
বাংলাদেশ পুলিশের জন্য ৬ হাজার ৬০৯ কোটি টাকা ব্যয়ে ৫ হাজার ৮৩০টি গাড়ি কেনার উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার। দেশের ৬৩৯টি থানায় বর্তমানে গড়ে দুটি করেও গাড়ি নেই। এমন পরিস্থিতিতে এই উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
পরিকল্পনা কমিশনের প্রস্তাবনায় উল্লেখ করা হয়েছে, বর্তমানে থানাগুলোতে মাত্র ১ হাজার ২৩৭টি গাড়ি আছে। এর মধ্যে ৬৪ শতাংশ গাড়ির বয়স ১০ বছরের বেশি। পুরোনো এসব গাড়ির কারণে পুলিশের নিয়মিত টহল, অপরাধ তদন্ত এবং জরুরিসেবা কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটছে।
গাড়ি কেনাকাটা দুটি প্রকল্পের মাধ্যমে সম্পন্ন হবে। এর মধ্যে ৪ হাজার ৮২৯টি অপারেশনাল গাড়ি কেনার জন্য ৪ হাজার ৩২৮ দশমিক ৯২৪৭ কোটি টাকা এবং ১ হাজার ১টি বিশেষায়িত (স্পেশালাইজড) গাড়ি কেনার জন্য ২ হাজার ২৮০ দশমিক ১৪১৪ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
পরিকল্পনা বিভাগের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, এই দুটি প্রকল্পই ২৫ অক্টোবর অনুষ্ঠেয় জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদনের জন্য পেশ করার কথা আছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে পুলিশের ১ হাজার ৭৪টি গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর পরিবহন সংকট আরও তীব্র হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত এসব গাড়ির মধ্যে ৪৫৫টি পুরোপুরি পুড়িয়ে ফেলা হয়েছিল।
গত ৩০ মার্চ জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, গণঅভ্যুত্থানের সময় অনেক গাড়ি পুড়ে যাওয়া বা ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ায় পুলিশের টহল ও আইনশৃঙ্খলা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, পুলিশের সক্ষমতা ফেরাতে এবং ক্ষতিগ্রস্ত গাড়ি পরিবর্তে নতুন গাড়ি সরবরাহ করতে সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছে।
তবে এই প্রস্তাবিত কেনাকাটার লক্ষ্য শুধু ক্ষতিগ্রস্ত গাড়ি প্রতিস্থাপন নয়; বরং পুলিশের সামগ্রিক পরিবহন সংকট দূর করা এবং তাদের বিশেষায়িত সক্ষমতা আরও জোরদার করা।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবিত এই প্রকল্পগুলো বাংলাদেশ পুলিশ ২০২৬ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৯ সালের জুন মাসের মধ্যে বাস্তবায়ন করবে। এই প্রকল্পের পুরো খরচ সরকার বহন করবে।
প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, প্রতিটি থানার অধীনে সাধারণত বেশ কয়েকটি ইউনিয়ন বা ওয়ার্ড থাকে। বিভিন্ন এলাকায় একই সঙ্গে টহল বা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রতিটি থানায় অন্তত চারটি থেকে পাঁচটি পিকআপ বা টহল গাড়ির প্রয়োজন হয়। তবে জনবহুল ও অপরাধপ্রবণ এলাকাগুলোর ক্ষেত্রে এর চেয়েও বেশি গাড়ির প্রয়োজন হতে পারে।
অনেক থানায় মাত্র একটি বা দুটি গাড়ি থাকায় কোনো অভিযানে একটি দল পাঠালে অন্য এলাকাগুলোতে পর্যাপ্ত টহল বা তাৎক্ষণিক পুলিশি সহায়তা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
পুলিশ সদরদপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (মিডিয়া) কামারুম মুনিরা বলেন, মূলত পরিবহন সংকট দূর করা এবং পুলিশের কার্যক্রমকে গতিশীল করার উদ্দেশ্যেই গাড়ি কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, ভবিষ্যতে বাহিনীর গাড়ির প্রয়োজনীয়তা পুনরায় মূল্যায়ন করা হবে এবং প্রয়োজন সাপেক্ষে আরও গাড়ির জন্য আবেদন করা হতে পারে।
নিয়মিত টহল, অপরাধ ও মাদকবিরোধী অভিযান, গ্রেপ্তার এবং জরুরি সেবা প্রদানে পুলিশের গতিশীলতা বাড়ানোর লক্ষ্যেই এই 'অপারেশনাল যানবাহন' প্রকল্পটি হাতে নেওয়া হয়েছে।
একইসঙ্গে, জাতীয় নির্বাচন বা বড় কোনো আয়োজনের সময় যখন সারা দেশে পুলিশকে একযোগে কাজ করতে হয়, তখন অতিরিক্ত গাড়ির প্রয়োজনীয়তার ওপরও প্রকল্প প্রস্তাবনায় গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সাধারণ যানবাহন প্রকল্পের লক্ষ্য হলো নিয়মিত টহল, অপরাধ ও মাদকবিরোধী অভিযান, গ্রেপ্তার এবং জরুরি সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে পুলিশের সক্ষমতা বাড়ানো।
এছাড়া জাতীয় নির্বাচন ও বড় ধরনের অনুষ্ঠানের সময়, যখন সারা দেশে পুলিশকে একযোগে কাজ করতে হয়, তখন অতিরিক্ত গাড়ির প্রয়োজনীয়তার কথা প্রস্তাবনায় তুলে ধরা হয়েছে।
অন্যদিকে, বিশেষায়িত যানবাহন প্রকল্পের লক্ষ্য হলো সংঘাত নিয়ন্ত্রণ, অপরাধ তদন্ত এবং দুর্গম এলাকায় অভিযান পরিচালনায় পুলিশের সক্ষমতা বাড়ানো।
প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, রায়ট কারগুলো জনশৃঙ্খলা রক্ষা ও জরুরি অবস্থায় পুলিশের সাড়া দেওয়ার সক্ষমতা বাড়াবে। আর যেখানে সাধারণ টহল গাড়ি যেতে পারে না সেখানে যাবে অল-টেরেইন ভেহিকেল। মোবাইল কমান্ড সেন্টারগুলো অস্থায়ী নিয়ন্ত্রণ কক্ষ (কন্ট্রোল রুম) হিসেবে কাজ করবে, যার ফলে উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা ব্যবহার করে পুলিশ অভিযান পর্যবেক্ষণ ও সমন্বয় করতে পারবে। এ ছাড়া, ক্রাইম সিন ভ্যানগুলো অপরাধের পরপরই ঘটনাস্থল থেকে আলামত সংগ্রহে তদন্তকারীদের সহায়তা করবে, এটি অপরাধ তদন্ত এবং সন্দেহভাজনদের শনাক্তকরণ প্রক্রিয়া সহজ করবে। এসবের পাশাপাশি নদীমাতৃক এলাকায় টহল, জরুরি পরিস্থিতিতে সাড়া দেওয়া এবং উদ্ধারকাজ পরিচালনায় জলযানের প্রয়োজনীয়তার ওপরও প্রস্তাবনায় জোর দেওয়া হয়েছে। নথিপত্র অনুযায়ী, দেশের ৬৩৯টি প্রশাসনিক থানার বাইরেও বাংলাদেশ পুলিশের ২৪টি রেলওয়ে এবং ৭৩টি হাইওয়ে থানা আছে।