ঢাকা সোমবার, ১২ জানুয়ারি ২০২৬, ২৮ পৌষ ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

সুসংবাদ প্রতিদিন

টমেটোর ফলনে খুশি কৃষক

টমেটোর ফলনে খুশি কৃষক

চান্দিনার দিগন্তজোড়া ফসলি জমিতে এখন শুধু সবুজের সমারোহ। শীতের আমেজ শেষ হতে না হতেই কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার মাঠজুড়ে দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে টমেটোর লাল-সবুজ আভা। এ বছর উপজেলায় টমেটোর যে বাম্পার ফলন হয়েছে, তা কৃষকদের চোখেমুখে দীর্ঘদিনের পরিশ্রমের সার্থকতা ফুটিয়ে তুলেছে। শীতকালীন সবজি আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছাপিয়ে টমেটোর এই ফলন এখন স্থানীয় অর্থনীতির নতুন আশার আলো হয়ে দাঁড়িয়েছে। চান্দিনা উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, চলতি মৌসুমে উপজেলার প্রায় ১৪৯৫ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন ধরনের শীতকালীন সবজি চাষের পরিকল্পনা ও উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছিল। তবে কৃষকদের আগ্রহ এবং অনুকূল পরিবেশের কারণে একটি বড় অংশ জুড়ে দখল করে নিয়েছে টমেটো। মোট আবাদি জমির মধ্যে প্রায় ৩৯০ হেক্টর জমিতে শুধুমাত্র টমেটোর চাষ করা হয়েছে। মাটির গুণাগুণ এবং সঠিক পরিচর্যার ফলে প্রতিটি গাছেই থোকায় থোকায় ঝুলছে রসালো টমেটো। ফলন এতটাই ভালো হয়েছে যে, স্থানীয় হাট-বাজারগুলোতে এখন থেকেই টমেটোর সরব উপস্থিতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ঘুরে দেখা গেছে, টমেটো চাষে এবার সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে মাইজখার ইউনিয়ন। কৃষি বিভাগের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই একটি ইউনিয়নেই প্রায় ৮৫ হেক্টর জমিতে টমেটোর আবাদ হয়েছে। মাইজখার ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে এখন শুধু টমেটো গাছের সারি। কৃষকরা ব্যস্ত সময় পার করছেন ক্ষেত থেকে ফল সংগ্রহ এবং তা বাজারজাতকরণের প্রস্তুতিতে। গত কয়েক বছরের তুলনায় এবার টমেটোর আকার এবং গুণমান অনেক ভালো হওয়ায় কৃষকরা ভালো দাম পাওয়ার ব্যাপারেও দারুণ আশাবাদী। বাম্পার ফলনের নেপথ্যে কাজ করেছে আবহাওয়া এবং সঠিক কৃষি পরামর্শ।

মাইজখার ইউনিয়নের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন এই সাফল্যের চিত্র তুলে ধরে জানান, এ বছর সবজি চাষের জন্য আবহাওয়া ছিল সম্পূর্ণ অনুকূল। শীতের তীব্রতা এবং কুয়াশার পরিমাণ পরিমিত থাকায় টমেটো গাছে রোগবালাইয়ের উপদ্রব অনেক কম ছিল। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, কৃষি অফিসের পক্ষ থেকে কৃষকদের নিয়মিত তদারকি এবং সঠিক সময়ে সার ও কীটনাশক ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। আবহাওয়া প্রতিকূল না হওয়ায় এবং সময়মতো পরিচর্যা পাওয়ায় টমেটোসহ সকল ধরনের শীতকালীন সবজির ফলন এবার প্রত্যাশার চেয়েও বেশি হয়েছে।চান্দিনার দোবাড়িয়ার কৃষক জালালের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত কয়েক মাস তারা হাড়ভাঙ্গা খাটুনি দিয়েছেন এই ফসলের পেছনে। শুরুর দিকে চারা রোপণ থেকে শুরু করে নিড়ানি দেওয়া এবং পানির সেচ নিশ্চিত করা, সবকিছুতেই তারা ছিল অত্যন্ত সচেতন। এখন মাঠের দিকে তাকালে তাদের ক্লান্তি দূর হয়ে যায়।

কৃষকদের মতে, ফলন ভালো হওয়ায় তারা গত বছরের লোকসান পুষিয়ে নিতে পারবেন। তবে ভালো ফলনের পাশাপাশি যদি বাজারদর স্থিতিশীল থাকে, তবেই তাদের এই হাসি দীর্ঘস্থায়ী হবে। তাছাড়া এবার টমেটোর দামও ভালো প্রতি কেজি টমেটো পাইকারি বিক্রি হয় ৫০ থেকে ৬০ টাকা ভালো মানের টমেটোটা। একই কথা বলেন কামারখোলা গ্রামের কৃষক মাসম বিল্লাল। পাইকারি ব্যবসায়ীরাও এখন ভিড় করছেন চান্দিনার মাঠগুলোতে, যাতে সতেজ টমেটো সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে সংগ্রহ করে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে দেওয়া যায়। চান্দিনার এই চিত্র প্রমাণ করে যে, সঠিক ব্যবস্থাপনা এবং প্রকৃতির সহায়তা পেলে কৃষিতে বিপ্লব ঘটানো সম্ভব। ৩৯০ হেক্টর জমির এই টমেটো শুধু একটি সংখ্যা নয়, বরং এটি কয়েক হাজার কৃষক পরিবারের জীবিকার প্রধান উৎস। মাইজখার ইউনিয়নের মতো অন্যান্য ইউনিয়নেও যদি এভাবে সবজি চাষে আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়া লাগে, তবে চান্দিনা আগামীতে পুরো জেলার সবজি ভাণ্ডার হিসেবে আরও শক্তিশালী ভূমিকা পালন করবে। বিকেলের রোদে যখন টমেটো ক্ষেতগুলো চিকচিক করে ওঠে, তখন মনে হয় প্রতিটি লাল টমেটো যেন কৃষকের ঘাম আর স্বপ্নের সফল প্রতিচ্ছবি। এই ফলন অব্যাহত থাকলে এবং সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা বৃদ্ধি পেলে ভবিষ্যতে চান্দিনার টমেটো দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিদেশেও রপ্তানি করা সম্ভব হবে।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত