ঢাকা সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬, ২৮ আশ্বিন ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

কর্ণফুলী টানেলে প্রতিদিন গচ্চা ১০ লাখ টাকা!

কর্ণফুলী টানেলে প্রতিদিন গচ্চা ১০ লাখ টাকা!

দুই পাড়ের যোগাযোগ সহজ করা, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের সঙ্গে সংযোগ বাড়ানো এবং বন্দরকেন্দ্রিক পরিবহনব্যবস্থায় গতি আনার প্রতিশ্রুতি নিয়ে চালু হয়েছিল নদীর তলদেশে নির্মিত কর্ণফুলী টানেল। কিন্তু বিপুল অর্থ ব্যয়ে নির্মিত এই অবকাঠামো এখন প্রত্যাশিত যানবাহন পাচ্ছে না। টানেল চালু হওয়ার প্রায় ৩ বছর হতে চললেও দৈনিক যান চলাচল পরিকল্পনার ধারেকাছেও পৌঁছায়নি। উল্টো টানেল পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয়ের তুলনায় টোল আদায় কম হওয়ায় প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১০ লাখ টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে।

বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) প্রতিবেদন অনুযায়ী, টানেল চালুর পর যানবাহন চলাচল বাড়ার যে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল, বাস্তবে তার সামান্য অংশ পূরণ হয়েছে। টানেল নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ১০ হাজার ৬৮৯ কোটি টাকার বেশি। অথচ এই বিপুল বিনিয়োগের বিপরীতে আয় পরিচালন ব্যয় মেটানোর মতো পর্যায়েও পৌঁছায়নি। একদিকে টানেলের আয়-ব্যয়ের ঘাটতি, অন্যদিকে যানবাহন বাড়াতে নতুন সড়ক নির্মাণ ও উন্নয়নে আরও ৩৩৬ কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। আনোয়ারা থেকে চন্দনাইশের গাছবাড়ী কলেজ গেট পর্যন্ত প্রায় ১৭ কিলোমিটার সড়ক প্রশস্ত করে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ)।

সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা বলছেন, সড়কটি উন্নত হলে টানেল ব্যবহার করে কক্সবাজারমুখী যানবাহনের যাতায়াত সহজ হবে। তবে বিশেষজ্ঞরা প্রশ্ন তুলে বলছেন, টানেলের ব্যবহার বাড়াতে প্রয়োজনীয় সংযোগ সড়ক ও অর্থনৈতিক কার্যক্রমের পরিকল্পনা প্রকল্প শুরুর আগেই কেন নিশ্চিত করা হয়নি।

আইএমইডি বলছে, টানেল নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের সময় চালুর বছর দৈনিক ১৭ হাজার যানবাহন চলাচলের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল। ২০২৫ সালে এই সংখ্যা ২৮ হাজার ৩০৫-এ পৌঁছানোর কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবে দৈনিক গড়ে প্রায় চার থেকে সাড়ে চার হাজার যানবাহন টানেল ব্যবহার করছে। অর্থাৎ, ২০২৫ সালের পূর্বাভাসের তুলনায় ব্যবহার হচ্ছে মাত্র প্রায় ১৪ শতাংশ।

আইএমইডির প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, টানেল পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয়ের তুলনায় টোল আদায় কম থাকায় প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১০ লাখ টাকা লোকসান হচ্ছে। মাসিক হিসাবে সড়ক ও সেতু কর্তৃপক্ষের আয়-ব্যয়ের যে চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, তাতেও বড় ঘাটতি দেখা যায়। গড়ে মাসে টোল আদায় হচ্ছে ৩ কোটি ৩৭ লাখ টাকা, বিপরীতে পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে ব্যয় হচ্ছে ৬ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। ফলে প্রতি মাসে ঘাটতি দাঁড়াচ্ছে প্রায় ৩ কোটি ৫৮ লাখ টাকা। অর্থাৎ, টানেলটি চালু রাখতে যে অর্থ ব্যয় হচ্ছে, টোল থেকে তার অর্ধেকের কিছু বেশি উঠছে।

আইএমইডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, টোল আয় দিয়ে পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ের মাত্র ৫৪ থেকে ৫৫ শতাংশ মেটানো যাচ্ছে। বাকি অর্থ জোগাতে হচ্ছে অন্য উৎস থেকে। এই ঘাটতি দীর্ঘদিন চলতে থাকলে টানেলের আর্থিক স্থায়িত্ব নিয়ে চাপ আরও বাড়বে।

টানেল নির্মাণের ব্যয়ও কম নয়। প্রকল্পটির মূল অনুমোদিত ব্যয় ছিল ৮ হাজার ৪৪৬ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। পরে প্রথম সংশোধনীতে ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ১০ হাজার ৩৭৪ কোটি ৪২ লাখ টাকা। দ্বিতীয় সংশোধনীতে তা আরও বেড়ে হয় ১০ হাজার ৬৮৯ কোটি ৭১ লাখ টাকা। অর্থাৎ, মূল অনুমোদিত ব্যয়ের তুলনায় খরচ বেড়েছে প্রায় ২৬ দশমিক ৫৬ শতাংশ। একই সঙ্গে প্রকল্প বাস্তবায়নের মেয়াদও বেড়েছে ১০০ শতাংশ। মূল পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২০ সালের জুনে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবায়ন শেষ হয়েছে ২০২৪ সালের জুনে।

এত অর্থ ও সময় ব্যয়ের পরও টানেলের ব্যবহার প্রত্যাশিত পর্যায়ে না পৌঁছানো প্রকল্প পরিকল্পনার দুর্বলতাকে সামনে নিয়ে আসছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এই পরিস্থিতিতে টানেলের ব্যবহার বাড়াতে ৩৩৬ কোটি টাকার নতুন সড়ক উন্নয়ন প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় আনোয়ারার কালাবিবি দিঘী মোড় থেকে বরকল সেতু পর্যন্ত সড়ক উন্নয়নে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৮২ কোটি টাকা। বরকল সেতু থেকে চন্দনাইশের গাছবাড়ী কলেজ গেট পর্যন্ত অংশে ব্যয় হবে ১৪৪ কোটি টাকা। প্রকল্পটির দরপত্র প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে। কার্যাদেশ দেওয়ার পর কাজ শুরু হবে বলে জানিয়েছে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর। সওজ সূত্র জানায়, প্রকল্পের একটি অংশে প্রায় ১০ দশমিক ২ কিলোমিটার সড়কের বর্তমান প্রস্থ ১৮ ফুট থেকে বাড়িয়ে ৩৪ ফুট করার পরিকল্পনা রয়েছে। সড়কটি প্রশস্ত করার পাশাপাশি বাঁক সোজা করা, বাজার এলাকায় আরসিসি ঢালাইয়ের সড়ক নির্মাণ, পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা এবং নয়টি সেতু বা কালভার্ট নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। কিছু স্থানে জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজনও হতে পারে। ঠিকাদার কাজ শুরু করার পর দুই বছরের মধ্যে প্রকল্প শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

সওজ সূত্র অনুযায়ী, টানেল থেকে মাসে গড়ে টোল আদায় হচ্ছে ৩ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। বিপরীতে পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে ব্যয় হচ্ছে ৬ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। ফলে প্রতি মাসে গড়ে ঘাটতি থাকছে ৩ কোটি ৫৮ লাখ টাকা।

সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) কর্মকর্তারা জানান, টানেলটির ব্যবহার বাড়াতে বিভিন্ন দিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে। তাদের পর্যবেক্ষণ, টানেলের সঙ্গে যুক্ত সড়কগুলো দূরপাল্লার যানবাহন চলাচলের উপযোগী নয়। বিকল্প সড়ক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা গেলে টানেল ব্যবহারে যানবাহনের আগ্রহ বাড়তে পারে। এ বিবেচনায় চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের চন্দনাইশের গাছবাড়িয়া কলেজ গেট থেকে আনোয়ারার কালাবিবির দিঘী মোড় পর্যন্ত বিকল্প সড়কটি প্রশস্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম দক্ষিণ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী পিন্টু চাকমা বলেন, বর্তমানে টানেল ব্যবহার করে কক্সবাজারের দিকে যেতে হলে আনোয়ারা থেকে পটিয়া হয়ে মহাসড়কে উঠতে হয়। কেউ কেউ পেকুয়া হয়েও যাতায়াত করেন। এই ঘুরপথের কারণে অনেক যানবাহন টানেল ব্যবহার করতে আগ্রহী হয় না। আনোয়ারা থেকে গাছবাড়ী পর্যন্ত সড়কটি সরাসরি চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের সঙ্গে যুক্ত হলে কক্সবাজার যেতে প্রায় ৩০ মিনিট সময় কমবে। এতে টানেলে যানবাহন চলাচল বাড়বে বলে আশা করছেন তারা।

এদিকে, আইএমইডির প্রতিবেদনে টানেলের সঙ্গে সংযুক্ত সড়ক উন্নয়ন, আনোয়ারায় শিল্পায়ন ত্বরান্বিত করা এবং বন্দরের সঙ্গে যুক্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠানের পণ্য পরিবহনে টানেল ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের সঙ্গে সংযোগকারী ৭৪ কিলোমিটার সড়ক উন্নয়ন এবং আনোয়ারা-বাঁশখালী-সাতকানিয়া ও চট্টগ্রাম-কক্সবাজার সড়কের সক্ষমতা বাড়ানোর সুপারিশও করা হয়েছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত না হলে টানেলকে ঘিরে যে অর্থনৈতিক সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছিল, তা কাজে লাগানো কঠিন হবে। টানেলের সঙ্গে যুক্ত সেবা এলাকাও প্রশ্নের মুখে পড়েছে। আইএমইডির প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই সেবা এলাকা নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ৪৮৪ কোটি ১৯ লাখ টাকা। কিন্তু টানেলের মূল উদ্দেশ্যের সঙ্গে এর কার্যকারিতা কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং স্থাপনাটি কতটা ব্যবহার হচ্ছে, তা নিয়ে প্রতিবেদনে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। ব্যয়বহুল এ স্থাপনা যথাযথভাবে কাজে না লাগলে তা প্রকল্পের আর্থিক চাপ আরও বাড়াতে পারে। এ কারণে সেবা এলাকাটি তৃতীয় পক্ষের কাছে ইজারা দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে প্রকল্পটির আর্থিক ও প্রশাসনিক জবাবদিহি নিয়েও উদ্বেগ উঠে এসেছে। এতে বলা হয়েছে, ৬৮টি নিরীক্ষা আপত্তি এখনো নিষ্পত্তি হয়নি। এর মধ্যে ৪৮টি গুরুতর আপত্তি হিসেবে চিহ্নিত। বড় অঙ্কের সরকারি বিনিয়োগের প্রকল্পে এসব আপত্তি অনিষ্পন্ন থাকা আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তাকে সামনে এনেছে। ডিজিটাল পদ্ধতিতে টোল আদায়, পণ্যবাহী ট্রাকের চলাচল টানেলমুখী করা, ব্যয়বহুল সেবা এলাকা কার্যকরভাবে পরিচালনা এবং দেশীয় দক্ষ জনবল তৈরি করে রক্ষণাবেক্ষণব্যবস্থা শক্তিশালী করার সুপারিশ করেছে আইএমইডি। একই সঙ্গে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের জন্য আলাদা তহবিল গঠনের প্রয়োজনীয়তাও তুলে ধরা হয়েছে।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত