
দুটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিদ্যুৎ ক্রয়-বিক্রয়জনিত ঘাটতি মেটাতে ৪ হাজার ৬৩১ কোটি ৫৭ লাখ টাকা বকেয়া ভর্তুকি চেয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ। পটুয়াখালীর আরএনপিএল বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং কক্সবাজারের মাতারবাড়ী কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিপরীতে এ অর্থ প্রয়োজন।
জাতীয় স্বার্থে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে জরুরি ভিত্তিতে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে এ অর্থ দেওয়ার ব্যবস্থা নিতে অর্থ বিভাগকে অনুরোধ করা হয়েছে।বিদ্যুৎ বিভাগের উন্নয়ন-১ শাখা থেকে গত ৯ সেপ্টেম্বর অর্থ বিভাগের সচিবের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে এ অনুরোধ জানানো হয়।
চিঠিতে বলা হয়েছে, বেসরকারি খাতের বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, পাবলিক কোম্পানি এবং ভারত ও নেপাল থেকে তুলনামূলক বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনে কম দামে বৃহৎ গ্রাহকদের কাছে বিক্রি করছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড। এতে সংস্থাটির যে আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে, তা পূরণে সরকারের রাজস্ব বাজেট থেকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।সরকারের এই আর্থিক সহায়তার মাধ্যমে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র, ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং আমদানি করা বিদ্যুতের বিল নিয়মিত পরিশোধের পাশাপাশি জ্বালানি তেল ও কয়লা আমদানি করে বিদ্যুৎ উৎপাদন কার্যক্রম সচল রাখা সম্ভব হচ্ছে বলে জানিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ।
চিঠিতে বলা হয়েছে, গত ৭ মে অনুষ্ঠিত অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সভায় যৌথ উদ্যোগের বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং আদানি পাওয়ার ঝাড়খন্ডসহ ভারত ও নেপাল থেকে বিদ্যুৎ আমদানিকে ভর্তুকির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়।
পটুয়াখালীর আরএনপিএল বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের বাণিজ্যিক উৎপাদনের তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৫। আর দুটি ইউনিটের একত্রে বাণিজ্যিক উৎপাদনের তারিখ ২৮ মে ২০২৬ নির্ধারণ করা হয়। স্বাক্ষরিত বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি অনুযায়ী, প্রথম ইউনিট চালুর তারিখ থেকে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড একটি ইউনিটের সক্ষমতা ও বিদ্যুৎ উৎপাদন বাবদ অর্থ পরিশোধ করছে। আর দুটি ইউনিট একত্রে বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাওয়ার পর থেকে দুই ইউনিটের সক্ষমতা ও বিদ্যুৎ উৎপাদন বাবদ অর্থ দেওয়া হচ্ছে।
এর পরিপ্রেক্ষিতে অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদনের আলোকে প্রথম ইউনিটের বাণিজ্যিক উৎপাদনের তারিখকে ভিত্তি ধরে ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৫ থেকে মে ২০২৬ পর্যন্ত সময়ের বকেয়া ভর্তুকি দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড অনুরোধ জানিয়েছে।
এ বিষয়ে গত ২৭ এপ্রিল অর্থ বিভাগকে চিঠিও দিয়েছিল বিদ্যুৎ বিভাগ। মাতারবাড়ীর দুই ইউনিটের বকেয়াও
অন্যদিকে মাতারবাড়ী কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দুটি ইউনিটের বাণিজ্যিক উৎপাদনের তারিখ ২৯ আগস্ট ২০২৪ নির্ধারণ করা হয়।সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির অনুমোদনের ভিত্তিতে কেন্দ্রটির উভয় ইউনিটের বাণিজ্যিক উৎপাদনের তারিখ থেকে অস্থায়ী বিদ্যুৎমূল্য অনুমোদন করা হয়। পরে অনুমোদিত মূল্য চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত করে ২৯ আগস্ট ২০২৪ থেকে কেন্দ্রটির দুটি ইউনিটের সক্ষমতা ও বিদ্যুৎ উৎপাদন বাবদ অর্থ পরিশোধ করছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড।
তবে ওই সময় থেকে মে ২০২৬ পর্যন্ত বিদ্যুৎ ক্রয়-বিক্রয়জনিত ঘাটতির বিপরীতে প্রাপ্য ভর্তুকি এখনো বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে দেওয়া হয়নি।
বিদ্যুৎ বিভাগের হিসাবে, পটুয়াখালীর আরএনপিএল বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্রের বকেয়া ভর্তুকি মিলিয়ে মোট ৪ হাজার ৬৩১ কোটি ৫৭ লাখ টাকা প্রয়োজন।
পটুয়াখালীর বিদ্যুৎকেন্দ্রটির বকেয়া ভর্তুকি দ্রুত পরিশোধের পক্ষে আরও একটি কারণ দেখিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ। কেন্দ্রটি নির্মাণে নেওয়া বিদেশি ঋণের কিস্তি পরিশোধ এবং কয়লার মজুত নিশ্চিত করতে অর্থের প্রয়োজন।
জানা গেছে, ২০১১ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড ও আরএনপিএলের মধ্যে বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ২০১৯ সালের ৮ এপ্রিল বাস্তবায়ন চুক্তিও স্বাক্ষরিত হয়।প্রকল্পটি বাস্তবায়নে চীনের এক্সিম ব্যাংকের নেতৃত্বাধীন একটি ঋণদাতা গোষ্ঠী থেকে নেওয়া ঋণের ৫০ শতাংশের জন্য বাংলাদেশ সরকার সার্বভৌম নিশ্চয়তা দিয়েছে।
এই নিশ্চয়তার আওতায় গত ২৫ মার্চ ঋণের প্রথম কিস্তির আসল ও সুদ বাবদ ১৩৯ দশমিক ৯৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১ হাজার ৭২২ কোটি ৪৮ লাখ টাকা, পরিশোধ করা হয়েছে।আগামী ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে দ্বিতীয় কিস্তি পরিশোধ করতে হবে। এ কিস্তির আসল ও সুদ বাবদ ১৩৬ দশমিক ১৩১৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বা প্রায় ১ হাজার ৬৮৮ কোটি ৩ লাখ টাকা পরিশোধের কথা রয়েছে।
আরএনপিএল বিদ্যুৎ বিভাগকে জানিয়েছে, নির্ধারিত সময়ে দ্বিতীয় কিস্তির আসল ও সুদ পরিশোধে ব্যর্থ হলে বাংলাদেশ সরকারের দেওয়া সার্বভৌম নিশ্চয়তার ক্ষেত্রে ঋণখেলাপের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
দুই বিদ্যুৎকেন্দ্রের বকেয়া ভর্তুকি বাবদ অর্থ বিভাগের কাছে টাকা চাওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে এখনো অর্থ বিভাগ থেকে আমরা কোনো জবাব পাইনি। —মোহাম্মদ সোলায়মান
বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে, আরএনপিএলের মাসিক বিদ্যুৎ বিলের বিপরীতে সময়মতো প্রাপ্য ভর্তুকি দেওয়া হলে দ্বিতীয় কিস্তির ঋণ পরিশোধের পাশাপাশি বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় কয়লার মজুত সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে।
বিদ্যুৎ বিভাগ মনে করছে, বর্তমান সংকটকালীন পরিস্থিতিতে দুই বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ উৎপাদন বজায় রাখা জরুরি। এ কারণে বকেয়া ভর্তুকির অর্থ দ্রুত পরিশোধ করা প্রয়োজন।
চিঠিতে জাতীয় স্বার্থে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আরএনপিএলের প্রথম ইউনিটের ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৫ থেকে মে ২০২৬ পর্যন্ত এবং মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্রের উভয় ইউনিটের ২৯ আগস্ট ২০২৪ থেকে মে ২০২৬ পর্যন্ত প্রাপ্য বকেয়া ঘাটতির বিপরীতে মোট ৪ হাজার ৬৩১ কোটি ৫৭ লাখ টাকা বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে ভর্তুকি হিসেবে দেওয়ার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে অর্থ বিভাগকে অনুরোধ করা হয়েছে।
যোগাযোগ করা হলে বিদ্যুৎ বিভাগের উপসচিব মোহাম্মদ সোলায়মান বলেন, দুই বিদ্যুৎকেন্দ্রের বকেয়া ভর্তুকি বাবদ অর্থ বিভাগের কাছে টাকা চাওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে এখনো অর্থ বিভাগ থেকে আমরা কোনো জবাব পাইনি।তিনি বলেন, চিঠিতে যে বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে, সেটি মূলত ভর্তুকির অর্থ। সরকার ভর্তুকি দেয় বলেই আমরা এই অর্থ চেয়েছি।
ভর্তুকির অর্থ পাওয়া গেলে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর কার্যক্রমে এর প্রভাব সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এই টাকা পেলে আমাদের দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্র আরএনপিএল বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় পরিচালনা করা সম্ভব হবে।লোডশেডিং কমাতে এর প্রভাব পড়বে কি না—এমন প্রশ্নে মোহাম্মদ সোলায়মান বলেন, অবশ্যই লোডশেডিং কমবে। বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় চললে লোডশেডিং কমবেই।