ঢাকা মঙ্গলবার, ০৪ আগস্ট ২০২৬, ২০ শ্রাবণ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

আর্থিক খাতে নতুন সম্ভাবনা

আর্থিক খাতে নতুন সম্ভাবনা

ডিজিটাল প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বজুড়ে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ঘটেছে আমূল পরিবর্তন। প্রচলিত শাখাকেন্দ্রিক সেবার গণ্ডি পেরিয়ে ব্যাংকিং পৌঁছে গেছে মানুষের হাতের মুঠোয়। মোবাইল অ্যাপ, ইন্টারনেট ব্যাংকিং, তাৎক্ষণিক অর্থ স্থানান্তর, কিউআর কোডভিত্তিক লেনদেন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর (এআই) প্রযুক্তির ব্যবহারে ব্যাংকিং খাত আরও দ্রুত, নিরাপদ, সহজ ও গ্রাহকবান্ধব হয়ে উঠেছে। স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের মাধ্যমে এখন যে কোনো সময় ও যে কোনো স্থান থেকে অর্থ স্থানান্তর, বিল পরিশোধ, সঞ্চয়, বিনিয়োগসহ বিভিন্ন ব্যাংকিং সেবা সহজেই গ্রহণ করা সম্ভব। আধুনিক নিরাপত্তাব্যবস্থা ও সহজ ব্যবহারব্যবস্থা গ্রাহকদের আস্থা আরও সুদৃঢ় করেছে। ফলে ব্যক্তি, ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাসহ সব শ্রেণির মানুষ আগের তুলনায় আরও নির্ভরযোগ্যভাবে ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবা ব্যবহার করছেন। বাংলাদেশও এই পরিবর্তনের ধারায় দ্রুত এগিয়ে চলেছে। ডিজিটাল ব্যাংকিং শুধু আর্থিক লেনদেনকে সহজ করেনি; বরং নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টি, কর্মসংস্থান, ই-কমার্সের সম্প্রসারণ, বৈধ রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধি এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তবে এই অগ্রযাত্রার সঙ্গে সাইবার নিরাপত্তা, তথ্য সুরক্ষা এবং গ্রাহকের আস্থা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তাই প্রযুক্তিনির্ভর এই নতুন বাস্তবতায় ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের সম্ভাবনা, চ্যালেঞ্জ এবং দেশের অর্থনীতিতে এর বহুমাত্রিক অবদান নিয়ে গভীরভাবে পর্যালোচনা করে বাংলাদেশের আর্থিক খাতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করতে যাচ্ছে ডিজিটাল ব্যাংকিং। দেশের আর্থিক ব্যবস্থায় যুক্ত হচ্ছে একডজন ডিজিটাল ব্যাংক। সবকিছু ঠিক থাকলে চলতি মাসেই ব্যাংকগুলো অনুমোদন পেতে যাচ্ছে। শুরুতেই ১২ থেকে ১৩টি ডিজিটাল ব্যাংককে অনুমোদন দেওয়া হবে। সরকারের নীতিগত প্রস্তুতি প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। ডিজিটাল ব্যাংকের মাধ্যমে দেশের আর্থিক খাতে প্রযুক্তিনির্ভর সেবার নতুন দিগন্ত উন্মোচন হতে যাচ্ছে। একইসঙ্গে প্রশ্ন উঠছে, দেশের ব্যাংকিং খাতের যে ভঙ্গুর অবস্থা, তাতে নতুন ব্যাংক চালু হলে সেটা অর্থনীতির জন্য কতটা ইতিবাচক হবে? বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র বলছে, ডিজিটাল ব্যাংকিং ব্যবস্থা চালু হলে গ্রাহকদের ব্যাংকিং লেনদেনের জন্য আর সরাসরি কোনো শাখায় উপস্থিত হতে হবে না। অ্যাকাউন্ট খোলা থেকে শুরু করে আমানত রাখা, ঋণ নেওয়া কিংবা যেকোনো সেবা পাওয়া যাবে স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের মাধ্যমে। প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে এসে সম্পূর্ণ ক্যাশলেস বা নগদ অর্থবিহীন আর্থিক লেনদেনকে জনপ্রিয় করতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

ডিজিটাল ব্যাংকের অনুমোদনের বিষয়ে ইতিবাচক সংকেত দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান জানান, প্রক্রিয়াটি এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে এবং আগস্টের শেষের দিকে; অর্থাৎ, চলতি মাসেই অনুমোদন দেওয়া হতে পারে।

ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্সের জন্য আবেদন করেছে কারা

দেশের প্রায় ১২ থেকে ১৩টি শীর্ষস্থানীয় ব্যাংক, মোবাইল সেবাদাতা ও করপোরেট প্রতিষ্ঠান ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স পেতে আবেদন করেছে। এর মধ্যে দেশের বৃহত্তম মোবাইল আর্থিক সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান বিকাশ লাইসেন্স পেতে আবেদন জমা দিয়েছে ‘বিকাশ ডিজিটাল ব্যাংক’ নামে। নিজস্ব বিশাল গ্রাহক নেটওয়ার্ক ও প্রযুক্তিগত অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে কোম্পানিটি আরও বড় পরিসরে বাজারে আসতে চাচ্ছে।

ডাক বিভাগের ডিজিটাল আর্থিক সেবা সংস্থা নগদও কার্যক্রম চালুর আবেদন জানিয়েছে। তারা আবেদন করেছে ‘নগদ ডিজিটাল ব্যাংক পিএলসি’ নামে। প্রত্যন্ত অঞ্চলের ব্যাংকিং সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীকে সরাসরি আধুনিক আর্থিক খাতে যুক্ত করার বিশাল পরিকল্পনা রয়েছে তাদের প্রস্তাবে।

টেলিকম খাতের প্রতিষ্ঠান রবি তাদের ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবা চালুর জন্য ‘বুস্ট-রবি’ নামে আবেদন জমা দিয়েছে। এ ছাড়া আরেক মোবাইল অপারেটর বাংলালিংক ও শিল্পগোষ্ঠী স্কয়ার গ্রুপ যৌথ উদ্যোগে ‘নোভা ডিজিটাল ব্যাংক’ নামে আবেদন করেছে। টেলিকম ও বাণিজ্যিক খাতের যৌথ অভিজ্ঞতাকে পুঁজি করে গ্রাহকদের জন্য নিরাপদ ও দ্রুতগতির ব্যাংকিং সেবা নিশ্চিত করার রূপরেখা রয়েছে তাদের আবেদনে।

শিল্প খাতের অন্যতম বড় নাম আকিজ গ্রুপ ‘মুনাফা ইসলামী ডিজিটাল ব্যাংক পিএলসি’ নামে একটি শরিয়াহভিত্তিক ডিজিটাল ব্যাংক চালুর আবেদন জমা দিয়েছে। আবেদনপত্রে কোম্পানিটি উল্লেখ করেছে, ইসলামী ব্যাংকিংয়ের নীতি মেনে আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে উদ্ভাবনী আর্থিক সেবা দেওয়াই তাদের উদ্দেশ্য।

ক্ষুদ্রঋণ দাতা সংস্থা আশা (এএসএ) এবং আরও কয়েকটি সংস্থা যৌথ উদ্যোগে ‘ মৈত্রী ডিজিটাল ব্যাংক পিএলসি’ নামে একটি প্রস্তাব জমা দিয়েছে। ক্ষুদ্রঋণের বিশাল নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে সারা দেশে ব্যাংকিং নেটওয়ার্ক চালু করতে চায় এনজিওটি।

বাণিজ্যিক ব্যাংকিং খাতের একাধিক বড় প্রতিষ্ঠান ও আর্থিক খাতের ১৬ জন স্টেকহোল্ডার মিলে ‘৩৬ ডিজিটাল ব্যাংক পিএলসি’ নামে একটি স্বতন্ত্র ডিজিটাল ব্যাংকের জন্য লাইসেন্সের আবেদন করেছে। তারা বলছে, দেশের উদীয়মান তরুণ ও উদ্যোক্তা শ্রেণির জন্য ক্যাশলেস ও অনলাইন ব্যাংকিংসেবা নিশ্চিত করা তাদের মূল লক্ষ্য।

দেশের প্রায় ২২টি ক্ষুদ্রঋণ দাতা সংস্থা বা এমএফআই একসঙ্গে মিলে ‘আমার ডিজিটাল ব্যাংক’ নামের ডিজিটাল ব্যাংক চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। যুক্তরাজ্য ও বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগ এবং প্রবাসীদের আর্থিক অন্তর্ভুক্তির পরিকল্পনা নিয়ে গঠিত একটি কনসোর্টিয়াম ‘ব্রিটিশ-বাংলা ডিজিটাল ব্যাংক পিএলসি’ নামে আবেদন জমা দিয়েছে। এর অন্যতম প্রধান উদ্যোক্তা অংশীদারদের মধ্যে রয়েছেন মিডিয়া ব্যক্তিত্ব ও চ্যানেল আই-এর পরিচালক শাইখ সিরাজ।

আন্তর্জাতিক ও বাণিজ্যিক অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে তৈরি অপর একটি প্ল্যাটফর্ম ‘ডিজিটাল ব্যাংকিং অব ভুটান’ নামে লাইসেন্সের জন্য আবেদন করেছে। এটি মূলত ভুটানের প্রথম ও শীর্ষস্থানীয় ডিজিটাল-ফার্স্ট ব্যাংক ‘ডিকে ব্যাংক’-এর একটি কোম্পানি। তারা বাংলাদেশে একটি পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করতে চায়। কৃষি ও পল্লি অর্থনীতিকে অগ্রাধিকার দিয়ে একটি বিশেষায়িত প্রযুক্তিভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘অ্যাপ ব্যাংক-ফারমার্স’ নামে লাইসেন্স পাওয়ার আবেদন করেছে। দেশের কৃষক, কৃষিভিত্তিক উদ্যোক্তা ও গ্রামীণ খাতের আর্থিক চাহিদা সহজ উপায়ে পূরণে কাজ করতে চায় এই ব্যাংকটি।

এ ছাড়া তথ্যপ্রযুক্তি সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান আইটি সলিউশন লিমিটেড ‘উপকারী ডিজিটাল ব্যাংক’ নামে ব্যাংকিং কার্যক্রম শুরুর জন্য আবেদন করেছে। এর বাইরে আরেকটি প্রতিষ্ঠান ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স পেতে আবেদন করেছে। তবে সেটির নাম জানা যায়নি। তবে দেশের ব্যাংকিং খাতের ভঙ্গুর অবস্থায় নতুন আরও ব্যাংকের অনুমোদন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অর্থনীতিবিদরা। তারা বলছেন, বাংলাদেশের ছোট অর্থনীতিতে আরও ব্যাংক চালু হলে সেটা অর্থনীতির জন্য ভালো না-ও হতে পারে। তার চেয়ে বরং ভালো হয়, প্রচলিত ব্যাংকগুলোকে ডিজিটালে রুপান্তর করা।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ‘দেশে বর্তমানে চালু থাকা প্রচলিত ব্যাংকগুলোর অবস্থা ভালো নয়। আর দেশের অর্থনীতিও ছোট। এই ছোট অর্থনীতির দেশে এতগুলো ব্যাংক, এটা খুবই বেশি। তারপর আবার যদি নতুন ব্যাংক আসে, তাহলে একই ডিপোজিট সবার মধ্যে ভাগ হবে। অর্থাৎ, দেশের অর্থ একই থাকল, কিন্তু অর্থ রাখার ব্যাংক বেড়ে গেল, একেকটি ব্যাংকের তারল্য কমে গেল। এটা খুব ইতিবাচক হবে বলে আমি মনে করি না।”

লাইসেন্স পেতে কী যোগ্যতা লাগে

বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘ডিজিটাল ব্যাংক স্থাপনবিষয়ক গাইডলাইনস: ভার্সন-২’ অনুযায়ী, একটি ডিজিটাল ব্যাংকের অনুমোদনের আগে যেসব দিক দেখা হবে-

১. ন্যূনতম পরিশোধিত মূলধন বা পেইড-আপ ক্যাপিট্যাল হতে হবে ৩০০ কোটি টাকা। এই টাকা পুরোটাই আসবে উদ্যোক্তাদের নিজস্ব অর্থ থেকে, ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান কিংবা ব্যক্তিগত কোনো ঋণ নিয়ে এখানে টাকা দেওয়া যাবে না। প্রত্যেক স্পন্সরের অন্তত ৫০ লাখ টাকার শেয়ার থাকতে হবে।

২. আবেদনকারী স্পন্সরদের অন্তত ১০ বছরের ব্যবসায়িক ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা থাকতে হবে, যার মধ্যে অন্তত ৫ বছর হতে হবে অ্যাপভিত্তিক ব্যাংকিং সেবা, ইলেকট্রনিক মানি ইস্যুয়ার (ইএমআই), ফিনটেক বা ইলেকট্রনিক পেমেন্ট সিস্টেমে।

৩. প্রাতিষ্ঠানিক স্পন্সরের ক্ষেত্রে অন্তত ৩ বছরের চলমান ব্যবসার অডিটেড বা নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী জমা দিতে হবে। কোনো খেলাপি ঋণগ্রহীতা, দেউলিয়া ঘোষিত ব্যক্তি, ফৌজদারি অপরাধে দণ্ডপ্রাপ্ত কিংবা আর্থিক অনিয়মে যুক্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান স্পন্সর হতে পারবেন না।

৪.কোনো ব্যাংক বা ফাইন্যান্স কোম্পানি ডিজিটাল ব্যাংকের স্পন্সর হতে পারবে না। ৫.পরিচালনা পর্ষদের অন্তত ৫০ ভাগ সদস্যকে প্রযুক্তিভিত্তিক ব্যাংকিং, উদীয়মান প্রযুক্তি, ক্লাউড, সাইবার নিরাপত্তা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং সাইবার আইন বিষয়ে পর্যাপ্ত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাসম্পন্ন হতে হবে। বাকি সদস্যদের ব্যাংকিং, ই-কমার্স, অর্থনীতি, সামাজিক বিজ্ঞান ও রেগুলেশন বিষয়ে অভিজ্ঞ হতে হবে। ৬. ব্যাংকটির যেহেতু কোনো শাখা, উপশাখা কিংবা নিজস্ব এটিএম বুথ থাকতে পারবে না, তাই আন্তর্জাতিক মানের সাইবার নিরাপত্তা, ডিজিটালাইজড ড্যাশবোর্ড, টিয়ার-থ্রি ডেটা সেন্টার এবং দেশের মধ্যে অবস্থিত ক্লাউড অবকাঠামোর সুনির্দিষ্ট নকশা ও আইসিটি পরিকল্পনা জমা দিতে হবে আবেদনপত্রের সঙ্গে।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত