
শুরুটা ভালো হয়নি ব্রাজিলের। তবে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ আছে যথেষ্টই। আজ হাইতির বিপক্ষে নিজেদের দ্বিতীয় ম্যাচে সেই ঘুরে দাঁড়ানোই দেখতে চান ব্রাজিল কোচ কার্লো আনচেলত্তি। সে লক্ষ্যে দলে কিছু পরিবর্তনও আসবে বলে জানিয়েছেন এই কোচ। মরক্কোর বিপক্ষে রাফিনিয়া, কাসেমিরোরা সেরাটা দিতে পারেননি। ম্যাচের পর এ নিয়ে কথাও হয়েছে অনেক। ব্রাজিলের শুরুর একাদশে তাদের জায়গা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন কেউ কেউ। আনচেলত্তি অবশ্য পরিবর্তনের কথা জানালেও কোন পজিশনের ক্ষেত্রে হবে, তা জানাননি। ফিলাডেলফিয়াতে ম্যাচণ্ডপূর্ববর্তী সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেছেন, ‘আমরা কিছু পরিবর্তন করব। খেলার মান আরও ভালো করতে চাই। আমরা আরও ভালো করতে পারি এবং সেটা করতেই হবে।’
ব্রাজিলের সংবাদমাধ্যম গ্লোবো তাদের এক প্রতিবেদনে লিখেছে, তাদের এক সাংবাদিককে হাসতে হাসতে আনচেলত্তি বলেছেন, চার-পাঁচটা পরিবর্তন আসছে। পরে আবার এটিকেই নাকি রসিকতা দাবি করেছেন আনচেলত্তি।
বিশ্বকাপে ব্রাজিল সর্বশেষ তাদের প্রথম ম্যাচে হেরেছিল ৯২ বছর আগে, ১৯৩৪ আসরে। দশকের পর দশক শুরুটা ভালো করা ব্রাজিল এবার প্রথম ম্যাচে মরক্কোর সঙ্গে ১-১ ড্র করেছে। খেলার ধরনের কারণে যেটিকে অনেকে হারের সমান বলেও মন্তব্য করেছেন। কেন মরক্কোর বিপক্ষে সেরাটা দিতে পারল না ব্রাজিল?
আনচেলত্তির উত্তর, ‘প্রথমার্ধে আমাদের পারফরম্যান্স অপ্রত্যাশিত ছিল। হতে পারে ব্রাজিলের জার্সি গায়ে তোলার চাপ খেলোয়াড়দের মানসিকতায় কিছুটা প্রভাব ফেলেছিল। শুরুটা ভালো করা জরুরি, তবে এটাই শেষ কথা নয়। মরক্কোর বিপক্ষে যারা ভালো খেলতে পারেনি, তাদের আমি আরও সুযোগ দিতে চাই। সেদিন আমাদের কেউ নিজের সেরাটা দিতে পারেনি। তবে প্রথম ম্যাচগুলো দিয়ে বিশ্বকাপের ভাগ্য নির্ধারিত হয় না।’ দলের নির্দিষ্ট কোনো কৌশল বা ট্যাকটিক্যাল আইডেন্টিটি নেই- সমর্থকদের এমন উদ্বেগের জবাবও দিয়েছেন আনচেলত্তি। তার মতে, পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়াটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তিনি সাফ জানিয়ে দেন, ‘আমি দলের কোনো একক পরিচয় চাই না। আমি চাই, আমার দল সব পরিস্থিতিতে সব ধরনের ফুটবল খেলতে পারুক।’ ‘সি’ গ্রুপের ব্রাজিল-হাইতি ম্যাচটি শুরু হবে আজ বাংলাদেশ সময় সকাল সাড়ে ছয়টায়।
হাইতির বিপক্ষে নেইমারকে ছাড়াই খেলবে ব্রাজিল : ২০২৬ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের জার্সিতে নেইমারকে দেখার অপেক্ষা আরও দীর্ঘ হলো। ইনজুরি থেকে সেরে উঠলেও হাইতির বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের ম্যাচে তিনি খেলছেন না। ব্রাজিল ফুটবল কনফেডারেশন (সিবিএফ) জানিয়েছে, পুনর্বাসনের শেষ ধাপ সম্পন্ন করতে নেইমার দলের সঙ্গে ফিলাডেলফিয়া সফরে যাচ্ছেন না। তিনি নিউ জার্সিতেই থেকে ব্যক্তিগতভাবে ফিটনেস ট্রেনিং চালিয়ে যাবেন। গত ১৭ মে সান্তোসে খেলতে গিয়ে ডান পায়ের কাফ ইনজুরিতে পড়েন ৩৪ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ড।
এরপর থেকেই তিনি মাঠের বাইরে। ব্রাজিলের মেডিকেল টিম তাকে ঝুঁকিতে ফেলতে চায় না, তাই হাইতির পাশাপাশি স্কটল্যান্ডের বিপক্ষেও তার খেলা অনেকটা অনিশ্চিত। এর আগে ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে জাতীয় দলের বাইরে আছেন নেইমার। নকআউট পর্বে পুরোপুরি ফিট নেইমারকে পাওয়াই এখন ব্রাজিলের মূল লক্ষ্য। ২০২৬ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের শুরুটা হয়েছে ড্র দিয়ে, এখন নজর হাইতির বিপক্ষে ম্যাচে।
প্রতিপক্ষ নয়, হাইতির কাছে ব্রাজিল এক ভালোবাসার নাম : টানা দুটি দিন কোনো অস্ত্রের গর্জন শোনা যায়নি। বাতাসে ভাসেনি বারুদের গন্ধ। সংঘাত-জর্জর হাইতিতে ২০০৪ সালের সেই প্রদর্শনী ম্যাচটি যেন কোনো ফুটবল ম্যাচ ছিল না, ছিল এক অলৌকিক জাদুকাঠি। তখনকার বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল দলটাকে অতিথি হিসেবে পেয়ে হাইতির রাজধানী পর্তোপ্রিন্স হয়ে উঠেছিল যেন এক উৎসবের নগরী। হাইতির প্রবীণ সাংবাদিক পিয়ের রিচার্ড মিদি সেদিনের কথা মনে করে এখনও রোমাঞ্চ অনুভব করেন। তার বিদেশি বন্ধুরা নাকি অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘ব্রাজিলিয়ানরা সত্যিই হাইতিতে খেলছে তো? দেখে তো মনে হচ্ছে তারা নিজেদের ঘরেই খেলছে!’ দৃশ্যটা আসলেই তেমন ছিল। রাস্তার দুই পাশে হলুদণ্ডসবুজ জার্সি পরা, মুখে রং মাখা হাজারো মানুষের ভিড়। রোনালদো, রোনালদিনিও কিংবা রবার্তো কার্লোসদের একঝলক দেখতে মানুষ গাছে পর্যন্ত চড়ে বসেছিল।
১৯৭৪ সালের পর থেকে এবারের আগপর্যন্ত হাইতি আর কখনও বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ পায়নি। তাই চার দশক ধরে বিশ্বমঞ্চে সাম্বার দেশটাই হয়ে উঠেছিল তাদের নিজেদের দল।
গত দুই-তিন দশকে শান্তিরক্ষা, মানবিক সাহায্য ও অভিবাসনে ব্রাজিলের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা এই ভালোবাসাকে আরও প্রগাঢ় করেছে। সেই ম্যাচটা হাইতি ৬-০ গোলে হেরেছিল; কিন্তু ক্যারিবীয় দ্বীপরাষ্ট্রটিতে জাতিসংঘের উদ্যোগে আয়োজিত সেই প্রীতি ম্যাচ তো শুধু স্কোরের ছিল না। গ্যাংওয়ারে ক্ষতবিক্ষত একটা দেশের জন্য ওটা ছিল শান্তির নিঃশ্বাস। মিদির ভাষায়, ‘সবাই দুই দিনের জন্য অস্ত্র নামিয়ে যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয়েছিল।’ এবার হাইতিয়ানদের সামনে এসেছে নিজেদের দলকে বিশ্বকাপে সমর্থন করার এক বিরল সুযোগ এবং কাকতালীয়ভাবে, গ্রুপ ‘সি’-তে তাদের সঙ্গী সেই ব্রাজিল! গ্রুপের প্রথম ম্যাচে স্কটল্যান্ডের কাছে হাইতি হেরেছে ১-০ গোলে। কিন্তু বিদ্যুতের অভাব আর তীব্র আর্থিক সংকটে ভোগা দেশটির কাছে ফুটবল মানে শুধু স্কোরলাইন নয়, এক বুক আশা।
আজ বাংলাদেশ সময়ে সকাল সাড়ে ছয়টায় হাইতি নিজেদের দ্বিতীয় ম্যাচটা খেলবে তাদেরই প্রিয় দল ব্রাজিলের বিপক্ষে। সেলেসাওরা এই ম্যাচটাকে ‘টিকে থাকার লড়াই’ মনে করলেও করতে পারে, কিন্তু হাইতির কাছে এটা ভালোবাসার এক ম্যাচ। হাইতিয়ান এক ফুটবলপ্রেমী জোয়েল জঁ-ব্যাপটিস্ট যেমন বলেন, ‘ব্রাজিলকে আমাদের বন্ধু রাষ্ট্রের মতো মনে হয়, সংস্কৃতির দিক থেকেও আমাদের দারুণ মিল।
মাঠের দিকে তাকালে আমরা এমন সব মানুষকে দেখতে পাই, যাদের দেখতে ঠিক আমাদের মতোই লাগে। তারা যখন বিশ্বমঞ্চে দুর্দান্ত সব কীর্তি গড়ে, তখন মনে মনে ভাবি, ইশ, আমরাও যদি এমনটা করতে পারতাম!’ এই ম্যাচটি তাই শুধু দুই দলের ৯০ মিনিটের লড়াই নয়, এটা জোয়েলের মতো লাখো হাইতিয়ানের জন্য এক টুকরা শৈশবকে ছোঁয়া, যেখানে এক পাশে দাঁড়িয়ে নিজের মাতৃভূমি, আর অন্য পাশে আজন্ম লালিত প্রথম ভালোবাসা।
গ্যালারিতে জোয়েল যখন বসবেন, তখন একটা চোখ হয়তো খুঁজবে হাইতির লাল-নীল পতাকা, আর মনটা গুনগুন করবে সাম্বার চিরচেনা সুরে। ফুটবল ছাড়া আর কিসে এমন হৃদয়ের দোলাচল সম্ভব!