
দেশজুড়ে তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় জনজীবনে নেমে এসেছে চরম ভোগান্তি। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে লোডশেডিং, যা পরিস্থিতিকে আরও দুর্বিষহ করে তুলেছে। বিশেষ করে শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎসংকট বেশি তীব্রআকার ধারণ করেছে। কারণ তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুতের চাহিদাও বেড়ে যায়। কিন্তু উৎপাদন ও সরবরাহে ঘাটতি থাকায় লোডশেডিং বাড়ছে। গ্রামের অনেক এলাকায় বিদ্যুতের সংযোগ থাকলেও দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় গরমে ভোগান্তিতে পড়েছেন বাসিন্দারা। ফলে অসহনীয় গরমে শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থরা সবচেয়ে বেশি কষ্ট পাচ্ছেন। দিনে-রাতে বারবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দিনে কয়েক ঘণ্টার বেশি বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না। হঠাৎ করে বিদ্যুৎ চলে যাওয়া এবং দীর্ঘ সময় না ফেরায় শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ীসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ বিপাকে পড়ছেন। গরমের মধ্যে বিদ্যুৎ না থাকায় অনেকেই খোলা জায়গায় বা বাইরে সময় কাটাতে বাধ্য হচ্ছেন।
জানা গেছে, দেশে দৈনিক বিদ্যুতের চাহিদা গড়ে ১৫ হাজার মেগাওয়াট, যার বিপরীতে উৎপাদন হচ্ছে ১৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। প্রায় ১ হাজার মেগাওয়াটের বেশি লোডশেডিংয়ের প্রভাব ঢাকার চেয়ে গ্রামাঞ্চলেই বেশি। একদিকে গরমের তীব্রতা ও অন্যদিকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে জনজীবন।
বিগত বছর অবশ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন ও লোডশেডিংয়ের চিত্র কিছুটা ভিন্ন ছিল। ঢাকা কিংবা গ্রামাঞ্চলে কোথাওই তীব্রআকারে লোডশেডিং দেখা যায়নি। তবে চলতি বছরে গ্রীষ্ম মৌসুমের শুরুতেই ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ শুরু হওয়ার ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে আমদানিকৃত জ্বালানি পণ্যের সাপ্লাই চেনে ব্যাঘাত ঘটে। ফার্নেস তেল, কয়লার মূল্য বেড়ে যাওয়া এবং এলএনজি আমদানি ব্যাহত হওয়ায় জ্বালানি সংকটে ভুগছে দেশের অধিকাংশ বিদ্যুৎকেন্দ্র। ফলশ্রুতিতে বাংলাদেশ ফার্নেস তেলের দাম বাড়িয়েছে, তবুও সহসাই সংকট কাটছে না। তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সাধারণত ব্যয়বহুল। জ্বালানি খাত নিয়ে সরকার আর্থিকভাবে চাপে থাকায় কয়লা ও গ্যাসের মাধ্যমে সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে চাইছে, যা তুলনামূলক সাশ্রয়ী।
লোডশেডিংয়ের চিত্র : দেশে অবস্থিত ১৩৯টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মোট উৎপাদনক্ষমতা ২৯ হাজার ২৬৯ মেগাওয়াট। যদিও বছরের পুরোটা সময় এ সক্ষমতার অর্ধেক অলস বসে থাকে। ১৮ এপ্রিল পর্যন্ত দেশে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়েছে ১৩ হাজার ৭৩২ মেগাওয়াট, যেখানে চাহিদা ছিল ১৪ হাজার ৫৫২ মেগাওয়াট। একই দিনে পিক আওয়ারে (সন্ধ্যায়) চাহিদা চলে গিয়েছিল ১৫ হাজার ৭২২ মেগাওয়াটে, যার বিপরীতে উৎপাদন হয়েছে ১৪ হাজার ৭৬৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। গত সোমবার সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ চাহিদা নির্ধারণ করা হয়েছে ১৬ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট।
বিপিডিবির গত ১৬ এপ্রিলের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেওয়া যায়, মোট উৎপাদনের বিপরীতে লোডশেডিং করা হয়েছে ১৪৮২ মেগাওয়াট। এর মধ্যে ঢাকায় সবচাইতে বেশি, ৩৬০ মেগাওয়াট লোডশেডিং। এছাড়া চট্টগ্রামে ১২০ মেগাওয়াট লোডশেডিং, খুলনায় ৩১৯ মেগাওয়াট, রাজশাহীতে ১৯৫ মেগাওয়াট, কুমিল্লায় ২১০ মেগাওয়াট, ময়মনসিংহে ৮০ মেগাওয়াট, সিলেটে ২৫ মেগাওয়াট, বরিশালে ৯৫ মেগাওয়াট ও রংপুরে ৭৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ লোডশেডিং করা হয়েছে। সার্বিক হিসেবে ঢাকার বাইরে লোডশেডিং হয়েছে ১১২২ মেগাওয়াট।
ন্যাশনাল লোড ডিসপ্যাচ সেন্টারের তথ্যানুসারে, ১৮ এপ্রিল দিনের শুরুতে সকাল ৬টায় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৪ হাজার ৪০১ মেগাওয়াট। তার বিপরীতে উৎপাদন হয়েছে ১৩ হাজার ৫৯৬ মেগাওয়াট। অর্থাৎ সে সময় লোডশেডিং করা হয়েছে ৮০৫ মেগাওয়াট। একইভাবে সকাল ৭টায় ১২৫৫ মেগাওয়াট, ৮টায় ৬৪৩ মেগাওয়াট, ৯টায় ৩৬০ মেগাওয়াট, ১০টায় ২০৯ মেগাওয়াট, বেলা ১১টায় ৬৭৯ মেগাওয়াট, দুপুর ১২টায় ১১০৬ মেগাওয়াট, ১টায় ১০৩৬ মেগাওয়াট, ২টায় ৮৪৪ মেগাওয়াট, বিকেল ৩টায় ৫৬২ মেগাওয়াট, ৪টায় ১৬৮ মেগাওয়াট, ৫টায় ১২৭ মেগাওয়াট, সন্ধ্যা ৬টায় ১১৮ মেগাওয়াট, ৭টায় ১২৮ মেগাওয়াট, রাত ৮টায় ১৪২ মেগাওয়াট, ৯টায় ৭৪ মেগাওয়াট, ১০টায় ১৪১ মেগাওয়াট, ১১টায় ৪৫১ মেগাওয়াট, ১২টায় ৭৩৩ মেগাওয়াট, রাত ১টায় ৮১৪ মেগাওয়াট, ২টায় ৮৯৮ মেগাওয়াট, ৩টায় ৯৫৩ মেগাওয়াট, ৪টায় ৯১৪ মেগাওয়াট ও ভোর ৫টায় ৬৮২ মেগাওয়াট লোডশেডিং করা হয়েছে।
বিপিডিবির তথ্য অনুযায়ী, ১৮ এপ্রিল ঢাকা ও বরিশালে কোনো লোডশেডিং হয়নি। তবে চট্রগ্রামে ৯৫ মেগাওয়াট লোডশেডিং, কুমিল্লায় ১১০ মেগাওয়াট, ময়মনসিংহে ১০০ মেগাওয়াট, সিলেটে ৩০ মেগাওয়াট, খুলনায় ১৪৫ মেগাওয়াট, রাজশাহীতে ১১০ মেগাওয়াট ও রংপুরে ৫৩ মেগাওয়াট লোডশেডিং করা হয়েছে।
জাতীয় গ্রিড ব্যবস্থাপনা দুইভাগে বিভক্ত। এর মধ্যে পূর্বাঞ্চল গ্রিডের অধীনে রয়েছে- ঢাকা, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, ময়মনসিংহ ও সিলেট এবং পশ্চিমাঞ্চল গ্রিডের অধীনে রয়েছে খুলনা, বরিশাল, রাজশাহী ও রংপুর। পিজিসিবির তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ঢাকা অঞ্চলে বিদ্যুতের চাহিদা বেশি থাকায় পশ্চিমাঞ্চল গ্রিডের চাইতে পূর্বাঞ্চল গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ তুলনামূলক বেশি। ১৮ এপ্রিল পূর্বাঞ্চল গ্রিডে ১০ হাজার ২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়েছে, যার মধ্যে ঢাকাতেই সরবরাহ করা হয়েছে ৫৬১৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। এছাড়া চট্টগ্রামে ১৪২৫ মেগাওয়াট, কুমিল্লায় ১৩৭৮ মেগাওয়াট, ময়মনসিংহে ১০১৯ মেগাওয়াট ও সিলেটে ৫৮০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়েছে।
সমগ্র পশ্চিমাঞ্চল গ্রিডে সরবরাহ করা বিদ্যুতের পরিমাণ ঢাকার বিদ্যুতের চাইতেও কম। ১৮ এপ্রিল ওয়েস্টার্ন গ্রিডে মোট বিদ্যুৎ দেওয়া হয়েছে ৪২৯৫ মেগাওয়াট। এর মধ্যে খুলনায় ১৭৫৪ মেগাওয়াট, বরিশালে ৪৮৮ মেগাওয়াট, রাজশাহীতে ১৪৯১ মেগাওয়াট ও রংপুরে ৫৬২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়েছে।
ঢাকার চাইতে গ্রামের লোডশেডিংয়ের পরিমাণ অনেকটাই বেশি। দিনের ৬ থেকে ৮ বারের লোডশেডিংয়ে গড়ে প্রতিদিন ৪-৬ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না। এতে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে, তেমনি প্রভাব পড়েছে কৃষিকাজে, ছোট ছোট কল-কারখানাগুলোতে। রংপুরের পীরগাছা উপজেলার তাম্বুলপুর ইউনিয়নের আমজাদ হোসেন বলেন, বিদ্যুৎ কখন যায় কখন আসে বোঝা যায় না। এখনও সেভাবে গরম শুরু হয়নি, অথচ তার আগেই যেভাবে দিনে ৭-৮ বার লোডশেডিং হচ্ছে, তা অনেকটা অসহনীয়। এতে কৃষিকাজের পাশাপাশি বাড়ির দৈনন্দিন কাজ ব্যাহত হচ্ছে। রংপুর নগরীর মুন্সিপাড়া এলাকার জাহাঙ্গীর কবির, শহরে খুব একটা লোডশেডিং নেই, এখন সহনীয় পর্যায়ে আছে। তবে সামনে এসএসসি পরীক্ষা রয়েছে, এই সময়টাতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ প্রয়োজন। এদিকে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকার বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধে সময় নির্ধারণ করলেও তা সরকারি তদারকের অভাবে প্রতিপালন করছেন না। রংপুরসহ আশপাশের জেলা ও উপজেলাগুলোতে রাত ৯টার পরও দোকানপাট, বিপণিবিতান খোলা রাখা হচ্ছে বলে খবর পাওয়া গেছে।
সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ কর্মকর্তারা বলছেন, রংপুর অঞ্চলে সহনীয় পর্যায়ে রয়েছে। চাহিদার তুলনায় খুব বেশি ঘাটতি না থাকায় এখনও তীব্র লোডশেডিং শুরু হয়নি। অপরদিকে রাজশাহী অঞ্চলেও বেড়েছে লোডশেডিংয়ের পরিমাণ। নেসকোর নির্বাহী পরিচালক (অপারেশন) মখলেসুর রহমান বলেন, বিদ্যুতের চাহিদা একেক সময় একেক রকম থাকে। তুলনামূলক সকালের দিকে চাহিদা কম থাকে। তাই এ সময় লোডশেডিং তেমন হয় না।
তিনি বলেন, ২০ এপ্রিল রাজশাহী সার্কেল-১ এ সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত চাহিদা ও বরাদ্দ সমান ছিল (চাহিদা সর্বোচ্চ ১১৯.৪ মেগাওয়াট পর্যন্ত ছিল)। ফলে কোনো লোডশেডিং হয়নি। তবে রাত ৮টায় চাহিদা বেড়ে ১২৪ মেগাওয়াট হলেও বরাদ্দ ছিল ১১১ মেগাওয়াট, যার ফলে এই সার্কেলে ১৩ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়েছে। রাজশাহী সার্কেল ২-এ সারা দিনে চাহিদা ৫৭ মেগাওয়াট থেকে ৬৮.৬ মেগাওয়াটের মধ্যে ছিল। নগরের বুধপাড়া এলাকার বাসিন্দা বাবু বলেন, সকালের দিকেও বিদ্যুৎ থাকে না অনেক সময়। আমাদের এলাকায় রাত ১০টার পরে বিদ্যুৎ গিয়ে এক থেকে দেড় ঘণ্টা পরে আসে। গভীর রাতেও কয়েকবার বিদ্যুৎ যায়। রাতে ঘুমাতে বেশ কষ্ট হয়।
বিদ্যুৎ ও বিতরণ বিভাগ নেসকোর রংপুর অঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী (ভারপ্রাপ্ত) শাহাদৎ হোসেন সরকার বলেন, বর্তমানে রংপুর বিভাগে চাহিদা ৯০০ মেগাওয়াট। আমরা চাহিদার তুলনায় ২৫-৩০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কম পাচ্ছি, অর্থাৎ ঘাটতি রয়েছে। এ কারণে খুব একটা লোডশেডিং হচ্ছে না। পল্লী বিদ্যুতের প্রকৌশলী মো. রেজাউল করিম জানান, রংপুর বিভাগে বর্তমানে ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ চাহিদা রয়েছে। এর বিপরীতে ঘাটতি ১৫-২০ মেগাওয়াট। অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় রংপুরে এখনো সেভাবে লোডশেডিং শুরু হয়নি। আমরা গ্রাম অঞ্চলে বিদ্যুৎ ব্যবহারে সবাইকে সাশ্রয়ী হবার পরামর্শ দিচ্ছি।
জ্বালানিসংকটে বিদ্যুৎকেন্দ্র : দেশে অবস্থিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের ৮৮ শতাংশ তেল, গ্যাস ও কয়লানির্ভর। তবে বর্তমানে জ্বালানি সংকটে ১৮টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। এর মধ্যে গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্র ১০টি ও তেলভিত্তিক কেন্দ্র ৮টি। এছাড়া ১৩৯টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে উৎপাদন কমে গেছে ৩৫টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের। এর মধ্যে গ্যাসভিত্তিক ৯টি, তেলভিত্তিক ২৪টি ও কয়লাচালিত কেন্দ্র রয়েছে ২টি।
বন্ধ ১৮ বিদ্যুৎকেন্দ্র : ঘোড়াশাল রিপাওয়ারড ইউনিট ৪, ঘোড়াশাল টিপিপি ইউনিট ৫, ঘোড়াশাল ৩৬৫ মেগাওয়াট, ঘোড়াশাল ১০৮ মেগাওয়াট, মেঘনাটঘাট ৩৩৫ মেগাওয়াট, সিদ্ধিরগঞ্জ ২১০ মেগাওয়াট, মেঘনাঘাট ৫৮৩ মেগাওয়াট, জেরা মেঘনাঘাট ৭১৮ মেগাওয়াট, বাঘাবাড়ী ৭১ মেগাওয়াট, সিরাজগঞ্জ ২২৫ মেগাওয়াট। তেলভিত্তিক : গাগনগর ১০২ মেগাওয়াট, মেঘনাঘাট ১০৪ মেগাওয়াট, জুলদাহ ১০০ মেগাওয়াট, জুলদাহ ২ ইউনিট ১০০ মেগাওয়াট, জঙ্গলিয়া ৫২ মেগাওয়াট, ফেনী লঙ্কা পাওয়ার, রূপসা ১০৫ মেগাওয়াট, নাটোর ৫২ মেগাওয়াট। বিপিডিবির সদস্য (উৎপাদন) মো. জহুরুল ইসলাম বলেন, জ্বালানি সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদনে একটা প্রভাব পড়ছে, তবে আমরা আশা করছি লোডশেডিং বড় আকারে হবে না। গ্যাস ও কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রের উৎপাদন বাড়ানো হচ্ছে। তবে ফার্নেস তেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় তেলভিত্তিক উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছ, তাই আপাতত সেখান থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন নির্দিষ্ট পরিমাণে করা হচ্ছে।
চট্টগ্রামে লোডশেডিংয়ে ভোগান্তি : গ্রীষ্মের শুরুতেই চট্টগ্রাম শহর ও গ্রামে বিদ্যুতের লোডশেডিং চলছে। শহরের তুলনায় গ্রামে লোডশেডিংয়ে মাত্র বেশি। নগরে প্রতিদিন চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না আর গ্রামে তা সাত থেকে আট ঘণ্টা পর্যন্ত গড়াচ্ছে। দিনের তুলনায় সন্ধ্যায় লোডশেডিং বেশি হচ্ছে। প্রচণ্ড গরমের মধ্যে ঘন ঘন বিদ্যুৎ আসা-যাওয়ায় জনজীবনে দুর্ভোগ নেমে এসেছে। বিশেষ করে মঙ্গলবার থেকে শুরু হওয়া এসএসসি পরীক্ষার্থীরা পড়াশোনা নিয়ে বিপাকে পড়েছে। সন্তানদের প্রস্তুতি নিয়ে উৎকণ্ঠায় রয়েছেন অভিভাবকেরা। এদিকে জ্বালানি তেলের সংকটে বহুতল ভবন ও অফিস এলাকায় বিকল্প হিসেবে জেনারেটর চালু রাখতেও হিমশিম খেতে হচ্ছে। বিদ্যুৎ পরিস্থিতির প্রভাব পড়ছে আয়- উপার্জনেও। এ অবস্থায় চট্টগ্রাম অঞ্চলের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন সক্ষমতার অর্ধেকেরও নিচে নেমে এসেছে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) কর্মকর্তারা বলছেন, জ্বালানিসংকটের কারণেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। পিডিবির চট্টগ্রামের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (পরিচালন ও সংরক্ষণ সার্কেল) এ কে এম মামুনুল বাশরী বলেন, গ্যাসসংকটের কারণে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না, কখনো কখনো বন্ধও রাখতে হচ্ছে। একই সঙ্গে পরিস্থিতির কারণে তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর উৎপাদনও সীমিত রাখা হচ্ছে। কাপ্তাই জলবিদ্যুৎকেন্দ্রেও পানির স্তর কমে যাওয়ায় পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে না।
উৎপাদন নেমেছে অর্ধেকে : জ্বালানি সরবরাহে বিঘেœর কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির প্রভাবে গ্যাস ও কয়লার সরবরাহে সংকট দেখা দিয়েছে, যা বিদ্যুৎ উৎপাদনে সরাসরি প্রভাব ফেলছে। চট্টগ্রাম অঞ্চলে ২৪টি বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে। এর মধ্যে গ্যাসভিত্তিক পাঁচটি, একটি জলবিদ্যুৎকেন্দ্র, দুটি কয়লাভিত্তিক, দুটি সৌর এবং একটি বায়ুচালিত কেন্দ্র রয়েছে। বাকি কেন্দ্রগুলো তেলভিত্তিক। এসব কেন্দ্রের মোট উৎপাদন সক্ষমতা ৪ হাজার ৬৭৮ মেগাওয়াট। তবে গত এক সপ্তাহে সর্বোচ্চ উৎপাদন হয়েছে গত শনিবার—দিনে ২ হাজার ১৬ মেগাওয়াট এবং সন্ধ্যার পর ২ হাজার ২৮৫ মেগাওয়াট, যা মোট সক্ষমতার তুলনায় অর্ধেকেরও কম। অন্য দিনগুলোয় উৎপাদন আরও কম ছিল। গত বৃহস্পতিবার দিনে মাত্র ১ হাজার ১১ মেগাওয়াট এবং সন্ধ্যায় ১ হাজার ৮০৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়। অধিকাংশ দিনই উৎপাদন দেড় হাজার মেগাওয়াটের নিচে ছিল। পিডিবি সূত্র জানায়, গ্যাসসংকট ও রক্ষণাবেক্ষণের কারণে ৪২০ মেগাওয়াট সক্ষমতার রাউজান বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ রয়েছে। কাপ্তাই জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের ২৪২ মেগাওয়াট সক্ষমতার পাঁচটি ইউনিটের মধ্যে প্রায়ই দুই থেকে তিনটি বন্ধ রাখতে হচ্ছে। চালু ইউনিটগুলো থেকেও পূর্ণ সক্ষমতা পাওয়া যাচ্ছে না।
গ্রামে লোডশেডিং বেশি : চট্টগ্রামে দৈনিক বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ১ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট, যা কখনো আরও বাড়ে। কিন্তু বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে ৮০ থেকে ১০০ মেগাওয়াট ঘাটতি থাকছে। এ কারণে সকাল-সন্ধ্যা লোডশেডিং হচ্ছে। প্রবর্তক এলাকার একটি বহুতল ভবনের তত্ত্বাবধায়ক মোহাম্মদ ইমরান বলেন, প্রতিদিন পাঁচ থেকে ছয়বার বিদ্যুৎ যায়। একেকবার আধা ঘণ্টা থেকে এক ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকে না। অফিসের কাজ ও লিফট চালাতে জেনারেটর চালাতে হয়, কিন্তু জ্বালানি সংগ্রহ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। গ্রামাঞ্চলে পরিস্থিতি আরও খারাপ। রাউজানে দিনে সাত থেকে আটবার লোডশেডিং হচ্ছে। নোয়াপাড়া পথেরহাট এলাকায় কর্মরত ব্যাংক কর্মকর্তা মুহাম্মদ বেলাল বলেন, ‘অফিসে থাকাকালীন ছয় থেকে সাতবার বিদ্যুৎ আসা-যাওয়া করছে। স্বাভাবিক কাজ চালানো কঠিন হয়ে পড়ছে।’ লোহাগাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ইকবাল হোছাইন বলেন, লোডশেডিংয়ের কারণে স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখা কঠিন হচ্ছে। চট্টগ্রাম পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১–এর জ্যেষ্ঠ মহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী নূর মোহাম্মদ বলেন, তাদের এলাকায় প্রতিদিন ১৭০ থেকে ১৮০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ প্রয়োজন হলেও ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কম সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে।