
বৈশ্বিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশের অবস্থান সুদৃঢ় করা এবং বৈদেশিক কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত উন্মোচনে আগামী পাঁচ বছরে ১ কোটি দক্ষ কর্মী বিদেশে পাঠানোর মহাপরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। মধ্যপ্রাচ্যের প্রচলিত শ্রমবাজারের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে ইউরোপ, এশিয়া ও ওশেনিয়ার উন্নত এবং উদীয়মান দেশগুলোতে বাংলাদেশি কর্মীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণে চলছে বহুমুখী তৎপরতা। এ লক্ষ্যে তরুণ-যুবকদের কারিগরি দক্ষতা উন্নয়ন, বিদেশি ভাষা শিক্ষা, আন্তর্জাতিক মানের সনদ প্রদান এবং নতুন শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী কর্মী তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত, মধ্যস্বত্বভোগী ও দালালচক্রের দৌরাত্ম্য বন্ধ এবং অভিবাসন ব্যয় কমানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী জানিয়েছেন, সরকারের বৈশ্বিক কর্মসংস্থান কৌশলের অন্যতম ভিত্তি হলো অপ্রথাগত আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের সুযোগ কাজে লাগানো। বিকল্প ও উদীয়মান শ্রমবাজারে দক্ষ কর্মী পাঠানোকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। আগামী পাঁচ বছরে ১ কোটি দক্ষকর্মী বিদেশে পাঠানোর লক্ষ্য নিয়ে সরকার কাজ করছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, পরিকল্পনাটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হলে দেশের কর্মসংস্থান, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, এ মহাপরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হচ্ছে নতুন ও উন্নত শ্রমবাজার সৃষ্টি, উচ্চ রেমিট্যান্সপ্রবাহ নিশ্চিত করা, নিরাপদ অভিবাসন প্রতিষ্ঠা, অভিবাসন ব্যয় কমানো এবং বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করা। এতদিন মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশের ওপর বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থানের বড় অংশ নির্ভরশীল ছিল। এই নির্ভরতা কমিয়ে ইতালি, জার্মানি, গ্রিস, রোমানিয়া, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের মতো দেশে দক্ষ জনশক্তির প্রবেশাধিকার বাড়াতে চায় সরকার।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে এখন শুধু সাধারণ শ্রমিকের চাহিদা নয়, বরং তথ্যপ্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা, প্রকৌশল, নির্মাণ, কৃষি, যন্ত্রপাতি পরিচালনা, কেয়ারগিভিং ও আতিথেয়তা খাতে প্রশিক্ষিত কর্মীর চাহিদা বাড়ছে। এ বাস্তবতায় অদক্ষ শ্রমিক পাঠানোর পরিবর্তে চাহিদাভিত্তিক দক্ষ জনশক্তি তৈরি করা গেলে কর্মীদের আয় বাড়বে, দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহও শক্তিশালী হবে।
দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে ১০৪ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র
এক কোটি দক্ষ কর্মী পাঠানোর লক্ষ্য বাস্তবায়নে সারা দেশে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। বর্তমানে দেশের ১০৪টি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের (টিটিসি) মাধ্যমে নিয়মিত প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে তরুণ-তরুণীদের। বৈশ্বিক শ্রমবাজারের চাহিদা বিবেচনায় তথ্যপ্রযুক্তি, আধুনিক ড্রাইভিং, নার্সিং, কেয়ারগিভিং, ইলেকট্রিক্যাল, মেকানিক্যাল ও হসপিটালিটিসহ মোট ৫৫টি কারিগরি কোর্স চালু রয়েছে। শুধু কারিগরি দক্ষতা অর্জনই নয়, বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য ভাষাগত দক্ষতা অর্জনের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ইংরেজির পাশাপাশি জাপানি, কোরিয়ান, জার্মান ও আরবি ভাষায় বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদেশি নিয়োগদাতাদের চাহিদা অনুযায়ী ভাষা ও পেশাগত দক্ষতা অর্জন করতে পারলে বাংলাদেশি কর্মীদের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়বে। কর্মীদের অর্জিত দক্ষতা আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য করতে বিভিন্ন দেশের স্বনামধন্য প্রশিক্ষণ ও সার্টিফিকেশন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে প্রশিক্ষণ এবং সনদ প্রদানের মাধ্যমে বিদেশি নিয়োগদাতাদের আস্থা অর্জন করতে চায় সরকার।
রেমিট্যান্স বাড়াতে দক্ষ কর্মী পাঠানোর লক্ষ্য
বৈদেশিক কর্মসংস্থানের পাশাপাশি রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ানোও সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত দেশে ১০ দশমিক ৭২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় এ প্রবাহ ১১ দশমিক ৯ শতাংশ বেশি। সদ্যসমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে রেকর্ড ৩৫ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। সরকার মনে করছে, দক্ষ ও প্রশিক্ষিত কর্মীদের উন্নত বেতনের চাকরিতে নিয়োগ নিশ্চিত করা গেলে রেমিট্যান্স প্রবাহ আরও বাড়ানো সম্ভব। এ কারণে কর্মীর সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি কর্মীদের পেশাগত মান উন্নয়ন, উপযুক্ত কর্মপরিবেশ এবং উচ্চ আয়ের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিতে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করার পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিতে গতিশীলতা আসবে।
মালয়েশিয়া ও জাপানের বাজারে নতুন সম্ভাবনা
বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালুর বিষয়ে সম্প্রতি একটি সুনির্দিষ্ট রূপরেখা ঘোষণা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। নিবিড় কূটনৈতিক তৎপরতার পর নেওয়া এ উদ্যোগের আওতায় ৩৩৮টি অনুমোদিত ও তালিকাভুক্ত রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে কর্মী নিয়োগ প্রক্রিয়া পরিচালিত হবে। এ ছাড়া বাংলাদেশ সরকারের বিশেষ অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে সম্পূর্ণ বিনা খরচে ১০ হাজার বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগে নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছে মালয়েশিয়া কর্তৃপক্ষ। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেডের (বোয়েসেল) তত্ত্বাবধানে এ বিশেষ পাইলট কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে অভিবাসন ব্যয় ছাড়াই কর্মীদের বিদেশে যাওয়ার সুযোগ তৈরির পাশাপাশি স্বচ্ছ নিয়োগপ্রক্রিয়া নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, জাপানের শ্রমবাজারেও বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে স্বাক্ষরিত নির্দিষ্ট দক্ষতাসম্পন্ন কর্মী বা এসএসডব্লিউ নিয়োগসংক্রান্ত চুক্তির আওতায় জাপানি ভাষায় স্বীকৃত দক্ষতা ও নির্দিষ্ট কারিগরি ক্ষেত্রে সনদধারী বাংলাদেশিরা কাজের সুযোগ পাচ্ছেন। বয়স্কদের সেবাযত্ন, তথ্যপ্রযুক্তি, নির্মাণ, কৃষি ও আতিথেয়তা খাতে এসব কর্মীর চাহিদা রয়েছে। এ ব্যবস্থায় কর্মীদের আইনি সুরক্ষা ও সমান অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে।
ইউরোপের শ্রমবাজারে বিশেষ নজর
ইউরোপের শ্রমবাজারে দক্ষ বাংলাদেশি কর্মীদের প্রবেশাধিকার বাড়াতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) যৌথভাবে 'সাপোর্টিং আ ট্যালেন্ট পার্টনারশিপ উইথ বাংলাদেশ' শীর্ষক কাঠামোর আওতায় কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য ইউরোপের বিভিন্ন দেশে জনমিতিক পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট শ্রমিক সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ থেকে নিরাপদ, নিয়মিত ও নথিভুক্ত পথে দক্ষ কর্মী পাঠানো। বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তি পেশাজীবী, প্রকৌশলী ও কারিগরি কর্মীদের ইউরোপের শ্রমবাজারের সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বোয়েসেল এ প্রকল্পের অন্যতম বাস্তবায়ন সহযোগী হিসেবে কাজ করছে। প্রকল্পের আওতায় বোয়েসেল ও জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) সমন্বিত অনলাইন ডেটাবেজ ব্যবহার করে ইইউ-স্বীকৃত দক্ষ পেশাজীবীদের সঙ্গে ইউরোপীয় নিয়োগদাতাদের সরাসরি যোগাযোগ স্থাপনে কাজ করছে।
এদিকে ইতালি সরকারের অর্থায়নে বাংলাদেশে বিনামূল্যে প্রাক-প্রস্থান ওরিয়েন্টেশন, প্রশিক্ষণ ও ভাষা শিক্ষা কর্মসূচি শুরু হয়েছে। এর মাধ্যমে অভিজ্ঞ কর্মীদের ইতালির কাজের ভিসা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক সেবা খাতেও সরকার অনুমোদিত স্পনসরশিপ কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশি নার্স ও কেয়ারগিভারদের কর্মসংস্থানের সুযোগ রয়েছে।
জার্মানির 'অপরচুনিটি কার্ড' বা 'চান্সেনকার্টে' ব্যবস্থার আওতায় তথ্যপ্রযুক্তি পেশাজীবী ও প্রকৌশলীরা দেশটিতে চাকরি খোঁজার সুযোগ পাচ্ছেন। এ ছাড়া রোমানিয়া, গ্রিস, সার্বিয়া, পর্তুগাল, ক্রোয়েশিয়া ও হাঙ্গেরিতে কৃষি, সরবরাহব্যবস্থা, ডেলিভারি এবং আতিথেয়তা খাতে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
ওশেনিয়া ও অন্যান্য অঞ্চলেও কর্মসংস্থানের সুযোগ
ইউরোপের পাশাপাশি ওশেনিয়া অঞ্চলের শ্রমবাজার সম্প্রসারণেও গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডে কৃষি খাতের মৌসুমি কাজ, নির্মাণ এবং মোটরগাড়ি মেরামত-সংক্রান্ত পেশায় বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য সুযোগ রয়েছে। নির্দিষ্ট যোগ্যতা ও নিয়োগব্যবস্থার আওতায় এসব দেশে কর্মী পাঠানোর সম্ভাবনা কাজে লাগাতে চায় সরকার। এ ছাড়া রাশিয়া ও ইউরেশিয়ার বিভিন্ন দেশে পোশাক ও উৎপাদনশিল্পে কারিগরি দক্ষতাসম্পন্ন কর্মীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ছে। মালদ্বীপ ও সেশেলসের আবাসন, নির্মাণ এবং পর্যটন খাতেও বাংলাদেশি আধা-দক্ষ কর্মীদের চাহিদা রয়েছে। ফলে প্রচলিত শ্রমবাজারের বাইরে কর্মসংস্থানের গন্তব্য বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
অভিবাসন ব্যয় কমানো ও সুরক্ষায় ডিজিটাল ব্যবস্থা
বিদেশে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের অন্যতম বড় সমস্যা অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয়, প্রতারণা এবং দালালচক্রের দৌরাত্ম্য। এসব সমস্যা মোকাবিলায় বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বিশেষ ডিজিটাল 'মাইগ্র্যান্ট কার্ড' ব্যবস্থা চালু করেছে সরকার। এ প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে প্রবাসীরা রেমিট্যান্সের ওপর বিশেষ ব্যাংকিং সুবিধা, নির্দিষ্ট বিমা সুরক্ষা এবং বিদেশে জরুরি আইনি সহায়তা পাওয়ার সুযোগ পাবেন। একই সঙ্গে অননুমোদিত মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য বন্ধ, অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ অনিয়মিত অভিবাসন প্রতিরোধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারি বৈধ চ্যানেল ও আধুনিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে নিয়োগপ্রক্রিয়া পরিচালনা করে কর্মীদের প্রতারণার ঝুঁকি কমাতে চায় সরকার।