
দেশে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির সরকারি চাকরির নিয়োগে কোটা অনুসরণ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী। তিনি বলেন, এ ক্ষেত্রে মেধাকোটা ৯৩ শতাংশ থাকবে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের ১৪তম দিন গতকাল বৃহস্পতিবার চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের বিরোধী দলের সদস্য (জামায়াতে ইসলামী) মো. নূরুল ইসলামের টেবিলে উত্থাপিত লিখিত প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা জানান। এদিন সংসদ অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। প্রতিমন্ত্রী জানান, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ২০২৪ সালের ২৩ জুলাই তারিখের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী কোটাগুলো হলো- মেধা ভিত্তিক ৯৩ শতাংশ, মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ও বীরাঙ্গনার সন্তান ৫ শতাংশ, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ১ শতাংশ এবং শারীরিক প্রতিবন্ধী ও তৃতীয় লিঙ্গ ১ শতাংশ। ওএসডি সংস্কৃতি আগের মতোই থাকবে কিনা সংসদ সদস্য মো. নূরুল ইসলামের এ প্রশ্নের জবাবে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী বলেন, ‘মেরিটোক্রেসির বাংলাদেশ বিনির্মাণে মেধা, সততা, সৃজনশীলতা, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও প্রশিক্ষকণ, বেসামরিক ও সামরিক প্রশাসনে নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে যোগ্যতই একমাত্র মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনা করা হবে। কেউ যেন অন্যায়ভাবে বঞ্চিত না হয়, সেটা নিশ্চিত করবে সরকার। এতে সরকারি অর্থের অপচয় রোধ হবে।
এছাড়াও প্রতিমন্ত্রী জানান, দেশের সব মন্ত্রণালয় ও সরকারি অফিসে শূন্য পদ ৪ লাখ ৬৮ হাজার ২২০টি বলে জানিয়েছেন জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী আবদুল বারী। শূন্য পদ পূরণের জন্য ৬ মাস, ১ বছর ও ৫ বছর মেয়াদি কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে। প্রতিমন্ত্রী জানান, সরকারি কর্মচারীদের হালনাগাদ তথ্যের ভিত্তিতে সবশেষ প্রকাশিত তথ্যমতে, ২০২৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত এর মধ্যে প্রথম শ্রেণির (প্রথমণ্ডনবম গ্রেড) শূন্য পদ ৬৮ হাজার ৮৮৪টি। দ্বিতীয় শ্রেণির (১০মণ্ড১২তম গ্রেড) শূন্য পদ ১ লাখ ২৯ হাজার ১৬৬টি। ১৩তম থেকে ১৬তম গ্রেডে শূন্য পদ ১ লাখ ৪৬ হাজার ৭৯৯টি। ১৭তম থেকে ২০তম গ্রেডে শূন্য পদ ১ লাখ ১৫ হাজার ২৩৫টি। অন্যান্য পদে ৮ হাজার ১৩৬টি পদ শূন্য পদ রয়েছে।
৬ মাসের মধ্যে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ২ হাজার ৮৭৯টি, ১ বছরের মধ্যে ৪ হাজার ৪৫৯টি এবং ৫ বছরের মধ্যে ৩ হাজার ১১০টি শূন্য পদে নিয়োগ কার্যক্রম সম্পন্ন করা হবে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী। তিনি আরও বলেন, এ ছাড়া কর্মপরিকল্পনায় বর্ণিত ‘স্বচ্ছতা ও দ্রুততার সঙ্গে পাঁচ লাখ কর্মচারী নিয়োগ’- এর বিষয়ে অন্যান্য মন্ত্রণালয়/বিভাগের নিয়োগের সবশেষ অবস্থা এবং শূন্য পদে নিয়োগের তথ্য পাঠানোর জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে চিঠি পাঠানো হয়েছে। সরকারি দলের সদস্য শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাসের প্রশ্নের জবাবে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী আবদুল বারী বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার গত ১৬ বছরে বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের ১২ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসর দেয়। ৩৯ কর্মকর্তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করে। আর ৫৬৪ কর্মকর্তাকে ওএসডি করে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, বিগত আওয়ামী লীগের সময় বিসিএস ক্যাডার নিয়োগে দুর্নীতি- দলীয়করণের বিষয়ে দুদকসহ আইন প্রয়োগকারী সংস্থা অনুসন্ধান ও তদন্ত করছে। তদন্ত প্রতিবেদন ও সুপারিশ পাওয়ার পর আইনানুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিরোধী দলের সংসদ সদস্য নূরুল ইসলামের প্রশ্নের জবাবে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী আবদুল বারী বলেন, মেরিটোক্রেসির বাংলাদেশ বিনির্মাণে মেধা, সততা, সৃজনশীলতা, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও প্রশিক্ষণ, বেসামরিক–সামরিক প্রশাসনে নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে যোগ্যতাই একমাত্র মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনা করা হবে। কেউ যাতে অন্যায়ভাবে বঞ্চিত না হন, সেটাও নিশ্চিত করা হবে। এতে সরকারি অর্থের অপচয় রোধ হবে। নূরুল ইসলামের আরেক প্রশ্নের জবাবে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী আবদুল বারী বলেন, বর্তমানে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে ৯৩ শতাংশ মেধাভিত্তিক। ৫ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ও বীরাঙ্গনার সন্তান কোটা। ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী ১ শতাংশ। শারীরিক প্রতিবন্ধী ও তৃতীয় লিঙ্গের জন্য ১ শতাংশ কোটা রাখা হয়েছে।
বিসিএস পরীক্ষার সিলেবাসে পরিবর্তন আসছে : বিসিএস পরীক্ষার সিলেবাসে পরিবর্তন আনার পরিকল্পনা করছে সরকার। এ উদ্দেশ্যে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী। বৃহস্পতিবার সংসদে রাজবাড়ী-২ আসনের সরকারি দলের সদস্য মো. হারুন-অর-রশিদের টেবিলে উত্থাপিত লিখিত প্রশ্নের উত্তরে তিনি এ তথ্য জানান। প্রতিমন্ত্রী বলেন, বিসিএসসহ অন্যান্য সরকারি চাকরির নিয়োগ প্রক্রিয়ায় প্রচলিত মুখস্থনির্ভর সিলেবাসের পরিবর্তে স্কিল-বেজড বা দক্ষতাভিত্তিক মূল্যায়ন পদ্ধতি প্রবর্তন করা বর্তমান কমিশনের অন্যতম লক্ষ্য। তিনি জানান, এ লক্ষ্যে কমিশন বিসিএস পরীক্ষার সিলেবাস পর্যালোচনা ও প্রয়োজনীয় সংশোধন-সংযোজনের জন্য একটি কমিটি গঠন করেছে। কমিটি বিভিন্ন দেশের সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার সিলেবাস পর্যালোচনা করে সুপারিশ দেবে। মৌখিক পরীক্ষায়ও পরিবর্তন আনা হচ্ছে জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, শিগগিরই যোগ্যতাভিত্তিক সাক্ষাৎকার পদ্ধতি চালু করা হবে, যেখানে প্রার্থীর জ্ঞান, দক্ষতা ও মনোভাব মূল্যায়ন করা হবে। তিনি আরও জানান, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা কমিয়ে এক বছরের মধ্যে একটি বিসিএস সম্পন্ন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ৫০তম বিসিএসের ক্ষেত্রে বিজ্ঞপ্তির সময়ই পরীক্ষার সুনির্দিষ্ট সময়সূচি প্রকাশ করা হয়েছে এবং সে অনুযায়ী প্রিলিমিনারি পরীক্ষার ফল প্রকাশ ও লিখিত পরীক্ষা শুরু হয়েছে।
অধস্তন আদালতে বিচারাধীন মামলা ৪০ লাখ ৪২ হাজার- সংসদে আইনমন্ত্রী : আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান জানিয়েছেন, ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত অধস্তন আদালতে ৪০ লাখ ৪১ হাজার ৯২৪টি মামলা বিচারাধীন। বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে বিএনপির সংসদ সদস্য জাহান্দার আলী মিয়ার এক প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী এ তথ্য জানান। ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে বৈঠকের শুরুতে প্রশ্নোত্তর টেবিলে উত্থাপন করা হয়।
আইনমন্ত্রী জানান, মামলার জট নিরসনে ৮৭১ আদালত এবং ২৩২টি বিচারকের পদ সৃজন করা হয়েছে। এ ছাড়া আরও ৩০৪টি বিচারকের পদ সৃজন প্রক্রিয়াধীন। নতুন ১৫০ জন সিভিল জজ নিয়োগের কার্যক্রম চলমান। বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে কেন্দ্রীয়ভাবে অধস্তন আদালতের স্টেনো-টাইপিস্ট, স্টোনোগ্রাফার, অফিস সহায়ক ও চালকের শূন্য পদে ৭০৮ জন বিচার বিভাগীয় কর্মচারী নিয়োগের সুপারিশ করা হয়েছে। বিভিন্ন পদে আরও ৫৫৩ কর্মচারী নিয়োগ চলমান। আইনমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার বিচারপ্রার্থী সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ লাঘব এবং মামলার জট নিরসনে দৃঢ় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরীর প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান বলেন, বিগত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে স্বাধীন করার ক্ষেত্রে কোনো আইনি বা প্রশাসনিক প্রতিবন্ধকতা ছিল না। তবে ফ্যাসিস্ট সরকার বিচারকদের বদলি–পদায়নের ক্ষেত্রে দলীয় আনুগত্যকে মুখ্য মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহার করে। তারা সুপ্রিম কোর্টের মাধ্যমে দলের প্রতি অনুগত বিচারকদের গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন করত। আর যাঁরা স্বাধীনভাবে বিচারকার্য পরিচালনার চেষ্টা করতেন, সুপ্রিম কোর্টের সহায়তায় তাঁদের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বদলির মাধ্যমে কার্যত শাস্তি দেওয়া হতো।
আইনমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার সেই পথ ধরে না হাঁটার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সততাণ্ডদক্ষতাসহ বিচারকদের বিচারিক আচরণই হবে মানদণ্ড। সেই লক্ষ্যেই আইন মন্ত্রণালয় সুপ্রিম কোর্টে সুপারিশ করবে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা সুপ্রিম কোর্টের। সরকারের এ ক্ষেত্রে একক ক্ষমতা নেই। স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানার প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, মামলা দায়েরের সময় এজাহারে অভিযুক্তের দলীয় পরিচয় উল্লেখ থাকে না। ফলে কোন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে কতগুলো হয়রানিমূলক ও মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং ভুয়া মামলাগুলোর মধ্যে কতসংখ্যক তদন্তে বা আদালতের রায়ে মিথ্যা/ভিত্তিহীন হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে, তার সঠিক পরিসংখ্যান নিরূপণ করা সম্ভব নয়। এ–সংক্রান্ত পরিসংখ্যান সরকারের কাছে নেই।
সরকারি দলের সংসদ সদস্য মনোয়ার হোসেনের প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে করা হয়রানিমূলক মামলাগুলো প্রত্যাহারের বিষয়ে বর্তমান সরকার সম্পূর্ণ সচেতন। এ লক্ষ্যে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। এর আগে অন্তর্বর্তী সরকার মামলা প্রত্যাহারের জন্য একটি কমিটি গঠন করেছিল। সেই কমিটির নীতিগত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কোনো হত্যা মামলা প্রত্যাহার করা হয়নি। রাজনৈতিক মামলা প্রত্যাহারের বিষয়ে বর্তমান সরকার কমিটি করেছে। রাজনৈতিক মামলাগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে প্রত্যাহারের কার্যক্রম চলমান। সরকারি দলের রফিকুল ইসলামের প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলা নিষ্পত্তিতে গড়ে কত সময় লাগে, তা নিয়ে কোনো সমীক্ষা হয়নি। এ–সংক্রান্ত কোনো তথ্য সরকারের কাছে নেই। ফৌজদারি দণ্ডবিধি অনুযায়ী, ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ১৮০ দিন ও দায়রা আদালতে ৩৬০ দিনের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তির বিধান আছে। দেওয়ানি মামলা নিষ্পত্তির কোনো সময়সীমা না থাকলেও কিছু গাইডলাইন আছে। মামলার প্রকৃতি ও জটিলতাভেদে কোনো মামলা এক বছরে নিষ্পত্তি হতে পারে। আবার কোনো মামলায় পাঁচ বছর বা তার থেকে বেশি সময় লাগতে পারে।