প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১১ জানুয়ারি, ২০২৬
ইসলামে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রধান প্রতিপাদ্য হলো, তা হালাল পন্থায় হওয়া। হারাম পন্থায় উপার্জনকারী রাতারাতি আঙুল ফুলে কলাগাছ হলেও একসময় তা ধ্বংস ও বিনাশের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হয়। তাইতো পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ অন্যায়ভাবে সম্পদ উপার্জনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে বলেন, ‘হে ঈমানদাররা! তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস কোরো না; শুধু তোমাদের পরস্পরের সম্মতিক্রমে যে ব্যবসা করা হয়, তা বৈধ।’ (সুরা নিসা : ২৯)। ব্যবসায় সততা ও আমানতদারি অত্যাবশ্যক। এতে যেমন বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি এবং ক্রেতা প্রতারিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না, তেমনি ব্যবসায়ীর উপার্জনও হয় শতভাগ হালাল, বিশুদ্ধ ও বরকতময়। উপরন্তু সে পরকালে আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের সঙ্গে দাঁড়ানোর মহাসৌভাগ্য অর্জন করবে। রাসুল (সা.) বলেন, ‘সত্যবাদী ও আমানতদার ব্যবসায়ী (কেয়ামতের দিন) নবী, সিদ্দিক ও শহিদদের সঙ্গে থাকবে।’ (তিরমিজি : ১২০৯)। রাসুল (সা.)-কে সর্বোত্তম উপার্জন সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে বললেন, ‘নিজ হাতে কাজ করা এবং হালাল পথে ব্যবসা করে যে উপার্জন করা হয়, তা-ই সর্বোত্তম।’ (মুসনাদে আহমদ : ১৭২৬৫)।
হারাম পণ্যের বেচাকেনা অবৈধ : যেসব পণ্যের পানাহার বা ব্যবহার ইসলামে হারাম, সেসবের ক্রয়-বিক্রয়ও হারাম। যেমন- গান-বাজনা করে রোজগার, মদ ও দেহ ব্যবসা এবং ভাগ্য নির্ণয় করে জীবিকা নির্বাহ করা। রাসুল (সা.) বলেন, ‘তোমরা গায়িকা বিক্রি কোরো না, ক্রয়ও কোরো না এবং তাদের গানের প্রশিক্ষণও দেবে না। এদের ব্যবসায় কোনো কল্যাণ নেই এবং এদের বিনিময় মূল্য হারাম।’ (তিরমিজি : ১২৮২)। এ ধরনের লোকদের ব্যাপারে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘কিছু মানুষ এমন, যারা অজ্ঞতাবশত আল্লাহর পথ থেকে মানুষকে বিচ্যুত করার জন্য খরিদ করে আনে এমন সব কথা, যা আল্লাহ সম্পর্কে উদাসীন করে দেয় এবং তারা আল্লাহর পথকে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করে। তাদের জন্য আছে লাঞ্চনাকর শাস্তি।’ (সুরা লোকমান : ৬)। আবু মাসউদ আনসারি (রা.) বলেন, ‘আল্লাহর রাসুল (সা.) কুকুরের মূল্য, ব্যভিচারের বিনিময় এবং গণকের বখশিশ ভোগ করতে নিষেধ করেছেন।’ (বোখারি : ২২৩৭)। তা ছাড়া প্রয়োজনে কাউকে রক্ত দেওয়া বৈধ। তবে এর বিনিময় নেওয়া অবৈধ। কেননা, শরিয়তে রক্ত বেচাকেনা নিষেধ। (বোখারি : ২২৩৮)। অবশ্য বিনামূল্যে পাওয়া না গেলে ক্রয় করা জায়েজ। তবে রক্তদানকারীর জন্য মূল্য নেওয়া জায়েজ হবে না। (জাওয়াহিরুল ফিকহ : ২/২৩)। যেসব ব্লাড ব্যাংকে লোকেরা স্বেচ্ছায় ব্লাড দান করে এবং ব্যাংকগুলো অভাবগ্রস্তকে বিনামূল্যে রক্ত সরবরাহ করে, সেখানে মুসলমানদের জন্য রক্তদান করা জায়েজ। এটি মানবসেবার অন্তর্ভুক্ত। (কিতাবুন নাওয়াজিল : ১৬/২১৫)।
মিথ্যা বলে বিক্রি করা অন্যায় : লাভ বেশি করার জন্য মিথ্যা কথা বলা চরম অন্যায়। এতে ক্রেতা প্রতারিত ও প্রবঞ্চিত হয়। তেমনিভাবে ক্রেতাকে আশ্বস্ত করার জন্য মিথ্যা শপথ করা মারাত্মক অপরাধ। এর শাস্তি খুবই ভয়াবহ। রাসুল (সা.) বলেন, ‘আল্লাহতায়ালা কেয়ামতের দিন তিন শ্রেণির লোকের সঙ্গে কথা বলবেন না, তাদের দিকে তাকাবেনও না এবং তাদের পবিত্র করবেন না; বরং তাদের জন্য রয়েছে ভয়ানক শাস্তি।’ বর্ণনাকারী বলেন, ‘রাসুল (সা.) এ কথাটি তিনবার বললেন।’ আবু জর (রা.) বলে উঠলেন, ‘তারা তো ধ্বংস ও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। হে আল্লাহর রাসুল! এরা কারা?’ তিনি বলেন, ‘টাখনুর নিচে কাপড় পরিধানকারী, অনুগ্রহ করে খোঁটা দানকারী এবং মিথ্যা শপথ করে পণ্য বিক্রয়কারী।’ (মুসলিম : ১৯৪)। যত দিয়ে কেনা হয়েছে, তা থেকে বাড়িয়ে কেনা মূল্য বলা নাজায়েজ। তবে পণ্য আমদানির গাড়ি ভাড়া, পণ্যটি রং করা, সেলাই করা ইত্যাদি আনুষঙ্গিক খরচ ধরে এভাবে বলা যেতে পারে যে, পণ্যটিতে আমার এত টাকা খরচ পড়েছে। যেমন- কোনো বস্তু একশ’ টাকা দিয়ে কেনার পর সেটিতে আনুষঙ্গিক আরও বিশ টাকা খরচ হলো। তখন এভাবে বলবে না যে, এটি ১২০ টাকা দিয়ে কিনেছি; বরং বলবে, ১২০ টাকা খরচ পড়েছে। এতে মিথ্যা হবে না। (কানজুদ দাকায়েক : ৪৪৫)।
পণ্যের ত্রুটি প্রকাশ করা চাই : পণ্যের প্রকৃত রূপ ক্রেতার সামনে উপস্থাপন করা বিক্রেতার কর্তব্য। পণ্যের পচা বা ছেঁড়া অংশ লুকিয়ে রাখা, নষ্ট অংশ গোপন রাখা চরম অন্যায়। একইভাবে উত্তম পণ্য দেখিয়ে তার সঙ্গে খারাপগুলোও গুজে দেওয়া খুবই ঘৃণ্য কাজ। রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি পণ্যের ত্রুটি বর্ণনা না করে (বরং গোপন করে) বিক্রি করে, সে সর্বদা আল্লাহর গজবে থাকে এবং ফেরেশতারা সব সময় তাকে অভিসম্পাত করতে থাকে।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ : ২২৪৭)। ত্রুটিযুক্ত বস্তু বিক্রি করতে চাইলে তা ক্রেতাকে বলে দেবে। না বলে বিক্রি করা ধোঁকার শামিল এবং হারাম। (আল বাহরুর রায়েক : ৬/৩৫)। অন্য কিছু কেনার পর যদি কোনো ত্রুটি দেখা দেয় (যেমন- কাপড়ের ভেতরে ফাটা, পণ্যের একাংশ নষ্ট), তাহলে ক্রেতা ইচ্ছে করলে পণ্য ফেরত দিয়ে মূল্য নিয়ে আসতে পারবে। তবে ত্রুটির কারণে টাকা কম দিতে পারবে না। বিক্রেতা যদি মূল্য কমিয়ে দিতে সম্মত হয়, তাহলে কোনো অসুবিধা নেই। (শরহুল বিদায়া : ২/৪৩)। অবশ্য পণ্য কিনে আনার পর যদি নিজের লোকেরা ত্রুটিযুক্ত করে ফেলে, এরপর ভেতরে দেখা গেল, আরও অন্যান্য ত্রুটি রয়েছে; যেমন- একটি কাপড় কিনে আনার পর তার ছেলে একটি কোনো কাঁচি দিয়ে কেটে ফেলেছে, এরপর ভেতরে আরও অন্যান্য ত্রুটি পরিলক্ষিত হয়, তাহলে এ কাপড়টি ত্রুটিযুক্ত থাকা সত্ত্বেও ফেরত দেওয়া যাবে না। (আদ্দুররুল মুখতার : ২/১০৯)। শসা, তরমুজ, লাউ ইত্যাদি কেনার পর যদি ভেতরে এত খারাপ হয় যে, কোনোভাবেই তা ব্যবহারযোগ্য নয়, তাহলে এই বিক্রি অশুদ্ধ বিবেচিত হবে এবং সব মূল্য ফেরত দিতে হবে। আর যদি কোনো কাজে আসার যোগ্য হয়, তাহলে বাজারে এর যতটুকু দাম হতে পারে, সে হিসেবে মূল্য পরিশোধ করতে হবে; সম্পূর্ণ মূল্য নয়। (আদ্দুররুল মুখতার : ৪/১১৭)। অবশ্য বিক্রেতা যদি কোনো পণ্য বিক্রির সময় বলে দেয়, ভালো করে দেখে নাও; কোনো দোষ-ত্রুটি থাকলে আমি দায়ী নই। এরপর দোষ-ত্রুটি পাওয়া গেলে তা ফেরতযোগ্য নয়। এভাবে বিক্রি করা জায়েজ আছে। (কানজুদ দাকায়েক : ২৩৮)। কোনো পণ্য কেনার পর যদি ব্যবহার করে, এরপর ত্রুটি দেখা গেলে তা ফেরতযোগ্য নয়। তবে ঠিকমতো হচ্ছে কি-না, তা দেখার জন্য যদি গায়ে দিয়ে থাকে, তাহলে তা ফেরত দিতে পারবে। (ফতোয়ায়ে শামি : ৪/১১৪)।
বিক্রয়ে প্রতারণা চরম অপরাধ : হালাল ব্যবসার একটি অন্যতম দিক হলো, তা ভেজাল ও প্রতারণামুক্ত হওয়া এবং কথায়-কাজে মিল থাকা ও সঠিক পরিমাপ নিশ্চিত করা। অন্যের ওজনে কম দেওয়া জঘন্য অপরাধ। এটাও প্রতারণার শামিল। যারা ওজনে কম দেয়, তাদের প্রতি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে মহান আল্লাহ বলেন, ‘মন্দ পরিণাম তাদের, যারা মাপে কম দেয়। যারা মানুষের কাছ থেকে মেপে নেওয়ার সময় পুরো মাত্রায় গ্রহণ করে এবং যখন তাদের জন্য মাপে অথবা ওজন করে দেয়, তখন কম দেয়।’ (সুরা মুতাফফিফিন : ১-৩)। তা ছাড়া প্রদর্শিত পণ্য এবং প্রদত্ত পণ্যের মধ্যে ব্যবধান থাকা যাবে না। উপরে ভালোগুলো দেখিয়ে নিচে তুলনামূলক খারাপগুলো ধরিয়ে দেওয়ার নির্লজ্জ মানসিকতা পরিহারযোগ্য। আবু হুরায়রা (রা.) সূত্রে বর্ণিত; একবার রাসুল (সা.) খাদ্যশস্যের একটি স্তূপের পাশ দিয়ে অতিক্রম করলেন। তিনি স্তূপের ভেতর হাত ঢুকিয়ে দিলেন, ফলে হাতের আঙুলগুলো ভিজে গেল। তিনি বললেন, ‘হে স্তূপের মালিক! এ কী ব্যাপার?’ লোকটি বলল, ‘হে আল্লাহর রাসুল! এতে বৃষ্টির পানি পড়েছে।’ তিনি বললেন, ‘সেগুলো তুমি স্তূপের ওপর রাখলে না কেন? তাহলে লোকেরা দেখে নিতে পারত। যে ধোঁকাবাজি করে, সে আমার দলভুক্ত নয়।’ (মুসলিম : ১৮৫)। এ জন্য কেউ যদি উপরে ভালো নমুনা দেখিয়ে নিচে খারাপ পণ্য দিয়ে দেয়, তাহলে ক্রেতার এখতিয়ার থাকবে। ইচ্ছা করলে নিতে পারবে, আবার ফেরত দিতেও পারবে। (ফতোয়ায়ে শামি : ৪/৯০)।
অনিশ্চিত বস্তু বিক্রয়যোগ্য নয় : শরিয়তের বিধান হচ্ছে, অনিশ্চিত বা সম্ভাব্য বস্তু বিক্রি করা যাবে না। কেননা, এতে ক্রেতা প্রতারিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ জন্যই বিশ্বনবী (সা.) বিশেষ কিছু পদ্ধতির কেনাবেচা করতে নিষেধ করেছেন। আবু সাঈদ খুদরি (রা.) সূত্রে বর্ণিত; তিনি বলেন, ‘রাসুল (সা.) গবাদি পশুর গর্ভস্থ বাচ্চা প্রসবের আগে, পশুর স্তনের দুধ পরিমাণ না করে, পলাতক গোলাম, গনিমতের মাল বন্টনের আগে, দান-খয়রাত হস্তগত হওয়ার আগে এবং ডুবরির বাজির (ডুব দিয়ে যা পাবে) ভিত্তিতে কেনাবেচা করতে নিষেধ করেছেন।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ : ২১৯৬)।
অতএব, পশুর বাচ্চা প্রসবের আগে বিক্রি করা নাজায়েজ। এমনিভাবে পেটের বাচ্চা ছাড়া শুধু পশু বিক্রি করাও অবৈধ। তবে পশুসহ বাচ্চা বিক্রি করা জায়েজ আছে। (বেহেশতি জেওর : ৫/১১)। সেই সঙ্গে কোনো বস্তু স্বত্বাধিকার বা হস্তগত হওয়ার আগে বিক্রি করা যাবে না। কেননা, কোনো পণ্য বিক্রি করা হয় তা ক্রেতাকে হস্তান্তরের নিমিত্তে। আর পণ্য নিজের আয়ত্তে আসার আগে হস্তান্তর সম্ভব নয়। রাসুল (সা.) বলেন, ‘কোনো ব্যক্তি খাদ্যশস্য ক্রয় করলে সে যেন তা হস্তগত করার আগে বিক্রি না করে।’ (বোখারি : ২১৩৩)।