ঢাকা শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ১৬ কার্তিক ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

প্রধানমন্ত্রীর ফ্লাইটে কারিগরি ত্রুটি

বিমানের ৪ সদস্যের তদন্ত কমিটি

জাপান সফর শেষে দেশে প্রধানমন্ত্রী
বিমানের ৪ সদস্যের তদন্ত কমিটি

জাপানের নারিতা থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তার সফরসঙ্গীদের বহনকারী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটে কারিগরি ত্রুটির কারণ অনুসন্ধানে চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। গতকাল শুক্রবার বিমানের পরিচালক (প্রশাসন ও মানবসম্পদ) এয়ার কমডোর নিয়ামুল কবীর এক অফিস আদেশে এ তথ্য জানিয়েছেন। এতে বলা হয়, বিমানের চিফ (প্ল্যানিং অ্যান্ড সিডিউলিং)-কে সভাপতি এবং ব্যবস্থাপক (আইনবিষয়ক)-কে সদস্য সচিব করে কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির অন্য দুই সদস্য হলেন—চিফ ইঞ্জিনিয়ার (ইঞ্জিনিয়ারিং প্রডাকশন) এবং ডেপুটি চিফ (ফ্লাইট সেফটি)। তবে প্রয়োজনে কমিটি বিমানের যে কোনো কর্মকর্তাকে অন্তর্ভুক্ত (কো-অপট) করতে পারবে বলে আদেশে বলা হয়েছে। এর আগে বৃহস্পতিবার নারিতা-ঢাকা রুটে পরিচালিত বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের 'ফ্লাইট বিজি ৩৭৭'-এ এই কারিগরি ত্রুটি ধরা পড়ে। চার দিনের সরকারি সফরে গত ২৬ অক্টোবর জাপান গিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

সফর শেষে স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টায় ফ্লাইটটি ঢাকার উদ্দেশে রওনা হওয়ার কথা থাকলেও ত্রুটির কারণে প্রায় ৫ ঘণ্টা বিলম্বিত হয় এবং প্রধানমন্ত্রীসহ যাত্রীদের বিমানবন্দরের লবিতে অবস্থান করতে হয়। ও ঘটনায় কমিটিকে চার কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও সিইও বরাবর দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

কমিটির কার্যপরিধি : জাপানের নারিতা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে উড্ডয়নের আগে উড়োজাহাজটিতে সংঘটিত কারিগরি ত্রুটির প্রকৃত কারণ ও ধরন উদ্ঘাটন করা। ত্রুটি শনাক্তকরণ, নিরসন ও পরবর্তী সময়ে উড্ডয়ন উপযোগিতা নিশ্চিতকরণে গৃহীত পদক্ষেপ পর্যালোচনা করা। এ ঘটনার ফলে ফ্লাইটের বিলম্ব, অতিরিক্ত পরিচালনা ব্যয়, যাত্রীদের ভোগান্তি এবং বিমানের প্রাতিষ্ঠানিক ভাবমূর্তির ওপর পড়া প্রভাব নিরূপণ করা। ঘটনায় কারও দায়িত্বে অবহেলা, সমন্বয়হীনতা বা প্রক্রিয়াগত ত্রুটি ছিল কি না, তা যাচাই করে দায়-দায়িত্ব নির্ধারণ করা। ভবিষ্যতে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়াতে প্রয়োজনীয় সুপারিশমালা প্রদান করা।

জাপান সফর শেষে দেশে ফিরেছেন প্রধানমন্ত্রী : দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদার, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে জাপানে চার দিনের সরকারি সফর শেষে দেশে ফিরেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গত বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে দেশে ফেরেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব শাহাদাৎ স্বাধীন জানান, 'প্রধানমন্ত্রী, তার স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান এবং তার সফরসঙ্গীদের বহনকারী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইট আজ রাত ২টা ৪৮ মিনিটে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে।' তিনি আরও জানান, ফ্লাইটটি বৃহস্পতিবার জাপানের স্থানীয় সময় রাত ১০টা ৫৫ মিনিটে টোকিওর নারিতা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেয়। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রী এসে পৌঁছালে বিমানবন্দরে তাকে অভ্যর্থনা জানাতে উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী, জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি, মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী প্রমুখ।

জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আমন্ত্রণে গত ২৬ থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত জাপান সফর করেন তারেক রহমান। সফরকালে তিনি উচ্চপর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় অংশ নেন, জাপানের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও ব্যবসায়িক নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শিল্প ও জ্বালানি স্থাপনা পরিদর্শন করেন। ২৭ অক্টোবর জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ বৈঠকে দুই নেতা বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি নিরাপত্তা, অবকাঠামো, প্রযুক্তি, মহাকাশ গবেষণা এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিষয়ে সহযোগিতা জোরদার করার বিষয়ে আলোচনা করেন।

এছাড়া, বাংলাদেশের জ্বালানি, অবকাঠামো এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) খাতে এক ট্রিলিয়ন জাপানি ইয়েন (প্রায় ৬.৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার) বেসরকারি বিনিয়োগের প্রস্তাব নিয়েও তাঁরা আলোচনা করেন। বিনিয়োগ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের গতি ত্বরান্বিত করতে জাপানি একটি প্রতিনিধি দলকে বাংলাদেশে পাঠানোর বিষয়েও তাঁরা আলোচনা করেন। সফরকালে বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে ছয়টি দ্বিপক্ষীয় সমঝোতা দলিল স্বাক্ষরিত হয়েছে। পাশাপাশি, মোট ৪৬.৫৬ বিলিয়ন জাপানি ইয়েন (প্রায় ২৯৫.৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার) মূল্যের দুটি 'ইয়েন-লোন' (ঋণ সহায়তা) প্রকল্পের প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে। এই চুক্তিগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের উপকূলীয় নিরাপত্তা সক্ষমতা জোরদার করার লক্ষ্যে একটি টহল জাহাজ সংগ্রহের জন্য ২.১২ বিলিয়ন জাপানি ইয়েন (১৩.৪৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার) পর্যন্ত অনুদান সহায়তা সংক্রান্ত চুক্তিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। উভয় দেশ ব্যবসায়িক পরিবেশের উন্নয়ন, কৃষি, দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে কর্মসংস্থান কর্মসূচি এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে সহযোগিতার বিষয়ে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছে। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক সহযোগিতার জন্য একটি 'লেটার অব ইনটেন্ট' বা আগ্রহপত্রও স্বাক্ষরিত হয়েছে। ঋণ সহায়তাপুষ্ট দুটি প্রকল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশে বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নয়ন এবং 'উপজেলা শাসন ও উন্নয়ন প্রকল্প'-এর দ্বিতীয় পর্যায় বাস্তবায়নে সহায়তা করা হবে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির জানিয়েছেন, সরকারি পর্যায়ের চুক্তির বাইরেও জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশন (জেট্রো)-তে বেসরকারি খাতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১৭টি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়েছে।

গত ২৮ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী টোকিওতে জেট্রো সদর দপ্তরে আয়োজিত 'বাংলাদেশ-জাপান ইকোনমিক ফোরাম ডায়ালগ'-এ বক্তব্য রাখেন। এ সময় তিনি জাপানি কোম্পানিগুলোকে বাংলাদেশের পাঁচটি অগ্রাধিকারমূলক খাত-অটোমোবাইল উৎপাদন, জ্বালানি, প্রযুক্তি ও মহাকাশ খাত, উচ্চগতির রেল ও লজিস্টিকস এবং কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে বিনিয়োগের আহ্বান জানান। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ব্যবসায়িক পরিবেশ উন্নয়নের লক্ষ্যে সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহায়তা ও সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেন। সফরকালে তিনি জাপানের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, উন্নয়ন সহযোগী এবং ব্যবসায়িক নেতাদের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেন।

তাঁদের মধ্যে ছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী তারো আসো, জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সির (জাইকা) প্রেসিডেন্ট ড. আকিহিকো তানাকা, জাপান ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশনের (জেবিআইসি) গভর্নর কাজুহিকো আমাকাওয়া এবং জেট্রোর প্রেসিডেন্ট সুসুমু কাতাওকা।

পোশাক খাতের জায়ান্ট ইউনিক্লো, মিতসুই অ্যান্ড কোং, সুমিতোমো কর্পোরেশন এবং জেরা-সহ জাপানের বড় বড় কোম্পানির প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, কারখানা স্থাপন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগগুলো নিয়ে আলোচনা করেন।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত