ্ট্রদূত আরও বলেন, আমরা মুসলমানদের মৃত্যুতে দুঃখিত। কিন্তু আমরা দায়ী নই। আমরা আত্মরক্ষা ও প্রতিরোধের অবস্থানে আছি। যারা নিহত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ, এজন্য আমরা দুঃখপ্রকাশ করছি। তবে এর জন্য সম্পূর্ণ দায়ী সেই দেশগুলো, যারা তাদের ভূখণ্ডে মার্কিন ঘাঁটি স্থাপনের অনুমতি দিয়েছে। রাষ্ট্রদূত জানান, ঈদের অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়েছে এবং সেখানে স্বাভাবিক কথাবার্তাই হয়েছে। সৌজন্যমূলক কথাবার্তা হয়েছে।
বাংলাদেশের জ্বালানিবাহী ৬ জাহাজকে হরমুজ প্রণালী অতিক্রমের অনুমতি- ইরানের রাষ্ট্রদূত : ঢাকায় নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত জলিল রহিমি জাহানাবাদি বলেন, বাংলাদেশের জ্বালানিবাহী ছয়টি জাহাজকে হরমুজ প্রণালী পার হওয়ার অনুমতি দিয়েছে তেহরান। এই পথ দিয়ে বাংলাদেশের জ্বালানিবাহী জাহাজ চলাচলের কোনো সমস্যা নেই। বুধবার ঢাকায় ইরান দূতাবাসে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে জলিল রহিমি জাহানাবাদি এ কথা বলেন। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ নিয়ে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে ইরান দূতাবাস।
রাষ্ট্রদূত জলিল রহিমি জাহানাবাদি বলেন, বাংলাদেশের ছয়টি জ্বালানিবাহী জাহাজকে হরমুজ প্রণালী পার হতে অনুমতি দিয়েছে ইরান। এসব জাহাজকে হরমুজ প্রণালী পার হতে দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে অনুমতি চাওয়া হয়েছিল। ছয়টি জাহাজের ব্যাপারে তারা তেহরানকে জানায়। ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিল এই জাহাজগুলোকে সহায়তার অনুমোদন দিয়েছে। জাহাজগুলো সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে ইরানের কাছে আগে না আসার কারণে তা শনাক্ত করতে পারেনি তেহরান।
জলিল রহিমি জাহানাবাদি বলেন, ‘আমরা বাংলাদেশ সরকারের কাছে জাহাজগুলোর স্পেসিফিকেশন (বিস্তারিত তথ্য) পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে দিতে বলেছিলাম। সেগুলো গত সপ্তাহে আমরা পেয়েছি। এটা নিয়ে কাজ চলছে। বাংলাদেশের জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা নেই। এ ব্যাপারে আমরা সর্বাত্মক সহযোগিতা করব।’
এক প্রশ্নের জবাবে জলিল রহিমি জাহানাবাদি বলেন, বাংলাদেশে জ্বালানিসংকট ঘিরে উদ্ভূত পরিস্থিতি লক্ষ্য করছে ইরান। ভ্রাতৃপ্রতিম দেশ হিসেবে বাংলাদেশ যেন জ্বালানিসংকটে না পড়ে, সে দিকে ইরানের নজর রয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাংলাদেশের জাহাজ চলাচল অব্যাহত রাখবে ইরান। জলিল রহিমি জাহানাবাদি আরও জানান, দেশটিতে আটকে পড়া ১৮০ জন বাংলাদেশি এরইমধ্যে বাংলাদেশে ফেরত এসেছেন। আরও যারা বাংলাদেশি সেখানে আছেন, তারা যদি আসতে চান, তাহলে ইরান সব ধরনের সহায়তা দেবে।
ইরান যুদ্ধ থেকে পালানোর পথ খুঁজছেন ট্রাম্প : ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে এখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোলান্ড ট্রাম্প পালাবার পথ খুঁজছেন বলে মন্তব্য করেছেন রাষ্ট্রদূত জলিল রহিমি জাহানাবাদি। তিনি বলেন, এই যুদ্ধে ইরান আগে কোনো আক্রমণ করেনি। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এই যুদ্ধ শুরু করেছে, তবে যুদ্ধের এক মাস যেতে না যেতেই ট্রাম্প পালাবার পথ খুঁজছেন। জলিল রহিমি জাহানাবাদি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে আগে যিনি প্রেসিডেন্ট ছিলেন, তিনি জায়নবাদী ইসরায়েলের ফাঁদে পা দেননি। তবে বর্তমান প্রেসিডেন্ট এই ফাঁদে পা দিয়েছেন। এখন যুদ্ধ নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট সকালে এক কথা, দুপুরে এক কথা আর রাতে আরেক কথা বলছেন। জলিল রহিমি জাহানাবাদি বলেন, ওমানে যখন শান্তি আলোচনা চলছিল, একটি সমাধানের পথ খোঁজা হচ্ছিল, তখনই যুক্তরাষ্ট্র এই যুদ্ধ শুরু করে। আর ইরান আত্মরক্ষার জন্য এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে।