
হবিগঞ্জ জেলার বাহুবল উপজেলার মিরপুর ইউনিয়নের পশ্চিম জয়পুর গ্রামের কৃষক মতিন মিয়া উন্নত জাতের জি-নাইন (জি-৯) কলা চাষ করে এলাকায় নতুন সম্ভাবনার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। উচ্চ ফলনশীল ও রপ্তানিযোগ্য এ জাতের কলা চাষে সফলতা পাওয়ায় স্থানীয় কৃষকদের মধ্যেও ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে। কৃষি বিভাগের কারিগরি সহায়তা, আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি এবং সঠিক পরিচর্যার মাধ্যমে তিনি স্বল্প খরচে লাভজনক ফল উৎপাদনের একটি উজ্জ্বল উদাহরণ তৈরি করেছেন।
সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, পশ্চিম জয়পুর গ্রামে নিজের বাড়ির সামনের প্রায় ৩০ শতক জমিতে সারিবদ্ধভাবে লাগানো হয়েছে জি-নাইন জাতের কলাগাছ। সবুজে ঘেরা ক্ষেতজুড়ে অধিকাংশ গাছেই ঝুলছে বড় বড় কলার ছড়া। কোথাও আবার নতুন করে মোচা বের হচ্ছে। পরিচ্ছন্ন ও পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা এ প্রদর্শনী প্লটটি দেখতে আশপাশের গ্রামের কৃষকরা আসছেন। অনেকেই এ জাতের কলার ফলন, পরিচর্যা ও বাজারজাতকরণ সম্পর্কে খোঁজখবর নিচ্ছেন।
জানা গেছে, ফ্রিপ প্রকল্পের আওতায় গত বছরের নভেম্বর মাসে প্রায় ৩০ শতক জমিতে ৮০টি জি-নাইন কলার চারা রোপণ করেন কৃষক মতিন মিয়া। শুরুতেই জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে কলার পাশাপাশি সাথি ফসল হিসেবে মাসকালাই চাষ করেন। মাসকালাই সংগ্রহের পর একই জমিতে লেবুর চারা রোপণ করেন। এতে একই জমি থেকে একাধিক ফসল উৎপাদনের মাধ্যমে বাড়তি আয় নিশ্চিত করার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছেন তিনি।
কৃষক মো. মতিন মিয়া বলেন, কৃষি অফিসের সহযোগিতায় আমি এই নতুন জাতের কলা চাষ শুরু করি। কলার চারা কৃষি অফিস থেকেই পেয়েছি। নিজের পক্ষ থেকে পরিচর্যা, সার ও অন্যান্য কাজে প্রায় ৭ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে। বর্তমানে গাছে গাছে কলার ছড়া এসেছে এবং কিছু কলা বিক্রিও শুরু করেছি। পাশাপাশি অনেকেই চারা কেনার জন্য যোগাযোগ করছেন। সব মিলিয়ে এ মৌসুমে কলা ও কলার চারা বিক্রি করে লক্ষাধিক টাকা আয় করতে পারব বলে আশা করছি।
তিনি আরও বলেন, নতুন জাত হওয়ায় শুরুতে কিছুটা শঙ্কা ছিল। তবে কৃষি বিভাগের নিয়মিত পরামর্শ ও তদারকির কারণে কোনো সমস্যায় পড়তে হয়নি। উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. শামিমুল হক শামীম সব সময় খোঁজখবর নিয়েছেন এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়েছেন। তার সহযোগিতা না পেলে হয়তো এত ভালো ফলন পাওয়া সম্ভব হতো না।
উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. শামিমুল হক শামীম বলেন, জি-নাইন জাতের কলা দেশে তুলনামূলক নতুন হলেও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এটি অত্যন্ত জনপ্রিয়। বাহুবল উপজেলার মিরপুর ইউনিয়নে প্রথমবারের মতো এ জাতের কলার প্রদর্শনী প্লট স্থাপন করা হয়েছে। কৃষকের জন্য টিস্যু কালচারের উন্নতমানের চারা সংগ্রহ করে দেওয়া হয়েছে এবং শুরু থেকেই নিয়মিত কারিগরি পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
তিনি জানান, সাধারণত বিদেশে নাশতার টেবিলে যে ধরনের কলা বেশি দেখা যায়, এটি সেই জাতের কলা। এর চাহিদা দেশ-বিদেশ উভয় জায়গায় রয়েছে। এটি উচ্চ ফলনশীল ও রপ্তানিযোগ্য একটি জাত। অনুকূল পরিবেশে একটি ছড়ির ওজন আড়াই মণ পর্যন্ত হতে পারে এবং প্রতিটি ছড়িতে প্রায় ২০০ থেকে ৫০০টি কলা ধরে। সঠিক পরিচর্যা নিশ্চিত করা গেলে এ জাতের কলা থেকে কৃষকরা প্রচলিত অনেক জাতের তুলনায় বেশি লাভবান হতে পারবেন।
তিনি আরও বলেন, টিস্যু কালচারের চারা ব্যবহারের ক্ষেত্রে চারার বয়স নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ল্যাবে বেশি বয়স হয়ে গেলে জমিতে রোপণের পর গাছ আগেভাগেই ফলন দিতে শুরু করে, যা অনেক সময় প্রত্যাশিত উৎপাদনে প্রভাব ফেলতে পারে। তাই মানসম্মত ও সঠিক বয়সের চারা ব্যবহার করতে হবে।
বাহুবল উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা চিন্ময় কর অপু বলেন, মিরপুর ইউনিয়নে জি-নাইন কলার প্রথম প্রদর্শনী সফল হওয়ায় স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। অনেক কৃষক ইতোমধ্যে এ জাতের কলা চাষের বিষয়ে কৃষি অফিসে যোগাযোগ করছেন। কৃষি বিভাগ সব সময় কৃষকদের পাশে রয়েছে এবং প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা ও পরামর্শ প্রদান করছে।
তিনি বলেন, কলা চাষে একটি বড় সমস্যা হলো বিটল পোকার আক্রমণ। কলা যখন কচি অবস্থায় থাকে, তখন এই পোকা কলার ত্বক কুরে কুরে খায়। পরে কলা পরিপক্ব হলে সেই স্থানে কালো দাগ দেখা যায়। এতে কলার গুণগত মানের কোনো ক্ষতি না হলেও দেখতে খারাপ লাগায় বাজারে অনেক সময় কৃষকরা ন্যায্য মূল্য পান না।
এ সমস্যা সমাধানে তিনি ব্যাগিং প্রযুক্তি ব্যবহারের পরামর্শ দেন। তার মতে, কলার মোচা বের হওয়ার পর বিশেষ ব্যাগ দিয়ে ঢেকে দিলে বিটল পোকার আক্রমণ থেকে সহজেই সুরক্ষা পাওয়া যায়। এতে অতিরিক্ত কীটনাশক বা ছত্রাকনাশক ব্যবহার করতে হয় না। ব্যাগিং করা কলা দেখতে উজ্জ্বল ও আকর্ষণীয় হয় এবং বাজারে ভালো দাম পাওয়া যায়। একই সঙ্গে নিরাপদ ফল উৎপাদনও নিশ্চিত হয়।
কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের এই সময়ে একই জমি থেকে অধিক উৎপাদন নিশ্চিত করতে উন্নত জাতের ফল চাষের বিকল্প নেই। জি-নাইন জাতের কলা উচ্চ ফলনশীল, রোগবালাই তুলনামূলক কম এবং বাজারে এর চাহিদাও ভালো। ফলে কৃষকরা এ জাতের কলা চাষে এগিয়ে এলে তাদের আয় বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি দেশের ফল উৎপাদনও বাড়বে।
স্থানীয় কৃষকদের ভাষ্য, মতিন মিয়ার খেত দেখে তারা উৎসাহিত হয়েছেন। অনেকেই আগামী মৌসুমে নিজের জমিতে জি-নাইন কলার বাগান করার পরিকল্পনা করছেন। কৃষি বিভাগের ধারাবাহিক সহযোগিতা অব্যাহত থাকলে বাহুবলে বাণিজ্যিকভাবে জি-নাইন কলার চাষ দ্রুত সম্প্রসারিত হবে বলে তারা আশা প্রকাশ করেন।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহার, উন্নত জাতের চারা, কৃষি বিভাগের নিবিড় তদারকি এবং কৃষকদের আন্তরিক প্রচেষ্টার সমন্বয়ে জি-নাইন কলা বাহুবলের কৃষিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। এ সফলতা অন্য কৃষকদের জন্যও অনুপ্রেরণা হয়ে উঠবে এবং ভবিষ্যতে দেশের ফল উৎপাদন ও রপ্তানি খাতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম হবে।