ঢাকা শনিবার, ২০ জুন ২০২৬, ৬ আষাঢ় ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

সংশয়ের আবর্তে শান্তিচুক্তি

সংশয়ের আবর্তে শান্তিচুক্তি

মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের অবসান ঘটাতে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পিত শান্তি আলোচনা গতকাল শুক্রবার অনুষ্ঠিত হচ্ছে না বলে জানিয়েছিল সুইজারল্যান্ড। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের সুইজারল্যান্ড সফরের পরিকল্পনা হঠাৎ বাদ দেওয়ায় এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে একটি স্থায়ী যুদ্ধবিরতি আদৌ সম্ভব কি না, তা নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। গত বৃহস্পতিবার রাতে হোয়াইট হাউসের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘এ আলোচনার সার্বিক প্রস্তুতি ও ব্যবস্থাপনা কখনোই সহজ বা আগে থেকে অনুমান করার মতো ছিল না।’ তবে পরিকল্পনা চূড়ান্ত হওয়ামাত্রই জেডি ভ্যান্স ও মার্কিন প্রতিনিধিদল রওনা হওয়ার জন্য প্রস্তুত ছিল বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়। সুইজারল্যান্ডের বার্গেনস্টক নামের একটি পার্বত্য অবকাশকেন্দ্রে এ আলোচনা হওয়ার কথা ছিল। এখন আলোচনা যে হচ্ছে না, দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তা নিশ্চিত করলেও এর সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ জানায়নি।

এ বিষয়ে ইরানের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। অবশ্য গত বুধবার ১৪ দফার একটি প্রাথমিক চুক্তির (সমঝোতা স্মারক) মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আরও অন্তত ৬০ দিন বাড়ানোর পর ইরান জানিয়েছিল, তারা কারিগরি আলোচনা শুরু করতে প্রস্তুত। তবে ইরানের আধা সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিম নিউজ জানিয়েছে, ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্সের বৃহস্পতিবারের ঘোষণার (সফর স্থগিত) আগেই ইরান শর্ত দিয়েছিল যে আলোচনার আগে অন্তর্বর্তী চুক্তি বাস্তবায়নে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে স্পষ্ট পদক্ষেপ দেখতে হবে। একই সঙ্গে ইরানের প্রতিনিধিদল সুইজারল্যান্ডের ওই অবকাশ কেন্দ্রে যাবে কি না, সে বিষয়েও আগে থেকে কোনো নিশ্চয়তা দেওয়া হয়নি।

মার্কিন কর্মকর্তারা এর আগে জানিয়েছিলেন, সুইজারল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার চুক্তির একটি আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে। তবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ পরিকল্পনা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে। দেশটির পক্ষ থেকে বলা হয়, উভয় দেশের প্রেসিডেন্ট ইতিমধ্যে চুক্তিতে সই করায় এমন কোনো আনুষ্ঠানিকতার প্রয়োজন নেই। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানকে লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলার মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত শুরু হয়। এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের ফলে এ পর্যন্ত অন্তত ৭ হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। সেই সঙ্গে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতি ও বাজারব্যবস্থায় বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে। এই শান্তি আলোচনা থেকে বাদ পড়া ইসরায়েল নিজেদের যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তি থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছে। লেবাননে ইরানের মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে তারা লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। ইসরায়েলের এ অবস্থানের কারণেও চুক্তিটি শেষ পর্যন্ত টিকবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

ওয়াশিংটনে কংগ্রেসের ভেতরে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দল রিপাবলিকান পার্টির কিছু সদস্যও এ চুক্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে অধিকাংশ মার্কিন নাগরিকই এ যুদ্ধ পছন্দ করছিলেন না। তাই কংগ্রেস সদস্যদের আশঙ্কা, যুদ্ধ থামানোর জন্য ট্রাম্প ইরানকে অনেক বেশি ছাড় দিয়ে ফেলেছেন।

ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, তিনি শুধু ইরানের ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের’ মাধ্যমে এ যুদ্ধের অবসান ঘটাবেন। কিন্তু ইরানের সঙ্গে স্বাক্ষরিত স্মারকলিপিতে উল্টো দেশটির ওপর থেকে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া, প্রায় ১০ হাজার কোটি ডলারের বেশি সমমূল্যের আটকে থাকা সম্পদ ছেড়ে দেওয়া এবং ইরানের তেল রপ্তানির ওপর থেকে তাৎক্ষণিকভাবে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের কথা বলা হয়েছে।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা আলী খামেনি বলেছেন, ট্রাম্প ‘হতাশা’ থেকে এ চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছেন। একই সঙ্গে তিনি ইঙ্গিত দেন যে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আগামী দিনের আলোচনা খুব একটা সহজ হবে না। অথচ এ পরমাণু কর্মসূচি বন্ধ করাই ছিল যুদ্ধ শুরু করার পেছনে ট্রাম্পের অন্যতম প্রধান অজুহাত। এক বার্তায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা বলেন, ‘আমেরিকান পক্ষ যদি অতিরিক্ত কোনো দাবি করে, তবে আমরা তা মেনে নেব না।’ চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, ইরানের পরমাণু কর্মসূচির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে দুই দেশের প্রতিনিধিদল ৬০ দিন সময় পাবে। তবে দুই পক্ষ সম্মত হলে এ সময়সীমা বাড়ানো যাবে। এ ছাড়া ইরানের জন্য তিন হাজার কোটি ডলারের একটি পুনর্গঠন তহবিল এবং অন্যান্য আর্থিক প্রণোদনার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেছেন, ওয়াশিংটন ইরানের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির ওপর সীমাবদ্ধতা আরোপের বিষয়টি নিয়েও চেষ্টা চালাবে। এদিকে যুদ্ধের ক্রমবর্ধমান ব্যয়ও এখন বড় আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। মার্কিন সংবাদপত্র দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগ দেশটির আইনপ্রণেতাদের জানিয়েছে, যুদ্ধের খরচ ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক বিল মেটাতে তাদের আরও আট হাজার কোটি ডলার প্রয়োজন।

প্রায় চার মাস আগে যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে, তখন ট্রাম্প বলেছিলেন যে তার লক্ষ্য ইরানের পরমাণু সক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস করা, যেন তারা কখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে। এ ছাড়া তিনি প্রতিবেশীদের ওপর তেহরানের হামলা চালানোর ক্ষমতা বন্ধ করতে, এ অঞ্চলে ইসরায়েলবিরোধী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে ইরানের সমর্থন দেওয়া ঠেকাতে এবং ইরানের শাসনব্যবস্থার পতন ঘটাতে চেয়েছিলেন। তবে ট্রাম্প যখন এ চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন, তখন এর কোনো লক্ষ্যই পূরণ হয়নি। চুক্তিতে ইরান শুধু কয়েক দশক ধরে চলে আসা তাদের পুরোনো দাবিরই পুনরাবৃত্তি করেছে যে তারা কোনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি বা সংগ্রহ করবে না। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের একের পর এক প্রেসিডেন্ট ইরানের এই দাবিকে সব সময়ই সন্দেহ করে এসেছেন।

চুক্তি অনুযায়ী, ইরান তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত নিজস্ব গবেষণাগারেই ধ্বংস করতে এবং পরমাণু অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি (এনপিটি) অনুযায়ী আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) পরিদর্শকদের নিয়মিত পরিদর্শনের সুযোগ দিতে রাজি হয়েছে। তবে ইউরেনিয়ামের এ মজুত দেশের বাইরে পাঠিয়ে দেওয়ার যে দাবি ট্রাম্প করেছিলেন, ইরান তা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে।

অবশ্য মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, এ আলোচনা থেকে এখনো ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে একটি শক্তিশালী চুক্তি বেরিয়ে আসতে পারে। ২০১৫ সালে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য দেশের মধ্যে যে পরমাণু চুক্তি হয়েছিল এবং ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে যা বাতিল করেছিলেন, নতুন চুক্তিটিকে তার চেয়েও উন্নত করাই মার্কিন কর্মকর্তাদের লক্ষ্য। কিন্তু সমালোচকদের মতে, ইরান এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। কারণ, তারা একটি পরাশক্তির আক্রমণ প্রতিহত করেছে, হরমুজ প্রণালির ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে এবং আর্থিক নিষেধাজ্ঞা থেকে বড় ধরনের ছাড় আদায় করতে পেরেছে।

ইরান স্পষ্ট জানিয়েছে, গুরুত্বপূর্ণ এ নৌপথের অপর পাড়ে থাকা প্রতিবেশী দেশ ওমানের সঙ্গে যৌথভাবে তারা হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতেই রাখবে। যুদ্ধপূর্ব সময়ের তুলনায় এখন তারা চলাচলকারী জাহাজগুলো থেকে নতুন একধরনের সেবা মাশুল (সার্ভিস ফি) আদায়ের পরিকল্পনা করছে। তবে আগামী ৬০ দিনের আলোচনার সময়ে এ মাশুল নেওয়া হবে না।

ইতিমধ্যে হরমুজ প্রণালি আবার চালু হওয়ার পর তেলবাহী ট্যাংকারগুলোর চলাচল শুরু হয়েছে। ফলে বাজারে তেলের সরবরাহ বৃদ্ধির সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় আজ বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম কিছতা কমেছে। যুদ্ধের আগে বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এ পথ দিয়েই পরিবাহিত হতো।

সমঝোতা চুক্তি ইরানের আগ্রহ নয়, মার্কিন মরিয়াভাবের ফসল- খামেনি : ইরানের বন্দর ও উপকূলীয় এলাকায় প্রবেশ ও ছেড়ে যাওয়া সব ধরনের নৌযানের ওপর আরোপিত অবরোধ প্রত্যাহার করেছে যুক্তরাষ্ট্র। গত বৃহস্পতিবার এ তথ্য জানিয়েছে মার্কিন সামরিক বাহিনীর মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক কমান্ড সেন্টকম (সেন্ট্রাল কমান্ড)। খবর আলজাজিরার।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে সেন্টকম জানায়, আরব উপসাগর ও ওমান উপসাগরে অবস্থিত ইরানের বন্দরগুলোতে যাওয়া কিংবা সেখান থেকে বের হওয়া জাহাজের চলাচলে মার্কিন বাহিনী আর কোনো বাধা দিচ্ছে না। তবে অবরোধ তুলে নেওয়া হলেও অঞ্চলটিতে মার্কিন নৌবাহিনীর উপস্থিতি অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছে সেন্টকম। সংস্থাটির ভাষ্য, ইরানের সঙ্গে হওয়া সমঝোতার ‘সব দিক’ যথাযথভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করতেই মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলো ওই এলাকায় মোতায়েন থাকবে।

সাম্প্রতিক উত্তেজনার পর যুক্তরাষ্ট্রের এ সিদ্ধান্তকে আঞ্চলিক সামুদ্রিক বাণিজ্য ও নৌ চলাচলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। যদিও সমঝোতার বিস্তারিত শর্ত সম্পর্কে সেন্টকমের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে আর কোনো তথ্য জানানো হয়নি।

প্রসঙ্গত, বৃহস্পতিবার ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এবং ডোনাল্ড ট্রাম্প ডিজিটালভাবে সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষর করেন। এর মাধ্যমে কার্যকর হয় চুক্তিটি। সমঝোতায় যুদ্ধ বন্ধ করা, লেবানন পরিস্থিতি, হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করা এবং ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ প্রত্যাহারের মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে, চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর লক্ষ্যে উভয় পক্ষ ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের মতো বিষয়গুলো নিয়ে ৬০ দিনের একটি আলোচনা প্রক্রিয়া শুরু করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

লেবাননে হামলা নিয়ে ইসরায়েলকে কড়া হুঁশিয়ারি ভ্যান্সের : মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সই করা ইরান চুক্তি (সমঝোতা স্মারক) মেনে নেওয়ার জন্য ইসরায়েল সরকারকে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স। একই সঙ্গে জে ডি ভ্যান্স মনে করিয়ে দিয়েছেন যে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইসরায়েল বিশ্বের বেশির ভাগ দেশের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে এবং এখন শুধু যুক্তরাষ্ট্রই তাদের একমাত্র শক্তিশালী মিত্র হিসেবে অবশিষ্ট আছে।

হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে প্রায় এক ঘণ্টাব্যাপী এক ব্রিফিংয়ের শেষভাগে ভ্যান্স বলেন, ‘আমি যদি ইসরায়েলের মন্ত্রিসভার সদস্য হতাম, তবে পুরো বিশ্বে আমার একমাত্র যে শক্তিশালী মিত্রটি টিকে আছে, অন্তত তাকে আক্রমণ করতাম না।’

প্রায় চার মাস আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার পর থেকে ইসরায়েলি নেতৃত্বের সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের সম্পর্ক যে কতা তিক্ত হয়ে উঠেছে, ভ্যান্সের এই মন্তব্য তারই সবচেয়ে বড় প্রকাশ্য প্রমাণ।

