
ফরিদপুরের বেসরকারি হাসপাতালে সিজারিয়ান অপারেশনের পর কনিকা মণ্ডল নামের এক নারীর পেটে গজ রেখেই সেলাই করার অভিযোগ উঠেছে। প্রায় দেড় মাস চিকিৎসাধীন থাকার পর তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় গতকাল শুক্রবার সকালে রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দিতে কনিকার বাড়িতে গিয়ে স্বজনদের সঙ্গে কথা বলেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। ঘটনার তদন্তে গত বৃহস্পতিবার রাতে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। অভিযোগের সত্যতা মিললে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন মন্ত্রী। মৃত কনিকা মণ্ডল উপজেলার বহরপুর ইউনিয়নের বাঘুটিয়া গ্রামের বাসিন্দা অশান্ত মণ্ডলের স্ত্রী।
সরেজমিনে দেখা যায়, স্বাস্থ্যমন্ত্রী আসার খবরে স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিরাও কনিকার বাড়িতে উপস্থিত হয়েছেন। প্রচুর লোকজনের ভিড় থাকলেও ওই বাড়িতে চলছে শোকের মাতম। ঘরের বারান্দায় কনিকার দেড় মাস বয়সী সন্তানকে কোলে নিয়ে কান্না করছেন তার বোন দীপিকা বিশ্বাস দীপা। পাশে রয়েছে কনিকার আরও দুই সন্তান। প্রতিবেশীরা তাকে সান্ত¡না দেওয়ার চেষ্টা করছেন। নিহত কনিকার স্বামী অশান্ত মণ্ডল বলেন, ‘গত ২৯ জুন ফরিদপুরের সমরিতা হাসপাতালে সিজারিয়ান অপারেশনের সময় কনিকার পেটে গজ রেখেই সেলাই করে দেন চিকিৎসক লক্ষ্মী রানি দত্ত। পরে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে ঢাকার ইবনে সিনা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে গত ১৯ আগস্ট রাতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় কনিকা মারা যায়।’ ছেলে পার্থ মণ্ডল বলেন, ‘আমার মায়ের মৃত?্যু হয়েছে। সেটার ক্ষতি তো পূরণ করা সম্ভব নয়। আর যেন কোনো মা মারা না যায়, সেজন?্য ওই হাসপাতাল বন্ধসহ চিকিৎসকের শাস্তির দাবি জানাচ্ছি।’
এদিকে কনিকার মৃত্যুর ঘটনায় গ্রামবাসীর মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন তারা। স্থানীয় সোলেমান বিশ্বাস বলেন, ‘ডাক্তাররা তো এখন কসাই। ওদের চিন্তা থাকে পেট কাটতে পারলেই টাকা আর টাকা। কনিকার সঙ্গে যে ঘটনা ঘটেছে, এজন?্য ওই চিকিৎসকের শাস্তি দাবি করছি। সেই সঙ্গে সারা দেশে এরকম যেন আর না ঘটে, সে জন?্য সরকারের দৃষ্টি কামনা করছি।’
মোসলেম খান নামের আরেকজন বলছিনে, ‘আর্থিকভাবে এই পরিবারকে শেষ করে দিয়েছে। আমাদের এখন চাওয়া এই পরিবারকে আর্থিক ক্ষতি পূরণ দেওয়া হক। এ ঘটনায় চিকিৎসকের শাস্তি এবং ক্লিনিকের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি করছি।’
চিকিৎসায় অবহেলা বরদাশত করা হবে না: স্বাস্থ্যমন্ত্রী
স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, কনিকা মন্ডলের মৃত্যুর ঘটনায় বৃহস্পতিবার রাতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে আগামী পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। প্রতিবেদন পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি বলেন, ‘ডাক্তারের অবহেলার কারণে একজন মায়ের মৃত্যু মেনে নেওয়া যায় না। পরিবারের প্রতি সহমর্মিতা জানাতে আমি এখানে এসেছি। এই পরিবারের পাশে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, স্থানীয় বিএনপি নেতারা এবং সরকার থাকবে।’
স্বাস্থ্যমন্ত্রী আরও বলেন, গত ১৭ বছরে স্বাস্থ্যসেবার যে ক্ষতি হয়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে সরকার কাজ করছে। জনগণের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দেশের সব স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র আধুনিকায়নের জন্যও পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে, যার সুফল সাধারণ মানুষ পাবেন। পরে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ব্যক্তিগতভাবে কনিকা মন্ডলের পরিবারকে ৫০ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা দেন। এ সময় রাজবাড়ীর জেলা প্রশাসক আফরোজা পারভীন, সিভিল সার্জন ডা. এসএম মাসুদ, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সামসুল হক, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) তারিফ উল হাসান, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা চৌধুরী মুস্তাফিজুর রহমান, উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. ফারুক হোসেন, বালিয়াকান্দি থানার ওসি আবদুর রব তালুকদার, উপজেলা বিএনপির সভাপতি গোলাম শওকত সিরাজ, সাধারণ সম্পাদক গোলাম সরওয়ার ভূইয়াসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
উল্লেখ্য, গত ২৯ জুন ফরিদপুরের সমরিতা হাসপাতালে ডা. লক্ষ্মী রানী দত্তের মাধ্যমে সিজারিয়ান অপারেশনে কন্যাসন্তানের জন্ম দেন বালিয়াকান্দি উপজেলার বহরপুর ইউনিয়নের বাঘুটিয়া গ্রামের অশান্ত মন্ডলের স্ত্রী কনিকা মন্ডল (৩৫)। অপারেশনের পরদিন তার পেট ফুলে যায়। অবস্থার অবনতি হলে গত ৩ জুলাই তাকে ঢাকার ইবনে সিনা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে ৭ জুলাই পরীক্ষা-নিরীক্ষায় তার পেটে গজ পাওয়া যায়। ওই দিনই অস্ত্রোপচার করে গজটি বের করা হয়। দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর গত বুধবার দিবাগত রাত সোয়া ২টার দিকে ঢাকার কল্যাণপুরের ওই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় কনিকা মন্ডলের মৃত্যু হয়।