
মানবিকতার টানে নির্যাতিত ও বাস্তুচ্যুত প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছে বাংলাদেশ। জীবন বাঁচাতে নিজ দেশ ছেড়ে আসা এই বিপুলসংখ্যক মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ। এই সংকটের ভার বাংলাদেশের একার পক্ষে বহন করা সম্ভব নয়, আর এমন প্রত্যাশা করাও উচিত নয়।
দীর্ঘদিন ধরে এই মানবিক দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে দেশের সম্পদ, পরিবেশ, সামাজিক স্থিতিশীলতা ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার ওপর বাড়ছে চাপ। তাই রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে। তুরস্কের ইস্তান্বুলে 'আন্তর্জাতিক জাস্টিস সামিট-ইস্তান্বুল, ২০২৬'-এর উদ্বোধনী অধিবেশনে এসব কথা বলেছেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান।
গত বৃহস্পতিবার সম্মেলনে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমারে। তাই এই সংকটের টেকসই সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সম্মিলিত দায়িত্ব পালন করতে হবে। রোহিঙ্গাদের মর্যাদা, নাগরিকত্ব ও শান্তিপূর্ণ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। রোহিঙ্গা সংকটে তুরস্কের সহযোগিতার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে আইনমন্ত্রী বলেন, সংকটের শুরু থেকেই তুরস্ক বাংলাদেশের পাশে রয়েছে। কক্সবাজারে তুরস্কের ফার্স্ট লেডি এমিনে এরদোয়ানের সফর এবং সংকট সমাধানে দেশটির ধারাবাহিক কূটনৈতিক সম্পৃক্ততা বাংলাদেশ কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করে। তবে শুধু সংহতি প্রকাশ নয়, এই সহযোগিতাকে আরও টেকসই ও কার্যকর পদক্ষেপে রূপ দিতে হবে।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ তুলে আইনমন্ত্রী বলেন, ওই সময়ে বাংলাদেশে ১ হাজার ৪০০'র বেশি মানুষ নিহত এবং প্রায় ৩০ হাজার মানুষ আহত হয়েছেন। নিহত ও আহতদের অধিকাংশই ছিলেন শিক্ষার্থী ও শ্রমজীবী মানুষ। চাকরি ও সরকারি সেবায় বৈষম্যের বিরুদ্ধে তারা নিজেদের দাবি ও প্রতিবাদ তুলে ধরেছিলেন। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক দপ্তরের ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং প্রতিবেদনেও এসব ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। আসাদুজ্জামান বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার বাংলাদেশে আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন ও মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ব্যাপক ও পদ্ধতিগত গুম এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক বিরোধ নিষ্পত্তির গুরুত্ব তুলে ধরে আইনমন্ত্রী বলেন, বিদেশি বিনিয়োগ, সীমান্ত নির্ধারণ, জ্বালানি বাজার, মেধাস্বত্ব এবং চুক্তিগত বাধ্যবাধকতা লঙ্ঘনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে আন্তঃসীমান্ত বিরোধ বাড়ছে। এসব বিরোধ দ্রুত ও কার্যকরভাবে নিষ্পত্তিতে আন্তর্জাতিক সালিশি ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের সংবিধানের ২৫ অনুচ্ছেদে আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধা এবং আন্তর্জাতিক বিরোধের শান্তিপূর্ণ নিষ্পত্তিকে রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম মৌলিক নীতি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা আরও জোরদার করতে বাংলাদেশ বাণিজ্যিক বিরোধ নিষ্পত্তির আইনি কাঠামো শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা যেন শুধু ক্ষমতাবান ও আর্থিকভাবে সামর্থ্যবানদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, সে বিষয়ে সতর্ক করেন আইনমন্ত্রী। তাঁর মতে, এই ব্যবস্থা হতে হবে সাশ্রয়ী, স্বচ্ছ ও ন্যায়সংগত। ন্যায়বিচার কখনো এমন সুযোগ হতে পারে না, যা কেবল ক্ষমতাবানদের নাগালে থাকে।
বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক ফোরামগুলোর সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দিয়ে আইনমন্ত্রী বলেন, বিশ্ব এখন শুধু অপূর্ণ রাজনৈতিক বক্তব্য ও প্রতিশ্রুতিতে ক্লান্ত। বড় বড় ঘোষণা বাস্তুচ্যুত মানুষের দুর্ভোগ দূর করতে পারে না, ডিজিটাল একচেটিয়াত্ব বন্ধ করতে পারে না কিংবা নিপীড়নের ক্ষত সারিয়ে তুলতে পারে না। তিনি বলেন, এখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়। এমন একটি বৈশ্বিক দায়িত্ববণ্টন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যার মাধ্যমে কোনো দেশের একার পক্ষে সমাধান করা সম্ভব নয় এমন সংকটগুলো সম্মিলিতভাবে মোকাবিলা করা যায়। আইনমন্ত্রী আরও বলেন, ইস্তান্বুল সামিটের মতো আয়োজন বিভিন্ন দেশের নীতিনির্ধারক, বিচারক, আইনজ্ঞ ও বিশেষজ্ঞদের অভিজ্ঞতা বিনিময়ের সুযোগ তৈরি করে। সম্মিলিত আলোচনা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে আরও ন্যায়সংগত, কার্যকর এবং বৈশ্বিক পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বিচারব্যবস্থা গড়ে তোলার বাস্তবসম্মত পথ নির্ধারণ করা সম্ভব।