
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আমেজ কাটতে না কাটতেই রাজধানীতে শুরু হয়েছে স্থানীয় সরকার নির্বাচন ঘিরে নতুন রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ। নির্বাচন কমিশন এখনও ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের ভোটের সুনির্দিষ্ট সময়সূচি ঘোষণা করেনি। তবে সম্ভাব্য প্রার্থীদের তৎপরতা, পোস্টার-ব্যানার এবং দলীয় নেতাকর্মীদের মাঠপর্যায়ের প্রস্তুতিতে এরই মধ্যে সরব হয়ে উঠেছে দুই সিটির রাজনীতি। ক্ষমতাসীন বিএনপির জন্য ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন শুধু স্থানীয় সরকার নির্বাচন নয়, বরং জাতীয় রাজনীতির ধারাবাহিকতায় গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পরীক্ষা হিসেবেও দেখা হচ্ছে। ফলে দলীয় ভোটের পাশাপাশি সাধারণ ভোটারদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা, ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা, নিজস্ব ভোটব্যাংক, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং নগর পরিচালনার অভিজ্ঞতা— সবকিছুর সমন্বয় ঘটিয়েই প্রার্থী বাছাই করতে চায় দলটি।
দলীয় সূত্র ও মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দুই সিটিতেই একাধিক হেভিওয়েট নেতা সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন। উত্তরে সাবেক প্রার্থী তাবিথ আউয়াল, বর্তমান প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান (মিল্টন) ও বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা এম এ কাইয়ুম আলোচনায় রয়েছেন। দক্ষিণে সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকায় রয়েছেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন, বর্তমান প্রশাসক আব্দুস সালাম এবং বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেল। তিনজনেরই রয়েছে আলাদা রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক শক্তি। ফলে দক্ষিণে প্রার্থী বাছাইয়ের সমীকরণ তুলনামূলকভাবে কঠিন হয়ে উঠেছে।
উত্তরে তাবিথের সামনে পুরোনো অভিজ্ঞতা : ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছেন গত নির্বাচনের প্রার্থী তাবিথ আউয়াল। ২০২০ সালের ৩০ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে তিনি বিএনপির ধানের শীষের প্রার্থী ছিলেন। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী আতিকুল ইসলামের কাছে পরাজিত হলেও বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে তার প্রার্থিতা নিয়ে এখনও আগ্রহ রয়েছে। তাবিথ আউয়ালের মতে, আগের নির্বাচনে অনিয়ম ও কারচুপির কারণে তিনি জয়ী হতে পারেননি। এবার দল তাকে মনোনয়ন দিলে আধুনিক ও বাসযোগ্য ঢাকা গড়ার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কাজ করতে চান তিনি।
নতুন সমীকরণে প্রশাসক মিল্টন : উত্তরের প্রার্থী তালিকায় নতুন করে আলোচনায় এসেছেন বর্তমান প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান (মিল্টন)। যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি মিল্টন এর আগে ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদলের সদস্য সচিবের দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করায় নগর ব্যবস্থাপনা ও সিটি কর্পোরেশনের কার্যক্রম সম্পর্কে সরাসরি অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ পেয়েছেন তিনি। ফলে রাজনৈতিক সংগঠন ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার সমন্বয় তার সম্ভাব্য প্রার্থিতাকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে। মিল্টন জানিয়েছেন, দল সুযোগ দিলে তিনি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে প্রস্তুত। তবে দল যাকেই প্রার্থী করবে, তার বিজয়ের জন্য কাজ করবেন বলেও জানিয়েছেন তিনি।
কাইয়ুমের সাংগঠনিক প্রভাব : উত্তরের রাজনীতিতে তাবিথের পাশাপাশি দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত নেতা এম এ কাইয়ুমের নামও জোরালোভাবে উচ্চারিত হচ্ছে। বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির ক্ষুদ্রঋণ বিষয়ক সম্পাদক কাইয়ুম ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সাবেক সভাপতি। মহানগর উত্তরের রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা এবং স্থানীয় নেতাকর্মীদের একটি বড় অংশের সমর্থন তার অন্যতম শক্তি বলে মনে করছেন অনুসারীরা। কাইয়ুম অবশ্য প্রার্থিতার বিষয়ে দলীয় সিদ্ধান্তকেই চূড়ান্ত বলে জানিয়েছেন। তার ভাষায়, নির্বাচন করার ইচ্ছা থাকলেও দল যাকে মনোনয়ন দেবে, তার পক্ষেই ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করবেন।
দক্ষিণে ইশরাকের 'ঢাকার সন্তান' সমীকরণ : ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে তুলনামূলকভাবে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন ইশরাক হোসেন— এমনটাই মনে করছেন দলটির দক্ষিণের অনেক নেতাকর্মী। ২০২০ সালের সিটি নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে ইশরাক হোসেন ২ লাখ ৩৬ হাজার ৫১২ ভোট পেয়েছিলেন। ওই নির্বাচনের পর দক্ষিণের বিভিন্ন এলাকায় ইশরাকের একটি নিজস্ব রাজনৈতিক পরিচিতি ও অনুসারী গোষ্ঠী তৈরি হয়েছে বলে দাবি বিএনপির স্থানীয় নেতাদের। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পুরান ঢাকার সঙ্গে তার পারিবারিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক। তার বাবা প্রয়াত সাদেক হোসেন খোকা ছিলেন অবিভক্ত ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের মেয়র এবং বিএনপির প্রভাবশালী নেতা। ফলে পুরান ঢাকায় খোকা পরিবারের দীর্ঘ রাজনৈতিক ঐতিহ্য ইশরাকের জন্য বাড়তি সুবিধা তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন দলের নেতারা। তরুণ নেতৃত্বের চাহিদা এবং 'ঢাকার সন্তান' পরিচয়— এই দুই সমীকরণও ইশরাকের পক্ষে যেতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
ইশরাক হোসেনও জানিয়েছেন, দল চাইলে সিটি নির্বাচনে অংশ নিতে তিনি প্রস্তুত। প্রয়োজনে মন্ত্রিত্ব ছেড়ে নির্বাচনের মাঠে নামতেও প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন তিনি। তার বক্তব্য, নগরকেন্দ্রিক রাজনীতির মধ্য দিয়েই তার রাজনৈতিক পথচলা শুরু এবং আগের সিটি নির্বাচনের মাধ্যমে দক্ষিণের বিভিন্ন এলাকায় তার শক্ত সামাজিক ভিত্তি তৈরি হয়েছে।
প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা নিয়ে এগোতে চান আব্দুস সালাম : ইশরাকের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের বর্তমান প্রশাসক আব্দুস সালাম। নগর প্রশাসনে তার দীর্ঘ অভিজ্ঞতাই তার সবচেয়ে বড় শক্তি। এর আগে তিনি ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের ডেপুটি মেয়রের দায়িত্ব পালন করেছেন। পাশাপাশি নির্বাচিত কাউন্সিলর ও ওয়ার্ড চেয়ারম্যান হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতাও রয়েছে তার। ফলে নগর ব্যবস্থাপনা, নাগরিকসেবা এবং স্থানীয় প্রশাসনের বাস্তব চিত্র সম্পর্কে তার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা রয়েছে।
আব্দুস সালামের অনুসারীরা এরইমধ্যে বিভিন্ন এলাকায় পোস্টার-ব্যানারের মাধ্যমে তার প্রার্থিতার জানান দিচ্ছেন। সালাম নিজেও নির্বাচনের প্রস্তুতির কথা জানিয়ে বলেছেন, জনগণ ভোট দিয়ে নির্বাচিত করলে পূর্ণ মেয়াদে আরও পরিকল্পিতভাবে নগরবাসীকে সেবা দিতে চান। তার মতে, দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের পাশাপাশি নগর পরিচালনার বাস্তব অভিজ্ঞতাই তাকে অন্যদের থেকে এগিয়ে রাখে।
সাংগঠনিক শক্তিতে সোহেলের চ্যালেঞ্জ : দক্ষিণে তৃতীয় শক্তিশালী প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেল। ছাত্র ও অঙ্গসংগঠনের রাজনীতি পেরিয়ে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলা তার অন্যতম শক্তি। স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় সভাপতি এবং ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সদস্য সচিবের দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। ফলে দলীয় মূলধারা থেকে শুরু করে অঙ্গসংগঠন এবং তৃণমূল পর্যন্ত তার সাংগঠনিক যোগাযোগ রয়েছে। সোহেলের অনুসারীরাও মাঠে সক্রিয়। বিভিন্ন এলাকায় তার ছবি ও শুভেচ্ছাবার্তা সংবলিত পোস্টার-ব্যানার দেখা যাচ্ছে। তবে নিজে প্রার্থিতার বিষয়ে এখনও দলীয় কোনো আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা পাননি বলে জানিয়েছেন সোহেল। দল যেভাবে দায়িত্ব দেবে, সেভাবেই কাজ করবেন বলে জানিয়েছেন তিনি।
