
কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার মাইজখার ইউনিয়নের বুক চিরে হেঁটে গেলে চোখে পড়ে এক অপূর্ব সবুজ দৃশ্যপট। গ্রামের বিস্তীর্ণ জমি জুড়ে সবজির সমারোহ, যার মধ্যে সবচেয়ে উজ্জ্বল ও লাভজনক ফসলটি হলো কচুর লতি। গ্রামের নাম কামারখোলা। নাম শুনে একসময় প্রথাগত কোনো পেশার ছাপ মনে এলেও, বর্তমানে কামারখোলা মানেই সবজি চাষের এক বিশাল বিপ্লব। এই গ্রামের মাটি যেন সোনা ফলায়, আর সেই মাটিতে মেধা ও শ্রম ঢেলে ভাগ্য বদলে ফেলেছেন স্থানীয় কৃষকেরা। এখানে টমেটো, শসা ও কচুর চাষ নিয়মিত হলেও লতি চাষ এই গ্রামকে অনন্য এক পরিচিতি এনে দিয়েছে। কামারখোলা গ্রামের প্রতিটি পরিবার যেন কোনো না কোনোভাবে সবজি চাষের সঙ্গে যুক্ত। ভোরের আলো ফোটার আগেই মাঠে নেমে পড়েন চাষীরা। নিবিড় পরিচর্যার পর জমি থেকে তাজা কচুর লতি তোলার মধ্য দিয়েই শুরু হয় তাদের দৈনন্দিন ব্যস্ততা। লতি তোলা, যত্ন করে আঁটি বাঁধা এবং বাজারে পাঠানোর উপযোগ করার এই ব্যস্ততায় গ্রামটিতে এক উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়। কৃষকদের কাছ থেকে জানা যায়, এই এলাকার মাটি ও আবহাওয়া কচু ও লতি চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। তুলনামূলক কম খরচে এবং কম সময়ে ভালো ফলন পাওয়া যায় বলেই গ্রামের চাষীরা লতি চাষে মুখরিত থাকেন পুরো মৌসুম জুড়ে। কামারখোলার সবজি চাষ শুধু উৎপাদনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এখানে গড়ে উঠেছে চমৎকার এক স্থানীয় বাজারব্যবস্থা ও বাণিজ্যিক শৃঙ্খল। ছোট ছোট প্রান্তিক চাষীরা তাদের কষ্টার্জিত ফসল সরাসরি স্থানীয় পাইকারদের কাছে বিক্রি করে থাকেন। মাঠ থেকে তোলা সতেজ কচুর লতি পাইকারি বাজারে বিক্রি হয় কেজি প্রতি প্রায় ২০ থেকে ২৫ টাকা দরে। তাৎক্ষণিক নগদ টাকা হাতে পেয়ে ক্ষুদ্র কৃষকেরাও খুশি মনে বাড়ি ফেরেন, যা তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে সরাসরি ভূমিকা রাখছে। এই ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেন গ্রামের মাঝারি ও বড় ব্যবসায়ী বা পাইকাররা। তারা ক্ষুদ্র চাষীদের থেকে সংগৃহীত লতি এক জায়গায় জড়ো করেন। তারপর যত্ন সহকারে প্রক্রিয়াজাত করে ও বস্তাবন্দী করে পাঠানোর প্রস্তুতি নেন বিভিন্ন জেলায়। রাজধানী ঢাকা, উপকূলীয় নোয়াখালী কিংবা বন্দরনগরী চট্টগ্রামের বড় বড় আড়তে এই লতি পৌঁছে যায় অত্যন্ত দ্রুতির সাথে। বিভিন্ন জেলার পাইকারি আড়ৎদারদের কাছে এই লতি বিক্রি হয় কেজি প্রতি ৩৫ থেকে ৪০ টাকা দরে। ফলে উৎপাদনকারী গ্রাম কামারখোলা থেকে শুরু করে দূরদূরান্তের বাজার পর্যন্ত একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক মেলবন্ধন তৈরি হয়েছে। কামারখোলার লতি বিপ্লব শুধু গুটিকয়েক কৃষকের উন্নতি ঘটায়নি, পুরো এলাকার অর্থনীতিতেই এনেছে এক নতুন উদ্দীপনা। একদিকে যেমন স্থানীয় বাজারে তরতাজা সবজির সরবরাহ বজায় থাকছে, অন্যদিকে দেশের বড় বড় শহরে সুস্বাদু ও পুষ্টিকর খাদ্য পৌঁছে দিচ্ছেন এই গ্রামের পরিশ্রমী মানুষগুলো। একসময় যেখানে অনিশ্চয়তা ছিল, সেখানে আজ কামারখোলার চাষীদের মুখে ফুটেছে স্বাবলম্বিতার চওড়া হাসি। প্রাকৃতিক রূপ আর মানুষের মেহনতের এমন অপূর্ব মেলবন্ধন সচরাচর দেখা যায় না। চান্দিনার কামারখোলা গ্রাম প্রমাণ করে দিয়েছে যে, সঠিক উদ্যোগ ও একনিষ্ঠ শ্রম থাকলে নিজের মাটিকে সম্বল করেই আত্মকর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন করা সম্ভব। সবুজ মাঠের এই লতি কেবল একটি সবজি নয়, এটি কামারখোলার শত শত কৃষকের ঘাম ঝরানো স্বপ্নের সফল রূপায়ণ।