
ঢাকার রাস্তায় আগে গভীর রাতে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ করতেন সিটি করপোরেশন থেকে নিয়োগকৃত কর্মীরা। এরপর সারাদিন আবর্জনা জমে পুরো শহর নোংরা হয়ে থাকত। দিনের আলো না নিভলে দেখা মিলতো না পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের। কিন্তু সেই দৃশ্য এখন বদলে গেছে। ঢাকা শহরকে পরিচ্ছন্ন রাখতে ভোর, দুপুর এবং রাত মিলে তিন বেলা পরিচ্ছন্নতার কাজ চলে। তিনটি দলে বিভক্ত হয়ে এই পরিচ্ছন্নতার কাজ করেন তারা।
গতকাল শুক্রবার দুপুরে ফার্মগেট মোড়ে একটুখানি ময়লা পড়েছিল একটি পান দোকানের সামনে। আর তা ঝাড়ু দিয়ে নিমিষেই পরিষ্কার করে নিলেন পরিচ্ছন্ন কর্মী শারমিন। শুধু শারমিন নয় তার মতো আরও দুজন মিলে এ এলাকায় পরিচ্ছন্নতার কাজ করেন। শারমিন জানান, তিনি সকাল ১১টায় এসেছেন বিকেল ৪টা পর্যন্ত কারওয়ান বাজার টু বিজয় সরণি পর্যন্ত রাস্তার দুই পাশে জমে থাকা ময়লা আবর্জনা পরিষ্কারের কাজ করবেন। এজন্য প্রতি মাসে আট হাজার টাকা করে বেতন দেয় সিটি কর্পোরেশন। বাকি সময়টা তিনি সংসারে দেন। এক ছেলে ও স্বামী নিয়ে তার সংসার।
গ্রামের বাড়ি উত্তরাঞ্চলের গাইবান্ধা জেলার সদর উপজেলায়। কিন্তু ঢাকায় স্থায়ীভাবে বাস করেন তিনি।
তিনি আরও জানান, বিএনপি সরকার আসার পর থেকে তাদের এখন তিন বেলা রাস্তা পরিষ্কারের কাজ করতে হয়, আগে করতে হতো এক বেলা। তবে তিনি আগে থেকেই ছিলেন না। সম্প্রতি নিয়োগ পেয়েছেন। তার মতো কারওয়ান বাজার থেকে বাংলামোটর এলাকা জুড়ে আরও দুইজন কাজ করেন।
এভাবে উত্তর সিটি কর্পোরেশনে তারা এলাকাভিত্তিক ভাগ হয়ে পরিচ্ছন্নতার কাজ করে যাচ্ছেন।
শারমিন এর সঙ্গে যখন কথা হচ্ছিল, আশপাশে তাকিয়ে দেখি ফুটপাত এবং মোড়ে কোনো আবর্জনা নেই। খুঁটিয়ে দেখে ময়লা পরিষ্কার করছেন তারা। হাতে লম্বা বাঁশের সঙ্গে লাগানো ঝাঁড়ু। শারমিনের সঙ্গে রয়েছেন শাওন নামে আরেক সহকর্মী। শাওন, শারমিন এবং আরও একজন যুবক তারা এই এলাকায় কাজ করেন। পুরো ৫ ঘণ্টা তাদের কাজ করতে হয়। তবে যারা ভোরে কাজ শুরু করেন তাদের তিন ঘণ্টাতেই কাজ শেষ হয়ে যায় বলে জানান পরিচ্ছন্ন কর্মী শাওন। কারণ তখন লোকজন তেমন থাকে না।
শাওন জানান, ভোর ৪টা থেকে সকাল ১০টা, সকাল ১১টা থেকে বিকেল ৪টা এবং বিকেল ৪টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত তিনটি দল ফার্মগেট এলাকায় পরিচ্ছন্নতার কাজে নিয়োজিত থাকে। এ কারণে আগের মতো এখন আর ময়লা আবর্জনা জমতে দেওয়া হয় না। এই কাজ করে তিনিও আট হাজার টাকা বেতন পান। তবে বেতন কারো আট, কারো ১২ আবার কারো ২৫ হাজার। যারা ২৫ হাজার টাকা বেতন পান তারা সরকারি। আট হাজার এবং ১২ হাজার টাকা বেতনের কর্মচারীরা আধা সরকারি বলে জানান তিনি।
সরকারি কর্মচারীদের মতো তারা কোনো সুযোগ সুবিধা পান না।
তবুও বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন তারা। কারণ পাঁচ ঘন্টা চাকরি করার পর বিকেল বেলা থেকে রাত পর্যন্ত অনেকের অনেক কিছু করার সুযোগ রয়েছে। এ চাকরিটাকে তারা বাড়তি আয়ের অনুষঙ্গ হিসেবে ভাবছেন।
তাদের সঙ্গে কথা বলার আধা ঘন্টা পর শারমিন শাওনকে ডাক দিলেন এরপর তারা কারওয়ান বাজারের রাস্তার দিকে ঝাড়ু নিয়ে এগিয়ে যেতে শুরু করলেন। এভাবেই প্রতিদিন সকাল ১১টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত শাওন এবং শারমিনের পরিচ্ছন্নতার কাজ চলে। তাদের সঙ্গে কথা শেষ করে কথা হচ্ছিল ফার্মগেটের মোড়ে বাইক নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা সিরাজুল শিকদারের সঙ্গে। সিরাজুল জানান, তিনি গত কয়েক মাস ধরে ফার্মগেট এলাকায় বাইক রাইড শেয়ার করেন। সকালে আসেন তিনি। বাসায় যান রাতে। পুরো সময়টা ফার্মগেট এলাকাতেই থাকা হয়। ফলে এ পরিচ্ছন্নতা অভিযানের অন্যতম সাক্ষী তিনি। সিরাজুলের মতে, ঢাকা শহর আগের থেকে অনেক পরিচ্ছন্ন। এখন দিনে-রাতে পরিচ্ছন্ন কর্মীদের ঝাড়ু দিতে দেখি। ময়লা আবর্জনা তেমন চোখে পড়ে না।
এরপর কথা হলো ফুটপাতের ব্যবসায়ী জয়নাল মুন্সির সঙ্গে। জয়নাল মুন্সি ভাসমান খাবারের দোকান পরিচালনা করেন। জয়নাল মুন্সি বলেন, কখনো কলা কখনো রুটি কখনো আপেল কিংবা পেয়ারার ব্যবসা করি। ক্রেতারা কলা খেয়ে রাস্তায় কলার খোসা ফেলে দিলে আগে অনেকক্ষণ ধরে পড়ে থাকতো। এখন পরিচ্ছন্ন কর্মীরা সেই কলার খোসাসহ যেকোনো আবর্জনা দেখামাত্র তা পরিষ্কার করে ফেলেন। ফলে রাস্তা এখন আর আগের মতো অপরিষ্কার থাকে না।