দুই সিটিতে সম্ভাব্য প্রার্থীদের শক্তি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, উত্তরে মূল লড়াইটি হতে পারে সাবেক প্রার্থী তাবিথ আউয়ালের নির্বাচনী অভিজ্ঞতা, এম এ কাইয়ুমের দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক প্রভাব এবং বর্তমান প্রশাসক মিল্টনের প্রশাসনিক অভিজ্ঞতাকে ঘিরে। অন্যদিকে দক্ষিণে ইশরাকের তরুণ নেতৃত্ব, পুরান ঢাকার পারিবারিক ঐতিহ্য ও আগের নির্বাচনের অভিজ্ঞতার বিপরীতে রয়েছে আব্দুস সালামের নগর প্রশাসনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা এবং সোহেলের বিস্তৃত সাংগঠনিক বলয়। বিএনপির দায়িত্বশীল নেতারা বলছেন, শুধু দলীয় পরিচয় বা সাংগঠনিক পদ নয়— প্রার্থী বাছাইয়ে সাধারণ ভোটারের কাছে গ্রহণযোগ্যতা এবং প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনে জয় পাওয়ার সক্ষমতাকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে। বিশেষ করে দক্ষিণে পুরান ঢাকা, নতুন যুক্ত হওয়া ওয়ার্ড এবং মধ্য ঢাকার ভোটারদের রাজনৈতিক মনোভাব ও স্থানীয় অগ্রাধিকার এক নয়। ফলে প্রার্থীর ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা সেখানে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। একইভাবে উত্তরে গাবতলী, মিরপুর, বাড্ডা, ভাটারা, উত্তরা ও আব্দুল্লাহপুরের মতো বৈচিত্র্যময় এলাকার ভোটারদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করাও বিএনপির প্রার্থীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে।
সিদ্ধান্তে এখনো 'গ্রিন সিগন্যাল' নেই : দলীয় সূত্র বলছে, দুই সিটির কোনো প্রার্থীকেই এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে সবুজ সংকেত দেওয়া হয়নি। বিএনপির নীতিনির্ধারকরা নির্বাচন কমিশনের সময়সূচি এবং মাঠের রাজনৈতিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন।
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু জানিয়েছেন, সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে মনোনয়ন নিয়ে দলীয় হাইকমান্ডে আনুষ্ঠানিক আলোচনা এখনও শেষ হয়নি। দলের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হবে। অন্যদিকে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর বক্তব্য, আগে নির্বাচনের সময়সূচি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা হতে হবে। এরপর নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে প্রার্থী নিয়ে আলোচনা হবে। প্রার্থী নির্ধারণ দলের গোপনীয় ও কৌশলগত বিষয় বলেও উল্লেখ করেছেন তিনি।
তৃণমূলে প্রস্তুতি, নজরদারিতে কাউন্সিলর প্রার্থীরাও : মেয়র প্রার্থী চূড়ান্ত না হলেও মাঠপর্যায়ে সাংগঠনিক প্রস্তুতি শুরু করেছে বিএনপি। ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপি থানা ও ওয়ার্ড পর্যায়ের সাংগঠনিক কার্যক্রম জোরদারে আটটি বিশেষ টিম গঠন করেছে। এসব টিম মাঠপর্যায়ে সংগঠনের অবস্থা, নেতাকর্মীদের তৎপরতা এবং স্থানীয় রাজনৈতিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। একই সঙ্গে সম্ভাব্য কাউন্সিলর প্রার্থীদের ব্যক্তিগত আমলনামা, জনপ্রিয়তা ও সাংগঠনিক ভূমিকা নিয়েও তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন মহানগর দক্ষিণের নেতারা। ফলে জাতীয় নির্বাচনের পর ঢাকার দুই সিটি নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপির রাজনীতিতে এখন মূল প্রশ্ন— জনপ্রিয় মুখ, নাকি পরীক্ষিত সংগঠক; সাবেক প্রার্থী, নাকি নতুন মুখ? শেষ পর্যন্ত কোন সমীকরণে হাইকমান্ড আস্থা রাখে, তার ওপরই নির্ভর করছে ঢাকার দুই সিটিতে বিএনপির 'নগরপিতা' হওয়ার দৌড়ে কে শেষ পর্যন্ত টিকিট পাচ্ছেন।