
পুরান ঢাকাকে প্রথমবার সরাসরি মেট্রোরেল নেটওয়ার্কে আনার পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে সরকার| ৩৫ কিলোমিটার রুটে ২৪টি স্টেশন, সম্ভাব্য ব্যয় প্রায় ৬১ হাজার কোটি টাকা| তবে অর্থায়ন ও অনুমোদনের কয়েকটি ধাপ এখনও বাকি| ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থায় আরেকটি বড় পরিবর্তনের পরিকল্পনা করছে সরকার| গাবতলী থেকে পুরান ঢাকা হয়ে নারায়ণগঞ্জের তারাবো পর্যন্ত নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছে নতুন মেট্রোরেল লাইন| প্রস্তাবিত এই রুটটির নাম দেওয়া হয়েছে এমআরটি লাইন-২| প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পথে ২৪টি স্টেশন রাখার পরিকল্পনা রয়েছে| রুটের কিছু অংশ উড়ালপথে এবং কিছু অংশ পাতালপথে নির্মাণের কথা ভাবা হয়েছে| প্রকল্পটির সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৬০ হাজার ৮৩৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা|
এই প্রকল্পের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এর মাধ্যমে পুরান ঢাকা প্রথমবারের মতো সরাসরি মেট্রোরেল নেটওয়ার্কের সথে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পাবে| রাজধানীর অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ ও ব্যস্ত এই এলাকার সঙ্গে বর্তমানে দ্রুতগতির গণপরিবহনের সরাসরি সংযোগ নেই| অথচ চকবাজার, মিটফোর্ড, নয়াবাজার, ধোলাইখালসহ পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকা দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্র| প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ এসব এলাকায় যাতায়াত করেন| ফলে নতুন মেট্রো লাইনটি চালু হলে শুধু যাত্রী পরিবহনে গতি আসবে না, শহরের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশের সঙ্গে অন্য এলাকার যোগাযোগও বদলে যেতে পারে|
পরিকল্পনা অনুযায়ী, মেট্রোরেলটি গাবতলী থেকে শুরু হয়ে ঢাকা উদ্যান, বছিলা মোড়, মোহাম্মদপুর, জিগাতলা, সায়েন্স ল্যাব, নিউ মার্কেট, আজিমপুর, লালবাগ, চকবাজার, মিটফোর্ড, নয়াবাজার, ধোলাইখাল, দয়াগঞ্জ, কাপ্তানবাজার ও ডেমরা হয়ে নারায়ণগঞ্জের তারাবো পর্যন্ত যাবে| পাশাপাশি গুলিস্তান থেকে নয়াবাজার হয়ে সদরঘাট পর্যন্ত একটি শাখা লাইন করার প্রস্তাবও রয়েছে| এই শাখা লাইন বাস্তবায়িত হলে পুরান ঢাকার আরও বড় একটি অংশ মেট্রোরেল নেটওয়ার্কের আওতায় আসবে|
এমআরটি-২-কে বিচ্ছিন্ন একটি লাইন হিসেবে নয়, বরং ঢাকার সামগ্রিক মেট্রোরেল ব্যবস্থার সথে যুক্ত করে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে| গাবতলীতে এমআরটি-৫-এর সথে, কমলাপুরে এমআরটি-১, ৪ ও ৬-এর সথে এবং সাইনবোর্ড এলাকায় এমআরটি-৪-এর সথে সংযোগের পরিকল্পনা করা হয়েছে| ফলে ভবিষ্যতে একজন যাত্রী একটি মেট্রো লাইন থেকে অন্য লাইনে সহজে স্থানান্তর করতে পারবেন| এতে ঢাকার এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যাতায়াতের সময়ও কমতে পারে| তবে এই প্রকল্প এখনও নির্মাণ পর্যায়ে পৌঁছায়নি| সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় থেকে প্রস্তাবিত প্রকল্পের প্রাক-প্রকল্প উন্নয়ন প্রস্তাব বা পিডিপিপি পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে| কমিশনে এর বিভিন্ন দিক যাচাই-বাছাই চলছে| এরপর প্রকল্পটি বৈদেশিক অর্থায়নের নিশ্চয়তার জন্য অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগে পাঠানোর কথা রয়েছে| অর্থাৎ প্রকল্প অনুমোদন, অর্থায়ন নিশ্চিত করা, বিস্তারিত নকশা তৈরি এবং দরপত্র প্রক্রিয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি ধাপ এখনও বাকি|
অর্থায়নের ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংকের ওপর বড় ধরনের নির্ভরতার পরিকল্পনা করা হয়েছে| প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রায় ৫৩ হাজার কোটি টাকা ঋণ সহায়তা চাওয়া হয়েছে বিশ্বব্যাংকের কাছে| এ ছাড়া এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক বা এআইআইবির সথেও অর্থায়ন নিয়ে আলোচনা চলছে| এর আগে বিশ্বব্যাংক এমআরটি-২-এর সম্ভাব্যতা যাচাই ও নকশা প্রস্তুতের জন্য কারিগরি সহায়তার উদ্যোগ নিয়েছিল| তবে চূড়ান্ত ঋণচুক্তি এখনো হয়নি| ফলে প্রকল্পের পুরো অর্থায়ন নিশ্চিত হয়েছে- এমনটি এখনো বলা যাচ্ছে না|
এমআরটি-২-এর পরিকল্পনা অবশ্য একবারে বর্তমান রূপ পায়নি| বিভিন্ন সময়ে এর রুট পরিবর্তন করা হয়েছে| কখনও গাবতলী থেকে চট্টগ্রাম রোড পর্যন্ত রুটের কথা এসেছে, আবার পরে ডেমরা ও নারায়ণগঞ্জকে যুক্ত করার পরিকল্পনা করা হয়েছে| রুটের দৈর্ঘ্য ও স্টেশনের সংখ্যাতেও বিভিন্ন পর্যায়ে পার্থক্য দেখা গেছে| সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো বলছে, সম্ভাব্যতা যাচাই শেষ হওয়ার পরই চূড়ান্ত এলাইনমেন্ট, স্টেশনের অবস্থান এবং উড়াল ও পাতাল অংশের পরিমাণ নির্ধারণ করা হবে|
সরকারের লক্ষ্য, চলতি বছরের শেষ দিকে অথবা ২০২৭ সালের শুরুতে প্রকল্পের কাজ শুরু করা এবং ২০৩০ সালের মধ্যে ট্রেন চালু করা| তবে বর্তমান অবস্থায় এই সময়সূচি কতটা বাস্তবসম্মত, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকছেই| কারণ সম্ভাব্যতা যাচাই, প্রকল্প অনুমোদন, ঋণচুক্তি, বিস্তারিত নকশা, জমি ও অবকাঠামোসংক্রান্ত প্রস্তুতি এবং নির্মাণ- সব মিলিয়ে বড় একটি প্রকল্প বাস্তবায়নে যথেষ্ট সময় প্রয়োজন|
বিশেষ করে পুরান ঢাকার অংশটি হবে সবচেয়ে কঠিন| এখানে জনবসতি ঘন, রাস্তা সরু এবং বহু পুরোনো ভবন ও বাণিজ্যিক স্থাপনা রয়েছে| কোথায় স্টেশন হবে, উড়ালপথ নাকি পাতালপথ হবে, নির্মাণকাজের সময় ব্যবসা ও যান চলাচলে কী ধরনের প্রভাব পড়বে- এসব বিষয় অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে ঠিক করতে হবে| শুধু রেললাইন তৈরি করলেই পুরান ঢাকার পরিবহন সমস্যা সমাধান হবে না| স্টেশন থেকে মানুষের চলাচলের জন্য হাঁটার পথ, বাস ও অন্যান্য গণপরিবহনের সথে সমন্বয়ও নিশ্চিত করতে হবে|
নারায়ণগঞ্জকে এই রুটে যুক্ত করার কারণে প্রকল্পটির গুরুত্ব আরও বাড়ছে| ভবিষ্যতে এই রুট নারায়ণগঞ্জ থেকে মুন্সিগঞ্জ পর্যন্ত সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও রয়েছে| ফলে এটি একসময় ঢাকা ও আশপাশের শিল্পাঞ্চলের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ গণপরিবহন করিডরে পরিণত হতে পারে|
সব মিলিয়ে এমআরটি-২ ঢাকার মেট্রোরেল ব্যবস্থার আরেকটি নতুন সংযোজনের চেয়ে বেশি কিছু হতে পারে| এর মাধ্যমে গাবতলী, মোহাম্মদপুর, পুরান ঢাকা, ডেমরা ও নারায়ণগঞ্জকে একই রুটে যুক্ত করার সুযোগ তৈরি হবে| কিন্তু ৬০ হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয়ের এই প্রকল্পের সাফল্য নির্ভর করবে শুধু রেললাইন নির্মাণের ওপর নয়; অর্থায়ন, পরিকল্পনা, বাস্তবায়নের গতি এবং পুরান ঢাকার মতো জটিল এলাকায় সঠিক নকশা ও ব্যবস্থাপনার ওপরও|
ঢাকায় আরও দুই রুটে মেট্রোরেল, ব্যয় দুই লাখ কোটি টাকার বেশি : ঢাকার দুটি পথে মেট্রোরেল নির্মাণে ব্যয় বাড়ছে দ্বিগুণের বেশি| শুরুতে প্রকল্প দুটির ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছিল ৯৩ হাজার ৮০০ কোটি টাকা| এখন ২ লাখ ১৩ হাজার ৯৮৫ কোটি টাকার নতুন প্রস্তাব তৈরি করা হয়েছে| বাড়তি ব্যয়ের এই প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনের অনুমোদনের অপেক্ষায়| এর একটি হলো- কমলাপুর থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত পাতালপথে মেট্রোরেল নির্মাণ| প্রকল্পটির (এমআরটি লাইন-১) কাজ চলমান| এর একটি অংশ উড়ালপথে নর্দ্দা থেকে পূর্বাচলে যাবে, অর্থাৎ এটি পাতাল ও উড়াল সমন্বয়ে নির্মাণ করা হবে| অন্যদিকে সাভার থেকে গাবতলী, মিরপুর, গুলশান হয়ে ভাটারা পর্যন্ত মেট্রোরেল নির্মাণ প্রকল্পটি হচ্ছে এমআরটি লাইন-৫ (উত্তর)| এটিও পাতাল ও উড়ালপথের সমন্বয়ে নির্মিত হবে|
ঢাকায় মেট্রোরেল নির্মাণ ও পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে ঢাকা মাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল)| সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের এ সংস্থার সূত্র বলছে, বিস্তারিত নকশায় পরিবর্তন, নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন, প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব এবং বিভিন্ন কারিগরি পরিবর্তনের কারণে দুটি প্রকল্পের ব্যয় বাড়ছে|
মেট্রোরেলের লাইন-১ ও লাইন-৫ (উত্তর) প্রকল্প নেওয়া হয় ২০১৯ সালে| ডিপো উন্নয়নের কাজ শেষ পর্যায়ে| ঠিকাদার নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে| এর মধ্যে ব্যয় বাড়ানোর জন্য প্রকল্প প্রস্তাব সংশোধন (আরডিপিপি) করে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছে ডিএমটিসিএল| আজ পরিকল্পনা কমিশনে দুটি প্রকল্পের ওপর মূল্যায়ন বৈঠক হওয়ার কথা| বাড়তি ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়ে আলোচনার পর আরডিপিপি অনুমোদন দেওয়া হবে|
মেট্রোরেলের প্রকল্প দুটি বাস্তবায়নে অর্থায়ন করছে জাপানের আন্তর্জাতিক সহায়তা সংস্থা জাইকা| বাড়তি ব্যয়ের বিষয়টি অন্তরর্বতী সরকারের আমলেই সামনে আসে| ব্যয় কমানোর তাগিদ দিয়ে অন্তরর্বতী সরকার আর এগোয়নি| এরপর অন্তরর্বতী সরকার ও বর্তমান বিএনপি সরকারের আমলে জাইকার সথে বেশ কয়েকবার আলোচনা হয়েছে| গত ২৪ মে বিএনপি সরকার প্রকল্পের ব্যয় কমানোর বিষয়ে পরামর্শ দিতে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের সাবেক অধ্যাপক শামীম জেড বসুনিয়ার নেতৃত্বে সাত সদস্যের একটি কারিগরি কমিটি গঠন করে| গত জুলাইয়ে কমিটি তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়|
সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, কারিগরি কমিটি মূল প্রকল্প প্রস্তাবের তুলনায় দ্বিগুণ ব্যয়ের বিষয়টি যৌক্তিক বলে প্রতিবেদন দিয়েছে| এরপরই ডিএমটিসিএল কর্তৃপক্ষ বাড়তি ব্যয়ের প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছে|
বাড়তি ব্যয়ের বিষয়টি যৌক্তিক বলে দাবি করেন শামীম জেড বসুনিয়া| তিনি বলেন, প্রতিবছর মূল্যস্ফীতি ৫ শতাংশ, ডলারের মূল্য বেড়েছে ৩৮ শতাংশ, নকশায় পরিবর্তনের কারণে কাজ বেড়েছে| এর বাইরে সরকারের ভ্যাট ও কর বেড়েছে| ঢাকার জন্য মেট্রোরেল দরকার| ব্যয় বেশি মনে হলে সরকার অন্য ঋণদাতা খুঁজতে পারে| তবে সময় যত যাবে, ব্যয় বাড়বে|
মেট্রোরেলের প্রকল্প দুটি বাস্তবায়নে অর্থায়ন করছে জাপানের আন্তর্জাতিক সহায়তা সংস্থা জাইকা| বাড়তি ব্যয়ের বিষয়টি অন্তরর্বতী সরকারের আমলেই সামনে আসে| ব্যয় কমানোর তাগিদ দিয়ে অন্তরর্বতী সরকার আর এগোয়নি| এরপর অন্তরর্বতী সরকার ও বর্তমান বিএনপি সরকারের আমলে জাইকার সঙ্গে বেশ কয়েকবার আলোচনা হয়েছে|
উত্তরা-মতিঝিল পথে মেট্রোরেল চলাচল করছে| এর সম্প্রসারিত অংশ যাবে কমলাপুর পর্যন্ত| এই অংশের কাজ চলছে| এ পুরো পথে ব্যয় হচ্ছে ৩৩ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা, অর্থাৎ প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় ১ হাজার ৫৮৪ কোটি টাকা| প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছিল ২০১২ সালে|
অন্তরর্বতী সরকারের আমলে ডিএমটিসিএলের পক্ষ থেকে এশিয়ার বিভিন্ন দেশে বাস্তবায়নাধীন মেট্রোরেল প্রকল্পের ব্যয় বিশ্লেষণ করা হয়| তাতে দেখা যায়, জমি অধিগ্রহণ ও বেতন-ভাতা বাদ দিয়ে প্রতি কিলোমিটার মেট্রোরেল নির্মাণে ভারতে ব্যয় হয়েছে ১৫০ থেকে ৪৫০ কোটি টাকা| ভারতও বিদেশি ঋণে প্রকল্প বাস্তবায়ন করে; কিন্তু ঋণে এমন কোনো শর্ত তারা মানে না, যা ঠিকাদার নিয়োগের প্রতিযোগিতা ক্ষুণ্ন করে|
দরপত্রে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা না আনতে পারলে ব্যয় কমবে না| সরকার যদি ঋণদাতা সংস্থাকে বুঝিয়ে শর্ত শিথিল করতে পারে, তাহলে ব্যয় এমনিতেই কমে যাবে| এটি পানির মতো পরিষ্কার| টাকার অবমূল্যায়ন, নকশায় পরিবর্তন, পণ্যের মূল্যবৃদ্ধিসহ অন্যান্য বিষয়ের জন্য যৌক্তিক হারে ব্যয় বাড়তে পারে| আকাশচুম্বী হওয়ার সুযোগ নেই|
বুয়েট পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক সামছুল হক
লাইন-১ ও লাইন-৫ (উত্তর) প্রকল্প দুটিতে দ্বিগুণের বেশি ব্যয় বাড়ানোর প্রস্তাবে বলা হয়েছে, ২০১৯ সালে প্রথম ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছিল| তখন বিস্তারিত নকশা হয়নি| পরে বিস্তারিত নকশা করার সময় অনেক পরিবর্তন এসেছে| এ ছাড়া মূল্যস্ফীতির পাশাপাশি নির্মাণসামগ্রীর দাম বেড়েছে| সিমেন্ট, ইস্পাত, জ্বালানি, বিটুমিন, যন্ত্রপাতি ও পরিবহন ব্যয়ের ওপর প্রভাব পড়েছে| এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে টাকার অবমূল্যায়ন| ২০১৯ সালে এক ডলারের বিপরীতে প্রায় ৮৪ টাকা ৫০ পয়সা ধরা হয়েছিল| ২০২৫ সালের হিসাবে তা প্রায় ১২২ টাকা ধরা হয়েছে, অর্থাৎ বিদেশ থেকে কেনা যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য সামগ্রীর টাকায় দাম অনেক বেড়েছে| এ ছাড়া কর, ভ্যাট, ভূমি অধিগ্রহণ, সেবা সংস্থার লাইন স্থানান্তর, পরামর্শক ব্যয়, নির্মাণকালীন সুদ ও বিভিন্ন ধরনের আপৎকালীন ব্যয় যুক্ত করে নতুন ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছে|
সড়ক, রেল ও নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, মেট্রোরেল দরকার| নতুবা ঢাকা বাঁচানো যাবে না| বাড়তি ব্যয়ের বিষয়ে তিনি বলেন, প্রথমে যে ব্যয় ধরা হয়েছিল, তখন পূর্ণাঙ্গ নকশা হয়নি| আর পূর্ণাঙ্গ নকশা বিএনপি সরকারের আগেই হয়েছে| পূর্ণাঙ্গ নকশা আগে না হলে কিছু খরচে কাটছাঁট করা যেত| এখন বাড়তি ব্যয়ে মেট্রোরেল না করলে ভবিষ্যতে আরও বাড়বে|
প্রতিযোগিতার অভাবে ব্যয় বৃদ্ধি : ২০১৯ সালে এমআরটি লাইন-১ প্রকল্পের জন্য ব্যয় ধরা হয়েছিল ৫২ হাজার ৫৬১ কোটি টাকা| পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো সংশোধিত প্রকল্প প্রস্তাবে ব্যয় ধরা হয়েছে ১ লাখ ২০ হাজার ৭৯৪ কোটি টাকা, অর্থাৎ মূল অনুমোদিত ব্যয়ের তুলনায় প্রস্তাবিত ব্যয় বাড়ছে প্রায় ৬৮ হাজার কোটি টাকা| টাকার অঙ্কে এটি রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পর সবচেয়ে ব্যয়বহুল প্রকল্প হতে যাচ্ছে|
লাইন-১ এর অধীন উড়াল ও পাতাল পথে ৩১ কিলোমিটারের বেশি মেট্রোরেল পথ ও ২১টি স্টেশন নির্মাণ করা হবে| বাড়তি ব্যয় অনুমোদন পেলে এই প্রকল্পে প্রতি কিলোমিটার মেট্রোরেলের পেছনে ব্যয় দাঁড়াবে ৩ হাজার ৮৬৬ কোটি টাকা|
লাইন-৫ (উত্তর) প্রকল্পের মূল ব্যয় ছিল ৪১ হাজার ২৩৯ কোটি টাকা| উড়াল ও পাতালপথের সমন্বয়ে এ পথের দূরত্ব ২০ কিলোমিটার| স্টেশন হবে ১৪টি| পরিকল্পনা কমিশনে সংশোধিত প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে প্রায় ৯৩ হাজার ১৯১ কোটি টাকার| এতে মূল ব্যয়ের তুলনায় বাড়ছে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা| অনুমোদন পেলে প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় দাঁড়াবে প্রায় ৪ হাজার ৬৬০ কোটি টাকা|
সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, মেট্রোরেলের ব্যয় বেশি হওয়ার কারণ ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান জাইকার বিভিন্ন শর্ত এবং কম প্রতিযোগিতা| দরপত্রে ঠিকাদার হিসেবে জাপানি কোম্পানিগুলো অংশগ্রহণ করে| তারা চড়া দাম হাঁকায়, যেখানে দর-কষাকষির সুযোগ কম থাকে| এর বাইরে দরপত্র দলিলে কাজের এমন পদ্ধতি ও প্রযুক্তির কথা অন্তর্ভুক্ত করা হয়, যা জাপানি প্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্যদের পূরণ করা প্রায় অসম্ভব| এ জন্য দরপত্রে সেভাবে প্রতিযোগিতা হচ্ছে না| লাফিয়ে ব্যয় বাড়ছে|
জানতে চাইলে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক সামছুল হক বলেন, দরপত্রে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা না আনতে পারলে ব্যয় কমবে না| সরকার যদি ঋণদাতা সংস্থাকে বুঝিয়ে শর্ত শিথিল করতে পারে, তাহলে ব্যয় এমনিতেই কমে যাবে| এটি পানির মতো পরিষ্কার| টাকার অবমূল্যায়ন, নকশায় পরিবর্তন, পণ্যের মূল্যবৃদ্ধিসহ অন্যান্য বিষয়ের জন্য যৌক্তিক হারে ব্যয় বাড়তে পারে| আকাশচুম্বী হওয়ার সুযোগ নেই|