
দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের জমি, অবকাঠামো, শেয়ার এবং কৌশলগত সম্পদ বিক্রয়-সংক্রান্ত বিনিয়োগ প্রস্তাব মূল্যায়ন ও অনুমোদনের জন্য একটি উচ্চপর্যায়ের ইনভেস্টমেন্ট প্রপোজাল অ্যাসেসমেন্ট কমিটি (আইপিএসি) গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে।
‘রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প বা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের জমি, অবকাঠামো, শেয়ার ও কৌশলগত সম্পদ হস্তান্তর নীতিমালা, ২০২৬ (খসড়া)’র আওতায় এ কমিটি গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে। নীতিমালার লক্ষ্য হলো রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণে একটি স্বচ্ছ, প্রতিযোগিতা ও জবাবদিহিমূলক কাঠামো গড়ে তোলা।
প্রস্তাবিত নীতিমালার আওতায় বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশন (বিসিআইসি), বাংলাদেশ সুগার অ্যান্ড ফুড ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশন (বিএসএফআইসি), বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস কর্পোরেশন (বিটিএমসি), বাংলাদেশ জুট মিলস কর্পোরেশন (বিজেএমসি) এবং বাংলাদেশ স্টিল অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং কর্পোরেশন (বিএসইসি)-এর অধীন প্রতিষ্ঠানে কৌশলগত বিনিয়োগ অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
শিল্পসচিব আবদুন নাসের খান বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের জমি, অবকাঠামো, শেয়ার এবং কৌশলগত সম্পদ হস্তান্তরের মাধ্যমে স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও বিনিয়োগবান্ধব ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে সরকার একটি সমন্বিত নীতিমালা প্রণয়ন করছে।
তিনি বলেন, নীতিমালাটি চূড়ান্ত করার আগে অংশীজনদের মতামত ও সুপারিশ গ্রহণের লক্ষ্যে সম্প্রতি একটি স্টেকহোল্ডার সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর উদ্দেশ্য ছিল অব্যবহৃত ও স্বল্পব্যবহৃত রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যবস্থাপনায় একটি সুস্পষ্ট ও অভিন্ন কাঠামো প্রতিষ্ঠা করা।
সভায় বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (বিডা), পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ অথরিটি (পিপিপিএ), অর্থ বিভাগ, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, পরিকল্পনা কমিশন এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার প্রতিনিধিদের পাশাপাশি শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন রাষ্ট্রায়ত্ত কর্পোরেশনগুলোর প্রধানরা অংশ নেন।
আবদুন নাসের খান বলেন, নীতিমালাকে আরও স্বচ্ছ, কার্যকর ও বিনিয়োগবান্ধব করতে অংশীজনদের সুপারিশ এতে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। তিনি জানান, গুরুত্বপূর্ণ সরকারি সংস্থাগুলোর প্রতিনিধিরা খসড়া নীতিমালার ওপর মূল্যবান মতামত দিয়েছেন এবং সভাটি অত্যন্ত ফলপ্রসূ হয়েছে। তিনি বলেন, অংশীজনদের কাছ থেকে আমরা গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ পেয়েছি। যেগুলো উপযুক্ত বলে বিবেচিত হবে, সেগুলো পর্যালোচনা করে চূড়ান্ত নীতিমালায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
শিল্পসচিব বলেন, এ নীতিমালার মাধ্যমে সম্পদ হস্তান্তর প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়বে এবং অব্যবহৃত বা স্বল্পব্যবহৃত সম্পদের উৎপাদনশীল ব্যবহার নিশ্চিত করে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
তিনি বলেন, ব্যাপক পরামর্শ ও আন্তর্জাতিক সর্বোত্তম চর্চার আলোকে খসড়াটি প্রস্তুত করা হয়েছে, যাতে রাষ্ট্রীয় সম্পদ শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। আবদুন নাসের খান বলেন, সরকার চায় নীতিমালার প্রতিটি বিধানে সব অংশীজনের মতামতের প্রতিফলন ঘটুক। তিনি বলেন, গঠনমূলক সুপারিশগুলো অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে, যাতে নীতিমালাটি বাস্তবসম্মত, স্বচ্ছ ও কার্যকর হয়।
খসড়া নীতিমালা অনুযায়ী, ইনভেস্টমেন্ট প্রপোজাল অ্যাসেসমেন্ট কমিটি (আইপিএসি)’র চেয়ারম্যান হবেন ইনভেস্ট বাংলাদেশ অথরিটির চেয়ারম্যান। কমিটিতে অর্থ মন্ত্রণালয়, আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের জ্যেষ্ঠ প্রতিনিধিরা সদস্য হিসেবে থাকবেন।
মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও রাষ্ট্রায়ত্ত কর্পোরেশনগুলোর জমা দেওয়া বিনিয়োগ প্রস্তাব পর্যালোচনার কেন্দ্রীয় সংস্থা হিসেবে কাজ করবে আইপিএসি। কমিটি প্রকল্পের বাণিজ্যিক সম্ভাব্যতা যাচাই করবে, সামাজিক-অর্থনৈতিক প্রভাব মূল্যায়ন করবে এবং প্রস্তাবিত লেনদেন জনস্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না তা নির্ধারণ করবে।
এ ছাড়া জটিল লেনদেনের জন্য কৌশলগত উপদেষ্টা নিয়োগের সুপারিশ, প্রতিযোগিতামূলক বিনিয়োগকারী নির্বাচন প্রক্রিয়ার তদারকি এবং সরকারের চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য সুপারিশ উপস্থাপনের দায়িত্বও পালন করবে কমিটি।
উচ্চমূল্যের বা জটিল সম্পদণ্ডসংক্রান্ত লেনদেন বাস্তবায়নের আগে অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির (সিসিইএ) অনুমোদন নিতে হবে। প্রস্তাবিত কাঠামোর আওতায় স্বচ্ছ দরপত্র প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়া হবে। আগ্রহপত্র (এক্সপ্রেশন অব ইন্টারেস্ট) আহ্বানের বিজ্ঞপ্তি বাংলা ও ইংরেজি সংবাদপত্রে এবং প্রয়োজন হলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও প্রকাশ করা হবে।খসড়া নীতিমালায় বাস্তবায়নের চারটি ধাপ নির্ধারণ করা হয়েছে। এগুলো হলো, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে উপযুক্ত সম্পদ চিহ্নিতকরণ, আইপিএসির মূল্যায়ন, উপদেষ্টা নিয়োগ ও প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র প্রক্রিয়া এবং সর্বশেষ সরকারের অনুমোদন ও চুক্তি সম্পাদন। বাস্তবায়ন রূপরেখা অনুযায়ী, আইনগত অনুমোদনের জন্য প্রয়োজনীয় সময় বাদ দিয়ে বিনিয়োগ প্রস্তাব জমা দেওয়া থেকে চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষর পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে প্রায় ৭৭ কার্যদিবস সময় লাগবে।