ভ্যান্স তার ব্রিফিংয়ের বেশির ভাগ সময়জুড়ে ইরানের সঙ্গে করা চুক্তির পক্ষে সাফাই গান। এ চুক্তিতে ইসরায়েল সরাসরি কোনো পক্ষ ছিল না। তবে চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, ইসরায়েলকে লেবাননে হামলা বন্ধ করতে হবে।

চুক্তির বিনিময়ে ইরানের ওপর থেকে অপরিশোধিত তেল রপ্তানির নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়ে দেশটির অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করবে যুক্তরাষ্ট্র। বিপরীতে ইরান বন্ধ করে দেওয়া হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দিতে রাজি হয়েছে এবং কোনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

এ সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের মাধ্যমে ৬০ দিনের একটি আলোচনা প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, যা শেষ পর্যন্ত ইরানের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য ৩০ হাজার কোটি (৩০০ বিলিয়ন) ডলারের একটি পুনর্বাসন তহবিল গঠনের দিকে যেতে পারে।

মার্কিন সংবাদভিত্তিক ওয়েবসাইট এক্সিওস জানায়, ইসরায়েলের কর্মকর্তারা এই চুক্তি নিয়ে ‘গভীর উদ্বেগ’ প্রকাশ করেছেন। দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর একজন উপদেষ্টা বলেছেন, সমঝোতা স্মারকের লেবাননসংক্রান্ত অংশটি মেনে চলতে ইসরায়েল কোনোভাবেই বাধ্য নয়।

সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর থেকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নিজে এ পর্যন্ত চুক্তিটি নিয়ে প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেননি। তবে তার অনুগত ও সমমনা ইসরায়েলি গণমাধ্যমগুলো ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তার দলের তীব্র সমালোচনা করছে। তারা ট্রাম্পের প্রতিনিধি স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনারের বিরুদ্ধে আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে ইসরায়েলকে ‘বিক্রি’ করে দেওয়ার অভিযোগ তুলেছে।

এসব আক্রমণের জবাবে জে ডি ভ্যান্স মনে করিয়ে দেন যে ইসরায়েলের ব্যবহৃত প্রতিরক্ষা অস্ত্রের তিন-চতুর্থাংশই যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি এবং এর খরচও তারাই জুগিয়েছে। ফলে ইসরায়েলের সমস্যাটি ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প নন’। ভ্যান্স আরও বলেন, ‘ইসরায়েলের যারা মনে করছেন, তাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট, তাদের এবার ঘুম থেকে ওঠা উচিত এবং বাস্তব পরিস্থিতিা বোঝা দরকার।’ প্রায় চার মাস আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার পর থেকে ইসরায়েলি নেতৃত্বের সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের সম্পর্ক যে কথা তিক্ত হয়ে উঠেছে, ভ্যান্সের এই মন্তব্য তারই সবচেয়ে বড় প্রকাশ্য প্রমাণ।

ভ্যান্স জানান, ট্রাম্প প্রশাসন ইসরায়েল সরকারের পাশাপাশি পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর সঙ্গেও ‘প্রায় প্রতিদিনই’ কথা বলছে। তবে ইসরায়েলের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে তার নিজের যে আলাপ হয়েছে, সেখানে তিনি এমন কোনো উদ্বেগের কথা শোনেননি।

অনুষ্ঠেয় আলোচনার মানে এটা নয় যে, শত্রুর মতামত মেনে নেয়া হবে- ইরানের সর্বোচ্চ নেতা : পার্সটুডে-ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সমঝোতা স্মারক সইয়ের বিষয়ে ইরানি জাতির উদ্দেশে বার্তা দিয়েছেন সবোর্চ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ মুজতাবা খামেনেয়ী। তিনি বলেছেন, ভবিষ্যতে অনুষ্ঠেয় সরাসরি আলোচনার মানে শত্রুর অবস্থান মেনে নেওয়া নয়। বার্তাটি এখানে তুলে ধরা হলো। ইরানের প্রাণবন্ত ও বিশ্বস্ত জনগণ,যেমনটি আপনারা অবগত হয়েছেন, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টদের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। এই পর্যায়ে পৌঁছানোর পথে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আন্তরিকতা ও সদিচ্ছা নিয়ে ব্যাপক চেষ্টা চালিয়েছেন। তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হতাশা থেকে বিভিন্ন ধরনের চাপ প্রয়োগের উপায় অবলম্বন করেছেন।

আমি নীতিগতভাবে ভিন্ন মত ছিল, তবে সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান হিসেবে সম্মানিত প্রেসিডেন্ট তার নিজের ও পরিষদের অন্যান্য সদস্যের পক্ষ থেকে ইরানের জনগণ ও প্রতিরোধ ফ্রন্টের অধিকার রক্ষার প্রতিশ্রুতি দেওয়ায় এবং এ সংক্রান্ত দায়িত্ব নেয়ার বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করায় আমি অনুমতি প্রদান করেছি।

তিনি (ইরানের প্রেসিডেন্ট) আরও স্পষ্ট করেছেন যে, যদি আমেরিকা অতিরিক্ত দাবি বা বাড়াবাড়ি করে, তবে তা গ্রহণ করা হবে না। এখন থেকে আমরা অর্থাৎ ইরানের গর্বিত জনগণ এবং এই নগণ্য সেবক সমঝোতা স্মারকে উল্লিখিত শর্তগুলো বাস্তবায়নের অপেক্ষায় থাকব। তবে এটি স্পষ্ট, ভবিষ্যতে অনুষ্ঠেয় সরাসরি আলোচনার মানে এটা নয় যে, শত্রুর মতামত মেনে নেয়া হবে। আশা করি আমাদের নেতা (আল্লাহ তার মহিমান্বিত আগমন ত্বরান্বিত করুন)-এর দোয়া ও আশীর্বাদ ইরানের সম্মানিত জাতির জন্য নানা ধরণের বিজয় ও সফলতা বয়ে আনবে।

আমাদের হাত বন্দুকের ট্রিগারে রয়েছে- ইরানের সংসদ স্পিকার কলিবফ : ইরানের ইসলামি বিপ্লবের নেতাকে পাঠানো এক বার্তায়, দেশটির সংসদ স্পিকার জনগণের অধিকার পুনরুদ্ধারের পথ হিসেবে আলোচনাকে গুরুত্ব দেয়ার কথা উল্লেখ করে লিখেছেন, সমঝোতা স্মারকের বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে পেরেছে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের শক্তি এবং যদি শত্রু বাড়াবাড়ি করে, তবে তাকে কঠোর জবাবের সম্মুখীন হতে হবে।

ইরানি ব্রডকাস্টিং এজেন্সিকে উদ্ধৃত করে পার্সটুডে জানিয়েছে, ইসলামী বিপ্লবের সর্বোচ্চ নেতা মহামান্য আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ মুজতবা খামেনেয়িকে পাঠানো বার্তায় ইরানের সংসদ স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কলিবফ বলেছেন, আমরা আপনার জ্ঞানগর্ভ ও প্রজ্ঞাপূর্ণ বার্তার জন্য কৃতজ্ঞ। এই বার্তাটি ছিল একটি পথনির্দেশিকা, যা আগের চেয়েও সুস্পষ্ট করে দিয়েছে যে, এই সমঝোতা স্মারকটি চূড়ান্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে আমরা সেই কঠিন ও আঁকাবাঁকা পথের সূচনা করেছি, যে পথে বিশ্বাসঘাতক শত্রুর কাছ থেকে আমাদের অবশ্যই ইরানি জনগণের অধিকার ও প্রতিরোধকে পুনরুদ্ধার করতে হবে।

আমরা মহামান্যের এই আদেশগুলোকে আমাদের লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করছি এবং অপর পক্ষকে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ ও বলপ্রয়োগের মাধ্যমে ইরানি জনগণ ও প্রতিরোধ ফ্রন্টের অধিকার লঙ্ঘিত হতে দেব না। হুসাইনি মাযহাবের শিক্ষা এবং আমাদের শহীদ ইমামের জীবনের উপর ভিত্তি করে আমি বিশ্বাস করি যে, একক খোদার ফ্রন্ট কখনোই একটি ভুয়া ফ্রন্টের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করতে পারে না এবং ভুয়া ফ্রন্টের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো আমাদের সকলের কর্তব্য, আর এই পথে আমরা আলোচনাকে প্রতিরোধের সংগ্রামের অন্যতম ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করি।

এই সমঝোতা স্মারক বাস্তবায়নের জন্য আমাদের নিশ্চয়তা এর ধারাগুলো নয়, বরং আমাদের জীবন, যা আমরা উৎসর্গ করেছি এবং ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের সেই শক্তি, যার আঘাত ও দৃঢ় সংকল্প সাম্প্রতিক যুদ্ধে আমেরিকান-জায়নবাদী শত্রু সচক্ষে উপলব্ধি করেছে।

হরমুজ প্রণালী সচল হওয়ায় বিশ্ববাজারে কমল তেলের দাম : যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ অবসানে শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরের পর কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি পুনরায় সচল হয়েছে। আর তাতে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ বাড়ার বড় সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় তেলের দাম নেমে এসেছে ৮০ ডলারের নিচে। বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, বিশ্ব বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৪৩ সেন্ট বা ০.৫৪ শতাংশ কমে প্রতি ব্যারেল ৭৯.৪২ ডলারে নেমে এসেছে।

অন্যদিকে মার্কিন ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) ক্রুডের দাম ১৭ সেন্ট বা ০.২২ শতাংশ কমে প্রতি ব্যারেল ৭৬.৪৩ ডলারে দাঁড়িয়েছে।

এছাড়া বাজারে বেশি বেচাকেনা হওয়া আগস্টের ভবিষ্যৎ সরবরাহ চুক্তির তেলের দাম ৩০ সেন্ট কমে প্রতি ব্যারেল ৭৫.৫৫ ডলারে বিক্রি হচ্ছে। গত বৃহস্পতিবার শন্তি চুক্তির খবরে দুই ধরনের তেলের দামই গত মার্চের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে যায়। দুই দেশের প্রেসিডেন্ট ঐতিহাসিক ওই চুক্তিতে সই করার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তিনটি সৌদি ট্যাংকারসহ বেশ কয়েকটি জাহাজ হরমুজ প্রণালি পার হয়। এসব ট্যাংকারে প্রায় ৬০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ছিল। বাজার বিশ্লেষকদের ধারণা, এই চুক্তির ফলে মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় অঞ্চলে আটকে থাকা ৮ কোটি ৫০ লাখ ব্যারেলের বেশি অপরিশোধিত তেল বিশ্ববাজারে চলে আসবে। চুক্তি অনুযায়ী ইরানি তেলের ওপর থেকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হলে বাজারে তেলের সরবরাহ আরো বাড়বে।

বাজার গবেষণা সংস্থা কেসিএমণ্ডএর প্রধান বাজার বিশ্লেষক টিম ওয়াটারার বলেন, “বাজারে তেলের দাম পরবর্তী দফায় আরও কমানোর আগে ব্যবসায়ীরা দেখতে চান হরমুজ প্রণালী দিয়ে ট্যাংকার চলাচল আসলেই স্বাভাবিক হচ্ছে কি না। তারা এখন সেই সুনির্দিষ্ট প্রমাণের অপেক্ষায় আছেন।” যুদ্ধের আগে বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই হরমুজ প্রণালি দিয়েই সরবরাহ হত।

শান্তি চুক্তি স্থায়ী হলে আগামী কয়েক মাসের মধ্যে বাণিজ্য পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। বিশ্ববাজারে সরবরাহ বাড়াতে পশ্চিম এশিয়ার তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোও তাদের রপ্তানি পুনরায় শুরু করার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

কুয়েত পেট্রোলিয়াম করপোরেশন জানিয়েছে, যুদ্ধের কারণে জারি করা অনিবার্য পরিস্থিতির বিশেষ নোটিস তারা প্রত্যাহার করে নিয়েছে। অন্যদিকে ইরাকের জ্বালানিমন্ত্রী বাসিম মোহাম্মদ জানিয়েছেন, তাদের তেলক্ষেত্রগুলো উৎপাদন শুরু করতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত এবং সরবরাহ শিগগিরই আগের স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসবে।

বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমলেও এখনও কিছু ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি রয়ে গেছে। লেবাননে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান ও সংঘাত অব্যাহত থাকায় মার্কিন-ইরান চুক্তি কতদিন টিকবে, তা নিয়ে বড় প্রশ্ন রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতায় কাতারের ভূমিকার প্রশংসা ইরানি প্রেসিডেন্টের : ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরে কাতার যে ভূমিকা পালন করেছে, তার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানির সঙ্গে এক ফোনালাপে তিনি এই প্রশংসা করেন। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা এ খবর জানিয়েছে।

প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের কার্যালয় থেকে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, কাতার আলোচনার জন্য একটি অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেছিল। এই চুক্তিটি কাতার, পাকিস্তান এবং অন্যান্য ইসলামিক দেশগুলোর সমর্থনে সম্ভব হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

ফোনালাপে কাতারের আমির শেখ তামিমও এই সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরকে স্বাগত জানিয়েছেন।

একই সঙ্গে আঞ্চলিক উত্তেজনা হ্রাস এবং স্থিতিশীলতা বাড়াতে কূটনীতি ও সংলাপের গুরুত্বের ওপর বিশেষ জোর দেন তিনি।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত