
ঈদুল আজহা ঘিরে দেশজুড়ে ৩৯৪টি সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ গেছে ৪০২ জনের; এর মধ্যে প্রায় ২৯ শতাংশের মৃত্যু হয়েছে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায়। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত দুর্ঘটনার খবর বিশ্লেষণ করে এ পরিসংখ্যান তুলে ধরেছে যাত্রী কল্যাণ সমিতি। সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী গতকাল রোববার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে সংবাদ সম্মেলন করে প্রতিবেদন বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। তিনি দাবি করেন, গত বছরের কোরবানির ঈদের তুলনায় এবার সড়ক দুর্ঘটনা ৩ দশমিক ৯৫ শতাংশ, নিহতের সংখ্যা ৩ দশমিক ৭ শতাংশ, আহতের সংখ্যা ৯ দশমিক ৪৭ শতাংশ বেড়েছে। ২০২৫ সালের ঈদুল আজহায় ৩৭৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৩৯০ জন নিহত ও ১১৮২ জন আহত হয়েছিলেন।
যাত্রী কল্যাণ সমিতি বলছে, এবার কোরবানির ঈদের আগে ও পরে বিভিন্ন স্থানে রেলপথে ৩১টি দুর্ঘটনায় ২৩ জন নিহত, ৩০ জন আহত হয়েছেন। নৌ-পথে ১৭টি দুর্ঘটনায় ১৩ জন নিহত ও ১৬ জন আহত হয়েছেন বলে হিসাব দিচ্ছে যাত্রী কল্যাণ সমিতি।
মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, দেশের সড়ক-মহাসড়কের বড় অংশে বৃষ্টির কারণে ছোট-বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। এসব গর্ত আর বেপরোয়া গতির কারণে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা বেড়েছে।
প্রতিবেদনে দেখা যায়, বরাবরের মতো এবারও দুর্ঘটনার শীর্ষে রয়েছে মোটরসাইকেল। এবারের ঈদে ১৫৩টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১৫৯ জন নিহত, ১৮০ জন আহত হয়েছেন, যা মোট সড়ক দুর্ঘটনার ৩৮.৮৩ শতাংশ। সড়কে দুর্ঘটনায় হতাহতদের মধ্যে ৮০ জন চালক, ৮৯ জন পরিবহন শ্রমিক, ৫৯ জন পথচারী, ৬৪ জন নারী, ৪৫ জন শিশু, ৬৬ জন শিক্ষার্থী, ৫ জন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, ৩ জন শিক্ষক, ১ জন চিকিৎসক, ৩ জন সাংবাদিক, ১ জন প্রকৌশলী, ৪ জন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীর পরিচয় মিলেছে।
দুর্ঘটনায় পড়া যানবাহনের ২৮ দশমিক ৯০ শতাংশ মোটরসাইকেল, ২১ শতাংশ ৪০ শতাংশ ট্রাক ও কভার্ডভ্যান, ১৬ দশমিক ৫৬ শতাংশ বাস, ১২ দশমিক ৩৪ শতাংশ ব্যাটারিচালিত রিকশা, ৭ দশমিক ৮১ শতাংশ কার-মাইক্রোবাস, ৬ শাতংশ ৫৬ নছিমন-করিমন এবং ৬ দশমিক ৪০ শতাংশ সিএনজিচালিত অটোরিকশা।
যাত্রী কল্যাণ সমিতি তাদের প্রতিবেদনে দুর্ঘটনার বেশ কিছু কারণও তুলে ধরেছে। জাতীয় মহাসড়কে মোটরসাইকেল, ব্যাটারিচালিত রিকশা, অটোরিকশার অবাধ চলাচল। জাতীয় মহাসড়কে রোড সাইন বা রোড মার্কিং, সড়কবাতি না থাকায় হঠাৎ ফিডার রোড থেকে যানবাহন উঠে আসা। সড়কে মিডিয়ান বা রোড ডিভাইডার না থাকা, সড়কে গাছপালায় অন্ধবাঁকের সৃষ্টি। মহাসড়কের নির্মাণ ক্রটি, যানবাহনের ক্রটি, ট্রাফিক আইন অমান্য করার প্রবণতা। উল্টোপথে যানবাহন, সড়কে চাদাঁবাজি, পণ্যবাহী যানে যাত্রী পরিবহন। অদক্ষ চালক, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, অতিরিক্ত যাত্রীবহন। বেপরোয়া যানবাহন চালানো এবং বিরামহীন ও বিশ্রামহীনভাবে যানবাহন চালানো। বৃষ্টিতে সড়কের মধ্যে গর্তের সৃষ্টি, ভাঙা সড়ক।
অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের কারণে নিম্নআয়ের মানুষ বাসের ছাদে, ট্রাকের ছাদে, পণ্যবোঝাই ট্রাকের উপর যাতায়াতে বাধ্য হওয়ার কারণে সড়ক দুর্ঘটনা বেড়েছে। প্রাণহাণি ও যাতায়াতের ভোগান্তি কমাতে যাত্রী কল্যাণ সমিতি বেশ কিছু সুপারিশও করেছে। ঈদযাত্রায় স্বল্পমেয়াদী, মধ্যমেয়াদী ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা প্রনয়ণ ও বাস্তবায়ন করা জরুরি। সারাদেশে উন্নত বিশ্বের আদলে আধুনিক বাস নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা প্রয়োজন। প্রযুক্তিনির্ভর সড়ক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা। চালকদের উন্নত প্রযুক্তির প্রশিক্ষণ দেওয়ার মাধ্যমে লাইসেন্স প্রাপ্তি নিশ্চিত করা। গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় মহাসড়কে ফুটপাতসহ সার্ভিস লেইনের ব্যবস্থা করা। কাঠামোগত সংস্কার করে সড়কে চাদাঁবাজি বন্ধ করা, চালকের বেতন ও কর্মঘণ্টা সুনিশ্চিত করা। মহাসড়কে ফুটপাত ও পথচারী পারাপারের ব্যবস্থা রাখা, রোড সাইন, রোড মার্কিং স্থাপন করা। মানসম্মত সড়ক নির্মাণ ও মেরামত নিশ্চিত করা, নিয়মিত রোড সেইফটি অডিট করা। ফিটনেস প্রদান পদ্ধতির আধুনিকায়ান, মেয়াদোত্তীর্ণ গণপরিবহন উচ্ছেদ করা। নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিআরটিএর সক্ষমতা বাড়ানো, ট্রাফিক ট্রেনিং একাডেমি গড়ে তোলা। পরিবহন সেক্টর পরিচালনায় বাস মালিক সমিতি ও শ্রমিক ফেডারেশনের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ বন্ধ করা।