
হলুদের মৌসুম এলেই বদলে যায় দিনাজপুরের বীরগঞ্জ উপজেলার ৪নং পাল্টাপুর ইউনিয়নের ভোগডোমা গ্রামের চিত্র। মাঠে সোনালি ফসল উত্তোলন, উঠোনে সেদ্ধ করার ধোঁয়া, আর চাতালে সারি সারি শুকাতে দেওয়া হলুদ সব মিলিয়ে গ্রামজুড়ে তৈরি হয় এক কর্মচঞ্চল পরিবেশ। এই মৌসুমি ব্যস্ততার প্রাণকেন্দ্রে রয়েছেন কৃষক আব্দুল জব্বার, যিনি চাষের পাশাপাশি হলুদ সংগ্রহ, প্রক্রিয়াজাত ও বিপণন করে গড়ে তুলেছেন সফল এক উদ্যোগ। পূর্ব পুরুষের কৃষি পেশা ধরে রেখে গত আট বছর ধরে নিয়মিত হলুদ চাষ করে আসছেন আব্দুল জব্বার। শুরুতে নিজ জমিতে সীমিত আকারে চাষ করলেও ধীরে ধীরে তিনি চাষের পাশাপাশি ব্যবসায়িক কার্যক্রমও শুরু করেন। বর্তমানে তিনি নিজে হলুদ চাষ করার পাশাপাশি গ্রামের কৃষকদের কাছ থেকে কাঁচা হলুদ কিনে তা প্রক্রিয়াজাত করে বাজারজাত করছেন। প্রতিবছর তিনি প্রায় ১৫০-২০০ টন কাঁচা হলুদ সংগ্রহ করেন। সংগৃহীত কাঁচা হলুদ প্রথমে সিদ্ধ করা হয়, এরপর রোদে ভালোভাবে শুকানো হয়। শুকানোর পর পরিষ্কার ও বাছাই করে বাজারে সরবরাহ করা হয়। স্থানীয় বাজার ছাড়াও বিভিন্ন কোম্পানির কাছেও তিনি প্রক্রিয়াজাত হলুদ বিক্রি করেন। এতে একদিকে কৃষকরা তাদের উৎপাদিত হলুদের ন্যায্য দাম পান, অন্যদিকে বাজারেও তৈরি হয় একটি নির্ভরযোগ্য সরবরাহ ব্যবস্থা। এই পুরো কার্যক্রমে প্রতি মৌসুমে ১৮ জন মহিলা ও পুরুষ শ্রমিক কাজ করেন। হলুদ সিদ্ধ করা, শুকানো, পরিষ্কার ও বস্তাবন্দি সব ধাপেই তাদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। শ্রমিক রহিমা বেগম বলেন, হলুদের মৌসুম এলেই আমাদের কাজের চাপ বাড়ে। নিয়মিত আয় হয়, এতে সংসারে স্বস্তি আসে। আরেক শ্রমিক মো. নাজমুল ইসলাম জানান, মৌসুমে টানা কয়েক মাস কাজ থাকে। এতে বাড়তি উপার্জনের সুযোগ পাই। আব্দুল জব্বার জানান, সব ধরনের খরচ শ্রমিকের মজুরি, পরিবহন সিদ্ধ ও শুকানোর ব্যয় বাদ দিয়েও তিনি প্রতিবছর প্রায় ২ থেকে ৩ লাখ টাকা লাভ করেন। তিনি বলেন, হলুদ চাষ ও প্রক্রিয়াজাত দুটো একসাথে করলে লাভের সম্ভাবনা বেশি। তবে মূলধন বাড়াতে পারলে কার্যক্রম আরও বড় করা সম্ভব। সরকার যদি সহজশর্তে কৃষি ঋণের ব্যবস্থা করে এবং উদ্যোগটিকে সম্প্রসারণে সহযোগিতা দেয়, তাহলে আরও বেশি কৃষকের কাছ থেকে হলুদ সংগ্রহ করে বৃহৎ পরিসরে বাজারজাত করা যাবে। স্থানীয় পাল্টাপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. তহিদুল ইসলাম বলেন, আব্দুল জব্বারের উদ্যোগ প্রশংসনীয়। তিনি গ্রামের কৃষকদের উৎপাদিত হলুদের বাজার তৈরি করেছেন। এমন উদ্যোগ গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করে।
বীরগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. শরিফুল ইসলাম জানান, এ এলাকার মাটি হলুদ চাষের জন্য উপযোগী। সঠিক পরিচর্যা ও প্রক্রিয়াজাত ব্যবস্থাপনা থাকলে হলুদ একটি লাভজনক ফসল। কৃষি বিভাগ প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিতে প্রস্তুত। পাল্টাপুর ইউনিয়নের ভোগডোমা গ্রামে হলুদের মৌসুম এখন শুধু ফসল তোলার সময় নয় এটি বাড়তি আয়ের সুযোগ। কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র এবং উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার প্রেরণা। আব্দুল জব্বারের সাফল্য প্রমাণ করে, পরিকল্পিত উদ্যোগ আর পরিশ্রম থাকলে কৃষি থেকেই গড়ে উঠতে পারে স্বাবলম্বিতার দৃঢ় ভিত্তি।