ঢাকা শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ৪ বৈশাখ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

তেল সংকটে ভোগান্তি বাড়ছে

তেল সংকটে ভোগান্তি বাড়ছে

রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় ফিলিং স্টেশনের বাইরে তেলের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছেন মোটরসাইকেল ও প্রাইভেটকারের চালকরা। কিন্তু পাম্পগুলো থেকে বলা হচ্ছে, তেল নেই। কোথাও ‘তেল নাই’ লেখা সাঁটিয়ে বিক্রি বন্ধ, কোথাও ‘সীমিত পরিসরে’ বিক্রি হচ্ছে। এতে ভোগান্তিতে পড়েছেন চালকরা।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা শুরু করে। ইরানও পাল্টা জবাব দিচ্ছে। যুদ্ধের কারণে তেল ও গ্যাসের উৎপাদন বিঘ্নিত হচ্ছে, সরবরাহ কঠিন হয়ে পড়ছে, দাম বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে ফিলিং স্টেশনে জ্বালানি তেল (অকটেন, পেট্রল ও ডিজেল) কিনতে ভিড় করছেন গাড়িচালকরা।

দুই দিন ধরেই রাজধানীর ফিলিং স্টেশনগুলোতে তেলের জন্য ঘুরছেন মোটরসাইকেলের চালক ইমরান হোসেন। তিনি মোটরসাইকেলে রাইড শেয়ার করেন। ফলে এই দুই দিন ধরে কোনো যাত্রীই পরিবহন করতে পারেননি ইমরান। গতকাল বৃহস্পতিবার বেলা ২টার দিকে রাজধানীর মতিঝিলের করিম অ্যান্ড সন্স ফিলিং স্টেশনে যখন এই চালকের সঙ্গে কথা হয়, তখন তার সামনে তিন শতাধিক মোটরসাইকেল তেলের জন্য অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে। এদিকে পাম্পের মালিক জানান, লাইনের বাইরে থেকে তেল নিতে আসা লোকজনের সঙ্গে পাম্পের কর্মী ও লাইনে থাকা চালকদের তিনবার মারামারির ঘটনা ঘটেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। মোটরসাইকেলের চালক ইমরান হোসেন বলেন, ‘দুই দিন ধরে এক পাম্প থেকে আরেক পাম্পে ঘুরছি। এখনো তেল নিতে পারিনি। আজও তেল পাব কি না, জানি না। আল্লাহ ভাগ্য রাখলে হয়তো পাব। কিন্তু ভোগান্তি অনেক। এই দুই দিন অফ ডে যাচ্ছে। একটা ভাড়াও নিতে পারিনি।’

এই রাইডশেয়ার চালক জানান, গত বুধবার রামপুরার হাজীপাড়া ফিলিং স্টেশনে আট ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেও তেল পাননি। ফিলিং স্টেশনের কাছাকাছি আসতেই তেল শেষ হয়ে যায়। এরপরে মহাখালী, তেজগাঁও, আসাদগেট এলাকায় ১০টির বেশি স্টেশন ঘুরেন। বেশির ভাগ ফিলিং স্টেশনে তেল না থাকার কারণে বন্ধ দেখতে পান। বাকি যেগুলো চালু ছিল সেগুলোতেও দীর্ঘ লাইন। ফলে তিনি আর লাইনে দাঁড়াননি।

বৃহস্পতিবার ভোর পাঁচটার সময় রাজধানীর মৎস্যভবন মোড়ে রমনার ফিলিং স্টেশনে তেলের জন্য লাইনে দাঁড়ান বলে জানান ইমরান হোসেন। সেখানে দুপুর ১২টা পর্যন্ত অপেক্ষা করেন। এরপরও ডিপো থেকে তেল না আসতে দেখে লাইন থেকে বের হয়ে পরীবাগে অবস্থিত মেঘনা মডেল ফিলিং স্টেশনে যান। সেখানে দীর্ঘ লাইন দেখে আর দাঁড়াননি। চলে আসেন মতিঝিলের করিম অ্যান্ড সন্স ফিলিং স্টেশনে। এই মোটরসাইকেলের চালক বলেন, ‘আগে একটি ওষুধ কোম্পানিতে জব করতাম। সেটি ছাড়ার পর নতুন চাকরি খুঁজতেছি। আপাতত না পেয়ে রাইড শেয়ার করি। কিন্তু এখানে এসে পড়লাম চরম ভোগান্তিতে। শুধু আমি না, লাখ লাখ বাইকার এই ভোগান্তির শিকার। কিছু তো আর করার নাই।’

ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে শেষ পর্যন্ত তেল না পাওয়া চালকের সংখ্যা অনেক। বেলা ১টার সময় রাজধানীর আরামবাগে অবস্থিত মেসার্স এইচ কে ফিলিং স্টেশনে কথা হয় প্রাইভেটকারের চালক মোহাম্মদ সুলতানের সঙ্গে। তিনি জানান, গত বুধবার এই ফিলিং স্টেশনে ১১ ঘণ্টা অপেক্ষা করে শেষ পর্যন্ত তেল পাননি। বৃহস্পতিবার ভোর পাঁচটার সময় লাইনে দাঁড়িয়েছেন।

ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধবিরতি চলছে। এই যুদ্ধবিরতির সময়ে বাংলাদেশের জ্বালানি তেলের সংকট কমার পরিবর্তে উল্টো বেড়েছে বলে মনে করেন চালক মোহাম্মদ সুলতান। তিনি বলেন, ‘দিন দিন দেখতেছি ভোগান্তি আরও বাড়ছে, তেল নিতে আমাদের আরও বেশি সময় লাগছে। ভোগান্তি কমার পরিবর্তে উল্টো বেড়েছে।’

রাজধানীর ফিলিং স্টেশনগুলোতে ঘুরে গত দুই সপ্তাহ তেলের জন্য যে লাইন দেখা গেছে, সে তুলনায় বৃহস্পতিবারের লাইন ছিল সবচেয়ে দীর্ঘ। গতকাল বেলা ১১টার সময় রাজধানীর রাজারবাগ ফিলিং স্টেশনে দেখা গেছে, মোটরসাইকেলের লাইন বিএনএন হসপিটাল অতিক্রম করে শান্তিবাগের গলির মাঝামাঝি পৌঁছে গেছে। অথচ গত দুই সপ্তাহে ফিলিং স্টেশনের সামনে থেকে মোটরসাকেলের লাইন সর্বোচ্চ শহীদবাগের বিএনএন হসপিটালের সামনে পর্যন্ত দেখা গিয়েছিল। আগে এই স্টেশনে মোটরসাইকেলের সংখ্যা সর্বোচ্চ ১১৫টি দেখা গেলেও আজকে দেখা গেছে ২২৩টি।

প্রাইভেটকারের সংখ্যা সর্বোচ্চ ৮৯টি দেখা গেলেও বৃহস্পতিবার ১৬৬টি দেখা গেছে। একই চিত্র দেখা গেছে আরামবাগের মেসার্স এইচকে ফিলিং স্টেশনে।

এই ফিলিং স্টেশনে গত দুই সপ্তাহ মোটরসাইকেলের লাইন স্টেশনের সামনে থেকে সর্বোচ্চ ফকিরাপুল পর্যন্ত দেখা গেছে। কিন্তু সেই মোটরসাইকেলের লাইন আজ ফকিরাপুল ঘুরে রাজারবাগ পুলিশ বক্স ঘুরে এজিবি কলোনির গলি পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। এই ফিলিং স্টেশনে এর আগে তেলের জন্য অপেক্ষা করা মোটরসাইকেলের সংখ্যা সর্বোচ্চ ২৩৭টি দেখা গেলেও আজ দেখা গেছে ৩৯৪টি। ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা সর্বোচ্চ ২৩২টি দেখা গেলেও আজ দেখা গেছে ৩২৯টি।

একই রকম চিত্র দেখা গেছে মতিঝিলের করিম অ্যান্ড সন্স ফিলিং স্টেশনে। এই ফিলিং স্টেশনে গত দুই সপ্তাহ ধরে মোটরসাইকেলের লাইন সর্বোচ্চ বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) ভবনের সামনে পর্যন্ত দেখা গেছে। আজকে সে মোটরসাইকেলের লাইন বাফুফে ভবন ঘুরে গাজী দস্তগীর সড়কের মাঝামাঝি পৌঁছে গেছে। এর আগে এই ফিলিং স্টেশনে বাইকের সংখ্যা সর্বোচ্চ ২৩৪টি দেখা গেলেও আজ দেখা গেছে ৩০২টি।

বিশৃঙ্খলা এড়াতে পুলিশ মোতায়েন তিনটি ফিলিং স্টেশনে বিশৃঙ্খলা এড়াতে বৃহস্পতিবার পুলিশ মোতায়েন করতে দেখা গেছে। বেলা ১টার দিকে আরামবাগের মেসার্স এইচ কে ফিলিং স্টেশনে লাইন অতিক্রম করে তেল নেওয়ার চেষ্টা করা কয়েকজনকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সরিয়ে দিতে দেখা গেছে।

গতকাল বেলা ২টার সময় মতিঝিলের করিম ফিলিং স্টেশনেও লাইনের বাইরে থেকে তেল নিতে আসা গাড়িগুলোকে পুলিশ সরিয়ে দেয়। এই ফিলিং স্টেশনের মালিক আবদুস সালাম জানান, আজ (বৃহস্পতিবার) সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত তিনবার পাম্পের কর্মীদের সঙ্গে চালকদের ও লাইন অতিক্রম করা নিয়ে চালকেরা নিজেদের মধ্যে মারামারির ঘটনা ঘটেছে। তিনি বলেন, ‘এসব এখন আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। পুলিশ সদস্যরা আছেন। তারা শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ করছেন।’

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত