
মাঠজুড়ে সারি সারি বেডের ওপর বিছানো মালচিং পলিথিন। সেখানে সবুজ পাতার ফাঁকে উঁকি দিচ্ছে লাউ, শশা, মরিচ, টমেটো, বেগুন, বারমাসি তরমুজসহ নানা জাতের সবজি। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, সবুজের ওপর একে দেয়া মনোরম এক নকশা। চোখ জুড়ানো এমন দৃশ্য এখন শরীয়তপুরের বিভিন্ন উপজেলায়। তবে জেলার শস্যভান্ডারখ্যাত জাজিরা উপজেলার আশি শতাংশের বেশি সবজি আবাদ হচ্ছে এই পদ্ধতিতে। আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহার ধীরে ধীরে বদলে দিচ্ছে বাণিজ্যিক কৃষির দৃশ্যপট। মালচিংয়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রযোজ্য জমিতে ফসল ভেদে মাচা ও পলিসেড পদ্ধতিও যুক্ত হওয়ায় অমৌসুমেও কৃষি আবাদে এখন দেখা দিয়েছে এক নতুন সম্ভাবনা। শরীয়তপুর কৃষি বিভাগ সূত্র জানিয়েছে, কৃষিনির্ভর এ জনপদে যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রচলিত কৃষির পাশাপাশি যুক্ত হচ্ছে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর চাষাবাদ। এরই ধারাবাহিকতায় প্রায় এক দশক আগে উপজেলা কৃষি বিভাগের উদ্যোগ ও সহযোগিতায় শুরু হয় মালচিং, মাচা ও সেড পদ্ধতিতে সবজি চাষ। প্রথম দিকে কৃষকদের মধ্যে এ পদ্ধতি নিয়ে তেমন একটা আগ্রহ পরিলক্ষিত হয়নি। তবে কৃষি বিভাগের ধারাবাহিক প্রচেষ্টা ও অনুপ্রেরণার ফলে এর সুফল দৃশ্যমান হওয়ায় এখন বদলে গেছে কৃষকদের মনোভাব। এখন অনেক কৃষকই বাণিজ্যিক কৃষিতে প্রচলিত পদ্ধতির পাশাপাশি মালচিং, মাচা ও সেড পদ্ধতির মাধ্যমে অমৌসুমেও সবজি চাষ করছেন। সরেজমিনে জানা গেছে, শুরুতে কিছুটা বাড়তি বিনিয়োগ প্রয়োজন হলেও পরবর্তী সময়ে সেচ ও সার কমলাগা এবং আগাছা দমনের খরচ নেই বললেই চলে। একইসঙ্গে রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ সহজ হওয়ায় উৎপাদন ব্যয় কমে নিরাপদ ও ভালো ফলন পাওয়া সম্ভব হচ্ছে। আধুনিক চাষাবাদের ফলে প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় এখন ২৫-৩০ শতাংশ ফলন বেশি হয়।
জাজিরা উপজেলার মুলনা ইউনিয়নের মিরাশার গ্রামের কৃষক রতন কাজী বলেন, মালচিং করার আগে জমির আগাছা পরিষ্কারের খরচই ছিল সবচাইতে বেশি। সবজি লাগানোর পর নিয়মিত আগাছা পরিষ্কার করতে হতো। এছাড়া সেচ ও সারের খরচও এখন কমে এসেছে। সবমিলে বছরে বিঘাপ্রতি ১২-১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত সাশ্রয় হচ্ছে। মালচিংয়ের জন্য প্রথমবার ৮-১০ হাজার টাকা খরচ হলেও পরবর্তীতে সেই খরচ তিন ভাগের দুই ভাগে নেমে আসে। মালচিং পদ্ধতির জমিতে ফলন যেমন বেশি হয় তেমনি সবজির মানও আগের চেয়ে অনেক ভালো। ফলে বাজারে চাহিদা বেশি থাকায় দামও ভালো পাই।
ভেদরগঞ্জ উপজেলার রামভদ্রপুর ইউনিয়নের কোড়ালতলি গ্রামের কৃষক বাবুল দালাল বলেন, ২০১৩ সালে যখন উপজেলা কৃষি স্যার আমাকে মালচিং পদ্ধতির কথা বলেছিলেন তখন প্রথমবার করতে তেমন একটা আগ্রহ ছিলনা। তবে শাখাওয়াত স্যারের অনুপ্রেরণায় প্রথম এক বিঘা জমিতে ৯ হাজার টাকা খরচ করে মালচিং পদ্ধতিতে বারমাসি তরমুজ আবাদ করি। ফলন ভালো হওয়ার পাশাপাশি জমির আগাছা পরিষ্কার করতে না হওয়ায় আমার সাশ্রয় হয় দশ হাজার টাকর বেশি। এতে আমার মোট লাভের পরিমাণও বেড়ে যায়। এর পর থেকে আমি মালচিং পদ্ধতির পাশাপাশি মাচা ও পলি সেডের মাধ্যমে নতুন নতুন ফসল চাষ শুরু করি। অমৌসুমে মারোমাসি তরমুজ, গ্রীস্মকালীন টমেটো, করলা ও শশা চাষ করে বেশ লাভবান হচ্ছি। আমি এখন মৌসুমের সবজি আবাদের চেয়ে অমৌসুমের সবজিতে বেশি মনোযোগী।