
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা না করেই নির্বাচন কমিশন (ইসি) ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের সময়সূচি ঘোষণা করেছে। তবে এ বিষয়ে সরকার কিছুই জানে না বলে জানিয়েছেন স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। গতকাল মঙ্গলবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী এ কথা জানান।
মীর শাহে আলম বলেন, 'বিভিন্ন পত্র-পত্রিকার মাধ্যমে জানতে পারি- নির্বাচন কমিশন স্থানীয় সরকার নির্বাচনের কয়েক ধাপের তারিখ ঘোষণা করেছে। এ ব্যাপারে সরকার কিছু জানে না, সকারের সঙ্গে কোনো পত্র যোগাযোগ বা অন্যকোনো মাধ্যমে আলোচনা হয়নি।'
তিনি আরও বলেন, নির্বাচন কমিশন স্বাধীন, 'তাদের (ইসি) সাংবিধানিক ক্ষমতা আছে নির্বাচন করার, কিন্তু স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী সরকারের সঙ্গে আলোচনার পর প্রস্তুতি সভা বা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভা করার পর তারা (নির্বাচন কমিশন) নির্বাচনের তারিখ ও বাজেট ঘোষণা করে। আবারও বলছি, নির্বাচন কমিশন যে তারিখ গুলি ঘোষণা করেছে এ ব্যাপারে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় এবং সরকারের সঙ্গে কোন আলোচনা হয়নি এবং সরকার এ ব্যাপারে কিছু জানে না।'
এর আগে গত সোমবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাছউদ নভেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা জানান।
ইউপি নির্বাচনের ঘোষিত সূচি 'একেবারেই প্রাথমিক' : সাত ধাপে ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের যে সম্ভাব্য সময় নির্ধারণ করা হয়েছে, তা একেবারেই প্রাথমিক সময়সূচি বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদ। তিনি বলেছেন, ১৭ সেপ্টেম্বর অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনার পর সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হবে। গতকাল মঙ্গলবার নির্বাচন ভবনে সাংবাদিকদের এ কথা জানান আখতার আহমেদ।
এর আগে গত সোমবার সাত দফায় নির্বাচনের সম্ভাব্য সময়সূচি ঘোষণা করেছিল নির্বাচন কমিশন। আজ সকালে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম সাংবাদিকদের বলেন, তাঁরা পত্রিকা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও টেলিভিশনগুলোতে দেখেছেন, নির্বাচন কমিশন কয়েক ধাপের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেছে। এ ব্যাপারে সরকার কিছু জানে না এবং সরকারের সঙ্গে ইসির কোনো পত্র যোগাযোগ বা অন্য কোনোভাবে আলোচনা হয়নি। স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রীর এ বক্তব্যের কিছু সময় পর নির্বাচন কমিশনের অবস্থান স্পষ্ট করেন ইসি সচিব আখতার আহমেদ। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ইসি সচিব বলেন, গতকালই এ বিষয়ে বিস্তারিত বলা হয়েছে। সাংবাদিকদের কৌতূহলের কারণে তিনি বিষয়টি স্পস্ট করছেন।
ইসি সচিব বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন হবে, এটি নিশ্চিত। তবে নির্বাচন কবে এবং কী পদ্ধতিতে বা কোন পর্যায়ে হবে, তা নিয়ে কমিশনে দুই দিন ধরে প্রাক্?-প্রস্তুতিমূলক আলোচনা হয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় গতকাল একটি টেন্টেটিভ (প্রাথমিক) সময়সূচি করা হয়েছে। সেখানে পাঁচটি ধাপে নির্বাচন আয়োজনের কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি দুটি ধাপ রিজার্ভ রাখা হয়েছে। তবে এটি একেবারেই প্রাথমিক সময়সূচি। ১৭ সেপ্টেম্বর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে বৈঠকের পর স্থানীয় নির্বাচনের সময়সূচি চূড়ান্ত করা হবে।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের মন্তব্যের বিষয়ে কোনো পাল্টা মন্তব্য করতে রাজি হননি ইসি সচিব। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ইসি সচিব বলেন, 'উনি যেটা বলেছেন, সেটা শিরোধার্য। তবে এ বিষয়ে পাল্টা কোনো মন্তব্য করার ধৃষ্টতা আমি দেখাব না। নো কমেন্টস ফ্রম মাই সাইড।'
মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন প্রয়োজন হবে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে ইসি সচিব বলেন, ১৭ সেপ্টেম্বরের বৈঠকের পর প্রয়োজনীয় ইনপুট পাওয়ার ভিত্তিতে কমিশনই এ বিষয়ে বিস্তারিত জানাবে।
সরকারের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে ইসি সচিব বলেন, আলোচনা তো একটা চলমান প্রক্রিয়া। কার সঙ্গে কখন, কীভাবে আলোচনা হয়েছে, এ বিষয়ে এ মুহূর্তে বাড়তি কোনো মন্তব্য করতে তিনি রাজি নন।
সরকার সিদ্ধান্ত নেবে ভোট কবে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে তথ্য উপদেষ্টা
স্থানীয় সরকার নির্বাচন কবে হবে, সে সিদ্ধান্ত সরকার নেবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান।
এই নির্বাচন আয়োজনের বিষয়ে ইসি 'একক কোনো এখতিয়ার নেই' জানিয়ে সরকারের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনার ওপর জোর দিয়েছেন তিনি।
জাহেদ উর রহমান বলেন, "এই ধরনের নির্বাচন অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে ইসিকে সরকারের সাথে আলোচনা ও সমন্বয় করেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সরকার সিদ্ধান্ত নেবে কবে নাগাদ নির্বাচন করবে।একটা টাইমলাইন তো আপনাদের কাছে জানানো হয়েছে মোটামুটি, সো এটাকে ফলো করে সরকার নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে কোলাবোরেট করে নির্বাচনে যাবে। নির্বাচন তো করবেই, নির্বাচন তো হবেই, এটা নিয়ে তো কোনো কনফিউশনের কিছু নেই।"
গতকাল মঙ্গলবার সরকারের বিভিন্ন কাজের অগ্রগতি নিয়ে সাপ্তাহিক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে কথা বলছিলেন তথ্য উপদেষ্টা।
চলতি বছরের ১২ নভেম্বর থেতে সাত ধাপে স্থানীয় সরকারের ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে নির্বাচন কমিশন। এদিকে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম মঙ্গলবার বলেছেন, ইউনিয়ন পরিষদের ভোটের সম্ভাব্য তারিখ ঘোষণার বিষয়ে সরকার 'কিছুই জানে না'।
এ বিষয়ে সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে জাহেদ উর রহমান বলেন, "নির্বাচন কমিশন সাংবিধানিকভাবে কেবল দুটি নির্বাচনের জন্য সরাসরি দায়িত্বপ্রাপ্ত— রাষ্ট্রপতি নির্বাচন এবং সংসদ নির্বাচন। অন্যান্য যত স্থানীয় নির্বাচন রয়েছে, সেগুলো নির্বাচন কমিশনকে সরকারের সঙ্গে কোলাবোরেট করেই করতে হবে।"
স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রীর দেওয়া বক্তব্যের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে উপদেষ্টা বলেন, প্রতিমন্ত্রী যেহেতু জানিয়েছেন যে এ বিষয়ে সরকারের কাছে এখনও তথ্য নেই, তাই সরকারের এই বক্তব্যকেই 'সঠিক ধরে নিতে হবে'।
"এবং উনিই জানেন যে সরকারের মধ্যে সিদ্ধান্ত হয়নি। আমি আবারও বলছি, এই নির্বাচনের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনকে সরকারের সাথে কোলাবোরেট করে করতে হবে।" অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, "ইসির ঘোষিত তারিখ চূড়ান্ত কি না বা নির্বাচন পেছাবে নাকি এগোবে, তা আলোচনার বিষয়।"
তবে বিষয়টিকে কোনো সরকারের সঙ্গে ইসির সংঘাত হিসেবে না দেখার আহ্বান জানিয়েছেন তথ্য উপদেষ্টা।
আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রকৃতি কেমন হবে জানতে চাইলে উপদেষ্টা বলেন, "এবার স্থানীয় নির্বাচনে কোনো রাজনৈতিক দল সরাসরি অংশ নিচ্ছে না, নির্বাচন সম্পূর্ণ ব্যক্তিভিত্তিক হবে।"
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের নির্বাচনের সমালোচনা করে তিনি বলেন, "আওয়ামী লীগের সময় স্থানীয় সরকারের প্রধান পদগুলোতে দলীয় প্রতীকে নির্বাচন হত। তবে আগামী লোকাল গভর্নমেন্ট ইলেকশনে কোনো দল সরাসরি অংশ নিচ্ছে না, এখানে প্রার্থীরা ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য নিয়ে নির্বাচন করবেন। ফলে কে কোনো দলের তা মুখ্য নয়।"
উন্মুক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ থাকায় নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হতে বাধ্য এবং এতে অতীতের মতো সুষ্ঠু প্রতিযোগিতার পরিবেশ ফিরে আসবে বলেও আশা করেন জাহেদ উর রহমান।
সংবাদ সম্মেলনে তথ্য অধিদপ্তরের প্রধান তথ্য কর্মকর্তা সৈয়দ আবদাল আহমদ এবং মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব মো. আলম মোস্তফা উপস্থিত ছিলেন।