ঢাকা মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট ২০২৬, ১০ ভাদ্র ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

নুসরাত হত্যা মামলা

হাইকোর্টে ২ জনের ফাঁসি বহাল ৪ জনের যাবজ্জীবন, খালাস ১০

* ‘ঢালাও’ ফাঁসি দেওয়া বিচারকের বিচারিক ক্ষমতা কেড়ে নিলেন হাইকোর্ট * নুসরাত হত্যা রহস্য থেকেই গেল, আপিলে উন্মোচন হবে : শিশির মনির
হাইকোর্টে ২ জনের ফাঁসি বহাল ৪ জনের যাবজ্জীবন, খালাস ১০

সাত বছর আগে ফেনীর সোনাগাজীতে আগুনে পুড়িয়ে মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ১৬ জনের মধ্যে দুজনের সাজা বহাল রেখেছে হাইকোর্ট। এছাড়া চারজনকে যাবজ্জীবন এবং বাকি ১০ জনকে খালাস দেওয়া হয়েছে। ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন), আপিল ও জেল আপিলের শুনানি শেষে সোমবার বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় দেয়। নুসরাতের মাদ্রাসার তৎকালীন অধ্যক্ষ এস এম সিরাজ-উদ-দৌলা ও তার সহযোগী শাহাদাত হোসেন শামীমের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হয়েছে। যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন- নূর উদ্দিন, সাইফুর রহমান মোহাম্মদ জোবায়ের, উম্মে সুলতানা ওরফে পপি ও জাবেদ হোসেন ওরফে সাখাওয়াত হোসেন। খালাস প্রাপ্তরা হলেন- সোনাগাজীর সাবেক পৌর কাউন্সিলর মাকসুদ আলম, হাফেজ আব্দুল কাদের, আবছার উদ্দিন, কামরুন নাহার মনি, আব্দুর রহিম শরীফ, ইফতেখার উদ্দিন রানা, ইমরান হোসেন ওরফে মামুন, মোহাম্মদ শামীম, মাদ্রাসার গভর্নিং বডির তৎকালীন সহ-সভাপতি রুহুল আমীন ও মহিউদ্দিন শাকিল।

২০১৯ সালে সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসা থেকে আলিম পরীক্ষা দিচ্ছিলেন নুসরাত। এর আগে ওই মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ দৌলার বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ তুলেছিলেন তিনি। ওই ঘটনায় নুসরাতের মা মামলা করার পর সে বছরের ২৭ মার্চ পুলিশ গ্রেপ্তার করে অধ্যক্ষ সিরাজকে।

সিরাজ গ্রেপ্তার হওয়ার পর তার পক্ষে নামে স্থানীয় প্রভাবশালীরা। তার মুক্তি দাবিতে মানববন্ধনেও সক্রিয় ছিল মাদ্রাসার কিছু শিক্ষার্থী। মামলা তুলে নিতে ক্রমাগত হুমকিও দেওয়া হচ্ছিল বলে নুসরাতের পরিবারের অভিযোগ। এর মধ্যেই ৬ এপ্রিল পরীক্ষা শুরুর আগে পরীক্ষা কেন্দ্র সাইক্লোন শেল্টারের ছাদে নুসরাতকে কৌশলে ডেকে নিয়ে তার গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। অগ্নিদগ্ধ নুসরাতকে ঢাকায় এনে বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়েছিল; টানা পাঁচ দিন যন্ত্রণা সহ্য করে ১০ এপ্রিল মারা যান তিনি। নুসরাতের গায়ে আগুন দেওয়ার দুদিন পর তার ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান আটজনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত আরও কয়েকজনকে আসামি করে হত্যাচেষ্টার মামলা করেন। নুসরাতের মৃত্যুর পর এটি হত্যা মামলায় পরিণত নেয়।

নুসরাতকে যখন ঢাকা মেডিকেলে আনা হয়েছিল, তখনও তিনি বলছিলেন, তিনি প্রতিবাদ করে যাবেন। প্রতিবাদী এই তরুণীর জন্য প্রতিবাদে ফেটে পড়েছিল দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ। বিচারের দাবিতে কর্মসূচি পালিত হয় গোটা দেশজুড়ে। প্রথমে সোনাগাজী থানার পরিদর্শক কামাল হোসেন মামলাটি তদন্ত করলেও পুলিশের বিরুদ্ধে গাফিলতির অভিযোগ ওঠায় পরে তদন্তভার পায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। ওই বছরের ২৯ মে পিবিআইয়ের পরিদর্শক শাহ আলম ১৬ জনকে আসামি করে অভিযোগপত্র দেন। মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা শাহাদাত হোসেন শামীমের বিষয়ে অভিযোগপত্রে বলা হয়, নুসরাতকে প্রেমের প্রস্তাব দিয়ে প্রত্যাখ্যাত হওয়ায় ক্ষোভ ছিল শামীমের। নুসরাতকে মেরে ফেলতে কার কী ভূমিকা হবে, সেই পরিকল্পনা সাজান শামীম। কাউন্সিলর মাকসুদের কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা নিয়ে তিনি তার বোরখা ও কেরোসিন কেনার ব্যবস্থা করেন। নুসরাতের গায়ে আগুন দেওয়ার সময় বোরখা পরিহিত শামীম হাত দিয়ে নুসরাতের মুখ চেপে ধরেন। তার জবানবন্দির ভিত্তিতে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত বোরখা ও কেরোসিন ঢালতে ব্যবহৃত গ্লাসটি উদ্ধার করে পিবিআই। হত্যাকাণ্ডের সাত মাসের মাথায় ২০১৯ সালের ২৪ অক্টোবর ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মামুনুর রশীদ আলোচিত এ মামলায় ১৬ আসামির সবাইকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পাশাপাশি এক লাখ টাকা করে জরিমানা করেন।

২০১৯ সালের ২৯ অক্টোবর ডেথ রেফারেন্সের জন্য মামলার নথিপত্র হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় পৌঁছায়। চাঞ্চল্যকর মামলা হিসেবে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ডেথ রেফারেন্সের জন্য পেপারবুক তৈরি করা হয়। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরাও পৃথক আপিল ও জেল আপিল করেন।

অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মামলার ডেথ রেফারেন্স, আপিল ও বিবিধ বিষয় শুনানি ও নিষ্পত্তির জন্য গত ১০ জুন হাইকোর্টের এই বেঞ্চ গঠন করে দেন প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী।

১৪ জুন বেঞ্চের কার্যক্রম শুরু হয়। এ হত্যা মামলার শুনানি শুরু হয় ২৮ জুলাই। টানা ১৭ কার্যদিবস শুনানি শেষে বৃহস্পতিবার রায় দেওয়া হল। এদিকে যৌন হয়রানির ঘটনায় নুসরাতকে থানায় ডেকে জিজ্ঞাসাবাদের ভিডিও ধারণ করে তা প্রচারের ঘটনায় সোনাগাজী মডেল থানার সাবেক ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে ব্যারিস্টার ছায়েদুল হক সুমন আইসিটি আইনে একটি মামলা করেন। এই মামলায় ২০১৯ সালের ২৮ নভেম্বর আদালত ওসি মোয়াজ্জেমকে ৮ বছরের কারাদণ্ড ও ১০ লাখ টাকা জরিমানা করে।

‘ঢালাও’ ফাঁসি দেওয়া বিচারকের বিচারিক ক্ষমতা কেড়ে নিলেন হাইকোর্ট : ফেনীর বহুল আলোচিত মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত হত্যা মামলায় নির্বিচারে ফাঁসির রায় দেওয়ায় ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের ওই সময়ের বিচারক মামুনুর রশিদের বিচারিক ক্ষমতা কেড়ে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। রায়ে আদালত বলেছেন, বিচারিক আদালত এভাবে নির্বিচারে ফাঁসি দিতে গিয়ে যেভাবে প্রতিটা পরিবারের ওপর একটা ডিভাস্টেটিং ইফেক্ট (বিপর্যয়) নেমে এসেছে, এইজন্য তার বিচারিক ক্ষমতা কেড়ে নেওয়ার জন্য নির্দেশ দেওয়া হলো এবং তাকে আইন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করতে নির্দেশ দেওয়া হলো। গতকাল সোমবার বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার হাইকোর্ট বেঞ্চ নুসরাত হত্যা মামলার রায়ে এ আদেশ দেন। বহুল আলোচিত এই মামলায় আসামিদের ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন), আপিল ও জেল আপিলের ওপর শুনানি নিয়ে দুই আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছেন হাইকোর্ট। যাদের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হয়েছে তারা হলেন- সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসার তৎকালীন অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা এবং শাহাদাত হোসেন শামীম। এ ছাড়া ১০ আসামিকে খালাস ও চার আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন হাইকোর্ট।

আদালতে আসামিদের পক্ষে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনসুরুল হক চৌধুরী, অ্যাডভোকেট এস এম শাহজাহান, অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম, ব্যারিস্টার এস এম মাসুদ হোসেন দোলন, অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল, ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সৈয়দ ইজাজ কবির।

নুসরাত হত্যা রহস্য থেকেই গেল, আপিলে উন্মোচন হবে -শিশির মনির : ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদরাসার ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় ‘রহস্য’ এখনও রয়ে গেছে বলে মন্তব্য করেছেন আসামিপক্ষের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শিশির মনির। নুসরাতের মৃত্যুপূর্ব জবানবন্দির সঙ্গে আসামিদের সংখ্যার অমিল এবং ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ গায়েব করার বিষয়টি সামনে এনে তিনি এমন মন্তব্য করেন। গতকাল সোমবার হাইকোর্টে নুসরাত হত্যা মামলার ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের রায় ঘোষণার পর সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে তিনি এসব কথা বলেন। এদিন বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ বিচারিক আদালতে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া ১৬ আসামির মধ্যে দুইজনের সাজা বহাল রাখেন, চারজনের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন এবং ১০ জনকে খালাস প্রদান করেন।

আইনজীবী শিশির মনির বলেন, নুসরাত মৃত্যুর আগে দেওয়া জবানবন্দিতে বোরকা পরা চারজন নারীর কথা বলেছিলেন। কিন্তু সাজা দেওয়ার সময় দেখা গেল একজন নারী আর বাকি তিনজন পুরুষ। জবানবন্দির সেই চার নারী তিনজন পুরুষ হয়ে গেল কী করে? এটা বড় একটা রহস্য হয়ে রয়ে গেল। তিনি আরও প্রশ্ন তোলেন, সাইক্লোন সেন্টারের তিন তলার ছাদে নুসরাতের গায়ে আগুন লাগানো হলো, অথচ আশপাশের কেউ কিছু শুনল না, কেউ কোনো শব্দ পেল না— একা একাই কি আগুন লেগে গেল? এই অংশের রহস্যও উদ্ঘাটিত হয়নি। তদন্তের গাফিলতির অভিযোগ তুলে এই আইনজীবী বলেন, ঘটনাস্থলে সিসিটিভি ক্যামেরা ছিল। ছয় বছর আগেও সেখানে ক্যামেরা সচল ছিল। কিন্তু তদন্ত কর্মকর্তা বা প্রসিকিউশন সেই ফুটেজ সংগ্রহ করে আদালতে উপস্থাপন করেনি। যদি সিসিটিভি ফুটেজ পাওয়া যেত, তবে মামলার মূল ভিত্তি এবং আমাদের যুক্তি ভিন্ন হতে পারত। ফুটেজ থাকলে স্পষ্ট বোঝা যেত কে সেখানে গিয়েছিল আর কে যায়নি। শিশির মনির জানান, নুসরাতের মৃত্যুকালীন জবানবন্দির অডিও ও ভিডিও হাইকোর্টে উপস্থাপনের আবেদন জানিয়েছিলেন তারা। সেটি দেখলে নুসরাত আসলে কী বলেছিলেন তা পরিষ্কার হতো। তিনি বলেন, আমরা ন্যায়বিচারের আশায় উচ্চ আদালতে (আপিল বিভাগ) যাব। আশা করি, সেখানে এই রহস্যের উন্মোচন হবে।

বিচারকের ক্ষমতা কেড়ে নেওয়ার নির্দেশ : বিচারিক আদালতের রায়ের কঠোর সমালোচনা করে শিশির মনির বলেন, হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণে এসেছে যে, বিচারিক আদালত কোনো বাছবিচার না করে ‘নির্বিচারে’ ১৬ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিলেন। আদালত মন্তব্য করেছেন যে, এমন রায় সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলোর ওপর ‘বিধ্বংসী প্রভাব’ ফেলেছে। তিনি জানান, হাইকোর্ট ওই বিচারকের বিচারিক ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে তাকে আইন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করার নির্দেশ দিয়েছেন। হাইকোর্টের রায়ে সাবেক অধ্যক্ষ এস এম সিরাজ-উদ-দৌলা ও শাহাদাত হোসেন শামীমের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হয়েছে। যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে সাইফুর রহমান জুবায়ের, উম্মে সুলতানা পপি, নুর উদ্দীন ও সাখাওয়াত হোসেন জাবেদকে। খালাস পাওয়া ১০ জন হলেন- মাকসুদ আলম ওরফে মকসুদ কাউন্সিলর, হাফেজ আব্দুল কাদের, আবছার উদ্দিন, কামরুন নাহার মনি, আব্দুর রহিম শরীফ, ইফতেখার উদ্দিন রানা, ইমরান হোসেন ওরফে মামুন, রুহুল আমিন, মহিউদ্দিন শাকিল ও মোহাম্মদ শামীম। আইনজীবী শিশির মনির এই মামলায় কামরুন নাহার মনি, সাইফুর রহমান জুবায়ের ও মোহাম্মদ শামীমের আইনজীবী ছিলেন। এদের মধ্যে মনি ও শামীম খালাস পেলেও জুবায়েরকে যাবজ্জীবন দেওয়া হয়েছে। জুবায়েরের সাজার বিরুদ্ধে তারা আপিল করবেন বলে জানান তিনি।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত