
টানা বৃষ্টি ও দেশের বিভিন্ন এলাকায় বন্যার প্রভাবে রাজধানীর নিত্যপণ্যের বাজারে অস্থিরতা বেড়েছে। চলতি সপ্তাহে গরুর মাংসের দাম স্থিতিশীল থাকলেও মাছ, ডিম, পেঁয়াজ, কাঁচা মরিচ ও অধিকাংশ সবজি এখন ১০০ টাকার আশেপাশে বিক্রি হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত ক্রেতারা। গতকাল শুক্রবার রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে।
বিক্রেতারা বলছেন, টানা বৃষ্টি ও দেশের বিভিন্ন এলাকায় বন্যার কারণে কৃষিপণ্য ও মাছের সরবরাহে বিঘ্ন ঘটেছে। পাশাপাশি পাইকারি বাজারে দাম বেড়ে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে খুচরা বাজারেও। পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং অনেক এলাকায় উৎপাদন কমে যাওয়ায় মরিচ, পেঁয়াজ, মাছ, ডিম ও সবজির দাম একসঙ্গে বেড়েছে। তাদের দাবি, তারা বেশি দামে পণ্য কিনতে বাধ্য হওয়ায় খুচরা বাজারেও বাড়তি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।
বাজার ঘুরে দেখা গেছে, সপ্তাহের ব্যবধানে অধিকাংশ মাছের দাম কেজিতে ২০ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। গরিবের মাছ হিসেবে পরিচিত পাঙাশের কেজি এখন ২৩০ টাকা, তেলাপিয়া ২৬০ টাকা, রুই ৩০০ থেকে ৪৫০ টাকা, পাবদা ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা, চিংড়ি ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা, টেংরা ৭০০ টাকা, দেশি কৈ ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা এবং শোল মাছ ৭০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ভেটকি, মৃগেল, বাইম, শিং ও পোয়া মাছের দামও আগের তুলনায় বেড়েছে।
সামুদ্রিক মাছের বাজারে দাম আরও বেশি। ধুপখোলা বাজারের মাছ বিক্রেতা আনোয়ার হোসেন বলেন, বর্তমানে মান ও আকারভেদে প্রতিকেজি ইলিশ ১ হাজার ৬০০ থেকে ৩ হাজার ২০০ টাকা, রূপচাঁদা ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা, লাল কোরাল ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা, টুনা ৮৫০ থেকে ১ হাজার টাকা এবং সামুদ্রিক সুরমা ৭০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বাজারভেদে এসব দামে কিছুটা তারতম্য হতে পারে। এদিকে কাঁচা মরিচের দাম নতুন করে বেড়ে প্রতি কেজি ৪০০ টাকায় পৌঁছেছে।
এক সপ্তাহের ব্যবধানে কেজিতে প্রায় ১০০ টাকা বেড়েছে এ পণ্যের দাম। নারিন্দা বাজারের সবজি বিক্রেতা লাল মিয়া বলেন, গত সপ্তাহেও কাঁচা মরিচ ২৮০ থেকে ৩০০ টাকায় বিক্রি করেছি। এখন পাইকারি বাজারেই দাম অনেক বেশি, তাই খুচরায় ৪০০ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে। বৃষ্টি কারণে অধিকাংশ সবজি খেত তলিয়ে গেছে। এ কারণে সবজির সরবরাহ কম। এ জন্য অল্প কিছু সবজি বাদে সব সবজির দাম বেশি।
পেঁয়াজের বাজারেও ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। দেড়-দুই সপ্তাহ আগে ৪০ থেকে ৪৫ টাকায় বিক্রি হওয়া দেশি পেঁয়াজ এখন মানভেদে ৫৫ থেকে ৬৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
রায়সাহেব বাজারের বিক্রেতা এনামুল হক বলেন, পাইকারি বাজারে হঠাৎ করেই পেঁয়াজের দাম বেড়েছে। আগে যে পেঁয়াজ ৪০ টাকায় বিক্রি করেছি, এখন সেটিই ৬০ টাকা বা তার বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।
সবজির বাজারেও স্বস্তি নেই। অধিকাংশ সবজি এখন ১০০ টাকার আশপাশে বিক্রি হচ্ছে। লম্বা বেগুন ১২০ থেকে ১৫০ টাকা, গোল বেগুন ১৮০ টাকা, সাদা বেগুন ১৪০ টাকা, করলা ১২০ থেকে ১৪০ টাকা, বরবটি ১১০ থেকে ১৩০ টাকা, চিচিঙ্গা ৯০ থেকে ১০০ টাকা এবং কচুরমুখি ৮০ থেকে ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে ধুন্দল ও পটোলের দাম কিছুটা কমে ৬০ থেকে ৮০ টাকায় নেমেছে।
ডিমের দামও নতুন করে বেড়েছে। বর্তমানে ফার্মের মুরগির ডিম প্রতি ডজন ১৪৫ থেকে ১৫৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা এক সপ্তাহ আগেও ছিল ১৩৫ থেকে ১৪০ টাকা। তবে ব্রয়লার মুরগি ১৮০ থেকে ১৯০ টাকা এবং সোনালি মুরগি ৩৩০ থেকে ৩৪০ টাকা কেজিতে বিক্রি হওয়ায় দাম তুলনামূলক স্থিতিশীল রয়েছে।
অন্যদিকে গরুর মাংসের দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। প্রতিকেজি গরুর মাংস ৭৫০ থেকে ৮০০ টাকা এবং খাসির মাংস ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
ক্রেতারা বলছেন, টানা বৃষ্টি, বন্যা ও সরবরাহ সংকটের কারণে প্রতিনিয়ত বাড়ছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম। এতে সীমিত আয়ের মানুষের সংসার চালানো দিন দিন আরও কঠিন হয়ে উঠছে।
রিকশাচালক মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, প্রতিদিন যা আয় করি, তার বড় একটা অংশ এখন বাজারেই চলে যায়। আগে সপ্তাহে এক-দুদিন মাছ কিনতে পারতাম, এখন ডিম আর সবজি কিনেই হিসাব মেলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। কাঁচা মরিচের মতো একটা সাধারণ জিনিসও ৪০০ টাকা কেজি হলে আমাদের মতো মানুষের জন্য খুব কষ্টকর।
ধুপখোলা বাজারের ক্রেতা নাসরিন আক্তার বলেন, শুধু মরিচ নয়, ডিম, পেঁয়াজ আর সবজির দামও একসঙ্গে বেড়েছে। কয়েক দিন আগেও যে ডজন ডিম ১৩৫-১৪০ টাকায় কিনেছি, এখন ১৫০ টাকার কাছাকাছি দিতে হচ্ছে। বাজারে এসে প্রতিদিনই হিসাব বদলাতে হচ্ছে। সাধারণ মানুষের জন্য এই দাম অনেক কষ্টের।