ঢাকা মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬, ৫ কার্তিক ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

জাপানে বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগের দ্বার খুলছে

জাপানে বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগের দ্বার খুলছে

জাপানের শ্রমবাজারে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলছে। কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়ন নিয়ে বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে নতুন একটি সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর আওতায় আগামী বছরের ১ এপ্রিল থেকে বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে জাপানের। প্রাথমিকভাবে পাঁচ বছরের জন্য স্বাক্ষরিত এই চুক্তির মেয়াদ শেষে স্বয়ংক্রিয়ভাবে আরও পাঁচ বছর বাড়বে। ফলে দুই দেশের সম্মতিতে চুক্তিটি কার্যকর থাকলে আগামী এক দশক ধরে জাপানের শ্রমবাজারে বাংলাদেশি কর্মীদের প্রবেশ, দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণের পথ তৈরি হবে। গত শনিবার 'মেমোরেন্ডাম অব কো-অপারেশন অন এমপ্লয়মেন্ট স্কিলস ডেভেলপমেন্ট' শীর্ষক এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। বাংলাদেশের পক্ষে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং জাপানের পক্ষে দেশটির বিচার মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য, শ্রম ও কল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং ন্যাশনাল পুলিশ অ্যাজেন্সির প্রতিনিধিরা এতে স্বাক্ষর করেন। কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে দুই দেশের সহযোগিতা জোরদার, কর্মীদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নের বিষয়গুলো চুক্তিতে গুরুত্ব পেয়েছে।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, প্রায় ১ বছর ধরে বাংলাদেশ সরকার ও জাপান সরকারের ধারাবাহিক প্রচেষ্টার ফল এই চুক্তি। সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, এর মাধ্যমে জাপানে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে এবং বিদেশে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বিদ্যমান বাজার আরও সম্প্রসারিত হবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন জাপান সফরের সময় চুক্তির কপি আনুষ্ঠানিকভাবে দুই পক্ষের মধ্যে হস্তান্তরের কথা রয়েছে। চুক্তির ফলে শুধু কর্মী নিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি নয়, বরং বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের অধিকার রক্ষা, কর্মপরিবেশের উন্নয়ন এবং দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে উচ্চ আয়ের সুযোগ তৈরির ক্ষেত্রেও অগ্রগতি হবে বলে আশা করছে সরকার। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী জানিয়েছেন, কর্মীদের সর্বোচ্চ সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং কর্মী পাঠানো ও গ্রহণের ক্ষেত্রে দুই দেশের সহযোগিতা আরও শক্তিশালী করাই এই চুক্তির অন্যতম লক্ষ্য। কর্মসংস্থানের মাধ্যমে বাংলাদেশি নাগরিকদের দক্ষতা বাড়বে, যা ভবিষ্যতে তাদের ভালো বেতন ও জাপানে দীর্ঘমেয়াদে কাজ করার সুযোগ তৈরিতে সহায়ক হতে পারে।

কর্মীদের অধিকার ও সুরক্ষায় গুরুত্ব : বিদেশে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের কর্মীদের অন্যতম উদ্বেগ হলো নিয়োগপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, কর্মপরিবেশ, ন্যায্য মজুরি এবং কর্মক্ষেত্রে অধিকার নিশ্চিত করা। নতুন চুক্তিতে এসব বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, জাপানে নিয়োজিত বাংলাদেশি কর্মীরা দেশটির স্থানীয় শ্রমিকদের সমতুল্য আইনি সুরক্ষা পাবেন। পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের সমান সুযোগ নিশ্চিত করার বিষয়টিও চুক্তির গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশেষ করে নারী কর্মীদের অধিকার সুরক্ষায় কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিধানের কথা তুলে ধরেছে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। গর্ভাবস্থা বা সন্তান জন্মদানের কারণে নারী বিদেশি কর্মীদের চাকরিচ্যুত করা কিংবা তাদের সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরণ করা যাবে না। একই কারণে জোরপূর্বক দেশে ফেরত পাঠানোর বাধ্যবাধকতাও চুক্তিতে রাখা হয়নি বলে জানিয়েছে মন্ত্রণালয়। বিদেশে নারী কর্মীদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা এবং মাতৃত্বকালীন সময়ে তাঁদের অধিকার রক্ষা করা দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এ ক্ষেত্রে জাপানের সঙ্গে সহযোগিতা চুক্তি বাংলাদেশি নারী কর্মীদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে এসব সুরক্ষা বাস্তবে কার্যকর করতে কর্মীদের চুক্তির শর্ত সম্পর্কে সচেতন করা, অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা সম্পর্কে জানানো এবং প্রয়োজনে দ্রুত সহায়তা পাওয়ার পথ নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ হবে। কর্মীদের আইনি সুরক্ষার পাশাপাশি নিয়োগকর্তা ও কর্মীর মধ্যে স্বচ্ছ চুক্তি, বেতন-ভাতা, কর্মঘণ্টা, ছুটি এবং চাকরির শর্ত সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকা প্রয়োজন। বিদেশে যাওয়ার আগে এসব বিষয়ে যথাযথ প্রশিক্ষণ ও তথ্য দেওয়া হলে কর্মীরা নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন থাকবেন। একই সঙ্গে প্রতারণা ও অনিয়মের ঝুঁকিও কমানো সম্ভব হবে।

দক্ষ কর্মীর চাহিদা পূরণে নতুন সুযোগ : জাপানের শ্রমবাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে দক্ষতা উন্নয়ন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। দেশটির নিয়োগব্যবস্থায় নির্দিষ্ট কাজের উপযোগী দক্ষতা, ভাষাজ্ঞান এবং কর্মপরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা প্রয়োজন হতে পারে। ফলে বাংলাদেশ থেকে কর্মী পাঠানোর আগে তাদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং জাপানের কাজের ধরন সম্পর্কে প্রস্তুত করা জরুরি। নতুন চুক্তির নামেই কর্মসংস্থানের পাশাপাশি দক্ষতা উন্নয়নের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশি কর্মীদের কাজের অভিজ্ঞতা ও পেশাগত দক্ষতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। জাপানে কাজ করে অর্জিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতে তাদের কর্মজীবনে কাজে লাগবে। দেশে ফিরে এলে সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন খাতেও অবদান রাখার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এ সুযোগ কাজে লাগাতে প্রশিক্ষণব্যবস্থাকে জাপানের শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা প্রয়োজন। কোন খাতে কত কর্মীর চাহিদা রয়েছে, কী ধরনের দক্ষতা ও ভাষাজ্ঞান প্রয়োজন এবং নিয়োগের জন্য কী কী যোগ্যতা পূরণ করতে হবে— এসব বিষয়ে আগাম তথ্য সংগ্রহ করে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম সাজাতে হবে। এতে কর্মীরা শুধু বিদেশে যাওয়ার সুযোগই পাবেন না, বরং তাঁদের উপযুক্ত কাজ পাওয়ার সম্ভাবনাও বাড়বে।

এ ক্ষেত্রে সরকারি প্রশিক্ষণকেন্দ্রের পাশাপাশি বেসরকারি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানগুলোকেও কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে। জাপানি ভাষা শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ, কর্মক্ষেত্রের শৃঙ্খলা এবং দেশটির আইন ও সংস্কৃতি সম্পর্কে ধারণা দেওয়ার ব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে নিয়োগের আগে দক্ষতা যাচাইয়ের স্বচ্ছ পদ্ধতি থাকলে কর্মী ও নিয়োগকর্তা— উভয় পক্ষই উপকৃত হতে পারেন।

বৈদেশিক কর্মসংস্থানে বাজার সম্প্রসারণের সম্ভাবনা : বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বৈদেশিক কর্মসংস্থান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিরা দেশে অর্থ পাঠানোর পাশাপাশি নিজেদের পরিবার ও স্থানীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখেন। কিন্তু বিদেশে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে নতুন বাজার তৈরি, দক্ষ কর্মীর সংখ্যা বাড়ানো এবং কর্মীদের অধিকার নিশ্চিত করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ। জাপানের সঙ্গে নতুন চুক্তি এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একটি সম্ভাবনাময় পদক্ষেপ হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতার কাঠামো থাকলে দুই দেশের মধ্যে কর্মী নিয়োগসংক্রান্ত যোগাযোগ ও সমন্বয় আরও সুসংগঠিত হওয়ার সুযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে জাপানের শ্রমবাজারে বাংলাদেশের পরিচিতি বাড়ানো এবং দক্ষ কর্মী সরবরাহের সক্ষমতা গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও এটি ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে চুক্তি স্বাক্ষরই কর্মসংস্থানের পূর্ণ নিশ্চয়তা নয়। বাস্তবে কতজন বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ পাবেন, কোন কোন খাতে তাঁদের চাহিদা থাকবে, নিয়োগের যোগ্যতা কী হবে এবং আবেদনপ্রক্রিয়া কীভাবে পরিচালিত হবে— এসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানা প্রয়োজন। কর্মী নিয়োগের কার্যকর সুযোগ তৈরি করতে হলে দুই দেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে এসব বিষয়ে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বিদেশে যাওয়ার আশায় অনেক কর্মী সঞ্চয়, ঋণ কিংবা পরিবারের সহায়তার ওপর নির্ভর করেন। নিয়োগের নামে অতিরিক্ত অর্থ আদায়, ভুয়া প্রতিশ্রুতি বা ভুল তথ্যের কারণে তাদের আর্থিক ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই অনুমোদিত নিয়োগপদ্ধতি, নির্ভরযোগ্য তথ্য এবং ব্যয়ের স্বচ্ছ হিসাব নিশ্চিত করা প্রয়োজন। কর্মীদের চুক্তিপত্র ও নিয়োগকর্তার পরিচয় যাচাইয়ের সুযোগ থাকলে প্রতারণার ঝুঁকি কমানো সম্ভব। সরকারি পর্যায়ে চুক্তির বাস্তবায়ন তদারকির পাশাপাশি কর্মীদের অভিযোগ গ্রহণ ও নিষ্পত্তির ব্যবস্থাও কার্যকর রাখা দরকার। জাপানে পৌঁছানোর পর কর্মীরা যেন প্রয়োজনীয় সহায়তা পান এবং কোনো সমস্যায় পড়লে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন, সেটি নিশ্চিত করা জরুরি। এতে কর্মীদের নিরাপত্তা বাড়বে এবং বাংলাদেশের কর্মীদের বিষয়ে জাপানি নিয়োগকর্তাদের আস্থাও শক্তিশালী হবে।

দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতার পথ : প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী চুক্তির সুবিধা তুলে ধরে বলেছেন, এর মাধ্যমে কর্মীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি কর্মী প্রেরণ ও গ্রহণের ক্ষেত্রে দুই দেশের সহযোগিতা জোরদার হবে। কর্মসংস্থানের মাধ্যমে বাংলাদেশি নাগরিকদের দক্ষতা বাড়বে এবং তাঁরা উচ্চ বেতন ও জাপানে দীর্ঘমেয়াদে বসবাসের সুযোগ পেতে পারেন বলেও তিনি উল্লেখ করেছেন। সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, এই চুক্তি বাংলাদেশ ও জাপানের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় করবে। পাশাপাশি দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন, কর্মীদের অধিকার রক্ষা এবং বৈদেশিক কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করবে। চুক্তির প্রাথমিক মেয়াদ পাঁচ বছর হলেও নির্ধারিত শর্ত অনুযায়ী তা আরও পাঁচ বছরের জন্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাড়ানোর ব্যবস্থা রয়েছে। ফলে সহযোগিতা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে দীর্ঘ সময় ধরে কর্মী নিয়োগ ও দক্ষতা উন্নয়নের বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে ধারাবাহিক কাজ করার সুযোগ তৈরি হবে।

এখন চুক্তির সুফল বাস্তবে পৌঁছে দেওয়াই হবে বড় কাজ। জাপানের শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ কর্মী তৈরি, নিয়োগপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, কর্মীদের অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা এবং বিদেশে তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার ওপর নির্ভর করবে এই উদ্যোগের সাফল্য। পরিকল্পিতভাবে এসব কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া গেলে জাপানে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হওয়ার পাশাপাশি দেশের দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত