ঢাকা সোমবার, ২৪ আগস্ট ২০২৬, ৯ ভাদ্র ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

ঠিকাদারের গাফিলতি, কর্তৃপক্ষের দুর্বল নজরদারি

উন্নয়নের খোঁড়াখুঁড়িতে বেহাল সড়ক, ভোগান্তি নিত্যসঙ্গী

উন্নয়নের খোঁড়াখুঁড়িতে বেহাল সড়ক, ভোগান্তি নিত্যসঙ্গী

বছরের পর বছর ধরে চলা ঢিলেঢালা উন্নয়নকাজ আর সমন্বয়হীন খোঁড়াখুঁড়িতে রাজধানীর সড়ক ব্যবস্থা পরিণত হয়েছে এক স্থায়ী দুর্যোগে। সড়কের উন্নয়ন করতে গিয়ে উল্টো বেহাল হয়ে পড়ছে। এতে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত নগরবাসীর নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠছে ভোগান্তি। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের চরম গাফিলতি আর কর্তৃপক্ষের দুর্বল নজরদারির কারণেই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

সড়কগুলো ঘুরে দেখা গেছে, এমনিতেই মাইলের পর মাইল রাস্তা চলাচলের অনুপযোগী। তার ওপর সামান্য বৃষ্টি হলেই এই কঙ্কালসার সড়কগুলোর কাঠামোগত দুর্বলতা পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলছে। স্থানীয়রা বলছেন, প্রকৃতি এখানে খলনায়ক নয়; অপরিকল্পিত উন্নয়নের কদর্য রূপ প্রকাশ করছে মাত্র। ডেমরা-রামপুরা সড়কের ত্রিমোহনী ব্রিজ থেকে দক্ষিণ বনশ্রীর বাগানবাড়ি পর্যন্ত অংশের কাজ চলছে ৮-৯ মাস ধরে। নির্মাণকাজে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের চরম ধীরগতি এবং তদারকির অভাবে এই এক কিলোমিটার পথ পেরোতে এখন যাত্রীদের ২ থেকে ৩ ঘণ্টা সময় লাগছে। নষ্ট হচ্ছে কর্মঘণ্টা।

এই সড়কের মেন্দিপুর, আমুলিয়া, দূর্গাপুর, ধীৎপুর, রাজাখালী এবং দাশেরকান্দি এলাকা থেকে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ ভোর থেকে রাত পর্যন্ত যাতায়াত করে। তবে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী এবং অফিসগামীরা।

মেন্দিপুর থেকে এই সড়ক ধরেই আইডিয়াল স্কুল অ্যন্ড কলেজের বনশ্রী শাখায় পড়–য়াদের প্রতিদিন যাতায়াত করতে হয়। এদেরই একজন কাশফিয়া আহমেদ, পড়ে পঞ্চম শ্রেণিতে। সড়কের করুণ পরিণতির জন্য তার স্কুল কামাই নিত্যদিনের ঘটনা। তার ভাষ্য, স্কুলে যেতে বড়জোর আধ ঘণ্টা লাগার কথা। কিন্তু ভোর সাড়ে পাঁচটায় উঠেও সকাল পৌনে সাতটার মধ্যে স্কুলে পৌছানো যায় না। কী হবে এমন উন্নয়ন দিয়ে-ক্ষোভ ঝাড়ে সে!

একই এলাকার আরেকজন বনশ্রী আদর্শ বিদ্যানিকেতন স্কুলের ৭ম শ্রেণির ছাত্র সাদমান আহমেদ জানাল, তার ক্লাস শুরু বারটা বিশে। সকাল দশটায় রওনা দিয়েও ঠিক সময়ে স্কুলে পৌঁছাতে পারে না সে।

তাছাড়া এই সড়ক দিয়ে তেজগাঁও, রামপুরা কিংবা বাড্ডা গুলশান কিংবা মহাখালীগামী যাত্রীদেরও ঠিক সময়ে গন্তব্যে পৌঁছানো এখন চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিয়েছে। এদিকে, উত্তর বাড্ডার আলীর মোড় থেকে বেরাইদ আবদুল্লাহবাগ মোড় পর্যন্ত সড়কটির কোথাও খোঁড়াখুঁড়ি, কোথাও ড্রেনের ম্যানহোল উঁচু হয়ে আছে। ঠিকাদারের গাফিলতিতে কাজ ফেলে রাখায় হাঁটুসমান পানি আর কাদায় এটি এখন মৃত্যুফাঁদ। প্রতিনিয়ত উল্টে পড়ছে যানবাহন, ভাঙছে মানুষের হাড়গোড়।

গুলশান-বাড্ডা সংযোগ সড়কের দক্ষিণ পাশের বড় একটি অংশ ধসে পানিতে তলিয়ে গেছে। ব্যারিকেড দিয়ে যান চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে। এই ধসের কারণ সরাসরি প্রকৌশলগত ত্রুটি।

এছাড়া নারিন্দা মোড়ের ধোলাইখালে সড়কের মাঝখানে হঠাৎ দেবে গিয়ে বিশাল গর্তের সৃষ্টি হওয়ায় আশেপাশের অংশও ভেঙে পড়েছে। এতে চরম দুর্ভোগ সঙ্গী করেই যাতায়াত করছেন এলাকার লোকজন।

শুধু বড় ধস নয়, দিনের পর দিন পানি জমে থাকায় এবং খোঁড়াখুঁড়ির কারণে বাড্ডা, রামপুরা, মতিঝিল, মৌচাক, মালিবাগ, শান্তিনগর থেকে শুরু করে ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, মিরপুর ও পুরান ঢাকার বিস্তীর্ণ এলাকার সড়কেও পচন ধরেছে। এসব সড়কে নিচু অংশে পানি জমে থাকায় উপরের বিটুমিন (পিচ) আলগা হয়ে খোয়া বেরিয়ে গেছে। দুর্বল কাঠামোর ওপর ভারী যানবাহন চলায় তৈরি হয়েছে অসংখ্য ছোট-বড় গর্ত।

সড়ক ধসে পড়া বা পিচ উঠে যাওয়ার পেছনে শুধু বৃষ্টিকে দায়ী করার সুযোগ নেই। যোগাযোগ ও পরিবহন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান এর পেছনের মূল কারণগুলো চিহ্নিত করেছেন।

তার মতে, ঢাকার অনেক এলাকায় নিচুভূমি ভরাট করে জনবসতি ও সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে। কাদামাটি দিয়ে ভরাট করা এসব জায়গায় মাটির প্রকৌশলগত সক্ষমতা কম। ফলে দীর্ঘসময় জলাবদ্ধতা থাকলে নিচের সাবগ্রেড বা ভিত্তি মাটি দুর্বল হয়ে সড়ক ধসে পড়ে।

পিচের (বিটুমিন) সবচেয়ে বড় শত্রু পানি। দীর্ঘসময় পানির সংস্পর্শে থাকলে বিটুমিন আর পাথরকে ধরে রাখতে পারে না। ফলে পাথর খুলে সড়ক ভেঙে যায়। আদর্শভাবে এলাকার ড্রেন স্থানীয় খালের সঙ্গে এবং খাল নদীর সঙ্গে যুক্ত থাকার কথা। কিন্তু অপরিকল্পিত নগরায়ণে সেই নেটওয়ার্ক ধ্বংস হয়ে গেছে। শুধু পাইপ বড় করে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।

নগরবাসীর এত বড় বিপর্যয়ের পরও কর্তৃপক্ষের কণ্ঠে সেই পুরোনো আমলাতান্ত্রিক সুর। ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান পুরো দায় চাপিয়েছেন ‘সঠিক পরিকল্পনার অভাব’-এর ওপর। সাঁতারকুল এলাকার ঠিকাদারদের তলব করা এবং গুলশান লেকের ওপর পাইপের বদলে সেতু নির্মাণের প্রস্তাব দেওয়ার কথা বললেও, দ্রুত সমাধানের কোনো রূপরেখা তিনি দিতে পারেননি।

অন্যদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জহিরুল ইসলাম জলাবদ্ধতা নিরসনে পৃথক প্রকল্পের কথা বললেও, পরিকল্পনা কমিশনের ধীরগতি ও সমন্বিত উন্নয়ন প্রকল্পের (ডিপিপি) দীর্ঘসূত্রতার অজুহাত দেখিয়েছেন। পাশাপাশি ড্রেনে পলিথিন জমার দায় চাপিয়েছেন জনগণের ওপরই।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত